behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

গ্রীক নাটকে প্রথম প্রতিবাদী নারী

মুম রহমান০৩:০৮, নভেম্বর ২৮, ২০১৫

গ্রীকএসকাইলাসকে আমরা জানি প্রতিবাদী নাট্যকার হিসাবে। তার ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’ বিশ্বসাহিত্যে প্রতিবাদের প্রথম প্রতীকরূপে গৃহীত। দেবতা প্রমিথিউস মানুষের মুক্তির জন্য আগুন চুরি করেছিলেন দেবরাজ জিউসের ভাণ্ডার থেকে। মানুষের মুক্তির জন্য দেবতা হয়েও তিনি দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তাই প্রমিথিউস আজ মানবমুক্তির মহানায়ক। আর গ্রীক ট্র্যাজেডির আদিপিতা এসকালাইস একই সঙ্গে হয়ে ওঠেন বিশ্বনাটকের প্রথম প্রতিবাদী চরিত্রের নির্মাতা। কিন্তু কেবল প্রমিথিউসই নয়, বরং অরেস্ট্রিয় ট্রিলজি রচনা করে এসকাইলাস হয়ে উঠেছেন আরো বেশি জরুরি এবং আজও প্রাসঙ্গিক। আত্রিউস পরিবারের পৌরাণিক কাহিনিকে কেন্দ্র করে অরেস্ট্রিয় ট্রিলজি রচিত। কিন্তু কাহিনি নয়, এ নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র আলোচনা করাই এ নিবন্ধনের লক্ষ্য।
অ্যাগামেনন, খিয়োফেরি, ইউমেনিদাইস- এই তিনটি নাটককে একত্রে বলা হয় অরেস্ট্রিয় ট্রিলজি। তিনটি নাটকেরই উল্লেখযোগ্য একটি চরিত্র ক্লাইতেমেনেস্ত্রা। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা অ্যাগামেননের স্ত্রী এবং অরেস্টিট, ইলেকট্রা ও ইফিজিনিয়ার মাতা। কিন্তু এই সম্পর্কের পরিচয়ই সব না। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা অরেস্ট্রিয় ট্রিলজির সেই কেন্দ্রিয় চরিত্র যে নারী হয়েও বিশ্বনাট্যসাহিত্যের সূচনা পর্বের একটি স্বতন্ত্র চরিত্রে আজও স্বকীয় ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজর বছর আগে অঙ্কিত ক্লাইতেমেনেস্ত্রা চরিত্রের দৃঢ়তা ও স্বাতন্ত্র্য আমাদের বিস্মিত করে।
গ্রীক নাটকের কাহিনি ও চরিত্র পুরাণ কেন্দ্রিক। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা ও তার কাহিনি হোমারের রচনাতে পাই। কিন্তু এসকাইলাস তার মহিমান্বিত রচনা শৈলীর স্বাতন্ত্র্যে এই নারী চরিত্রকে তার নাট্যত্রয়ীর প্রধাণ আকর্ষণে রূপান্তরিত করেছেন। সমগ্র নাট্যকাহিনিতে ক্লাইতেমেনেস্ত্রা চরিত্র কেন্দ্রিয় চরিত্রের মর্যাদা লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, এ নাট্যত্রয়ীতে সেই সবচেয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী চরিত্র। এই চরিত্রে নারী মুক্তি ও নারীর প্রতিবাদী রূপের যে বীজ ব্যপ্ত তা আলোচনার আগে নাট্যত্রয়ী গল্পক্রম আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
অ্যাগামেননের যুদ্ধ জাহাজ সমুদ্রে স্থির হয়ে গেলে ভবিষ্যদ্বক্তা কেলচাস জানান যে, অ্যাগামেননের জেষ্ঠ্য কন্যা ইফিজিনিয়াকে দেবী আর্তিমিসের কাছে উৎসর্গ করলে পুনরায় সমুদ্রে বাতাস বইবে ও জাহাজ চলবে। অ্যাগামেনন ইফিজিনিয়াকে মিথ্যা কথায় ভুলিয়ে নিয়ে আসে এবং বলি দেয়। ইফিজিনিয়ার মাতা ক্লাইতেমেনেস্ত্রা স্বামীর এই অপরাধ কখনো ক্ষমা করতে পারে না।
পরবর্তীকালে যুদ্ধ জয়ী অ্যাগামেনন দেশে ফেরে বন্দি রাজকন্যা কাসান্দ্রাকে নিয়ে। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অ্যাগামেননকে হত্যা করে। তার এই হত্যায় সাহায্য করে প্রেমিক এজিস্থাস।
ক্লাইতেমেনেস্ত্রাকে পরবর্তীকালে হত্যা করে পুত্র অরেস্টিস। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে সে সাহায্য নেয় বোন ইলেকট্রার। কিন্তু অরেস্টিস প্রতিহিংসার দেবীদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক রক্তপাত ও অনুশোচনার পথ বেয়ে দেবতার মধ্যস্থতায় আত্রিউস পরিবার অভিশাপ মুক্ত হয়।
এই আখ্যানকে কেন্দ্র এসকাইলাসের অরেস্ট্রিয় ট্রিলজি রচিত। অ্যাগামেননের হত্যা কাহিনি পর্যন্ত নিয়ে অ্যাগামেনন, পুত্র অরেস্টিস কর্তৃক ক্লাইতেমেনেস্ত্রা ও এজিস্থাস হত্যা পর্যন্ত খিয়োফেরি এবং অরেস্টিস ও ইলেকট্রার অভিশাপ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পর্যন্ত ইউমেনেদাইস নাটক রচিত। এই ট্রিলজিতে ক্লাইতেমেনেস্ত্রাই একমাত্র চরিত্র যাকে তিনটি নাটকেই দেখা যায়। নাট্যকার সচেতনভাবেই এই চরিত্রকে গুরুত্বপূর্ণ করেছেন। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা চরিত্রের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব এবং বলিষ্ঠতা নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। শুধু পুরাণের অন্ধ অনুকরণ নয় বরং সমসাময়িক এথেন্সের জীবন-যাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এ চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে।
এথেন্সে পুরুষের তুলনায় নারী স্বাধীনতা সীমিত। খিয়োফেরি নাটকে কোরাসের উক্তি থেকে আভাস পাওয়া যায়, ‘আমাদের সমস্ত নারী জাতি আজ অবধি দেবতাদের দ্বারা পরিত্যজ্য ও অভিশপ্ত, পুরুষের দ্বারা নাগরিক অধিকার হতে চ্যুত এবং ঘৃণ্য।’ তাই বঞ্চিত ক্লাইতেমেনেস্ত্রা প্রতিবাদ করে। সে একদিকে তার স্বামী-সন্তানকে হত্যা করেছে, অন্যদিকে গ্রহণ করেছে কাসান্দ্রাকে। তাই শুধু সন্তানকে হারানোর বেদনা নয় বা এজিসস্থাসের প্রতি প্রণয়াশক্ত হয়ে নয়, বরং নারীরূপে মাতারূপে তাকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। তার নারীত্ব ও মাতৃত্বের প্রতি এই চরম অবহেলার কারণেই সে নিজে হত্যাকারী হয়েছে। স্বামীকে সে গোপন প্রেমিকের জন্য খুন করেনি, বরং করেছে স্বামীর প্রতি ঘৃণা, কাসান্দ্রার প্রতি ঈর্ষা এবং ইফিজিনিয়ার প্রতি ভালোবাসার তাড়নায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের একচ্ছত্র শোষণের ফলেই ক্লাইতেমেনেস্ত্রা হয়ে ওঠে নৃশংস প্রতিবাদী। ছলনা, মিথ্যাচার, বিকৃতি প্রভৃতি ঋণাত্মক দিক সত্ত্বেও ক্লাইতেমেনেস্ত্রা আধুনিক পাঠকের সহানুভূতি কেড়ে নেয়। এ শুধু ট্র্যাজেরি ক্যাথারসিস প্রক্রিয়া নয়, বরং বেঁচে থাকার, প্রতিবাদ করার যে আপোষহীন দৃঢ় মানসিকতা তার জন্যই সে পাঠকের পক্ষপাত পায়।
ইউমেনেদাইস নাটকের শেষ পর্যায়ে এপোল্লো সংলাপ দেয়, ‘সচারাচর বলা হলেও মা সন্তানের অভিভাবক নয়, মা কেবল একজন সেবিকা, পিতৃ কর্তৃক ব্যপ্ত বীজের যত্ন নেয়াই তার কাজ। পুরুষই সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক।’ যেন এপেল্লোর এই সংলাপের বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদকে আরো জোড়ালো করার জন্যই ক্লাইতেমেনেস্ত্রা হত্যা করে এবং নিজেও হত হয়। ক্লাইতেমেনেস্ত্রার ট্র্যাজেরি সূচনা ও সমাপ্তি ঘটেছে মাতৃত্বকে কেন্দ্র করেই। ইফিজিনিয়াকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেয়া হলো বলে ক্লাইতেমেনেস্ত্রা স্বামীকে হত্যা করলো অর্থাৎ মা তার সন্তান হত্যার অপরাধে ঘাতকের জীবন নিলো। অথচ এই সন্তান হত্যার অপরাধেই তিনি পুত্রের হাতে জীবন দিলে। ক্লাইতেমেনেস্ত্রা চরিত্রে এই মাতৃত্বের সংকটই তার ট্র্যাজিডির আদি-অন্ত কারণ।
clytemnestraক্লাইতেমেনেস্ত্রা মাতৃত্বের সম্মান পায়নি, স্ত্রীর সম্মান তো নয়ই। নারীর অধিকার সে পায়নি। তবু সে মাতৃত্বের জন্য, নারীত্বের জন্য এবং সবচেয়ে বড় কথা মানুষ হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে। নাটকের শুরুতই আমরা ক্লাইতেমেনেস্ত্রা সম্পর্কে আমরা প্রহরীর মন্তব্য শুনি, ‘As a woman with man’s will’ আর্গসের বৃদ্ধরাও ক্লাইতেমেনেস্ত্রাকে পুরুষসুলভ বলেছে। তাদের মন্তব্য, ‘Madam, your words are like a man’s.’
অন্যদিকে তার প্রেমিক এজিস্থাসকে কোরাসগণ নারী বলে উল্লেখ করেছে। একজন পুরুষসুলভ নারী আরেকজন নারীসুলভ পুরুষ এই দুই বিপরীতকামী চরিত্রের বিপর্যয় ঘটিয়ে এসকাইলাস হয়েতো পিতৃতন্ত্র পালিত নারী-পুরুষের প্রাচীন ধারণা ভঙ্গে সম্ভাব্য বিপর্যয়কে দেখিয়েছেন। কিন্তু তবু শেষপর্যন্ত পুরুষসুলভ নারী হিসাবে নয়, বরং প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসাবেই ক্লাইতেমেনেস্ত্রা আমাদের নজর কাড়ে। ইবসেনের নোরার মতো বিপ্লবী নয়, অথবা শেকসপিয়রের লেডি ম্যাকবেথের মতো অনুশোচনায় জর্জরিতও সে নয়, ক্লাইতেমেস্ত্রার পক্ষে কোন সহানূভূতি নেই। তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, প্রতারিত করা হয়েছে, তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তবু সে ভেঙে পড়েনি। পাল্টা আঘাত করেছে, নিজের ক্রোধকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে যখন নাট্যচর্চা কেবল সূচনার দিকে সেই মুহূর্তে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হওয়া স্বত্ত্বেও এসকাইলাস ক্লাইতেমেনেস্ত্রা চরিত্রকে প্রতিবাদ রূপে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। হয়তো মহান লেখক এভাবেই নিজের অজান্তে চারপাশের খাঁচা ভাঙতে শুরু করেন।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ