ঢাকায় আর্টের ক্রিটিসিজম বলে কিছু নাই: মনিরুল ইসলাম

Send
কারু তিতাস, চিত্রশিল্পী
প্রকাশিত : ১৪:০৫, অক্টোবর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪২, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

মনিরুল ইসলাম। ছবি- সংগৃহীত।মনিরুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশি কিংবদন্তি চিত্রকর। জন্ম জামালপুর জেলার ইসলামপুরে। ঢাকা চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে পাঠ শেষে সেখানে শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে সে দেশে যান উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য। এরপর থেকে সেখানেই স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করছেন। স্পেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার বহু একক ও যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন বিশ্বের বিভিন্ন আর্টফেয়ার ও এক্সিবিশনের বিচারক তিনি। তবে এই কৃতি বিশেষভাবে খ্যাতিমান তার ছাপচিত্রের জন্য। এচিংয়ে তিনি এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে মনিরোর স্কুল বলে পরিচিত। ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক পান। ২০১০ সালে তিনি ভূষিত হন স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা রানি ইসাবেলার নামাঙ্কিত দ্য ক্রস অব দ্য অফিসার অব দি অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা-তে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তিনি দেশে ১৯৯৯ সালে একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বরেণ্য এ মানুষটি গত সপ্তাহে কথা বলেছেন চিত্রকলায় তার দর্শন ও জার্নি নিয়ে। তার কথায় উঠে এসেছে জয়নুল আবেদিন, রফিকুন নবীসহ অনেকে। পাঠকদের জন্য থাকছে এই কথোপকথন- 

কারু তিতাস: আপনার স্পেশালাইজড ফরম নিয়ে আলাপ করতে চাই, বিশেষ করে এচিংয়ে ‘মনিরোর স্কুল’ বলে যে ধারা আপনি স্পেনে প্রবর্তন করেছেন সেটার আদ্যোপান্ত জানতে চাই।

মনিরুল ইসলাম: ১৯৬৯ সালে স্পেন সরকারের স্কলারশিপ পেলাম। তখন তো পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কোনও ভেদাভেদ ছিল না; একমাত্র গভার্মেন্ট হাউজ ছাড়া। ৬৯ সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা। সত্তর থেকে দুই পাকি​স্তানে (পূর্ব​ ও পশ্চিম)​ দামামা বাজতে লাগল। যাক​ ​ওই অবস্থায় একটা স্কলারশিপ! সরকারি স্কলারশিপ ছিল এটা, নট মেরিট। ডিপলোমেসিক স্কলারশিপ। পাকিস্তানের সঙ্গে স্পেনের সঙ্গে কালচারাল বিনিময় আরকি। ৯ মাসের জন্য এটা ছিল।

ঐ সময়ে স্কলারশিপ পাওয়াটা আসলে খুব কঠিন ছিল। রফিকুন নবী ছিলেন আমার সিনিয়র শিক্ষক। বয়সে চার মাসের ছোট তিনি। কিন্তু একাডেমিকভাবে তিনি আমার সিনিয়র। আসলে মেট্রিক ফেল করেছিলাম। কাছের কিছু মানুষ না থাকলে আমি হয়তো তিনবার মেট্রিক ফেল করতাম। ৫৮-এ মেট্রিক​ দিলাম।​ ফেল করলাম। আন​অ্যালাউড হলাম। হেড স্যার বললেন, ডিজঅ্যালাউ তো হোসনি। এটা হলো বিপদ হতো।

জীবনানন্দ দাশের একটা লাইন আছে, ‌‘জীবনের গভীরতম বেদনার মধুরতম প্রকাশের নামই হলো আনন্দ।’

তখন (স্কুলের সময়) খুব ক্রশিয়াল সময় ছিল। ​​সাজেশনের জন্য​ ​​সবাই বলত, ‘ওকে ধর​,​ ওকে ধর’। ​তারপর পরীক্ষায় নকল করতাম। এমনও হয়েছে, ৩০টি রচনা পকেটে করে নিয়ে গিয়েছি​;​ একটাও কমন পড়েনি। কলমে গায়ে সুঁই দিয়ে নকল করতাম। সে এক কঠিন বিষয়!

লাইফ একটা অন্যরকম বিষয়​,​ মানুষের জন্য। এক সেকেন্ডর জন্য​​ ​ পুরো ক্যারিয়ার ১৮০ ডিগ্রি চেঞ্জ হয়ে যেতে পারে। সেটা আমার হয়েছে।

আমি টিচার ছিলাম। রফিকুন নবী আমার সিনিয়র টিচার। একদিন করিডোরে হাঁটছি। বললেন, ‌‘ওই মনির​,​ যাবা নাকি স্পেনে?’ আমি ভেবেছিলাম ফান। বললাম, ‘আপনি যান না!’ বললেন, ‘দেখ না, ১৫ বছর ধরে শুধু ফরমই লিখছি।’

আর একটা বিষয় সেসময়টাতে যত স্কলারশিপ হতো তার ঠিক ৭ দিন আগে ইস্ট পাকিস্তানে প্রকাশ হতো। অনেক ফর্মালিটি করতে হতো। সময় কম পাওয়া যেত। তখন বাইরে যাওয়াটা মিরাকল-ই বলা যায়।

মুর্তজা বশীর, কিবরিয়া সাহেব গেছেন। তারা সরাসরি গেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যাওয়াটা বিরাট বিষয়।

মনিরুল ইসলামকারু তিতাস: বাংলাদেশে এচিংয়ের এই ধারা প্রবর্তনের কোনও সুযোগ পেয়েছিলেন কী? নাকি অন্য কোনও ফরমেশনে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু দিতে চান?

মনিরুল ইসলাম: বর্তমানে যে অবস্থা, তখন সব কিছু অতটা সহজলভ্য ছিল না। এখন যে স্কোপটা দেখার, বোঝার; আমাদের সময়ে তা ছিল না। আমরা কখনও অরিজিনাল পেইন্টিং দেখিনি। কোনও গ্যালারি ছিল না।

প্রথম মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম এক্সিবিশন করলেন। মডার্ন আর্ট  তারা নিয়ে আসলেন। এই প্রথম দেখলাম।

সিনেমার ব্যানার দেখতাম। এগুলো আমার ইস্পিপিরিশন। আর্টপিস। দিল্লি মিউজিয়ামে মধুবালার (নায়িকা) একটা পোস্টার দেখলাম। সব ছবি যেন ম্লান। অরিজিনাল লিথোগ্রাফি বলতে যা বোঝায়।

ঐ সময়ে বই ছিল না। আর্ট ফাউন্ডেশন কিছু বই দিয়ে গেল, ঐটাই ছিল শেখার জায়গা। প্রথম দেখলাম লিথোগ্রাফি। ঐ টাইমে জানার ইচ্ছে ছিল প্রবল।

মুস্তাফা মনোয়ার এখনও যে ড্রয়িং করে​ন​ না! টিচার হিসেবেও তিনি অসাধারণ। ভারত থেকে এলেন ওয়াটার কালারের গোল্ড মেডেলিস্ট।

আমি তাদের কাছে অনেক শিখেছি। সাদা কাগজে সাত দিনে ধরে দাগ দেওয়াতেন। একটা কাগজে আর কত বেশি দাগ দেওয়া যায়? আর ওয়েল পেইন্টিং যত কাজ করবে তত ভালো হবে।

মেথড অনেক চেঞ্জ হয়েছে। এখন বুঝি সাদা কাগজে দাগ টানাটা কতটা উপকার হয়েছে। একটা স্কুলিং খুব জরুরি। এটা ফাউন্ডেশন। আমরা তো ড্রয়িং করছি হয়তো কোনও কাজে আসেনি। স্কুলিং খুব জরুরি। সেখানে ডিসিপ্লিন আছে। যা আয়ত্ত করার জন্য খুব কাজের। এগুলো বেজ। এটা হয়তো কোনও কাজে আসে না।

লাইন বিষয়টি আছে। ভেনিসিং লাইন​,​ বোক্রেন লাইন। এগুলো​র​ মিনিং আছে। এগুলো জানা জরুরি।

কারু তিতাস: একটা সময় ছাত্র ছিলাম, পাতা এঁকেছি, ল্যান্ডস্কেপ করছি, আউটডোর করছি, হচ্ছে না তাও কষ্ট করে গেছি। এখন তো অনেকে ফটোগ্রাফি করে ফার্স্টক্লাস পাচ্ছেন। তাহলে আমরা কি স্যার ভুল করেছি?24b99339e2a3f0aecce29cdd51f9b227-5d834abe0eb79

মনিরুল ইসলাম: না​,​ ভুল করিনি। এখন একটা যুগ এসেছে​ এমনই​। কিন্তু কিছু জিনিস সার্বজনীন। ক্যামেরায় কখনও আসল কালার ধরা যায় না। পাতা তো সবসময় চেঞ্চ হয়ে যায়। দূরে গেলেই তা হয়। এই যে ধুলার মধ্যে, রোদের মধ্যে কাজ করা- এগুলো খুব শক্তিশালী। নেচারে যাওয়ার মাধ্যম। ধুলা, বৃষ্টি, কুয়াশা অস্পষ্ট। বিপরীত লাইটে রোদও অস্পষ্ট।​ ​

মাটি, বাতাস, আগুন ও পানি- এগুলোতে আমরা বেঁচে আছি। এগুলো খুবই দরকারি। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, রোদ যখন বদলায় তখন ধ্বংস করে দেয় সব। আমি বলব, যুগের সাথে সাথে সবাই বলবে, আমরা ভালো ছিলাম। তবে সার্বজনীন বিষয় থাকবে। ঘুরে ঘুরে সেই জায়গায় আসতে হবে।

এখন একটা ক্রাইসিস চলছে। এটা বলা যায়, ৫-৭ বছরের গ্যাপ। আর্টের এখন ব্যক্তিত্ব নাই। এখন আর্ট আর নন আর্ট বোঝা মুশকিল। কোটি আর্টিস্টের নিয়ত একটাই- তারা বিখ্যাত হবে​ন​। 

কারু তিতাস: কবিতা, গান, চিত্রকলার সব শাখায় এটা প্রযোজ্য?

মনিরুল ইসলাম: আসলে সৃষ্টিশীলতার একই উৎস। কবিতা, গান, চিত্রকলা- সবই একই। একটা সিনেমার দুটি মেইন নায়ক থাকতে পারে না। একটা মেইন, বাকিগুলো সাপোর্টিং। তেমনি পেইন্টিংটাও তাই। একটা ছবিতে অনেকগুলো ইন্টারেস্টিং বিষয় থাকে না। অনেক সময় পেইন্টিংয়ে দেখা যায়, দশটা ছবি। ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কিছু হয় না। একটা বিষয়, ঢাকায় আর্টের ক্রিটিসিজম বলে কিছু নাই। রিয়েল ক্রিটিসিজম করলে খবর আছে।

কারু তিতাস: স্যার​,​ একটু আগে বললেন, সবাই বিখ্যাত হতে চায়। কিন্তু ফাইন আর্টসের ক্ষেত্রে চাইলেই কি বিখ্যাত হওয়া যায়?

মনিরুল ইসলাম: না। তবে সাময়িকভাবে হয়তো হওয়া যায়। কিছু সহজ উপায় আছে। আর্ট ছেড়ে সস্তা কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। কিছু পয়সা খরচ করে হালকা দরের এক্সিবিশন করলেই হয়ে যায়। মিডিয়া ডাকলাম, লবিং করলাম। আর্ট সাইডে রেখে ওগুলোই করতে হবে।

কারু তিতাস: একজন এক্সিবিশন করলেন, প্রচুর ছবি বিক্রি হলো। তাহলে বিক্রির সঙ্গে কি বিখ্যাত হওয়ার সম্পর্ক?

মনিরুল ইসলাম: না, তা নয়। ওর ছবিই হয়েছে শুধু, অন্য কিছু নয়। ছবি থেকে কপি করাই যায়। কিন্তু ইনার বের করাটা কঠিন। এগুলোই তো আর্ট। মোরি​ও পেইন্টার​ ভার্জিন ছবি আঁকত। মেয়েদের ছবি আঁক​তেন​।​ আবার​ গোয়া বিখ্যাত আর্টিস্ট। ফ্রেঞ্চদের বিরুদ্ধে প্রচুর ছবি আঁক​তেন​। ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসিতে যখন তার ডেড বডি আসল, মাথা পাওয়া যায়নি তার। মোরি​ও প্রসঙ্গে বলি। মোরিও তখন খুব হিট। খালি অর্ডার আর অর্ডার। টিশার্ট, রাস্তায় তার ছবি। যখন সে বুঝতে পারলো জনপ্রিয়তা ফল করছে। সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আঁকা ছেড়ে দিয়েছিল। আমরা চাই ছবি বিক্রি হোক।

ধরো, একটা ধনী ছেলে। তার পয়সার দরকার নাই। সে বলল,  না আমার এক্সিবিশন দরকার নাই, গ্রেটিং বিশ্বাস করি না। কিন্তু এটাও ঠিক, একটা এক্সিবিশন হওয়া দরকার। ছবি বিক্রি হওয়া দরকার। যদি বিক্রি না হয়, তাহলে অনেক মেসেজ থাকে। অন্যরা পছন্দ করছে না, কেন করছে না- এগুলো। আবার একটা ছবি বিক্রি হলে অক্সিজেন পায় আর্টিস্ট। তবে বিক্রির একটা লিমিটও আছে। কারণ এর প্রতি এডিক্টেড হয়ে গেলে সমস্যা।

যখন একটা আর্টিস্টের অনেক ইমেজ​,​ তখন ক্রাইসিস তৈরি হয়। তখন আর্টিস্ট টায়ার্ড হয়ে যায়। আরেকটা হলো আর্টিস্টের মাথা খালি হয়ে যায়। আর্টিস্ট হলো, অ্যাকুরিয়ামের মাছের মতো। তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে বেড়ে উঠবে।

কারু তিতাস: চিত্রকলার কোন মাধ্যমে কাজ করতে আপনি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

মনিরুল ইসলাম: এটা অনেক ধরনের মাধ্যম! জলরংটা একটা সময় মেজর মাধ্যম ছিল। শেষ ৫০ বছরে কত কিছু এসেছে​-​ প্লাস্টিক মিডিয়া, ফাইবার গ্লাস মিডিয়া, কম্পিউটারের কাজ। এই সময়টাতে একটা বিপ্লব হয়েছে, সবদিক থেকে। আমাদের  এক শিল্পী অস্ট্রেলিয়া গেলেন সেদিন। এখান থেকে বসে আমি ছবি নিয়ে আলাপ করলাম। কত উন্নত হয়েছে যোগাযোগ! এগুলো কেউ চিন্তা করেছে আগে? রেডিওটাই তো আমার কাছে এখনও রহস্য। আমি এখনও স্পেনে রেডিও শুনি।

দেখা গেল, রেডিওতে একটা লোকের গলা তোমার ভালো লাগে। তুমি তার শো শুনতে লাগলে। শুনতে শুনতে ছবি আঁকলে। হঠাৎ করে একদিন টিভিতে তোমার আঁকা লোককে দেখলে! তোমার সব কিছু কিন্তু ওলটপালট হয়ে যাবে। এজন্য বলি রেডিওটাতেই বেশি ক্রিয়েটিভটি আছে এবং অনেক ম্যাজিকাল। পৃথিবীতে বহু লোক রেডিও শোনে।​ ​আমরা তো সবসময় অ্যাডাপ করি। শৃগাল মাছ খেত, এখন নাড়িভুঁড়ি খায়।

পিকাসো যেমন বাদ দে​ন​নি কিছু। লিভিং টাইমে এত মেটারিয়াল পেয়েছে। করেছে। কিন্তু আমরা কয়টা মাধ্যম করি। এখন যে দোতারা বাজাই​,​ সেম টাইম আমি ক্লাসিকাল পিয়ানো বাজাতে পারব না।

কিন্তু আমি পেইন্টিংয়ে যত মেটারিয়াল পাই, করি। আমার কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।

আবার অন্য অর্থে ৫০০ বছর আগে যা ছিল তার কি পরিবর্তন হয়েছে? পেইন্টিংয়ে মেটা মরফসিস ও মেটা পলিজম থাকে। এখনও আছে। 

কারু তিতাস: একটা প্রশ্ন স্যার, আর্টটা নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা কী করছি?

মনিরুল ইসলাম: ছবি আসলে কেনে কারা? যার পয়সা আছে। সাধারণ লোক কিনতে পারবেন না। ৫০ বছররে আগে ৯৮ পারসেন্ট বিদেশের লোক কিন​তেন​। এখন বাংলাদেশিরা কিনছে​ন​।

কারু তিতাস: এখন মধ্যবিত্ত পরিবারও কিন্তু পেইন্টিংয়ের কথা চিন্তা করে​​।

মনিরুল ইসলাম: আমি তোমার সঙ্গে একমত। এই পেইন্টিংটা এলো কীভাবে? এখন প্রত্যেকটা মধ্যবিত্ত পরিবারে কোনও না কোনও সন্তান দেশের বাইরে​ থাকেন​। তারা যাওয়ার পর একটা ট্রেন্ড হয়েছে।​- ​​মিউজিয়াম যাওয়া, কনসার্ট শোনা, আর্ট-কালচারের অভ্যস্ত হওয়া। এরা যখন দেশে আসে​ন​। তখন এই ট্রেন্ডটা ঘরে এনেছে​ন​। তবে আর্টটা প্রভাইডেড হয়েছে টাকার দ্বারা।

কারু তিতাস: এটাও তো ঠিক, বাংলাদেশে ছবি আকার ইতিহাস ১০০ বছরের। কিন্তু মার্কেট তৈরি হয়নি।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। তবে একটা পেইন্টারের ৫০ বছরের আগের ছবি পাওয়া যায় না। মার্কেট হবে কীভাবে! দেখা যেত​,​ এদেশের ধনীরা তার স্ত্রীর প্রো​ট্রেট তৈরি জন্য ভারত থেকে আর্টিস্ট নিয়ে আস​তেন​। কদাচিৎ! কিন্তু কাজটা ইউরোপিয়ান। দেশের ইকোনমিই কিন্তু কালচার তৈরি করে।

একবার বাংলাদেশের পুতু​লের​ ছবি আঁকতে গেলাম। দেখলাম নেটে বাংলাদেশের কোনও পুতুল নাই। সব চেঞ্জ। এটাও তো আর্ট। কিন্তু বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এক নম্বর বিষয়, টাকা। দ্বিতীয় বিষয়, আমাদের এখনও একটা চিত্রশালা নাই।  প্রত্যেক দেশে আছে। যেটা নন গভ:মেন্ট।

স্পেনের গোগেনহেইম মিউজিয়াম (স্থপতি ফ্রাঙ্ক গেরি) ভবনটা দেখতেই তো কয়েক লক্ষ লোক আসে​ন​। মানে পুরো জিনিসটাই সৃষ্টিশীল হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেইন্টিং কিনতে হবে। উপহার নিয়েই মিউজিয়ামে দিয়ে সাজিয়ে রাখলে হবে না।

মিউজিয়ামে রেস্টুরেন্ট নাই। মানুষ তো শুধু ছবি দেখতে চায় না। মিউজিয়ামে শপিং সেন্টার থাকতে হবে। এটা তো লাইফ দেওয়ার মতো। এবং টিকিট কেটে ছবি দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশে তো তা নাই। 

কারু তিতাস: কেন আমাদের দেশে এগুলো হয়নি?

মনিরুল ইসলাম: দেশে আর্ট কালেক্টর আছে​ন​, ঘর ভর্তি ছবি আছে। কিন্তু তারা সেভাবে ভাবেন না। কিছু কালেক্টর আছে​ন​ ধনী। খুচরো ছবি কিনছেন তারা। কিন্তু ব্যাপক পরিসরে কেউ ভাবছেন না। আর প্রসেসটাও অনেক ধীরগতির।

কারু তিতাস: ইয়াং আর্টিস্টদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করেন!

মনিরুল ইসলাম: আর্টে কোনও ইয়াং​ বা​ সিনিয়র বলে কিছু নাই। আর্টের কোনও বয়স নাই। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, রফিকুন নবী বা আমি- এই যে সিরিয়াল হচ্ছে কিন্তু আর্টিস্টের জার্নি কেউ লক্ষ করেন না। এই জার্নিটা ইম্পরট্যান্ট। আর একটা বিষয় ঢাকা যেন কাজের সেন্টার হয়ে গেছে। এটাও ঠিক না। অন্যদের সুযোগ দেওয়া উচিত।

​বয়সে ​ইয়াং বা যারা অ্যাক্টিভ তাদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা খবুই সুন্দর। কারণ তারা নতুন ইস্টিমুলেশন দেয়। এটা অনেকটা আমার কাছে ভ্যাকসিনের মতো লাগে। উদ্দীপনা পাই।  ইয়াংদের বলব সৎ থাকতে। আর একটা ছবিতে চমকের পর চমক দেখানোর কিছু নাই। অনেকে ট্রেকচারের পর ট্রেকচার দেয়। এগুলো ছবি নষ্ট করে ফেলে। আর্টিস্ট আর আর্কিটেক্টের মধ্য পার্থক্য হলো আর্টিস্ট সাইন করা মাত্র ছবি শেষ। আর আর্কিটেক্ট দেখবা বিল্ডিং করার পর নতুন করে কাজ করা শুরু করে।

কারু তিতাস: আপনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার শিল্পীরা সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। একবিংশ শতাব্দীর চিত্রকলার শিল্পীরা কী সেটি পারছে?

মনিরুল ইসলাম: আর্টটা এখন ইমোশন থেকে ইনটিলেজেন্সিতে চলে গেছে। এটা যুগের দাবি। আমি তো উল্টো দিকে সাঁতরাতে পারব না। আমদের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাইটার লিখেছেন, সিনেমা মেকার মেক করেছেন। এগুলো মনের তাগিদে করেন। আমি সেসময় (মুক্তিযুদ্ধের আগে) স্পেনে গিয়েছি। কিন্তু আমি মন খারাপ করেছি। তবে আমি সে সময় একটি এক্সিবিশন করেছিলাম। এটা ব্যক্তিগত অনুভূতি। সবাই করবে​ন​, তা নয়। ৪৩-এ জয়নুল আবেদিন ছবি আঁকলেন। এর আগে তার স্বাক্ষর সেভাবে সামনে আসেনি। কিন্তু তিনি কী করলেন, সময়টা ধরলেন। এটাই ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কারু তিতাস:  মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি স্পেনে ছিলেন, সে সময় অনেক ছবি প্রদর্শনী করেছিলেন যুদ্ধের থিমে এঁকে, সেই সময়ে আপনার সমসাময়িক শিল্পীদের ভূমিকা যদি বলতেন।

মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশ সবার মুক্তিযুদ্ধের ছবি আছে, তা নয়। শিল্পী শাহবুদ্দিন আহমেদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি ভালো ভালো ছবি এঁকেছেন। খুব ভালো পেইন্টার।

কারু তিতাস: যখন স্পেনে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছবি নিয়ে এক্সিবিশন করলেন, সেসময় কেমন রেসপন্স পেয়েছিলেন?

মনিরুল ইসলাম:​ এটা একটা গ্যালারিতে। নতুন এচিং আরম্ভ করেছি। ম্যাসিভ লোক তো আসে​ন​ না। তবে স্পেন সাপোর্ট দিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য।  

কারু তিতাস:  একজন শিল্পী হয়ে কতটুকু আনপলিটিক্যাল বা অরাজনৈতিক থাকা সম্ভব?

মনিরুল ইসলাম: আর্টিস্ট তো শুধু দেশের নয়, বিশ্বের শিল্পী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, ‌‘একটা সময় আসবে, যখন শিল্পীরা ইউনিভার্সাল চিন্তা নিয়ে কাজ করবেন।’ যদি সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাগুলো দে​খো, তিনি​​ কিন্তু ভারতীয় রীতিনীতি যেমন​-​ সালাম, আদাব ঢোকাননি। তার ছবি তখন ইউরোপের মধ্যবিত্তও নিজের পরিবারের স্বাদ পায়। পলিটিক্সে মিডিল ক্লাসটা খুব ভয়ংকর ও গুরুত্বপূর্ণ। মনিরুল ইসলাম। ছবি- সংগৃহীত
কারু তিতাস:
বাংলাদেশের ৫০ বছরের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে দেশের চিত্রকলার সামগ্রিক অর্জনটা কী বলে মনে করেন?    

মনিরুল ইসলাম: আলটিমেটলি যুগ চলে গেছে। আমি পুরনো গান শুনি। এখন তো ইন্সট্রুমেন্ট গলা ঢেকে ফেলে। অনেক নয়েজ।
এখনকার জেনারেশন মেটালিক সাউন্ড পছন্দ করছে। একটা এইজ আছে। এরপর আর ভালো লাগে না। আমি তো মাইকেল জ্যাকসন, স্টিভ ওনন্ডারের।  সেটা ফান। তবে একটা সময় পরিবর্তন আসে​...​

কারু তিতাস: চিত্রকলা বা মঞ্চনাটকে আমাদের একধরনের অর্জন আছে। গান কবিতা বা সাহিত্যে অর্জনটা কি সেভাবে হয়েছে?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, এটা সত্য। বিশেষ করে মঞ্চনাটক। এখানে অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে বইমেলায় গেলে বোঝা যায়, কত লেখক, কত কবি! এখন বাইরে এক্সোপোজ না হলে সেটা অন্য বিষয়। কমার্শিয়াল ফেয়ারগুলোতে আর্ট নিয়ে যেতে হবে। কে গে​লেন, কারা গে​লেন- এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সব জায়গায় যাওয়ার দরকার নাই। এমনও ফেয়ার আছে যেখানে একবারে যা লোক হয় বিশ বছরেও অন্য  গ্যালারিতে তা হয় না। এই যে কলকাতা, মোস্ট মিজারেবল। এগুলো নির্ধারণ করে রেখেছে ইরোপীয়ানরা। কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন, এমন বাগান আর বিশ্বের কোথাও নাই। নোবেলজয়ী লেখক-চিত্রকর গুন্টার গ্রাস এসেছিলেন ছবি আঁকার জন্য। কয়দিন থেকে আর থাকতে পারেননি। যাই হোক।
অনেককেই ইন্টান্যাশনালি ও কমার্শিয়ালি যেতে হবে। পলিটিক্স তো থাকবেই। এই যে বেঙ্গল গ্যালারি কাজ করছে। 

কারু তিতাস: শিল্পাচার্যের সঙ্গে আপনার গভীর হৃদ্যতা ছিল, তার কারণেই চারুকলার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন বলে জানি- সেই হৃদ্যতার গল্প জানতে চাই, তার কোনও প্রভাব কী আপনার কাজে রয়ে গেছে?

মনিরুল ইসলাম: হি ইজ রেসপেক্টেডেড পারসন। তখন চারুকলায় সান্ধ্যকালীন বেতন ছিল ২০০ টাকা, আরেক জায়গা​য়​ ছিল ৬০০ টাকা, টেলিভিশনের ছিল ৪ শ ​কী​​​​ সাড়ে ৩ শ টাকা। লোভনীয় অফার সব। অনেক ভালো আর্টিস্ট চলে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, দেখো কী করবা?
এখন কিন্তু টেলিভিশন, গার্মেন্টস, ফ্যাক্টরিতেও বহু  আর্টিস্ট কাজ করছেন। একটা কথা আছে, আর্ট ইজ বুলশিট, বাট এভরি ইঞ্চি অব লাইফ উই নিড ইট।

কারু তিতাস: জয়নুল আবেদিন স্যারের সঙ্গে আপনার ইন্টারেস্টিং ঘটনা মনে পড়ে? সেটা যদি একটু শেয়ার করতেন?

মনিরুল ইসলাম: স্পেনের রোস্তোরাঁয় সাধারণত ওয়াটার কালারের পেইন্ট থাকে। তার আর্টিস্টদের খুব পছন্দ করেন। সেগোভিয়ার একটা ঘটনা। রেস্তো​রাঁ​​য় আমরা (জয়নুল আবেদিন ও মনিরুল ইসলাম) বসে আছি। গরুর শরীরের বিভিন্ন মাংসের একেকটা নাম। তিনি এগুলো এঁকে দেখালেন। চারদিকে হইচই পড়ে গেল- একটা বিদেশি আর্টিস্ট এসেছে! তারা কিন্তু এগুলোতে খুব মজা পায়।
একদিন হঠাৎ তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। বাসায় গেলাম। বললেন, তার ছবি এঁকে দিতে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম।
আমি পাঁচ বছর তার পিছে পিছে ঘুরেছি; যেন কাগজে একটা দাগ দিয়ে দেন। কত বলেছি, কিন্তু তিনি বলতেন এগুলো ভুলে গেছি। অথচ তার ছবি আঁকতে বললেন। তবে মানতেই হবে আর্ট কলেজের (গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউট  বা বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা) জন্য তিনি বিশাল সেক্রিফাইজ করেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেছেন।
তার দুটি মজার ঘটনা বলি। একবার তিনি সেকশন অফিসে বসে আছেন। অফিসার দৌড়ে এসে বললেন, ‘আরে আবেদিন সাহেব​!​ আপনি এখানে! অফিসার তার বন্ধুকে জোরে জোরে হাঁক দিলেন। বললেন, ‘ঐ আমার ছাতিটা নিয়ে আয়।’ এরপর ঐ ছাতাতে অফিসারের নাম লিখে দিতে হলো আবেদিন স্যারকে।
আরেকটা ঘটনা তিনি আমাকে বলেছিলেন। মুহাম্মদ আজম খান ইস্ট পাকিস্তান গভর্নর ছিলেন। তিনি একটা ওয়াটার কালারের ছবি এঁকে নেবেন। ছবি নিলে তো টাকা দিতে হবে। উনি জয়নুল আবেদিনকে জিজ্ঞেস করলেন ছবির দাম কত? আবেদিন স্যার বললেন, ‌‘২ শ ডলার’। তিনি (আজম খান) লাফ দিয়ে উঠলেন। ‘উনি তো (জয়নুল আবেদিন) শিক্ষক। বেতন দেড় শ টাকা। ছবির দাম চায় ২ শ ডলার!’ বললেন আজম খান। বিষয়টি নিয়ে জয়নুল আবেদিনও খুব রিয়াক্ট করলেন। তাকে এমন খেপতে আর কখনও দেখিনি। বললেন, ‘দেখো আমার বেতন দিয়ে শিল্পের মাপ করতে চায়!  তা হতে পারে না।’ খুবই খেপেছিলেন।

অনুলিখন: ওয়ালিউল বিশ্বাস

/এম/

লাইভ

টপ