সমকালীন আফ্রিকার গল্প পরশু দিন ।। মূল : আনি কায়োডে সোমতো

Send
অনুবাদ : মেহেদী হাসান
প্রকাশিত : ১৫:১৬, অক্টোবর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২১, অক্টোবর ২৭, ২০১৯

আনি কায়োডে সোমতো’র জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই নাইজেরিয়ার এনুগু’তে। তিনি নিজেকে গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং কবি হিসেবে দেখতে চান। তিনি এনুগু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগে পড়াশুনা করছেন। গল্পটি টাক ম্যাগাজিনে ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়।

সাদিকের সঙ্গে বিয়ের পর আমি এমেকার দর্শন পাই। সেদিন সিকিরা’র দোকান থেকে সদাইপাতি নিয়ে বাসায় ফেরার পথে পলিথিন ব্যাগটি ছিঁড়ে যায়। আমি তখন আরেকটি ব্যাগ কিনে এনে জিনিসগুলো তোলার জন্য উবু হয়ে দেখি আমার পরনের হিজাব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আমি হিজাবের পাড় গুটিয়ে এনে পেছনের দিকে বেঁধে রাখি। আর ঠিক তখনই এমেকার আগমন।

‘ম্যাডাম, দাঁড়ান আমি তুলে দেই,’ এমেকা হেসে বলে। প্রথমে আমি ভাবি কাকে সে ম্যাডাম বলে ডাকছে, আমি তো অতটা বয়স্ক নই, এরপর ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলি। আমরা দুজন উবু হয়ে জিনিসপত্র তুলে ব্যাগে ভরি এবং আমার মনে হয় সবকিছু এক ব্যাগে ধরবে না, যদিও সিকিরা তা ধরাতে পেরেছিল। আমি আরেকটা ব্যাগ কিনে আনি।

ব্যাগে জিনিসপত্র ভরা শেষ হলে ব্যাগ দুটি হাতে নেয়ার সময় তাকে ধন্যবাদ জানাই। সে পুনরায় হেসে হেসে মাথা দোলায়। বেশ খানিকটা রাস্তা চলে আসার পর সে আমাকে ডাকতে ডাকতে আমার পেছন পেছন দৌড়ে আসে।

‘ম্যাডাম! ম্যাডাম, পলিথিনের দোকানে আপনি আপনার হাতব্যাগ ফেলে এসেছেন।’ আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ওটাকে আমার বগলের নিচে রাখতে বলি, যাতে আমি চেপে ধরতে পারি। এরপর সে আমার হিজাবের বাঁধন খুলে দিতে চায়।

আমি বলি, ‘হায় আল্লাহ, হিজাবের বাঁধন খুলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।’ আমার কথা শুনে সে হাসে। যদিও এটা হাস্যকর কিছু না তবুও তার সঙ্গে আমি হাসতে থাকি, তার হাসি আমার হাসির খোরাক যোগায়।

সাদিক ভয়ানক রেগে যেত এবং তার মা এমনকি আরো বেশি রেগে যেত, যদি এ অবস্থায় আমি তাদের চোখে পড়ে যেতাম। সে হিজাবের বাঁধন খুলে দেয় এবং আমাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়, বাতাস এসে হিজাব তেরছা করে দিলে সে তা সে সোজা করে দেয়। এবং আমাকে বলে সে কখনো কুনু [কুনু নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় পানীয়] পান করেনি এবং কারা বাজারে সবকিছু কত সস্তায় পাওয়া যায়, এসব। আমরা হাসি, যা আমি কখনই সাদিকের সঙ্গে করি না। বাস-স্ট্যান্ডের ‌পাশের স্কুলে তার থাকার জায়গায় সে আমাকে আসার আমন্ত্রণ জানায় এবং আমি তাকে বলি, আসতে পারব কিনা জানি না।

সাদিক প্রচণ্ড ক্ষেপে যাবে যদি আমি তাকে বলি ইগবো সম্প্রদায়ের অপরিচিত একজনের সঙ্গে আমি এতক্ষণ ধরে কথা বলেছি।

সেদিন সাদিক যখন বাড়িতে ফিরে আসে এবং আমি তার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসি, সে তখন আগের মতো শুধু মাথা দোলায়। আমার আশঙ্কা ছিল সে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবে আমি কোনো বিধর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি কিনা। পরের দিন সকালে সাদিকের জন্য কুনু বানিয়ে আনি। তবে আমি যখন বলি, ‘সাদিক, আমি তোমার জন্য কুনু বানিয়ে এনেছি,’ তখন সে বলে, ‘এই মেয়ে, তুমি কি আমাকে কারখানায় যেতে দেরি করিয়ে দিতে চাও?’

সাদিক বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমি কিছুটা কুনু পান করি, এরপর বসে পাত্রে অবশিষ্ট থাকা কুনুর দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পরে আমি একটা বোতলে কুনুটুকু ভরে বাস-স্ট্যান্ডের পাশের স্কুলে এমেকার বাসায় যাই।

‘নাফিসা,’ আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সে চিৎকার করে ওঠে। তার গায়ে ছিল একটা সাদা শার্ট এবং সাদা ব্রিফ, তবে তা ক্ষেত-খামারে কাজ করার পোশাক নয়।

‘দেখো, আমি তোমার জন্য কুনু নিয়ে এসেছি।’ আমি তাকে বলি। কুনু দেখে এমেকা উতলা হয়ে ওঠে। কুনু পেয়ে সে হাসে, কথা বলে এবং কাচুমুচু করে। আমি তাকে তৃপ্তিভরে কুনু খেতে দেখি।

‘আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে কুনু এত সুস্বাদু,’ সে বলে। পুরো বোতল শেষ করার পর সে আমার পাশে এসে বসে।

‘আমি কি তোমার বোরকা খুলতে সাহায্য করব?’ সে জিজ্ঞেস করে। ‘এখানে বেশ গরম,’ এই বলে সে তার শার্ট খুলে ফেলে।

‘ধন্যবাদ। আমি ঠিক আছি,’ আমি উত্তরে জানাই। আমার কথা শুনে সে ঘাড় চুলকায় এবং কিছুক্ষণ আমার দৃষ্টি এড়িয়ে চলে। আমরা হেসে হেসে কথা বলি।

আমি হাসতেই থাকি।

সেই রাতে সাদিক যখন আমাকে স্পর্শ করে তখন তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ভেবে রাগ হয়। আমি কামনা করি সে যদি আমাকে ডিভোর্স দিত তাহলে আমাদের মধ্যকার সকল সম্পর্ক চুকে যেত।

পরের দিন, আমি আবার সেখানে যাই, যদিও কুনু ছাড়া। এবং আজকেও সে জিজ্ঞেস করে আমি আমার হিজাব খুলতে চাই কিনা এবং আমি না বলার পর সে কয়েক মিনিট আমার দৃষ্টি এড়িয়ে চলে। এবং এরপর আমরা হাসাহাসি করি।

হাসি আমার জন্য অনেক কিছু বয়ে আনে। এটা আমাকে সবসময় এমেকার কথা মনে করিয়ে দেয়। কুকা, রিমা টিভির সংবাদকর্মী, উলঙ্গ শিশু, ঘাস এবং সবকিছুই। সুতরাং প্রতিদিন বিকেলে যখন আমি নিশ্চিত হই যে এখন স্কুল ছুটি হয়ে যাবে তখন আমি তার বাসায় যাই এবং আমার হিজাব খুলতে তার সাহায্যের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিকতার পর আমরা দুজনে মিলে হাসাহাসি করি। আশেপাশের লোকজন বলতে শুরু করে আমাকে কতটা তরুণ দেখায়।

‘তোমার স্বামী আসলেই তোমার অনেক যত্ন নেয়,’ তারা বলে, তবে আমি জানি এর পেছনে সাদিকের কোনো অবদান নেই। এমনকি লোকজনে ভর্তি বাসও, যা কারা বাজারে যাওয়ার রাস্তায় আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, আমার মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে। তবে ব্যাপারটা এতই ভালো যে বেশিদিন টিকে থাকার মতো নয়। আমি হৃদয়ের গভীর থেকে বুঝতে পারি যে এটা খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। সেই বুধবারে যখন আমি আসি এবং এমেকা দরজার কাছে আমাকে হেসে স্বাগত জানায় না তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়ি। পরম করুণাময় আল্লাহ আমার প্রতি এরকমটা হতে দিতে পারে না। সুতরাং আমার মনে হয় সে এটা করেছে। সে আমার প্রতি এটা ঘটতে দিয়েছে।

‘আমার এখানকার কাজ শেষ, নাফিসা’ সে বলে। ঠিক একই সময় আমি বুঝতে পারি এবং বুঝতে পারি না সে কি বলতে চাচ্ছে।

‘আমি এনুগুতে চলে যাচ্ছি,’ সে বলে। আমি সুস্থির হই। স্তম্ভিত হয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। আমরা সেখানে চুপচাপ বসে থাকি, মুখে বেদনার অভিব্যক্তি নিয়ে এমেকা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

অবশেষে আমি বলি, ‘কবে যাচ্ছো?’

‘পরশু দিন, শুক্রবার। নাফিসা, তুমি ঠিক আছো?’ তাকে চিন্তিত দেখায়। আমার কি ঠিক থাকার কথা? সে কি ঠিক আছে? সে যদি ঠিক থাকে তাহলে আমি তাকে দোষারোপ করতে পারি না। তার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে এবং তারুণ্য ধরে রাখতে তার কাছে আছে অনেক হাসি। এই প্রথমবারের মতো আমাদের মধ্যকার বৈপরীত্যের কাছে আমি হার মানি। 

‘নাফিসা,’ সে এমন অদ্ভুতভাবে আমাকে ডাকে যে তা সঙ্গীতের মতো শোনায়, ‘তুমি কি ঠিক আছো?’

‘হিজাব খুলতে আমাকে সাহায্য কর,’ আমি বলি।

‘তুমি কি নিশ্চিত, নাফিসা?’ সে জিজ্ঞেস করে। আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। এরপর আমি নিজেই হিজাব খুলে ফেলি। এবং খুব দ্রুত আমার অন্যান্য কাপড়-চোপড়ও খুলে ফেলি যখন সে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি মনে করেছিলাম যে সে সাদিকের মতো দায়সারাভাবে কাজ সেরে ফেলবে এবং ঠিক একারণেই এটা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করে যখন সে আমাকে চুমু খেতে, গলায়, ঘাড়ে, স্তনে, পেটে এবং উরুতে সোহাগ করতে শুরু করে। সে শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে। অবশেষে যখন তাকে আমার ভেতরে অনুভব করি, তখন আমার হৃদয় ভরে ওঠে, এমন একটা আধার যে আমার ভেতরে আছে তা আমার জানাই ছিল না। অবশেষে যখন সে ব্যয়িত হয়ে যায়, সাদিকের ব্যাপারের মতো না, তখন গোসল করার প্রয়োজনের কথা আমার মনেই আসে না। সুতরাং পরের দিনও আমার হিজাব খুলি এবং পরশু দিন তাকে বিদায় জানানোর জন্য অনেক ভোরে রওনা দেই, সাদিক তখনো বাসাতেই।

‘কোথায় যাচ্ছ, নাফিসা?’ সাদিক জিজ্ঞেস করে। তবে আমি না শোনার ভান করে দ্রুত পায়ে বের হয়ে আসি। আমার বিশেষ হিজাবটি, সোনালি সূচিকর্ম করা হলুদ রঙের হিজাব, যেমন তার মনে ধরে ঠিক তেমনিভাবে তার জন্য বানিয়ে নিয়ে যাওয়া কুনুও সে পছন্দ করে।

‘শুধু সুখের মুহূর্তে এই হিজাব পড়া হয়,’ আমি বলি যখন সে হিজাবের কারুকার্যের উপর আঙুল বোলাতে থাকে, ‘তুমি আমাকে সুখী করেছ।’ সে কাঁদতে শুরু করে।

‘আমি দুঃখিত, নাফিসা’ এমেকা বলে। আমি মাথা নাড়ি এবং হিজাবের পাড় দিয়ে তার চোখের জল মুছে দেই। আর মনে মনে ভাবি কান্নায় তাকে কত সুন্দরই না মানিয়েছে। সবকিছুতেই তাকে কত সুন্দর মানিয়েছে। আমার দৃষ্টি-সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি তার বাসের দিকে তাকিয়ে থাকি। এরপর আমি বাড়িতে ফিরে এসে এই বিশেষ হিজাবটা যত্ন করে রেখে দেই এবং বুঝতে পারি যে হিজাবটা কখনো কাচা হবে না। আমি সবসময় হিজাবে লেগে থাকা তার অশ্রুর দাগের দিকে তাকিয়ে থাকব এবং স্মরণ করব যে এই মানুষটি আমাকে হাসাত এবং এই মানুষটি আমাকে তারুণ্য উপহার দিয়েছিল।

যথারীতি দুপুর এলো এবং আমার যাওয়ার মতো কোনো জায়গাই নেই। আমি দরজার পাশে বসে এই প্রথমবারের মতো নিজেকে কাঁদতে দেই আমার তারুণ্য এবং সুখ হারানোর শোকে। নিজের জন্য শোকে।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ