Vision  ad on bangla Tribune

ফিলিস্তিনি কবি ঘাসসান জাকতান-এর কবিতা

০৪:৫২, নভেম্বর ১৮, ২০১৫

1000ভূমিকা ও তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

 

[ঘাসসান জাকতান ফিলিস্তিনের কবি। লেখেন আরবিতে। সমসময়ের আরবি কাব্যসাহিত্যের অন্যতম এই ব্যক্তিত্বের জন্ম ১৯৫৪ সালে, বেথেলহামের কাছে, বেইত জালা-য়। ১৯৪৮ সালে তাঁর পরিবারকে জাকারিয়া গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল ইহুদিরাষ্ট্রপন্থীরা। পড়ালেখা করেছেন জর্দানে; এরপর বৈরুত, দামাস্কাস এবং তিউনিস-এ ছিলেন। ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন ১৯৯৪ সালে। থাকেন পশ্চিম তীরের রামাল্লায়। বাবা খলিল জাকতানও কবি ছিলেন। প্রাচীন আর আধুনিক কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক সংমিশ্রণে কাহিনি ও কাব্যের মিশ্রণে নতুন ভাষা নির্মাণের অন্বেষণের মধ্য দিয়ে ঘাসসানের অসামান্য কবিতা জায়গা করে নিয়েছে সমসময়ের আরবি ও ফিলিস্তিনি কবিতার ভুবনে। কবিতা ছাড়াও তিনি উপন্যাস ও নাটক লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সাহিত্য পত্রিকা ‘বাইয়াদের।’ ফিলিস্তিনের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাহিত্য ও প্রকাশনা বিভাগের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০১৩ সালে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ঘাসসানকে আরবি ও ফিলিস্তিনি সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য সম্মানসূচক জাতীয় পদকে ভূষিত করেন।

তার সঙ্গে যার নামটি না নিলেই নয় তিনি হলেন আরব-আমেরিকান কবি ফাদি জুদাহ্, ঘাসসান জাকতানের রচনার ইংরেজি অনুবাদক। ফাদি’র করা ইংরেজি তর্জমা ধরেই এ-তর্জমাগুলি করা হয়েছে। ঘাসসান জাকতান ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা লিট ফেস্টে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন।]   

 

বৈরুত, আগস্ট ১৯৮২

যদি সে বেঁচে যেত
যে মরে গেল বুধবারের হামলায়

নাজলাত আল-বাইর দিয়ে সে খুঁড়িয়ে নামছিল
গৌরকেশি এক তরুণ
সে ছিল উত্তর ইরাকের নদীবর্তী লোকদের মত

ধৈর্যের সাথে...“নির্বোধ” এক মায়ের মত
সেই গ্রীষ্মে যুদ্ধ বুনছিল তার উল
যেমনটা এখন!

রেডিয়োতে কিছু গান বাজে: “ওহ্ বৈরুত”
আর গানটা বাড়িটাকে গুমগুমিয়ে তোলে
কারামাহ্-এ আমার বাবার বাড়ি
কিংবা বেইত জালায় তার আগের বসতবাড়িটা
যে-বাড়িটা আমি গিয়ে কখনোই খুঁজে পাই না।

ওহ্ গানগুলি আমাদের যা যা বলেনি!

যুদ্ধের গরীব মহল্লায়
একটা সরু রাস্তা
গ্রীষ্ম আর ফাইটার জেটবিমান ছাড়া
যেটাকে আর সবকিছু ফেলে রেখে গেছে

গান বাজে
আর উত্তর ইরাকের তরুণটি তখন
মৃত্যুতে খুঁড়ায়...
গৌরকেশি...
যে আমাকে ভেবেছিল গ্রাম থেকে আগত এক মরক্কান
মিলিয়ে যায় না
বাতিঘরে কিংবা স্মৃতিতে।

 

টীকা:
বৈরুত, আগস্ট ১৯৮২— ঘোষিত যুদ্ধবিরতিকালে ১৯৮২ সালের আগস্টে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছিল ইসরাইলিরা।
নাজলাত আল-বাইর— একটি জায়গার নাম, যার শাব্দিক অর্থ কুয়োর দিকে নেমে যাওয়ার পথ।
কারামাহ্— জর্দান নদীর পূর্বে অবস্থিত একটি ফিলিস্তিনি আশ্রয় শিবিরের নাম। এ-শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল কবি ঘাসসানের পরিবার, বেইত জালা থেকে নির্বাসিত হয়ে।
বেইত জালা— পশ্চিম তীরের পশ্চিম প্রান্তে, জেরুজালেম থেকে ছয় মাইল দক্ষিণে, হেব্রোন-এর কাছে এ-জায়গাটিতেই কবি ঘাসসানের পরিবার প্রথমবারের মত আশ্রয় নিয়েছিল ১৯৪৮ সালে জাকারিয়ার মূল ভিটা থেকে উৎখাত হয়ে।


গাইড

সে আমাদেরকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল...
এদিকে।
এরপর মিলিয়ে গেল
বাড়িঘরগুলির ধ্বংসাবশেষে
বিস্ফোরণের পর
দেয়ালের ফাঁকে তার আঙুলগুলি
এখনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছে:
এদিকে...
এদিকে।

 

পাহাড় বেয়ে নেমে আসে এক শত্রু

যখন সে নেমে আসে
কিংবা তাকে দেখা যায় নেমে আসতে 
যখন সে আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয় যে সে নেমে আসছে।

অপেক্ষা আর নীরবতা

তার সমস্ত অভাব
যখন সে গাছগাছালির সামনে দাঁড়িয়ে শোনে।

নেমে আসবার সময়ে তার সতর্কতা
চুপ চুপ বলে মুলতবি রাখার মত, 
আর তার সত্তা যা “আমরা” নই
আর যা “এখানে”নয়
মৃত্যু ঘনায়।

সে একটি ফুল নিয়ে আসে
আর কিছু নয়, শুধু একটি ফুল
যেটির কোনো দানি নেই, নেই কোনো ইচ্ছে।

পাহাড় থেকে, তার চোখে পড়ে ফৌজি চৌকি, ছত্রীসেনা,
চকিতে সে দেখে নেয় জবরদখলকারীদের, পর্বতের কিনারা, আর একমাত্র রাস্তা 
যেখানে তাদের পা ছাপ রেখে যাবে পাথরে, কাদায়, আর জলে। 

অভাবও হাজির হবে পাহাড় থেকে 
প্রচেষ্টাবিহীনভাবে পরিত্যক্ত।

আর ছায়ার মধ্যে ভঙ্গুরতা,
লম্বা গোঁফঅলা ইহুদি লোকটি
যাকে দেখতে এখানকার মৃত আরবদের মতন লাগে। 

পর্বতের কিনারা থেকে, সমস্ত গুহাকে শান্তিপূর্ণ লাগবে
আর রাস্তাটিকে মনে হবে যেমনটা তা ছিল।

নেমে আসছিল সে যখন
গুহাগুলি অবিরাম চোখ মেলে তাকালো
আর ঠাণ্ডায় মিটমিট করল। 

 

বেইত জালা-র বাড়ির একটি ছবি
 
সেই জানালাটা বন্ধ করার জন্য তাকে ফিরতে হবে,
এটা ঠিক পরিষ্কার নয়
এ-কাজটা তাকে করতেই হবে কি না,
এখন আর সবকিছু পরিষ্কার নয়
যেহেতু সে ওগুলিকে হারিয়ে ফেলেছে,
আর মনে হয় তার মধ্যে কোথাও একটা চিড়
ধরতে শুরু করেছে।

ফাটল ভরাতে ভরাতে সে ক্লান্ত,
বেড়া সারানো
শার্সি মোছা
ঝোপ-ঝাড় সাফ করা
আর ধুলো দর্শন যা দেখে মনে হয়, যেহেতু সে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে,
তার স্মৃতিকে তামাসা আর ছল-চাতুরির লোভ দেখায়।
এখানে তার বালকবেলা হাজির হয় যেনবা এটা এক কৌশল!
দরজাগুলি নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে সে ক্লান্ত,
জানালার খিল
গাছপালার হাল
আর ধুলো মোছা
যে-ধুলো এখনো উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ছে
কামরায়, বিছানায়, চাদরে, হাঁড়িতে
আর দেয়ালে ঝোলানো ছবির ফ্রেমে

সে ওগুলিকে হারিয়ে এখন বন্ধুদের সঙ্গে থাকে
যাদের সংখ্যা এখন আগের চেয়ে কম,
তাদের বিছানায় ঘুমায়
যা এখন আগের চেয়ে আরও সরু
এখন যখন ধুলো তার স্মৃতিকে কুরে কুরে খায় “ওখানে”
 
...সেই জানালাটা বন্ধ করার জন্য তাকে ফিরতেই হবে
দোতলার জানালা যা সে প্রায়ই ভুলে যায়
সিঁড়ির শেষটায় যেখান দিয়ে ছাদে ওঠা যায়

যেহেতু সে ওগুলিকে হারিয়ে ফেলেছে
সে হাঁটে নিরুদ্দেশ
আর দিনের ছোট ছোট কাজগুলিও
আজ আর পরিষ্কার নয়। 

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ