জীবনের জন্য মোরব্বা || ওলগা তোকারচুক

Send
অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ১৬:১৭, অক্টোবর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২০, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

তিনি যখন মারা গেলেন সে মোটামুটি ভদ্রগোছের একটা দাফনের ব্যবস্থা করলো। দাফনে উপস্থিত হলেন তার বান্ধবীরা, সবাই বৃদ্ধা, পরনে সুতি কাপড়ের চ্যাপ্টা টুপি আর কাঠবিড়ালির পশমে তৈরি কলারঅলা শীতের কোট। তাদের কোট থেকে ন্যাপথলিনের গন্ধ বের হচ্ছিল। কোটের ভেতর থেকে সামনের দিকে বের হয়ে থাকা সবার মাথা ব্যাধিগ্রস্ত ফ্যাকাশে অঙ্গের মতো দেখাচ্ছিল। কফিন কবরে নামানোর সময় তারা সবাই কায়দা করে নাকি-কান্না শুরু করলেন। বৃষ্টিভেজা দড়ির ওপরে আটকে থাকলেন। তারপর তাঁদের অসম্ভব প্যাটার্নের ফোল্ডিং ছাতার তৈরি গম্বুজের নিচে সবাই ছোট একটা দলে গাদাগাদি করে জড়ো হয়ে তাদের বাসস্টপের দিকে হাঁটা দিলেন।

ওই সন্ধ্যায়ই সে আলমারি খুলল। ওই আলমারিতেই তিনি তাঁর দলিলপত্র রাখতেন। নির্দিষ্টভাবে কোনো কিছুর কথা মাথায় না নিয়েই সে আলমারিতে খোঁজাখুজি শুরু করল। টাকাপয়সা। গোপন কোনো শেয়ারের নথি। ঝামেলাহীন বার্ধক্যের জন্য দরকার হতে পারে এমন কোনো অঙ্গীকারপত্র। টেলিভিশনের পর্দায় এ সবের পক্ষে বিজ্ঞাপন প্রচার করার সময় সাধারণত শরতের মরা পাতার দৃশ্য দেখানো হয়।

সে শুধু ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকের পুরনো বিমার কয়েকটা বুকলেট পেল। আর পেল বাবার নামে একটা দলের সদস্য পদের কার্ড। বাবাও মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। তখন পর্যন্ত বাবার অবিমিশ্র বিশ্বাস ছিল, সমাজতন্ত্র হলো আধিভৌতিক এবং চিরস্থায়ী সমাজ ব্যবস্থা। নার্সারি স্কুলে পড়ার সময়ে আঁকা তার নিজের কিছু চিত্র দেখতে পেল, একটা কার্ডবোর্ডের ফোল্ডারে খুব যত্ন করে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার আঁকা ছবিগুলো তিনি রেখে দিয়েছেন—বিষয়টা কেমন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো! তার কল্পনাতেই আসার মতো নয়। তার নিজেরও কয়েকটা নোটবুক দেখতে পেল সে, সবগুলোই আচার, চাটনি, জ্যাম ইত্যাদি তৈরির রেসিপিতে ভরা। প্রতিটা রেসিপি শুরু হয়েছে একটা নতুন পৃষ্ঠায়। প্রতিটার নামই চমৎকার বাঁকা রেখায় অলঙ্করণ করা হয়েছে। রন্ধনশিল্পের সৌন্দর্যের প্রয়োজনটা এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে : ‘সরিষা আচার’, ‘সিরায় ভিজানো কুমড়া আ লা ডায়না’, ‘এভিগনন সালাদ’, বোলেটাস ক্রিওল স্টাইল’ ইত্যাদি। কখনও কখনও সামান্য খামখেয়ালিপনাও দেখা যাচ্ছে কোনো কোনোটার নামে : ‘আপেলের খোসার জেলি’ কিংবা ‘চিনির ভেতর মিষ্টি কেতন’।

এসব দেখার পর তার ভেতর মদ্যভাণ্ডারে যাওয়ার তাড়না জেগে ওঠে। সে তো বহুবছর ওখানে ঢোকেনি। কিন্তু তিনি তো ওখানে সময় কাটাতে পছন্দই করতেন। যে কারণেই হোক এই বিষয়টা সম্পর্কে জানতে চাওয়ার ইচ্ছেটাকে দমাতে পারেনি সে। যখনই তিনি দেখতেন, সে হৈচৈ করে ম্যাচ দেখছে, যখনই তার দুর্বল বকঝকা কাজে আসছে না বুঝতে পারতেন তখনই সে চাবির ঝনঝন শব্দ শুনতে পেত, তারপর দরজার শব্দ; তারপর তিনি ওখানে ঢুকে পড়তেন এবং পরম সুখে দীর্ঘ একটা সময় পার করতেন। ততক্ষণে সে নিজের মজায় ডুবে যেত : একটা একটা করে বিয়ারের ক্যান খালি করতে থাকত আর নিবিড় মনোযোগে দেখত রঙিন শার্টপরা দু’দল মানুষ একটা পিচের একপাশ থেকে আরেক পাশে বিচরণ করে যাচ্ছে।

মদ্যভাণ্ডার তো দারুণ পরিচ্ছন্ন। এখানে পড়ে আছে একটা পুরনো জীর্ণ গালিচা। ও হ্যাঁ, মনে পড়ছে, ছেলেবেলা থেকে সে এটা দেখে এসেছে, এখানে একটা সুন্দর মখমলের হাতলঅলা চেয়ার আছে, চেয়ারের ওপরে ছড়ানো একটা হাতে বোনা ভাঁজ করা কম্বল। রাতে জ্বালানোর জন্য কয়েকটা বাতি আর কয়েকটা বইও আছে। বইগুলো পড়তে পড়ছে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তবে নরকের মতো অবস্থা তৈরি করে আছে তাক বোঝাই করে রাখা বিভিন্ন মোরব্বার অনেকগুলো বয়েম। প্রতিটার গায়ে আঠা দিয়ে লাগানো লেবেল আছে। নোটবুকে দেখা নামগুলোরই পুনরাবৃত্তি। ‘স্টাসিয়ার সিরায় ডোবানো গারকিনস, ১৯৯৯’, ‘পাকা মরিচের তৈরি অ্যাপেটাইজার, ২০০৩’, ‘মিসেস জি’র রোস্ট-নির্গত চর্বি’ ইত্যাদি। কয়েকটা নামের মধ্যে রহস্য আছে মনে হচ্ছে। একটাতে লেখা আছে ‘অ্যাপেটাইজড স্ট্রিং বিনস’। জীবনে সে অ্যাপেটাইজড কথাটার অর্থই ভালো করে বুঝে দেখেনি। তবে বিবর্ণ মাশরুম আর একটা বয়েমে ঠাসাঠাসি করে রাখা রক্তের মতো লাল মরিচ দেখে তার মধ্যে জীবনের প্রতি বাসনা জেগে ওঠে। মোরব্বাগুলোর সমাহার ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে সে। কিন্তু এগুলোর পেছনে লুকিয়ে রাখা কোনো গোপন নথিপত্র কিংবা গুটিয়ে রাখা টাকাপয়সা দেখতে পায় না সে। মনে হচ্ছে তার জন্য তিনি কিছুই রেখে যাননি।

তার চলাচলের পরিধি তার শোয়ার ঘর পর্যন্ত বাড়িয় দিল সে। এবার সে ময়লা জড়ানো কাপড়চোপড় এবং বিয়ারের জমাট কার্টুনগুলো ওখানে ছুড়ে ফেলা শুরু করল। মাঝে মাঝেই সে নিচ থেকে মোরব্বার বয়েম ওপরের তলায় আনতে লাগল। হাতের এক মোচড়ে একটা বয়েম খুলে কাঁটাচামচ দিয়ে ভেতরের পদার্থ বের করে ফেলল একবার। সিরা মেশানো মরিচ কিংবা শিশুদের শরীরের মতো কোমল গেরকিনসের সঙ্গে বিয়ার এবং বাদাম খেতে দারুণ স্বাদ। নিজের জীবনের নতুন পরিস্থিতি, নতুন স্বাধীনতা নিয়ে ভাবার জন্য টেলিভিশনের সামনে বসল সে। মনে হতে লাগল, সে এইমাত্র স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা পাস করেছে এবং গোটা জগত তার সামনে খোলা যেন তার নতুন জীবন, উন্নত জীবন শুরু করতে যাচ্ছে। সে ইতোমধ্যে বয়সের একটা পর্যায়ে এসে গেছে। গত বছর চল্লিশ পার করেছে। কিন্তু তার মনের অবস্থা অল্পবয়সীদের মতো, হাইস্কুল থেকে গ্রাজুয়েট করা ছাত্রদের মতো। যদিও তার মৃত মায়ের পেনশনের টাকা শেষ হয়ে আসছে তবু তার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় আছে বলেই মনে হচ্ছে। মা যা যা রেখে গেছেন সেগুলো শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে আলস্যে খেয়ে-পরে চলবে। খাওয়ার জন্য বড়জোর সে রুটি আর মাখন কিনবে। আর কিনবে বিয়ার। তারপর সে হয়তো এদিক ওদিক চাকরির খোঁজ করবে। গত বিশ বছরে তিনি কাজকর্ম নিয়ে তার সঙ্গে বেশ খ্যাচখ্যাচ করেছেন। সেও হয়তো লেবার এক্সচেঞ্জে গিয়েছে। তার মতো চল্লিশ বছর বয়সী একজন হাইস্কুল গ্রাজুয়েটের জন্য তারা নিশ্চয়ই কিছু খুঁজে দেখবে বলেছে। সে হয়তো মায়ের হাতে সুন্দর করে লন্ড্রি করে রাখা হালকা স্যুটে ঠিকমতো তৈরি হয়েছে, ওয়ার্ডরোবের সামনে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে একটা নীল শার্ট পরে বাইরে যাওয়ার জন্য। তারপর শহরের দিকে হাঁটা দিয়েছে। অবশ্য টিভিতে কোনো ম্যাচ না থাকলেই কেবল বের হয়েছে।

তিনি স্যান্ডেল পরে চলাচল করলে একরকম শব্দ হতো। তার স্যান্ডেলের চাপা শব্দের সঙ্গে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন সে শব্দ আর শুনছে না বলে খুব মনে পড়ছে। স্যান্ডেলের শব্দের সঙ্গে মনে পড়ছে তার মৃদু বকুনির কথাও, ‘টেলিভিশনটাকে একটু বিশ্রাম দিতে পারিস না? বাইরে গিয়ে লোকজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে তো পারিস। একটা মেয়ের সাথেও কি দেখা করতে পারিস না? বাকি জীবনটা কি এভাবেই কাটাবি বলে ভেবেছিস? তুই বাইরে কোথাও একটা ফ্ল্যাট দ্যাখ। এখানে আমাদের দু’জনের জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই আর। লোকজন বিয়েশাদী করে, ছেলেমেয়ে জন্মে, ছুটির দিনে ক্যাম্পিং করতে যায়, বারবিকিউ করার জন্য বাইরে দেখা করে। আর তুই? আমার মতো একজন বুড়ি তোর দেখাশোনা করছে—তোর লজ্জা লাগে না? আগে তোর বাবার জন্য করেছি, পরে তোর জন্যও করলাম। কাপড়চোপড় ধোয়া, ইস্ত্রি করা, বাসায় বাজার টেনে আনা—সব করলাম। ওই টেলিভিশনটাই আমাকে সব সময় জ্বালাচ্ছে। আমি ঘুমাতে পারি না। কিন্তু তুই ভোর পর্যন্ত দেখতেই থাকিস। সারা রাত ধরে তুই কী ঘোড়ার ডিম দেখিস? তোর একঘেয়ে লাগে না? পারিস কী করে তুই?’ তিনি শেষ পর্যন্ত এ রকম তাড়া দিতেই থাকলেন। শেষে সে বাধ্য হয়ে ইয়ারফোন কিনে ফেলল। সেটা ও এক রকমের সমাধান—তিনি আর টেলিভিশনের শব্দ শুনতে পেলেন না। সেও আর তার স্যান্ডেলের শব্দ শুনতে পেল না।

তবে এখন সবকিছু কেমন একদম নীরব হয়ে আছে। তার এক সময়ের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রুমটা কাপড়ের টুকরো আর কাচের আলমারি দিয়ে ঠাসা; কার্ডবোর্ড বক্সের স্তুপের নিচে চাপা পড়ে যেন রুমটা জবুথবু হয়ে আছে। তারপর শুরু হয়েছে অদ্ভূত গন্ধে ভরে যাওয়ার প্রক্রিয়া—ধুলায় পরিণত হয়ে যাওয়া টুকরো কাগজ, ফাঙ্গাসের দাঁতে ফুটো হয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের টুকরো ইত্যাদি বোঝাই হতে শুরু করেছে। মুক্ত বাতাসের প্রবাহ না থাকলে একটা ঘেরা দেওয়া জায়গার অবস্থা খারাপ হতে থাকে; জায়গাটা ক্রমান্বয়ে পচা জিনিসের মতো গাঁজিয়ে ওঠে। নতুন তোয়ালে খোঁজার সময় একদিন সে ওয়ার্ডরোবের একদম নিচে আরেক সারি বয়েম দেখতে পেল। বিছানাপত্রের স্তুপের নিচে বয়েমগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছে, বিভাজন তৈরির মতো করে উলের ফেটির সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে রাখা আছে। শত্রুর আঘাত থেকে বয়েম জগতের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যেন ফিফ্থ কলাম তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়েমগুলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে, বয়সের দিক থেকে এগুলো মদ্যভাণ্ডারের বয়েমগুলো থেকে আলাদা। লেবেলের গায়ে লাগানো লেখা খানিকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। ১৯৯১ এবং ১৯৯২ সাল বারবার লেখা হয়েছে। তবে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন নমুনাও আছে, সেগুলোতে আরো আগেকার সময় লেখা আছে—১৯৮৩; আরেকটায় লেখা আছে ১৯৭৮ সাল। এই বয়েমটাই হলো বদ গন্ধের উৎস। ধাতব স্ক্রুর মাথা ঢিলা হয়ে গেছে বলে ভেতরে বাতাস ঢুকেছে। বয়েমটার ভেতর এক সময় যা-ই রাখা হোক না কেন এখন সেটা বাদামী বর্ণের পিণ্ডে পরিণত হয়ে গেছে। ঘৃণাভরে সে বয়েমটা ছুড়ে ফেলে দিল। লেবেলগুলোতে একই রকম লেখা : ‘কিমমিশের ঘ্যাঁটের মধ্যে কুমড়া’, ‘কুমড়ার ঘ্যাঁটের মধ্যে কিশমিশ’। কয়েকটা বয়েমে পাওয়া গেল কয়েক রকমের গেরকিন, পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে। তবে লেবেলগুলোর নম্র এবং অনুগত বার্তা না থাকলে অনেকগুলোর ভেতরের জিনিস সে চিনতেই পারত না। মাশরুমের আচার ঘন কালো জেলি হয়ে গেছে, কোনোভাবেই চেনার মতো অবস্থায় নেই। জ্যামগুলো ঘন মিশ্রণে পরিণত হয়ে গেছে। পেটিসগুলো ঘন হয়ে কুঁচকে যাওয়া মুষ্টির আকার ধারণ করেছে। জুতার কাবার্ডে এবং গোসলখানার পাশে ফাঁকা জায়গায় আরো কিছু বয়েম দেখতে পেল সে। বিস্ময়কর রকমের সংগ্রহ! তিনি কি তার কাছ থেকে খাবার জিনিসগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন? ছেলে এক সময় আলাদা জায়গায় চলে যাবে—এই ভেবে খাবারগুলো কি তিনি নিজের জন্য রেখেছিলেন? নাকি ছেলের জন্যই রেখেছিলেন? হয়তো ভেবেছিলেন, ছেলের আগে তিনিই চলে যাবেন। মোটের ওপর মায়েরাই তো ছেলেদের আগে চলে যান। এই ভেবে হয়তো তিনি ছেলের ভবিষতের জন্য এইসব বয়েম ভরে খাবার রেখেছিলেন। কিছুটা মায়া আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মোরব্বাগুলোর দিকে তাকায় সে। শেষে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে আরেকটা বয়েম দেখতে পায়। সেটাতে লেখা আছে ‘সিরকার মধ্যে জুতার ফিতা, ২০০৪’। দেখে নিশ্চয়ই সে চমকে উঠেছে। একটা বলের মতো পাকানো ফিতাগুলোর দিকে সে তাকায় : নোনা পানিতে ভাসছে, সেগুলোর মধ্যে আরো আছে অলস্পাইসের কালো ছোট ছোট দলা। এ সব দেখে অস্বস্তিই লাগে তার। সব মিলিয়ে এই।

কান থেকে ইয়ারফোন খুলে বাথরুমের দিকে যাওয়ার সময় সে দেখেছে, তিনি তার যাওয়ার রাস্তায় ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছেন। রান্নাঘর থেকে পা টেনে টেনে বের হয়ে এসে তার পথ আটকে দাঁড়াতেন, বলতেন, ‘সব বাচ্চাই বাসা ছেড়ে চলে যায়। প্রকৃতির নিয়ম এটাই। বাবা-মা তখন বিশ্রাম পান। এই নিয়ম প্রকৃতির সবখানেই চলে। তাহলে তুই আমাকে এত জ্বালাচ্ছিস কেন, বল তো! তোর তো অনেকদিন আগেই চলে যাওয়া উচিত ছিল। নিজের মতো করে জীবন সাজাতে পারতি।’ এ রকম কথা বলে তিনি আহাজারি করতেন। তারপর সে আস্তে করে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তিনি তার জামার হাতা ধরে ফেলতেন। তখন তার কণ্ঠ আরো উঁচু শোনাত, আরো তীক্ষ্ম শোনাত, ‘বুড়ো বয়সে আমি একটু শান্তি চাই। আমাকে একা থাকতে দে। আমি বিশ্রাম নিতে চাই।’ কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে বাথরুমে পৌঁছে যেত। নিজের চিন্তার মধ্যে ঢুকে যেত। তার বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় তিনি আবার পাকড়াও করার চেষ্টা করতেন; তবে আগের মতো মনের জোর পেতেন না। তারপর তিনি ঘুরতে ঘুরতে নিজের রুমে ঢুকে চোখের আড়ালে চলে যেতেন। সকাল পর্যন্ত আর তার কোনো আনাগোনা দেখা যেত না। সকালে তিনি ইচ্ছে করে কড়াই পাতিলের শব্দ করতেন। তার ঘুম ভেঙে যেত।

সবাই যেমন জানে, মায়েরা নিজের সন্তানদের ভালোবাসেন। মায়েদের কাজই তাই—সন্তানদের ভালোবাসা এবং ক্ষমা করে দেওয়া। সুতরাং জুতার ফিতা নিয়ে তার কোনোরকম ভাবনাচিন্তাই ছিল না। কিংবা মদ্যভাণ্ডারে পাওয়া টমেটো সসের মধ্যে স্পঞ্জ নিয়েও মাথা ঘামাল না সে। আর লেবেলের লেখাটা তো ছিলই, ‘টমেটো সসের মধ্যে স্পঞ্জ, ২০০১’। সে বয়েমটা খুলেই ফেলল। পরীক্ষা করে দেখল, লেবেলে ভুল লেখা আছে কি না। তারপর ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিল। তবে স্বাদুতার উপাদানও সে পেয়ে যায় : মদ্যভাণ্ডারের সবার ওপরের দিকের তাকের ওপর শেষে একটা বয়াম পেয়ে যায়; সেটাতে শুকরের হাঁটুর মাংস দিয়ে তৈরি একটা স্বাদের খাবার পেয়ে যায়। কিংবা আরেকটার কথা বলা যায় : কচি বিট দিয়ে তৈরি ঝাল এবং মসলাদার খাবার। এটার বয়েম সে পেল তার রুমের পর্দার পেছনে। দুদিনের মধ্যে সে বেশ কয়েকটা বয়ামের খাবার সাবাড় করে দিল। সালাদ হিসেবে খাওয়ার জন্য আঙুল দিয়ে তুলে আনল নাশপাতির জ্যাম। 

পোল্যান্ড-ইংল্যান্ড ম্যাচ দেখার সময় সে মদ্যভাণ্ডার থেকে আনা মোরব্বার পুরো এক বাক্স টেনে সাবাড় করে দিয়েছে। সেগুলোর চারপাশে জড়ো করেছে বিয়ারের ক্যানের সারি। খেলা দেখতে দেখতে যখন তখন বাক্সের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বের করে এনে গপাগপ খেয়ে ফেলেছে; কী খাচ্ছে না খাচ্ছে দেখার দরকার মনে করেনি। একটা বয়েমের চেহারা ভালো করে দেখেছে সে; কারণ তিনি একটা মজার ভুল করেছেন, ‘মাশরুমের আচার, ২০০৫’। ওপরের নরম সাদা টুকরোগুলো তোলার জন্য একটা কাটা চামচ ব্যবহার করেছে সে। টুকরোগুলো তার গলা দিয়ে প্রাণবন্ত কিছুর মতোই পিছলে নেমে গেছ। খেলায় ইতোমধ্যে কয়েকটা গোল হয়ে গেছে। এজন্য সে খেয়াল করে দেখেনি কত পরিমাণে খেয়ে ফেলেছে। রাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় তার মনে হলো, তিনি সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর অসহ্য তীক্ষ্ম কণ্ঠে আহাজারি করছেন। তবে তখনই তার মনে পড়ে গেল, তিনি তো মারা গেছেন। সকাল পর্যন্ত সে বারবার বমি করতেই লাগল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। হাসপাতালে তার লিভার প্রতিস্থাপনের কথা বলা হলো। কিন্তু দাতা হিসেবে কেউ এগিয়ে এল না। সুতরাং তার আর জ্ঞান ফিরল না। কয়েকদিন পর সে মারা গেল।

কতিপয় সমস্যা দেখা দিল তখন। দাফন করার জন্য তার লাশ মর্গ থেকে কেউ নিতে এল না। শেষে তার মায়ের সুতি কাপড়ের চ্যাপ্টা টুপিপরা কদাকার বৃদ্ধা বান্ধবীরাই এগিয়ে এলেন তার লাশ নিতে। তাদের বিদঘুটে প্যাটার্নের ছাতাগুলো মেলে ধরলেন তার কবরের ওপর। তারাই তার দাফনের করুণ কৃত্যগুলো পালন করলেন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ