শামসুর রাহমানের মাতাল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

Send
মাসুদুল হক
প্রকাশিত : ০৮:১৬, অক্টোবর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৯, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)-এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় নয়াবাজার পার্কের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায়। তার সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনের বাড়ির কাছেই জিন্দাবাহারে আমি থাকতাম। কবিকে প্রথম আবিষ্কার করি সেই রাস্তায়। সেই সময় তিনি দৈনিক বাংলায় কাজ করতেন। প্রায়ই দেখতাম বাংলা কবিতার রাজপুত্র সুপুরুষ এই কবি বসে আছেন গাড়িতে। কখনো জানালা দিয়ে বাইরের কোলাহল দেখছেন; কখনোবা নিমগ্ন হয়ে কী যেন পড়ছেন। এভাবেই অবলোকন করতে করতে তাকে পেয়ে যাই সেই রাস্তায়। সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। মৃদু হেসে আপনজনের মতো নাম জানতে চাইলেন। ঠিক এভাবেই কবির সঙ্গে পরিচয় ঘটে যায় কোনো রকম মধ্যস্থতা ছাড়াই। তারপর হঠাৎ করেই আমরা দু’জন যে-যার মতো হারিয়ে যাই। তারও বহু পরে কবিকে পুনরাবিষ্কার করতে থাকি পাঠ্যপুস্তকে, তার কাব্যগ্রন্থে। 

শামসুর রাহমানের ‘যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে’ কাব্যগ্রন্থটি আমার হাতে প্রথম আসে। আজও মনে পড়ে:

যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে রাত্রিদিন আমার নিঝুম

বুকের কন্দরে একাকিনী

তাকে চিনি বলে মনে হয়। অনিন্দ কুসুম ঝরে 

তার চুলে মধ্যরাতে, সকল সময়

হাঁটুতে থুতনি রেখে বসে থাকে চুপচাপ, হাতে

গালের মসৃণ ত্বকে তার সুষ্পষ্ট কান্নার ছাপ।

 (যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে)

এই কবিতার ইমেজ চিরদিন মনে রাখার মতো। কবির অন্ধ সুন্দরীকে দেখিনি, কিন্তু কী আশ্চর্য! এই কবিতা-পাঠে এক অন্ধ সুন্দরী নারীর প্রত্যয় আমার ভাবনার জগতে জায়গা করে নিয়েছে। আজও আমি তাকে অনুভব করি, তার অনির্দিষ্ট একটা প্রতিমা তৈরি হয়ে গেছে আমার মস্তিষ্কে। সেই নারীকে আজও খুঁজে ফিরি। বহু পরে জেনেছি শামসুর রাহমানের মনোবিশ্বের প্রেরণার নাম নারী। তিনি তার প্রেমিকার দেহী-রূপ এবং জৈবনিক গতিচঞ্চল প্রাণ-প্রতিষ্ঠার জন্যেই নারীর চুল, চোখ, ঠোঁট, স্তন, জিভ, পা ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-সূচক শব্দের অনুষঙ্গ ব্যবহার করেন। 

ছোটবেলা থেকে পুরনো ঢাকায় বেড়ে ওঠার কারণে ঐ জনপদের মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখেছি। তাদের জীবন, আচার-আচরণ, ভাষা, সর্বোপরি সংস্কৃতি আমার স্মৃতির মেধা-কোষে সঞ্চিত হয়ে আছে। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই পুরনো ঢাকার সেই মানুষগুলোর কাউকে বাংলাদেশের যেখানেই দেখি না কেন, তাদের প্রোটোটাইপ দেখে চিনি ফেলি। এরা আমার খুব চেনাজানা স্বজন। কী আশ্চর্য! শুধু মানুষ কেন, পুরনো ঢাকার বাড়ি, রাস্তা, বাজার, নর্দমা, কুকুর, কাক, ইদুঁর, চিল, ঈগল, চিকা কতো কী! সবই যেন খুব চেনা। এই চেনাজানা অভিজ্ঞতা নিয়ে যতবার শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ি, সেই কবিতার অক্ষরগুলো উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠে আমার স্মৃতির শহর! শৈশবের স্মৃতি থেকে সেই শহরে দেখতে পাই ‘বেতো ঘোড়া’. ‘সহিস’, ‘আস্তাবল’, ‘নর্দমা’, ‘পঁচা ড্রেন’, ‘নির্লোম কুকুর’, ‘ভিস্তিওয়ালা‘, ‘গ্যাসবাতি’, ‘জ্যোৎস্না-ধোয়া মসজিদের মিনার’, ‘রাতের মাতাল’, ‘খিস্তিওয়ালা পথিক’, ‘শ্যাওলা ধরা বাড়ি’, ‘বাড়ির প্রাচীরে রোগা ঈগল’, ‘কুয়োতল’, ‘কুয়োর ঠান্ডা দূষিত জল’, ‘ইঁদুর’, ‘ফ্যাকাশে চাঁদ’, ‘সেলুনে বসে থাকা গলাবসা বেকার প্রৌঢ়’, ‘কার্ণিসের কাক’, ‘ পার্ক’, ‘ জানালা’, ‘গলির অন্ধ বেহালাবাদক’, ‘ঘোড়ার নালের মতো চাঁদ’—আরো কতো কী! এই যেমন কবি বলেন:

আস্তাবলে ফিকে অন্ধকার, ফুলছে নিষ্কম্প স্তব্ধতা

আর সেই বেতো ঘোড়াটা অনেকক্ষণ থেকে ঝিমোচ্ছে

নিঃশব্দ কোনো আফিমখোরের মতো, মাঝে মাঝে শুধু

ফোলা-পা নাড়ছে ঘাড় বাঁকিয়ে।

[...]

এইতো এখানে নর্দমার ধারে কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন প্রৌঢ়

মাটির ভাড়ে ঢক্ ঢক্ শব্দ ক’রে গিলেছে তাড়ি,

সব অনুতাপ হাওয়ায় উড়িয়ে, জ্যোৎস্নায় ভেজা ঠোঁটে

পান করেছে পূর্ব পুরুষের স্মৃতি-বিষ!

(‘সেই ঘোড়াটা’)

এই প্রৌঢ়জনেরা আমার খুব চেনা। চেহারা মনে নেই। চোখ বন্ধ করলে আজও তাদেরকে দেখতে পাই। বাড়ির কাছে কানাগলির অন্ধকারে আমি ওদের দেখছি তাড়ি পান করতে। কিন্তু খেয়াল করিনি সেখানে নর্দমা আছে। আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে, কবির চোখে সেই নর্দমাটাও ধরা পড়েছে। তার আরেকটা কবিতা ‘এই মাতোয়ালী রাইত’ পড়ে কী যে অপার আনন্দ পাই! আনন্দ পাওয়ার কিছুটা বুঝতে পারি এ-কারণে যে, কবিতাটিতে ঢাকাইয়া শব্দ প্রয়োগ করে কবি এক অসামান্য রূপ তৈরি করেছেন। সেই মাতালটি আমার খুব চেনা। কিশোর জীবনে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই মাতালের চিৎকার, সংলাপ, গালাগাল শুনেছি বাড়ির পাশে গলিতে। সেই মাতাল আমর মস্তিষ্কে ঘুমিয়ে ছিল। একদিন ওকে আবিষ্কার করি শামসুর রাহমানের কবিতায়। সেই মাতলটিকে নিয়ে আমার রহস্যপোলব্ধির শেষ নেই। অনেক পরে ২০০১-এ রাহমান ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে সেই মাতালের প্রসঙ্গ চলে আসে। এ-প্রসঙ্গে তিনি জানান:

“অনেকদিন আগের কথা। আমি যে পাড়ায় ছিলাম, সে পাড়ার ভাষা ব্যবহার করে একটা কবিতা লিখেছিলাম, যা আর কেউ করে নি। আমি একসময় খুব পান করতাম। মাঝরাতে বাসায় ফিরতাম। হঠাৎ একদিন গভীর রাতে বাসায় ঢোকার পথে একজন পা ছুঁয়ে সালাম করলো। তখন আমি বুঝলাম যে সে পানাসক্ত। হঠাৎ বিষয়টি আমাকে স্ট্রাইক করলো। এ পরিবেশকে কবিতায় তুলে আনা যায়। সেখানে আমি আমাকে বাদ দিয়ে খুব অল্প সময়ে ‘এই মাতোয়ালী রাইত’ লিখলাম। কবিতাটা ‘বিচিত্রা’য় বেরুনোর পর সাড়া জাগিয়েছিল। কেউ কেউ অশ্লীল বলেছে। কেউ কেউ মাইন্ড করেছে, আমি ঢাকাইয়া ভাষা ব্যবহার করে তাদেরকে বিদ্রুপ ও অপমান করেছি। কিন্তু আমি তা করিনি, শ্রদ্ধা রেখেই আমি সে ভাষাকে সাহিত্যে স্থান দিয়েছি।

(‘শ্রাবণের আড্ডা’, ২০০১)

যে মাতালের কণ্ঠ আমি কৈশোরের মধ্যরাতের ঘুমে হরহামেশাই শুনেছি; সে মাতাল কবির পা ছুঁয়ে সালাম করলো; কবি ওকে নিয়ে কবিতা লিখলো; সেই কণ্ঠ-চেনা না-দেখা মাতালকে আমি খুঁজে পাই কবির কবিতায়; এ আনন্দ-উপলব্ধি আমি কাউকে বোঝাতে পারব না। এ আনন্দ আমি নীরবে পান করি। বন্ধুদের সঙ্গে বসে পানপাত্রে দেখি সেই মাতালের মুখ; কবি আমাকে দেখিয়েছেন যেভাবে। 

ছোটবেলায় আমার নানির মুখের কথায়, বাক্যের ভেতর বেশ কিছু শব্দ শুনতাম; সেই শব্দগুলো কবি শামসুর রাহমান চমৎকার প্রয়োগ করেছেন তার কবিতায়! ‘জাঁহাবাজ’, ‘কুর্সি’, ‘খঞ্জর’, ‘রেকাবি’ প্রভৃতি শব্দগুলো অদ্ভুত এক ব্যাঞ্জনা নিয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জেগে উঠেছে বাংলা ভাষার শব্দ-ভান্ডারে। এ কৃতিত্ব একমাত্র শামসুর রাহমানের।

শামসুর রাহমান নাগরিক-চৈতন্য-লালিত কবি। তার নগর-চৈতন্যের এক প্রান্তে যেমন থাকে দীপ্ত আধুনিকতা; অন্যপ্রান্তে থাকে ইতিহাস-ঐতিহ্য-কিংবদন্তি-পুরাণ; থাকে নাগরিক বিষাদ, মৃত্যুচিন্তা ক্লেদ, পাপ ও হতাশা। এ-সবই আমি এখন উপলব্ধি করি চেনাজানা পুরনো ঢাকায় বেড়ে ওঠা আমার শৈশব অভিজ্ঞতা থেকে। এ-রকম আমার মতো কোটি মানুষ যার যার অভিজ্ঞতায় শামসুর রাহমানের কবিতাকে দেখতে পায় তাদের মনোজ আয়নায়। এ-কথা আজ মিথ্যে নয়। অন্তত তার শবযাত্রায় মানুষের ঢল দেখে তা প্রমাণ হয়েছে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ