ডক্টর গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য জীবনে মরণে বাংলাদেশি

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৭:০৩, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৮, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল পঁচানব্বনই। জন্ম ১৯২৪ সালে। মারা গেছেন কলকাতার বালিগঞ্জের একটি নার্সিং হোমে। মৃত্যুর খবর দিয়েছেন গায়ক মঈন চৌধুরী, যিনি ‘পিটু’ নামে বার্লিনে অধিক পরিচিত। তিনি খবর পেয়েছেন কবি মিতালী মুখোপাধ্যায়ের টেলিফোনে। তারও বাস বার্লিনে। মঈন চৌধুরী ওরফে পিটু বাংলাদেশের। একদা উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিতালী মুখোপাধ্যায় কলকাতার।

পরিণত বয়সেই গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য মারা গেছেন, এই সংবাদ পিটু জানান মোবাইল ফোনে।

কে এই গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য? বাংলাদেশের, এমন কী কলকাতার সাধারণ পাঠকেরও তা অজানা। ইতিহাস নিয়ে যাদের ভাবনাচিন্তা—বিশেষত পুরাতত্ত্ব, প্রাচীন মূর্তি, পাথুরেলেখ, পুরনো মুদ্রা—তারা জানেন গৌরীশ্বর ভট্টাচার্যকে। জানেন, তিনি কতটা অথরিটি ছিলেন। জানেন, প্রাচীন শিল্পকলার ‘চলন্তিকা’ (তথা অভিধান)। বাংলাদেশে যখন ন্যাশনাল মিউজিয়াম হাঁটি-হাঁটি পা পা, জাতীয় যাদুঘরের অধ্যক্ষ (পরিচালক) ডক্টর এনামুল হক নির্দ্বিধায় বেছে নেন গৌরীশ্বর ভট্টাচার্যকে। পয়লা পরামর্শক হিসেবে। ছুটে যান এনামুল হকের আহ্বানে। ছিলেন মাসাধিক। তারই তত্ত্বাবধানে মহাস্থানগড়, চট্টগ্রামের বৌদ্ধ পুরাকীর্তির বহু দুর্লভ ও প্রাচীন মূর্তির সন্ধান এবং উদ্ধার। বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছেন মিউজিয়ামের জার্নালে। লিখেছেন ইংরেজি ভাষায়। তার লেখা ভারতের এবং পৃথিবীর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত। ‘কেন বাংলায় লেখেন না?’ প্রশ্ন করলে অমায়িক উত্তর : ‘বাংলার পাঠকের এই-বিষয়ে গুরুগম্ভীর লেখা পাঠে অনীহা। তাছাড়া, বিষয়টি বিদেশি পুরাতত্ত্বের বিশেষজ্ঞদের জন্য লেখা, যাদের কাজে লাগবে গবেষণায়।’ ঠিকই বলতেন। ১৯৮৭ সাল থেকে বার্লিনে তার সান্নিধ্যে, দেখেছি বিশ্বের নানা দেশের পুরাতত্ত্ব, প্রাচীন মুদ্রা, পাথুরেলেখ (শিলালেখ), মূর্তি নিয়ে গবেষক গৌরীশ্বর ভট্টাচার্যের দ্বারস্থ।

ক্ষোভ ছিলো আমাদের, এখনো আছে, গ্রন্থাকারে কোনো লেখা প্রকাশ করেননি। দেশবিদেশের প্রকাশকের আগ্রহ সত্ত্বেও। তার ছাত্রছাত্রীরা অভিযোগ করলে মৃদু হেসে একটিই কথা, ‘জার্নাল কিনে পড়, জার্নালের বিক্রি হবে। সাধারণ পাঠক জার্নাল কেনে না।’

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বার্লিনের ভারতীয় মিউজিয়ামের শিল্পকলার ক্যাটালগ তৈরি করা। করেছেন ১৯৭১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। চাট্টিখানি কথা নয়। নিরলস পরিশ্রম। ক্যাটালগ তৈরির কাজে ছুটতে হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কেবল কাজ নয়, বিভিন্ন দেশের মিউজিয়ামে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার কথায় ‘বগ্‌ বগ্‌ করেছি’; অর্থাৎ বক্তৃতা। পড়িয়েছেন বার্লিন ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহু বছর। তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি, সব লেখাই জার্নালে। হোক তা। তাকে সম্মানিত করেছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে নিয়ে নানাজনের লেখায় ‘ফেলিসিটেড’ গ্রন্থ প্রকাশিত। জীবিতকালেই। মহাসম্মানিত গ্রন্থ।

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্যের জন্ম রাজশাহী* (ভুল করছি কী?)। যৌবনের শুরু থেকেই ভবঘুরে। শান্তিনিকেতনের (বিশ্বভারতী) পাঠ শেষ করেই লাপাত্তা। দেরাদুনে গিয়ে কিছুদিন উচ্চশিক্ষা। দেরাদুন থেকে উধাও। ইউরোপের নানা দেশ ঘুরে সুইৎসারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ। পিএইচডি করেন দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে (১৯৬৭ সাল), হয়ে যান ‘ডক্টর গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য।’ নিজেকে নিয়ে তাচ্ছিল্য, ‘ধ্যেৎ, এরকম ডক্টরেট বিশ্বের নানাপ্রান্তে ভূরি ভূরি।’

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য বহু ভাষাবিদও। সংস্কৃত খুব ভালো জানতেন। বাংলা ভাষায় সুপণ্ডিত। ব্যাকরণে একটু ভুল হলে রেহাই নেই। ‘লক্ষ এবং লক্ষ্য বানানে পার্থক্য কী জানো? ব্যাকরণের ইয়প প্রত্যয় শেখো।’ একবার চমকে দেন, ‘রবীন্দ্রনাথও ভুল বাংলা লিখেছেন। আমি বলেছিলাম, আমি করেছিলাম, আমি শুনেছিলাম-এর মধ্যেই আমি যুক্ত। ছিলাম-এ আমি। রবীন্দ্রনাথের এই অভ্যেস বাল্যবয়সে গান লেখায়। আমির প্রাধান্য। শেষাবধি ছাড়তে পারেননি।’

গোরীশ্বর ভট্টাচার্যের আত্মীয়কুল বাংলার গৌরব। তার ভাগ্নেভাগ্নিকুলে কবি মণীশ ঘটক, চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক, কথাশিল্পী মহাশ্বেতা দেবী।

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য চিরকুমার, ‘আপনার কুমারত্ব সন্দেহজনক, এত বান্ধবী কেন?’ এই প্রশ্নে উত্তর : ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।’ কে কখন ধরা পড়ে খোলাসা করতে নারাজ, ‘নারীপুরুষ এক দোঁহে বাঁধা’, বলতেন।

বাংলাদেশের বহু ছাত্রছাত্রী, যারা বার্লিনে একদা ছিলেন, পড়েছেন এবং অছাত্রছাত্রীও তার কাছে ঋণী। আর্থিক সাহায্যই শুধু নয়, সুখদুঃখে সাথী, পরম আত্মিক। তিনি ছিলেন প্রত্যেকের অভিভাবক। একবার তার কাছ থেকে একশ ইউরো ধার নিয়েছিলুম, শোধ করতে গেলে বলেন, ‘না, না দিতে হবে না। লটারি জিতলে দিও। আমি জীবনভর বাংলাদেশি, মরণেও।’

গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য মারা গেছেন, এই বিদেশবিভূঁইয়ে আমাদের অভিভাবক নেই, আমরা এতিম।

* মালদা—সম্পাদক

//জেডএস//

লাইভ

টপ