জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ বর্তমান আর অতীত মিশিয়েই আমি লিখি : শাহীন আখতার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অনন্য মুশফিক
প্রকাশিত : ১৯:০০, নভেম্বর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০০, নভেম্বর ০৭, ২০১৯

শাহীন আখতারের জন্ম ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, কুমিল্লায়। তিনি ইতিহাস-পুরাণ খনন করে তুলে আনেন নারী সাম্যের সূত্রগাথা। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘শ্রীমতির জীবন দর্শন’, ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’, ‘আবারো প্রেম আসছে’ প্রভৃতি। উপন্যাস: ‘তালাশ’, ‘সখী রঙ্গমালা’, ‘ময়ূর সিংহাসন’ প্রভৃতি। এছাড়া ‘সতী ও স্বতন্তরা’ তিন খণ্ডে বাংলা সাহিত্যে নারীকথনের নির্বাচিত সংকলন। প্রকাশিত হয়েছে ‘গল্পসমগ্র-১’ ও ‘গদ্যসংগ্রহ-১’। ‘অসুখী দিন’ উপন্যাসের জন্য তিনি এ বছর জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউন : জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাই।

শাহীন আখতার : পুরস্কার পাওয়াটা অবশ্যই আনন্দের। ‘অসুখী দিন’ উপন্যাসের জন্য আমার এই মূল্যবান পুরস্কার। বইটি ছাপা হয়েছে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির একুশে বইমেলায়। গত ৩ নভেম্বর শামীম রেজা আমাকে পুরস্কারের সংবাদ দিয়ে অভিনন্দন জানালে আমি ওকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর আমি উপন্যাসের পাতাগুলো মনে মনে ওল্টাচ্ছিলাম। ‘অসুখী দিন’কে দূরে সরিয়ে পরের উপন্যাসের কাজ শুরু করতে হয়েছে। ফিরে বিশেষ তাকানো হয়নি। শামীমের ফোন পাওয়ার পর বইটাকে আবার নিজের করে কাছে পাওয়ার অনুভূতি হলো।

‘অসুখী দিন’ এমন এক বিষয়ে যে, এ নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম। আমরা ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বড়জোর ৫২-এর ভাষা আন্দোলন—পেছনের এ সময়কালে আমাদের ইতিহাস খুঁজি, সাহিত্য খুঁজি। আর এ উপন্যাসের হৃৎপিণ্ডটাই হচ্ছে গত শতকের চল্লিশের দশক। জেমকন পুরস্কার ‘অসুখী দিন’ পাঠে পাঠককে আগ্রহী করবে আশা করি। 

 

বাংলা ট্রিবিউন : ময়ূর সিংহাসন প্রকাশের চার বছর পর ‘অসুখী দিন’ প্রকাশিত হয়েছে। গত চার বছর ধরেই কি উপন্যাসটি লিখেছেন? এই জার্নি সম্পর্কে জানতে চাই।

শাহীন আখতার : তা না। চার বছর ধরে তো অবশ্যই লিখি নাই। দুটি উপন্যাসের মাঝখানে কয়েকটা ছোটগল্প লিখেছি। আর কিছু টুকটাক লেখা। তবে ময়ূর সিংহাসন উপন্যাস লেখার রেশ মিলিয়ে যেতে পরের উপন্যাস নিয়ে ভাবতে শুরু করি। তখন এটা ‘অসুখী দিন’ নামে ভাবনায় ছিল না। বিষয়টা আবছাভাবে মনে আসছিল। কয়েকটা জায়গায় ঘন ঘন সফর করছিলাম, যেমন শিলং, আমাদের গ্রামের বাড়ি, যেখানে উপন্যাসের সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীরা রয়েছেন। উপন্যাসের ভাবনা মনে আসার আগেই শিলংয়ের অঞ্জলি লাহিড়ী মাসি মারা গেছেন। তিনি নেই। কিন্তু আমি নানা ঋতুতে শিলং গেছি। ‘অনিতা সেনের ডায়েরি’ অধ্যায়টা ড্রাফট করেছি তাঁর পাহাড়-ঢালের বাড়িতে বসে। উপন্যাস লেখার শেষ দিকে আব্বাও চলে গেলেন।

গ্রামের নানা জনের কাছ থেকে আমি আমার ছোটবেলায় শোনা গল্পগুলো ঝালাতাম। উপন্যাসের জন্য সাক্ষাৎকার নিচ্ছি—আমাকে জন্ম থেকে দেখছেন এমন সব মানুষের কাছে এ রকম পোশাকি আবদারের সুযোগ নেই। গল্প শোনারই ভান করতাম। বইপত্র অবশ্যই পড়তে হচ্ছিল। দরকারি। দরকারের বাইরের। বিষয়টা ততদিনে আছর করে ফেলেছে। অবসেশনে পরিণত হয়েছে। তা না হলে বোধহয় দীর্ঘ সময় একটা বিষয় নিয়ে থাকা মুশকিল। কলকাতার নেতাজি ভবন, যা এখন মিউজিয়াম, ওখানে অন্য দর্শনার্থীদের সাথে টুকটাক গল্প, নির্ধারিত সময়ের ভিডিও ক্লিপিংস, শো ইত্যাদি দেখা—এসব করেছি পর্যটকের মতোই আরকি। সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশাল সায়েন্সেস-এর আর্কাইভে রক্ষিত কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকা খুব কাজে দিয়েছে। দু-একটা ইনফরমাল সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম আমার সেই কলকাতা সফরে। আসলে চেনা-অচেনা কতজনের কাছ থেকে যে সাহায্য নিয়েছি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে—বলে শেষ করা যাবে না। এ ঋণ শোধ করারও নয়।

 

বাংলা ট্রিবিউন : ‘অসুখী দিন’ লেখার প্রেরণা বা ভাবনার বীজ কীভাবে পেলেন?

শাহীন আখতার :  আমার এ উপন্যাসের ভাবনার বীজ মনে হয় প্রাচীন। আর তা রোপিত হয়েছিলো দিল্লির চিত্তরঞ্জনপার্ক-এ। একটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কোর্সে আমার ট্রেনিং ফিল্ম ছিল একজন উদ্বাস্তুকে নিয়ে। ৮৯-৯০ সালের কথা। পদ্মাপাড়ের মায়াময় স্মৃতি একজন অবসরপ্রাপ্ত বিপত্নীক মানুষের। তিনি চিত্তরঞ্জনপার্কের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন। তখন বা তার পরে দিল্লি ও কলকাতায় দেশভাগের অনেক গল্প শুনেছি। বাবরি মসজিদের ঘটনার পর সেই গল্পগুলোকে বদলে যেতেও দেখেছি। আমার তখন মনে হতো না যে, ‘দেশভাগ’-এর গল্পগুলো শুধু তাদের। আমিও যুক্ত হয়ে যাচ্ছি। অবশ্য দায় নিতে অপারগ। পুকুর থেকে নেয়ে ওঠা হাঁসের মতো ডানা ঝেড়ে ভাবতাম—আমি খুব ছোটবেলায় কিছু অদৃশ্য প্রতিবেশির গল্প শুনেছি। তারা ছিলেন, তারপর চলে গেছেন। ৭১ সালের যুদ্ধ প্রলংকরী ঝড়ের মতো সেই গল্পগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।

আমি জানি না, এ রকম অভিজ্ঞতা ‘অসুখী দিন’ লেখার অনুপ্রেরণা কিনা। এ সমস্ত কিছুই হয়ত আমি মনে মনে শান দিয়েছি। উল্টেপাল্টে দেখেছি।এর বহু বছর পর যখন জয়া চ্যাটার্জির ‘বাংলা ভাগ’ পড়ি, তখন চোখ থেকে চশমা খসে পড়ার উপক্রম হয়। তবে কোনো কিছুই শেষ কথা নয়।

আমি আসলে আমাদের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে ‘অসুখী দিন’ লিখতে চেয়েছি। আমাদের দেশভাগের ইতিহাস আর বর্তমান বাস্তবতা পাকিস্তান এবং ভারতের চেয়ে আলাদা। দেশভাগ নিয়ে আমাদের কোনো সরল গল্প নেই। তা উদ্বাস্তু হওয়ার বেদনা বা নতুন দেশ অর্জন, যে অর্থেই বলি না কেন। মাঝখানে তালভঙ্গ করে দেওয়ার মতো ৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবধারিতভাবে ঢুকে পড়বে। আমি মনে হয় ‘অসুখী দিন’-এ এসবই বলতে চেয়েছি অতীত-বর্তমান মিশিয়ে, এপার-ওপারের দুই সময়ের দুজন মানুষের মুখ থেকে। একটা নেই-জগতকে নির্মাণ করতে চেয়েছি পাজলের টুকরার মতো জুড়ে জুড়ে। ধ্রুপদী সাহিত্যের মতো একটা গল্পের শুরু থেকে শেষ অব্দি নিরবিচ্ছিন্নভাবে বলে যাওয়ার সুযোগ নেই মনে হয় এখানে। গত চল্লিশের দশক অসম্ভব ছিঁড়ে-খুঁড়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।

তবে আমার ভারতীয় বন্ধুদের প্রভাব আমার মধ্যে এতখানি যে, দেশভাগের উদ্বাস্তু বিষয়টা যখনই উপন্যাসে এসেছে, তারা হাজির হয়ে গেছেন, তাদের প্রলম্বিত সাফারিংসসহ। আমাদের গ্রামের রিফিউজি পরিবারের কথা উপন্যাসে আসলেও সেটা পরোক্ষভাবে অন্য কারো বয়ানে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কাহিনী বয়ানে দুই প্রজন্মের দুই নারীকে বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাই।

শাহীন আখতার : আমি তাদের বাছি নাই। ওরাই মনে হয় আমাকে বেছে নিয়েছে!

আসলে কাহিনী বয়ানের কয়েকটা বিকল্প পন্থা বাতিল হবার পর দুই প্রজন্মের দুই ভূগোলের দুই নারীর আবির্ভাব।

অনিতা সেন। আগে বললাম না, আমার নানা বয়সের বন্ধু আছে ভারতে! অনিতা সেন এ রকমই একজনের আদলে গড়া। বেঁচে থাকলে যার বয়স এখন ৯৬-৯৭ হতো। অঞ্জলি লাহিড়ীকে এখানে অনেকেই চেনেন। মৃত্যুর এক বছর আগে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বিদেশি বন্ধুদের মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা’ দিয়েছে। তিনি ৭১ সালে মেঘালয়ের শরনার্থী ক্যাম্পে কাজ করেছেন। খুব নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আমার কর্মস্থল ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’র তরফে এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে প্রায় দুই দশক আগে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়, বন্ধুত্ব। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম যুগের কমিউনিস্ট। আমি যখন গত চল্লিশের দশক নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা ভাবি, তাকে খুব মনে পড়ছিল। তখন তিনি জাস্ট মারা গেছেন। খুব মিস করছিলাম। তিনি আমার ভাবনায় ঘন ঘন হাজির হচ্ছিলেন। এভাবেই মনে হয় ‘অনিতা সেনের স্মৃতিকথা’ অংশটা চেহারা পেতে থাকে।

অন্য চরিত্রটি সাবিনা, যার কোনো বিকল্প নেই। এ প্রজন্মের কোনো মেয়ে ছাড়া কে বলবে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে গত চল্লিশের দশকের গল্প? বিশেষত আমার কলমে? আমার গল্পের বেশিরভাগ প্রোটাগনিস্টই তো নারী।

 

বাংলা ট্রিবিউন : সখী রঙ্গমালা লেখা হয়েছে পুরনো একটি লোককাহিনিকে ভিত্তি করে। পরবর্তীকালে ‘ময়ূর সিংহাসন’ও দেখেছি ইতিহাসকে উপজীব্য করে লেখা। অসুখী দিনে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, বাঙালি-খাসিয়ার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক বৈরিতা, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা, মোটকথা ইতিহাসকে উপজীব্য করে লেখা। আপনার অধিকাংশ উপন্যাসের প্লট গড়ে উঠেছে ইতিহাসকে উপজীব্য করে। এর নেপথ্যের কারণ জানতে চাই।

শাহীন আখতার : সখী রঙ্গমালার আগের উপন্যাস ‘তালাশ’-এর নামও এখানে আনা যায়।

ইতিহাসকে উপজীব্য করে কেন লিখি—এর যুক্তিসঙ্গত জবাব মনে হয় আমার নেই। আমি কি বর্তমান সময়টা সহ্য করতে পারছি না? তাই বারবার অতীতে আশ্রয় নিচ্ছি?

আমার মনে হয় বর্তমান সময় আর অতীত মিশিয়েই আমি লিখি। তালাশ-এর সিংহভাগ-জুড়ে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা। ময়ূর সিংহাসন নিখাদ ঐতিহাসিক উপন্যাস হলেও আপনি এখনকার মায়ানমারের রক্তাক্ত রাখাইন রাজ্যের গন্ধ পাবেন। উপন্যাস ইতিহাস নয়। ঐতিহাসিক ঘটনা আশ্রয়ী হলেও বহুলাংশে কাল্পনিক। কোথায় সত্যের শেষ আর ফিকশনের শুরু—নিজেরও ঠাহর হয় না। সেই অতীত কল্পনায় বর্তমানের ছায়া মিশে থাকে। লেখকের স্মৃতি-শ্রুতি-পঠনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকে। তাই হয়ত লেখাটা অতীত-আশ্রয়ী হলেও বর্তমানের স্বরে কথা কয়।

অসুখী দিন-এর প্রায় অর্ধেক-জুড়ে আছেন অনিতা সেন। বরাক উপত্যকার চল্লিশের দশকের কমিউনিস্ট। ভারতের মেঘালয় রাজ্য তার আমৃত্যু আবাস। সেই সুবাদে গত ৬০-৭০ দশকের বাঙালি-খাসিয়ার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক বৈরিতা এসেছে এবং উপন্যাসকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। এখানে অনিতা সেনই সময়ের নির্ধারক, আমাকে চালিত করেছেন, অতীত-বর্তমানের মাঝের বেড়া ভেঙেছেন ইচ্ছামতো। এটা একটা উদাহরণ। আপনার প্রশ্নের জবাবের ইতি টেনে বলি—আমার প্রতিটা উপন্যাসের নেপথ্যে এ রকম কিছু কথা আছে।

ধন্যবাদ বাংলা ট্রিবিউনকে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ