behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অথঃ নাইপল সমাচার

অমল চক্রবর্তী১৪:৩১, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৫

Naipaul-1[স্যার বিদ্যাধর র্সূযপ্রসাদ নাইপল। নামটি যেমন বড়, খ্যাতিও তেমন বিশাল। নোবেল পাওয়ার আগেই ১৯৯০ সালে ‘স্যার’ উপাধি পেয়ে যান। আর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ২০০১ সালে। তার লিখা উপন্যাস এবং ভ্রমণ কাহিনি চমৎকার। গদ্যের প্রসংশা সবাই করেন। কাহিনি বলার ঢংটিও বেশ চমকপ্রদ। আরেক নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক জি এম কোয়েটজি ২০০১ সালে দি নিউর্য়ক রিভ্যিউ অব বুকস-এ নাইপলকে ‘আধুনকি ইংরেজি গদ্যের একজন মাষ্টার’ বলে প্রশংসা করনে। নোবেল কমিটি নাইপলকে তুলনা করনে জোসেফ করাডের সাথে, বলনে ‘কনরাডের উত্তরসূরী’। ১৯৩২ সালে ক্যারাবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্র ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে জন্মগ্রহণ করেন এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক।]  

ভি. এস. নাইপলের সাথে গ্রীক পুরাণের ইউলিসিসের মিল অনেকটাই। এরা দুজনেই পথ খুঁজেছেন। নিজ দ্বীপ ইথাকা থেকে কতদূরে ট্রয়। সেখানে দশ বছর যুদ্ধ শেষে আরো দশ বছর জাহাজে করে এদিক-সেদিক বেভুল যাত্রা শেষে অনেক কষ্টে যখন ইউলিসিস নিজ ভূমে পৌঁছালেন তখন কেউ তাকে চিনতে পারলো না, শুধু পুরনো চাকর ছাড়া। তারপর যুদ্ধ-সংগ্রাম করে আবার ইথাকা পুনরুদ্ধার; কিন্তু অতৃপ্ত আত্মা চির অশান্ত রয়েই যায়। পুত্র টেলামেকাসের হাতে রাজদণ্ড সমর্পণ ও অবশেষে আবার বেরিয়ে যাওয়া নতুন কোন অভিযানে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ও বিতর্কিত সাহিত্যিক নাইপলও যাত্রা শুরু করেছেন এক দ্বীপ থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদের এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। না, নাইপল কোন গ্রীক বীর নন। তিনি মহৎ কোন অভিযাত্রী নন, দারিদ্র ও মনস্তাত্বিক খর্বতা থেকে পালাতে চেয়েছেন সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে, ইংলান্ডে। ইউলিসিস তিনি নন, তার লক্ষ্য লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আজীবন তিনি বিচ্ছিন্নতার কাহিনী লিখেই চলেছেন, আর তার নিজের জীবনে সে কেন্দ্র তিনি খুঁজে পেলেন না কোনদিন তার কোন আর্থ-সামাজিক ব্যাখ্যার গভীরে না গিয়ে তিনি আত্মসংকটের উৎস খুঁজলেন সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার উপরিসৌধে। নাইপলের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট আত্মানুসন্ধানের প্রোটোটাইপ মেলে তার অসংখ্য উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনির চরিত্রগুলোর কথকতায় যা অবশ্যম্ভাবীভাবে মোড় নেয় উত্তর-ঔপনিবেশিক সংকটের নিপুণ বর্ণনায়।
নাইপল মাত্র আঠারো বছর বয়সে বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়তে গেলেন। পড়া শেষে লেখালেখির ছোটখাটো কাজ করে ক্ষুন্নিবৃত্তির সংকট মেটাতে চাইলেন তিনি। কিন্তু কী লিখবেন তিনি এই ভাবতে গিয়ে মনে হলো ত্রিনিদাদের পোর্ট-অব-স্পেনের যে ঔপনিবেশিক জগতে তিনি শৈশব কাটিয়েছেন, সেগুলো নিয়েই লিখবেন। লিখলেন কিছু ছোটগল্প, নাম দিলেন ‘মিগুয়েল স্ট্রীট’। এই ছোটগল্প লিখতে গিয়েই তিনি বুঝতে চাইলেন নিজেকে। ‘প্রোলোগ টু এ্যান অটোবাইয়োগ্রাফি’ নামের এক প্রবন্ধে তিনি পরবর্তীকালে লিখলেন : ‘আমার লন্ডনে এগারো মাসব্যাপী অবস্থানের সময়ে আমি বোগার্ট সম্পর্কে লিখলাম। আমি আমার বই লিখলাম; আমি আরেকটি লিখলাম। আমি পেছনে ফিরতে শুরু করলাম।’ নাইপলের এই ‘পেছন’ যাত্রা একই সাথে বাস্তবিক ও মেটাফরিক্যাল। তিনি লিখলেন তার ‘ম্যাগনাম ওপাস’ যে লেখায় তিনি অনায়াসেই তুলে ধরলেন উত্তর-ঔপনিবেশিক যন্ত্রণা-ক্ষুব্ধ দংশন ও আত্মরতির নির্যাস, সেই ‘এ হাউস ফর মিঃ বিশ্বাস’ এ বিশ্বাস মহাশয় নামের এক ভারতীয়– ট্রিনিদাদিয়ান সাংবাদিকের চরিত্রের মাধ্যমে নাইপল ফুটিয়ে তুললেন উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের বিচ্ছিন্ন মানবাত্মাকে– যিনি কিং লীয়ারের মতো ঝড়ের মধ্যে সব পোশাক ঝেড়ে ফেলে খুঁজে ফেরে যেন জানতে চাচ্ছেন আসলে এই বিপন্ন পৃথিবীতে মানুষ কোথায়?

 

 নিম্নবর্গের মানুষের পরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিধৃত হয়েছে নাইপলের উপন্যাসে। ১৯৬১ সালে ২৯ বছর বয়সে প্রকাশ করলেন ‘এ হাউজ ফর মিঃ বিশ্বাস’। এখানে নাইপল আত্মজৈবনিক কথকতায় নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তার নিজের পিতার ব্যর্থ জীবনের সংগ্রাম, গ্লানি এবং অস্তিত্বের বিস্তৃত বিহবলতাকে । মিঃ বিশ্বাস সারাজীবন ব্যর্থ লড়াই করে একটির পর একটি বাড়ি গড়তে চেয়েছেন তুলসী পরিবারের মাতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নিজের আত্মপরিচয়ের বর্গ খুঁজে পাবার প্রেষণায়। এই উপন্যাসে নাইপল মূলত নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবনা কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখে হলেও জাতিসত্ত্বা ও ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার মূলে বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ খুঁজে ফিরেছেন। এই উপন্যাসেই আমরা খুঁজে পাই মোহন বিশ্বাসের পায়ের তলার শেষ মাটির উপর নির্মিত সৌধটির নিপুণ বর্ণনা– ‘In the extra space Mr. Biswas Planted a laburnum tree, It grew rapidly. It gave the house a rimantic aspect, softened the tall graceless lines, and provided some shelter from afternoon sun. Its flowers were sweet, and in the still hot evening their smell filled the house.’

 

ত্রিনিদাদে ভারতীয় সমাজ ভান করে যে তারা কলোনিয়াল বা উপনিবেশিক প্রভূ। এবং এই কারণেই তাদের সব ভণিতা সব অসম্ভব নিয়ে স্পষ্টতর হয়ে পড়ে।

 

 

vs-naipaul-0021এতো সাধ করে বানানো সেই বাড়িটিও এক সময় শূন্য হয়ে পড়ে থাকে বিচ্ছিন্নতাবোধের মূর্ত প্রতীক হিসেবে যখন মোহন বিশ্বাসের মৃত্যুর পর শবদাহ করে সবাই ফিরে যায় : ‘Afterwards the sisters returned to their respective homes and Shama and the children went bank in the perfect to the empty house.’
আনন্দ, এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র লন্ডনে রয়ে যায়, তার বাবার শেষ যাত্রার সঙ্গী সে হতে পারেনি। বিচ্ছিন্নতা শুধু পরিবেশের সাথে মানুষের মধ্যেই নয়, পিতার সাথে সন্তানের অবধারিত বিচ্ছেদের মধ্যেও তা দেখা যায়। মিঃ বিশ্বাসের এই ব্যর্থ গৃহ নির্মাণ প্রচেষ্টার মধ্যে আমরা ঔপনিবেশিক কাঠামোর বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষের আত্মপরিচয় বিনির্মাণের ঐকান্তিক বাসনা খুঁজে পাই। কিন্তু অভিবাসী অস্তিত্বের পরতে পরতে শূন্যতা ও অন্তিমে পরাভব থেকেই যায়।
ত্রিনিদাদ দ্বীপে ভারতীয় অভিবাসী জীবনের এই যে উৎকেন্দ্রিকতা, প্রান্তিকী দশা তার প্রতিফলন আমরা পরিহাস ও বিদ্রুপের আড়ালে গাঢ়ভাবে বিধৃত হতে দেখি ‘দ্যা মিস্টিক ম্যাসুর’ উপন্যাসে । ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের নায়ক এক চতুর ভারতীয় প্রতারক পণ্ডিত রাম সুমাইয়ার গণেশ যে তার ভারতীয় সত্ত্বাকে লুকাতে চেষ্টা করে ‘G. Ramsay Muir’ এই ঔপনিবেশিক নাম ধারণ করে। কাকতালীয়ভাবে নয়, অনেকটা অবচেতনভাবে হলেও আমরা ভি. এস. নাইপলের মধ্যেও এই আত্মপরিচয় জনিত দ্বিধা দেখি। তাই ভারতীয় হয়েও তিনি ঔপনিবেশিক সত্ত্বার গুণগান তার ইসলাম সম্পর্কিত ভ্রমণ কাহিনিগুলোতে। বিখ্যাত ওয়েষ্ট ইন্ডিয়ান লেখক George Lemming, তার ‘The Pleasures of Exile’ প্রবন্ধে নাইপল সম্বন্ধে বলেছেন : ‘Naipaul is a colonial, ashamed of his cultural background and striving like mad to prove himself through promotion to the peaks of a “Superior” culture whose values are gravely in doubt.’ হয়তো রাম সুমাইয়ার গণেশের মতো নাইপলও ক্ষমতার প্রান্তিক অবস্থান থেকে পৌঁছাতে চান ক্ষমতার কেন্দ্রে। পণ্ডিত গণেশ নিজের নাম-পরিচয় শর্টকাট করতে চেয়েছিলেন প্রভূ-সংস্কৃতির স্তাবক হয়ে, খুব সূক্ষ্ম ও সুশোভিত ভাষায় হলেও আমরা এই ঔপনিবেশিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ পাই নাইপলের কথনে। প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক মিশিকো কাকুতানি ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এ প্রকাশিত এক আলোচনায় নাইপলকে বলেছেন ‘an outsider by circumstances as well as temperature.’ এই কারণেই হয়তোবা নাইপলের ন্যারেটিভগুলোর নামকরণেও খুঁজে পাই বিচ্ছিন্নতাবোধের সাংকেতিক স্মারক। তার পরবর্তী উপন্যাস ‘The Mimic Men’, ‘The Enigma of Arrival’ কিংবা প্রবন্ধগ্রন্থ ‘Finding The centre’ উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্রগুলোর মুখোশে লেখকের নিজের সর্বগ্রাসী বিচ্ছিন্নতাবোধের হাহাকার বহন করে । তার প্রথম দিকের উপন্যাসের বিষয়বস্তুতে দেখি উৎস অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা। ‘Finding The centre’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থে তাই অকপটে লিখেন যে ‘আমি পোর্ট-অ-স্পেনের রাস্তাগুলোয় কাটানো আমার শৈশব নিয়ে লিখেছি... তখনো আমি জানতাম না আমি কেমন ধরনের ব্যক্তি মানুষ বা লেখক হিসেবে– এবং মূলত দুটো একই সত্ত্বা।’
এই আত্ম-অনুসন্ধান প্রচেষ্টা নাইপলের লেখার মূল মোটিফ। ‘আওয়ার ইউনিভার্সাল সিভিলাইজেশন’ প্রবন্ধে তিনি যেমন দাবি করেছেন যে, তিনি ত্রিনিদাদ থেকে লন্ডনে আসতে চেয়েছেন প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে উত্তরণের মাধ্যমে একটি শ্রেয়তর ‘Pursuit of happiness’ সন্ধানব্রতে। তিনি কি তা পেয়েছেন? তা যে পাননি, তা তার ২২টি  উপন্যাস ও ভ্রমণ কাহিনির প্রতিটি অধ্যায়ে বিধৃত। ‘A Bend in the River’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সলিমের কথকতায় তার উৎকেন্দ্রিক ও অস্থির মানসিকতাই আরো সুতীব্রভাবে ফুটে ওঠে যখন সলিম বোধ করে ‘একটি ঔপনিবেশিক ক্রোধ– সেই লোকদের প্রতি যারা একটি বিদেশি অলীক কল্পনার বৃত্তে নিজেদের বিলীন হতে দিয়েছে।’ সলিমের আফ্রিকায় বা তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশেই নাইপল সেই শেকড় ও শৃঙ্খলা খুঁজে পান না যার প্রকল্প তিনি রচনা করেছেন ‘centre’ বা কেন্দ্রের ভূমে।
‘দ্যা মিমিক মেন’ উপন্যাসের ভারতীয় বংশোদ্ভূত রালফ সিং যিনি আসলে রঞ্জিত কৃপাল সিং ও এই নৈরাজ্য দেখেছিলেন তার ত্রিনিদাদের নাটকীয় রাজনৈতিক জীবনে। রালফ সিং এর ভেতরে যে ‘Schism’ বা বিভক্তি দেখি তা উত্তর-ঔপনিবেশিক মানুষের দগ্ধ জীবনের অবধারিত গাধা মাত্র। দেখা যায় খণ্ডিত উত্তর-ঔপনিবেশিক সত্ত্বার ব্যর্থতা ও অভিবাসী পরিচয়ের গৌণ অস্তিত্বজনিত দূর্বলতাবোধ রালফ সিংকে উপনিবেশিক রাজনীতির কেন্দ্রে ধাবিত করে, যাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে অন্যান্য দূর্বলতা অতিক্রম করা যায়। ইসাবেলা নামের কাল্পনিক দ্বীপ রাষ্ট্রে রালফ সিং মনে করেন ‘আমরা নিজেদের রাজনৈতিক সচেতনতার চেয়ে বরং রাজনৈতিক উদ্বেগ মধ্যেই খুঁজে পেয়েছি, আমাদের কাজ হল শুধুমাত্র নির্দেশনা দেয়া।’ উত্তর- ঔপনিবেশিক সমাজের নৈরাজ্য এ নেতিবাচকতাকে ‘নির্বাসিত’ হিসেবে নাইপল কোনমতেই মেনে নিতে পারেননি।

 

(ইংল্যান্ডের) জগৎ আমাদের কাছে ছিল এক পবিত্র জগৎ যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি; যা বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে আরো পবিত্র করা হয়েছে।

 

imagesনির্বাসিত ও বিভক্ত সত্ত্বা নিয়ে নাইপল পরিভ্রমণ করেছেন ভারতে– তার পিতৃভূমিতে। শহীদ কাদরির একটি কবিতায় যেমন আছে এই উদ্ধৃতি ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে/ শান্তি পাবে না, শান্তি পাবে না, শান্তি পাবে না।’ আমাদের বিদ্যাধর নাইপল ভারতে দীর্ঘ ভ্রমণেও শান্তি তো পেলেন না, পেলেন সর্বগ্রাসী নেতিবাচকতা। ‘এরিয়া অব ডার্কনেস’ বা ‘অন্ধকারের ভূবন’ নামের ভ্রমণ কথায় তিনি লেখেন ভারতবর্ষের সর্বত্র তিনি দেখেন মানুষ ‘বাহ্যক্রিয়া’ করে খোলা জায়গায়। তিনি ভারতের ভেতরে দেখেছেন ‘মিমিক্রি’ বা অনুকরণ, উত্তর-ঔপনিবেশিক যা অবধারিত কিন্তু নাইপলের আদর্শিক প্রকল্পে যা অগ্রহণযোগ্য। আদর্শের বিশুদ্ধতায় তিনি ভারতকে পেতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে লিখেছেন– ‘এটা পরিষ্কার যে তাদের কোন ইতিহাস বোধ নেই; তা না হলে কীভাবে তারা তাদের ঐতিহাসিক স্থানে বাহ্যক্রিয়া করে?’
ভারত সম্বন্ধে আরো দুটি গ্রন্থ লিখেও নাইপল তার শেকড় সন্ধানে ক্ষান্ত দেননি। ‘দি এনিগ্মা অব অ্যারাইভাল’ উপন্যাসে তিনি লিখেছেন কীভাবে ভারতীয় ডায়াসপোরা কল্পিত ‘মাতৃভূমি’ নিয়ে স্বকপোলকল্পিত আদর্শেভূমের ‘ফ্যান্টাসি’তে আবদ্ধ থাকে কিন্তু অবশেষে তারা হতাশার গহ্বরে নিমজ্জিত হয় যখন আদর্শ ভারতের ঐ আত্মপ্রসাদ পুষ্ট অস্তিত্ব তাদের জগৎ থেকে হারিয়ে যায় : ‘There is no ship of antique shape now to take us back. We had come out of the nightmare; and there was nowhere else to go.’ এই উত্তর-ঔপনিবেশিক হতাশা বিধৃত হয়েছে নাইপলীয় পরিব্রাজনের ছত্রে ছত্রে। ‘এরিয়া অব ডার্কনেস’ এ নাইপল এই ঔপনিবেশিক যাতনার ইঙ্গিত দেন। নাইপল বলেন– ‘ত্রিনিদাদে ভারতীয় সমাজ ভান করে যে তারা কলোনিয়াল বা উপনিবেশিক প্রভূ। এবং এই কারণেই তাদের সব ভণিতা সব অসম্ভব নিয়ে স্পষ্টতর হয়ে পড়ে।’
এই ‘কলোনিয়াল’ বা উপনিবেশিক মিমিক্রিকে নাইপল ভয় পান বা ভূতের মতো মনে হয় এই মানসিকতাকে। তাই তিনি শেষে শান্তি খুঁজেন ইংলেন্ডেই। তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘দি এনিগ্মা অব অ্যারাইভাল’ এ ঐতিহাসিক নিয়তিবাদ ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের উপরেই গুরুত্ব দেখা যায়। তিনি অনেকটা আত্মস্বীকৃতির মতো করে হলেও লেখেন ‘(ইংল্যান্ডের) জগৎ আমাদের কাছে ছিল এক পবিত্র জগৎ যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি; যা বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে আরো পবিত্র করা হয়েছে।’ তিনি জোর দিয়েছেন এই ঔপনিবেশিক আদর্শ ভূমি শাসিত শ্রেণির মানসজাত ‘(We) had consttucted out of them a fantasy of home.’ এই উপন্যাসে নাইপল তার রক্ষণশীল চেতনা নিয়ে অনেকটাই শান্তধী ও স্থিত। ‘এনিগ্মা অব অ্যারাইভাল’ সত্যিকার অর্থেই একজন অভিবাসীর গন্তব্যস্থলে উপস্থিত এবং চূড়ান্তভাবে ‘মিলিয়ে যাওয়া’– সেই দেশেই ঠাঁই খুঁজে পাওয়া– যে দেশ তার পূর্বপুরুষদের উৎখাত করেছিল।
 
নাইপলের আদর্শিক জগতে রক্ষণশীলতা ওতপ্রোতভাবে এতটাই জড়িত যে তার প্রসঙ্গ আসলেই আরেকজন রক্ষণশীল ইংরেজ লেখক কনরাডের নাম আসে। নাইপল নিজেই এর স্বীকৃতি দিয়েছেন : ‘দেখলাম যে কনরাড– আজ থেকে ষাট বছর আগে– সব জায়গায় আমার চেয়ে এগিয়ে– যেমনটা তিনি Nostromo উপন্যাসে পৃথিবীর ‘অর্ধ-সৃষ্ট সমাজগুলো’ সম্পর্কে বলেছেন।’এখানে লক্ষ্যণীয় যে নাইপল কলোনাইজড সমাজকে ‘Half-made Society’ বা অর্ধ-সমাপ্ত সমাজ বলেছেন। তাহলে তিনি অবশ্যম্ভাবীভাবে উপনিবেশ স্থাপনকারী সাম্রাজ্যবাদীদের সমাজকে আরেকজন ‘কলোনিয়াল’ নিরীদ সি. চৌধুরীর মতো ‘আদর্শ সমাজ’ হিসেবে মেনে নিয়েছেন নাইপলের সাথে তার সমসাময়িক বা অগ্রজ উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকদের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য এখানেই যে, যদিও নাইপল উত্তর-ঔপনিবেশিক কালো জগতের কথা বলেছেন, তিনি কলোনিয়াল মানসিকতার বাইনারী বিরোধীতা যথা ‘আমরা’ ও ‘তারা’ এই বিতর্কের উর্দ্ধে যেতে পারেননি। তৃতীয় বিশ্বের প্রসঙ্গ বা ওরিয়েন্টর বিষয়ে তিনি এক ‘স্থূল’ সাধারণীকরণ টানেন। নাইপলের ভারত তাই– সব সময় নোংরা ও নাইপল বর্ণিত ইসলাম সেই কারণে সর্বদা উগ্র ও অসহিষ্ণু। ডেরেক ওয়ালকট, ত্রিনিদাদের আফ্রিকা বংশোদ্ভূত আরেকজন নোবেল বিজয়ী যখন নাইপল সম্পর্কে আলোচনা করেন তখনই একটা পার্থক্য আমাদের সামনে স্পষ্টতর হয়ে উঠে। দুজনেই একই দ্বীপে জন্ম নেয়া অভিবাসী বংশোদ্ভূত কিন্তু ডেরেক ওয়ালকট তার কবিতার মাধ্যমে যেখানে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তিকে সমান আক্রমণ করেছেন, সেখানে বিদ্যাধর নাইপল তার আক্রমণের তোপ হেনেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে নির্যাতিত ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের উপর। চিনুয়া আচিবে, নাইজেরিয় উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখক, তার বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ এ দেখিয়েছেন কিভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি প্রথমে সাংস্কৃতিক ও পরে রাজনৈতিকভাবে একটি উপনিবেশকে দমন করে। চিনুয়া আচিবে পোষ্ট-কলোনিয় ধ্বংসযজ্ঞের গভীরে মানুষের নিজভূম থেকে উৎখাত হওয়া ও নিজস্ব চেতনাস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পেছনে গভীর ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। তাই সেই সমাজের ভঙ্গুরতার কাহিনি আমাদের আরো বেশি করে নির্যাতিতদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে। স্যার বিদ্যাধর নাইপলের উপন্যাসগুলোর কোথাও সাম্রাজ্যবাদের প্রতি জিগীষা নেই। সন্দেহ নেই কেন তার রচিত ‘গেরিলা’ (১৯৭৫) এত দ্রুত আমেরিকায় পুলিৎজার পুরস্কার পেল। নাইপলের বর্ণনায় গভীরতা রয়েছে; ডিটেইলের প্রতি তার টান স্পর্শযোগ্য কিন্তু তিনি দার্শনিক দৃষ্টি-ভঙ্গিতে অতটা স্পষ্ট নন।
নাইপলের উপন্যাসের চরিত্রগুলো তাদের স্রষ্টার মত বিচ্ছিন্নতার উপত্যকায় বন্দি। এখানে ডব্লিউ. বি. ইয়েট্স এর কবিতার ভাষায় ‘Things fall apart/Centre can no longer hold.’ সবকিছু ভেঙ্গে পড়া এই বিশ্বে মানুষ অত্যন্ত অসহায় ও আত্মপরিচয়ের সংকটে বিপন্ন। মোহন বিশ্বাস, বোগার্ট, রাম সুমাইয়ার গণেশ, রালফ সিং, সলিমেরা এমন এক জগতে নিয়তি-নির্দিষ্ট পথে আটকে আছে যার অতীত নেই, বর্তমান পংকিল ও ভবিষ্যৎ আঁধারে ঢাকা। নিরাশার এই জগতে অস্তিত্বের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াটাই অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য; গন্তব্য অস্পষ্ট। এখানেই নাইপল অন্যদের থেকে আলাদা। ভারতীয় পোষ্ট-কলোনিয়াল লেখকদের মধ্যে রুশদী, অমিতাভ ঘোষ বা বিক্রম শেঠদের লেখায় ‘মিমিক্রি’র প্রতি সমর্থন পাই, নাইপলের জগতে পরিচয়ের নতুন কোন বিনির্মাণ নেই। উত্তর-ঔপনিবেশিক এই জগতে যেখানে দেয়াল ও সীমানাগুলো অমিতাভ ঘোষের ভাষায় ‘Shadowlines’ ছাড়া আর কিছুই নয় সেখানে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় ‘মিমিক্রি’ নিজেই যে ‘কলোনিয়াল হেজিমনি’র বিরুদ্ধে নতুন কোন বর্গ তৈরি করবে সেই ইঙ্গিত নাইপলে নেই।
 ‘Centre’ ও ‘Periphery’ র এই দ্বন্দ্ব নাইপলের মননে ও বীক্ষায় অবশ্যম্ভাবীভাবে উপস্থিত। আঠারো বছর বয়সে সাম্রাজ্যের কেন্দ্র অভিমুখে নাইপল যে যাত্রা শুরু করেছেন, তেরাশি বছর বয়সে এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। না, তিনি গ্রীক বীর ইউলিসিসের মতো নতুন কোন দেশ জয় বা হেলেনকে উদ্ধার করার জন্য নতুন কোন ট্রয়ে যাননি। তার যাত্রা নিজেকে খুঁজে পাবার জন্য; অ্যালেক্স হ্যাক্সলীর ‘রুট্স’ উপন্যাসের শেকড় যাত্রার মতো। কিন্তু সাম্রাজ্যের যে প্রপঞ্চ তার মগজে গোড়াতেই গেঁথে গেছে তা থেকে মুক্তি কোথায়? বিচ্ছিন্নতাবোধ তাই নাইপলকে শেকড় থেকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছে; যেমন তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো তাদের নৈরাজ্যময় বিশ্বে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ঝুলে আছে নিরালম্ব অন্ধকারে অনন্ত নাস্তিতে।      
  

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ