পেটার হান্ডকের মায়ের মুখ : এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস

Send
অমল চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৮:১৩, অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৩, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

এবছর সাহিত্যে নোবেলজয়ী পেটার হান্ডকে’র ‘এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। এটি গড়ে উঠেছে ৫১ বছর বয়সী এক গৃহবধূর জীবনের করুণ সমাপ্তি দিয়ে। যার জীবনচিত্রের মধ্যে তার মায়ের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। এক অর্থে উপন্যাসটি পেটারের আত্মজৈবনিক উপাদানে ভরপুর।

শুরুতেই হান্ডকে একটি পত্রিকা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন এভাবে : ‘এ নামের গ্রামে এক গৃহবধূ, বয়স ৫১, শুক্রবার রাতে বেশি ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।’

পরের বাক্যটি এভাবে শুরু : ‘মা মারা গেছেন সাত সপ্তাহ হলো।’ হান্ডকে নৈর্ব্যক্তিক সত্যের সঙ্গে ব্যক্তিক সত্যকে আবেগের কারণেই বাদ দিতে চাচ্ছেন। একই সঙ্গে যে সামাজিক প্রেক্ষাপট এর জন্য দায়ী সেটাও তিনি তুলে ধরেছেন।

মায়ের কাহিনী শুরু হয় অস্ট্রিয়ার একটি ছোট গ্রামে। মায়ের নামটি অনুক্ত থাকে, হয়তো পুরনো রীতিতে মেয়েদের ওপর চাপানো সামাজিক বাধাটি কত তীব্র ছিল সেটা বোঝানোর জন্যই। তখন এমন এক সমাজ ছিলো, যেখানে মেয়েদের জীবন নেহাতই ঠাট্টার ব্যাপার।

হান্ডকের আবেগশূন্য সুরটি অবশ্যই ‘তার অনুভূতিবোধের সম্ভাব্য বন্যার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা, পেটার হান্ডকে এমনভাবে মায়ের আত্মহননের কাহিনী লিখেছেন যেন এক মা হয়ে ওঠেন অন্য অনেক মায়ের প্রতীক।

‘প্রায় সাত সপ্তাহ হলো মা মারা গেছেন : তার সম্পর্কে লেখার আগে আমার আরো ভালো কাজ করা উচিত ছিল, যা আমি তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় খুব দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছি, অনুভূতি মরে যায় এবং আমি তার প্রতি যে নিস্তেজ স্বরে আত্মহত্যার পর প্রতিক্রিয়া জানালাম আবার সেখানে চলে গেলাম।’

কাহিনী লিখতে গেলে শব্দ লাগে, কিন্তু লেখক হিসেবে হান্ডকে নৈঃশব্দের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে  যাচ্ছেন। এই দ্বৈরথের মধ্য দিয়ে তিনি যে মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা আমাদের জানাচ্ছেন সেটাই এই ছোট্ট উপন্যাসটির উপজীব্য। মৃত্যু লেখককে দিচ্ছে এক অফুরাণ অর্থহীনতা। লেখক হিসেবে তিনি এই  হৃদয়-মোচড়ানো অভিজ্ঞতা লিখতে অপারগ।

‘আমি পাঠককের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য লিখছি না। আমি একটি চমৎকার কাহিনী উপহার দিতে চাচ্ছি।’ বারবার পাঠকের ‘বিশ্বাস করার’ অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে হান্ডকে নাট্যকার ব্রের্টাল্ট ব্রেকটের ‘এপিক থেটার’ থিওরির কথা মনে করাচ্ছেন; যেখানে পাঠক/দর্শক যেন কাহিনীর সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম না হন। তিনি বারবার লিখছেন : ‘এই সহানুভূতি যদি নজরেও আসে তা সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হবে—আমার মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে আমি কারো কাছে কিছু বলতে অনিচ্ছুক, কেউ যদি তা উল্লেখ করে আমি ক্ষোভে ফেটে পড়ি।’

বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্ট্রিয়ায় সবার জন্য, বিশেষত, নারীদের জন্য অসহনীয় দারিদ্র্যের ছিল। হান্ডকের লেখায় উঠে এসেছে মায়ের প্রেমহীন জীবন, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, অনুভূতিশূন্য সমাজে নিস্পেশিত দিনযাপন। সে সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, বেঁচে থাকার জন্য চরম কৃচ্ছতাসাধন করতে হত। হান্ডকের ভাষায় : ‘আমি আসলেই কৃতজ্ঞ ছিলাম বিদ্যালয়ের একেবারে দরকারি সরঞ্জামগুলোর জন্য; আর ওগুলোকেই বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখতাম।’ এতো তীব্র দরিদ্র জীবনে যখন অবসর পেতেন, বই পড়ে নিজের বিবর থেকে বের হতে চাইলেন। কিন্তু সাহিত্যের পাঠ তাকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী করল না। ‘বরং তাকে মনে করিয়ে দিলো বড় দেরি হয়ে গেছে।’ যার ফলে নেতিবাচক চিন্তা তাকে গ্রাস করলো—মনে হলো ‘আমি আর মানুষ না’ ঠান্ডা মাথায়, সচেতনভাবে সে জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলো। কিছুদিনের জন্য সমাজকর্ম, স্বামীর সেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও হতাশা তাকে আরো গ্রাস করে; চুপসে গেলেন, নিশ্চুপ হলেন, ক্রমশ নির্জীব। শহরের স্নায়ু-বিশারদকে দেখানোর পর জানা গেলো ‘স্নায়ু-বিকারে’ ভুগছেন তিনি। ঔষধ খেয়ে কিছুদিন ভালো থাকতেন। কিন্তু সেই অসুস্থতা, অবসাদের দিন, বারবার ফিরে আসতো। একদিন ১৯৭১ সালের নভেম্বরের এক সন্ধ্যায় মেয়ের সঙ্গে ডিনার সেরে, ছেলের সঙ্গে টিভি দেখে সবগুলো ঘুমের বড়ি একসঙ্গে গিলে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন মা।

মায়ের নামগোত্রহীন জীবন আর সামাজিক শক্তির বৈরিতা সবকিছু মিলে যে তীব্র যন্ত্রণা মারিয়া  হান্ডকের জীবনকে হননের দিকে ঠেলে দেয় তা বর্ণনা করতে হলে যে ভাষা দরকার সেই ভাষা  খুঁজতে চাচ্ছেন পেটার। এই ইঙ্গিতময়তা যা চিহ্নবিদ্যার বিষয় তার দিকেও পেটার হান্ডকে আলোকপাত করেছেন। মায়ের সংকীর্ণ জগৎ বোঝাতে হান্ডকে লিখছেন : ‘বাসায় সব পুরনো কিছু স্মৃতির চিহ্ন হিসাবে রাখা। গত শতকের ইস্ত্রি, আরামদায়ক চুল্লি, রান্নার পাত্র…’ এই শব্দগুলো কী বোঝায় তার চেয়ে কী ইঙ্গিত দেয় সেটাই হান্ডকের কাছে বেশি কাম্য সেই  : ‘শব্দগুলো যে  পরোক্ষ, আত্মতুষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করে, যা আসলে বোঝানোর কথা তার চেয়ে পুরনো ইস্ত্রির  মেশিন, সেলাই মেশিন, হোৎকা কাঁচি সেই নারী জীবনের উপর বৈরী-সমাজ চাপানো ক্ষুদ্র  অবয়বের প্রতীক।’

এভাবে দেখলে এই উপন্যাসের বয়ান অনেকটা ব্যক্তিগত, দোষ স্বীকারের মতো। এটি শুধু মারিয়া হান্ডকে নামের ৫১ বছর বয়েসী এক অবসাদগ্রস্থ অস্ট্রিয়ান নারীর আত্মহননের কাহিনী নয়, হান্ডকের নিজের ভাষা খুঁজে পাবার কাহিনীও বটে। পেটার হান্ডকে যেন বলতে চাচ্ছেন 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?' ‘এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’ সেই অনুসন্ধানের ফসল।

উপন্যাসটি যেসব কারণে উল্লেখযোগ্য—প্রথমত. সামাজিক শক্তিসমূহের সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষে ক্রমশ ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো মানসিক বৈকল্যের উদয় হওয়ার প্রেক্ষাপট।

দ্বিতীয়ত. উপন্যাসটির বিষয় ও বর্ণনারীতির বৈচিত্র। মায়ের মৃত্যুর একটু আগে তিনি পাঠককে বলছেন, ‘এখন থেকে, গল্প যেন নিজে নিজে না-চলে সে ব্যাপারে আমাকে সতর্ক থাকতে হবে।’ মায়ের আত্মহননের পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া এমন : ‘তৎক্ষণাৎ, আমার অক্ষম ক্ষোভে, মায়ের  বিষয়ে আমার কিছু লিখতে ইচ্ছা হলো।’

কিন্তু মাতৃ-বিয়োগের এই কাহিনীনির্মাণ কাঙ্ক্ষিত 'ক্যাথার্সিস' বা বিমোক্ষণ আনতে পারলো না।  কাহিনী বর্ণনার সঙ্গে মায়ের নিজের কথা বলার মাধ্যমে হ্যান্ডকে পাঠককে সৃজনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে  অন্তর্দর্শনের সুযোগ করে দেন। একই সঙ্গে এই বিষয়টাও বোঝাতে চাচ্ছেন যে, লেখালেখি নিজেই একটা উদ্দেশ্য ও ফলাফল। 

উপন্যাস শেষ করার আগে হান্ডকের উক্তি : ‘একদিন এই সবকিছু নিয়েই বিস্তারিতভাবে  লিখবো।’

হান্ডকে বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখলেও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ‘এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’। মাতৃবিয়োগ নিয়ে আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’ উপন্যাসের সূচনায় চমৎকার নিস্পৃহতা  দেখাচ্ছে মেয়ারসলত নামের কেন্দ্রীয় চরিত্র যে ঠিক মনে করতে পারছে না কবে তার মা মারা গেছেন।

অতটা নিস্পৃহ না হলেও, পেটার হান্ডকে চাচ্ছেন মায়ের আত্মহত্যা নিয়ে সংযত ভাষায় আবেগ  প্রকাশ করতে। তবে তিনি কারো কাছে সহানুভূতি চান না। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ