কে কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

Send
আবীর আদনান
প্রকাশিত : ১৬:২৭, অক্টোবর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৬, অক্টোবর ০৩, ২০১৯

আগামী ১০ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হতে যাচ্ছে—এই সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনে একটাই প্রশ্ন জাগবে, কে পাচ্ছেন?

প্রশ্ন যত সহজ, উত্তর তত নয়। তবে একই দিনে দুজন লেখক নোবেল লরিয়েট হবেন এটা পাঠকের কাছে অনেক উত্তজনার বিষয়।

প্রতিবছর এই সময় নোবেল নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলে। কেউ কেউ সেইসব লেখকদের নাম সামনে হাজির করেন যারা এখনো ‘জীবিত’ আছেন, মানে যাদের নোবেল দেয়া উচিৎ বলে বিশ্বের পাঠকেরা মনে করেন।

কিন্তু সুইডিশ একাডেমি কারো অনুমান সত্য হতে দিচ্ছে না বা কারো ঔচিত্যের ধারও ধারছে না। সুইডিশ একাডেমি যখন লিও তলস্তয়কে নোবেল না দিয়ে সমালোচনার কাঁটা গিলে ফেলতে পেরেছে, তখন আর কি বলা!

তবে কয়েক বছর ধরে হয়ত স্নায়ুর চাপ সবচেয়ে বেশি সহ্য করছেন জাপানি ভাষার লেখক হারুকি মুরাকামি, এবং তার ভক্তরা।

গত বছর যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার স্তগিত করে নোবেল কমিটি বলেছিলো ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ীর নামের সাথে একসাথে ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এক বছরের জন্য থেমে থাকলেও সুইডিশ সোসাইটির ১০০ সদস্য মিলে সাহিত্যে নোবেলের পরিবর্তে শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জন্য ‘নিউ একাডেমি প্রাইজ’ প্রবর্তন করেন। সেই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ফ্রান্সের জনপ্রিয় লেখক ও বিখ্যাত সেগু উপন্যাসের লেখক ম্যারিস কোনডে, ব্রিটিশ লেখক নীল গাইমান, ভিয়েতনামে জন্মগ্রহণকারী কানাডিয়ান লেখক কিম থুয়ে-এর সাথে মুরাকামির নাম ছিলো। কিন্তু মুরাকামি নিজের নাম প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে নোবেলের বিকল্প হিসেবে নিউ একাডেমি প্রাইজকে আমি সমর্থন করছি না।’ অনুমান করা যায় অন্য কোনো বিকল্প গ্রহণ করে তিনি নোবেলের সম্ভবনা পায়ে ঠেলতে চান না।

সাহিত্যিকের ভৌগলিক অবস্থান, ভাষা, লিঙ্গ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিবেচনা করে সাধারণত অনুমান করা হয়, যে বছর চীনের মো ইয়ান পুরস্কার পেলেন, তখন সবাই ধরে নিলেন মুরাকামি তো বহু দূর, কোনো এশিয়ান এই পুরস্কার আপাতত পাবেন কিনা সন্দেহ।

বিশ্বের অন্যান্য পুরস্কারের বেলায় দীর্ঘ তালিকা, সংক্ষিপ্ত তালিকা এবং বিচারকদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু নোবেলের বেলায় দ্বার রুদ্ধ। কাজেই অনুমান করা খুবই কঠিন।

মুরাকামির দিকে নোবেল কমিটি দৃষ্টি না দিলেও রয়েছেন সিরিয়ার কবি অ্যাদোনিস, কেনিয়ার কথাসাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, আমেরিকার কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস, আলবেনিয়ার লেখক ইসমাইল কাদারে, স্প্যানিস ঔপন্যাসিক হাভিয়ার মারিয়াস, নরওয়ের নাট্যকার জন ফসে, দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন বানভিল প্রমুখ।

অ্যাদোনিসের নাম ল্যাডব্রক্সের বাজির তালিকায় অবস্থান করছে অনেক বছর ধরে। এছাড়াও অ্যাদোনিসের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ আরব বিশ্বে তারচেয়ে প্রভাবশালী কবি আর কেউ নেই।

চিনুয়া আচেবের চেয়ে বয়সে প্রায় এক দশকের ছোট নগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো। নোবেল কমিটি আচেবেকে সম্মানীত করতে পারেনি, কিন্তু নগুগির মতো একজন শক্তিশালী ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ যিনি আফ্রিকার সাহিত্যের আন্তর্জাতিক লেখকদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন, বিশেষ করে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের লেখকদের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তাকে নিশ্চয়ই আমরা নোবেল কমিটির বিস্মৃতির জলে ডুবে থাকতে দেখতে চাই না।

১৯৮৬ সালে নাইজেরিয়ার নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক ওলে সোয়েঙ্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, এবং ২০০৩ সালে জে এম কোয়েটজি, এরমধ্যে আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান এই পুরস্কার পাননি। সুতরাং নগুগি এবার পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আমেরিকার আরেক কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস বহুলপ্রজ লেখক। আমেরিকার সমসাময়িক ভূবনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তার লেখার প্রধান বিষয়। টনি মরিসন ১৯৯৩ সালে নোবেল পাবার পর দু’যুগেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এবার ওটস কিংবা আর কোনো আমেরিকান নোবেল পেতেই পারেন। তবে ভৌগলিক ও লিঙ্গ বিচারে প্রতিবেশি দেশ কানাডার নারী লেখক এলিস মুনরো দু’বছর আগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে আমেরিকার নারী লেখক জয়েস ক্যারল ওটসের সম্ভাবনা একটু কমেও যেতে পারে। তাছাড়া ২০১৫ সালে আরেক নারী লেখক সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভস তো পেলেনই। 

তাছাড়া আমেরিকার কথা কিংবা শুধু ইংরেজির কথা উঠলে ডন ডেলিলোর নাম আসতেও পারে। সমসাময়িক মানুষের জটিল জীবনের বয়ান খুব নিচু স্বরে তুলে ধরেন তিনি।

আলবেনিয়ার জ্যেষ্ঠ লেখক, কবি ও কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে এবার নোবেল পাচ্ছেন কিনা? হ্যাঁ, এটাও চিন্তার বিষয়। ষাটের দশক থেকেই তিনি আলবেনিয়ার প্রভাবশালী এবং নেতৃস্থানীয় লেখক। ১৯৬৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’ প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাদারে কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার এই উপন্যাসটিই তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। এছাড়া কয়েক দশক জুড়ে তার নামটি পাঠকদের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে।

মিলান কুন্ডেরা নোবেল পাননি? হায় হায় বলে কি! হ্যাঁ, তিনিও ‘জীবিত’ লেখকদের একজন, যাকে পুরস্কার দিয়ে সুইডিশ একাডেমি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে।

ফ্রান্স-প্রবাসী চেক কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা জনপ্রিয়তার মাপকাঠি পার হয়ে গেছেন বহু আগেই। তবু এক অজানা কারণে পিছিয়ে আছেন কয়েক দশক ধরে। তার নাম আর কেউ বলছেন না। তিনি এই বয়সে এসে নোবেল পেলে পাঠকের আনন্দের সীমা থাকবে না।

মো ইয়ান পেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার বর্ষীয়ান কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে তা নয়। বরং কথাসাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের বিশাল কাতারের মাঝে কবিতার রং লাগতে পারে কো উনকে নিয়ে। সুতরাং এশিয়াবাসী সংগত কারণেই আশা করতে পারেন, কো উনকে নিয়ে।

বয়সের বিচারে নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচির নাম কিন্তু উচ্চারিত হয়েছে কারো কারো মুখে। তার বয়স কম হলেও এই বয়সে তার লেখার ওজন কোনো দিক থেকেই কম নয়। আচেবের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি।

এছাড়াও মিশরের নারী লেখক নাওয়াল আল সাদাউই, হাঙ্গেরির ঔপন্যিাসিক-নাট্যকার পিটার নাদাস, সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী, রুশ কথাসাহিত্যিক মিখাইল শিসকিন, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কারো নাম নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে উচ্চারিত হতেই পারে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। 

আগামী ১০ অক্টোবর  সাহিত্যে আমরা দুজন নোবেল লরিয়েটকে পাচ্ছি। তার আগ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপতো সহ্য করতেই হবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ