করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
মতিকার বয়স পঞ্চান্ন। পঞ্চান্ন একেবারে থামবার বয়স না। আর মতিকার মতো দাপুটে লোক তো যেদিকে গেলে থামতে হয় তার উল্টো দিকে হাঁটার নিয়ত। ত্যাঁদড়। মতিন হাওলাদার নামটি অপভ্রংশ হয়ে মতিকা রূপ নিয়েছে এই পঞ্চান্ন বয়সে। মতিন হাওলাদার>মতিন>মতি>মতিকাকা>মতিকা। পাড়ার প্রায় সব বয়সের লোকজনের সঙ্গে মতিকার ওঠা-বসা, খাতির। বলা যেতে পারে এ পাড়ার সেরা চাটামবাজ মতিকা। আবু ভাইয়ের চায়ের দোকানে মতিকার সকাল-বিকাল আড্ডা। দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন মতিকার সঙ্গে কেবল আড্ডা দিতে আসে। আড্ডায় তার একটা ওস্তাদি আছে। সে যখন কথা বলে তার হাত-চোখ-মুখ সমস্ত শরীর যেন কথা বলে। আর চারপাশের সবাই খুব কৌতূহলী হয়ে শুনতে থাকে। মতিকা বাংলায় যখন এমএ পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছিল তখন এপাড়ায় দুইজন এমএ পরীক্ষার্থী ছিল। তারাও মতিকার মতো পাস করেনি। পড়াশুনা বাংলায় হলেও জগতের যাবতীয় বিষয়গুলো একমাত্র মতিকাই জানে এই বিষয়টা নির্ধারিত এপাড়ার অনেকের কাছে। মতিকার বউ মারা গেছে বছর পাঁচ হলো। একটি মাত্র মেয়ে মুমু ইংল্যান্ডে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে। একটা বিরাট বাড়ি, একজন কাজের লোক ও কুকুর চিতাকে নিয়েই মতিকার সংসার। বাড়িতে ঢোকার মুখেই ডানে মতিকার বউয়ের একটা বড় ভাস্কর্য। ভাস্কর নৃপেন মতিকার বন্ধুজন খুব যত্নে এটি নির্মাণ করেছে বোঝা যায়। ভাস্কর্যের নিচে লেখা
‘তুমি আছ জানি কিছু নেই আর, মৃত্যুতে আরও বেশি হয়েছ আমার’
আয়েশা আখতার মায়া (১৯৭২-২০১৫)
মতিকার বউ মারা যাওয়ার পর থেকে তার সেই দাপুটে স্বভাব আর নেই। আড্ডায়ও অনিয়মিত। বাসার সামনের বাগান পরিচর্যা করা, চিতাকে খাওয়ানো-গোসল করানো, গান শোনা, টিভিতে নিয়মিত খবর-টকশো-মুভি দেখা আর মাঝেমধ্যে মুমুর সঙ্গে ভাইবারে কথা বলা এসবেই মতিকার সময় যায়। করোনাভাইরাস লন্ডনে বিস্তৃত হওয়ার পর এখন মুমুর সঙ্গে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় কথা হয়। লকডাউন লন্ডন। মুমু একা রুমে। মতিকা সারাক্ষণ ওয়ার্ডওমিটার সাইট ওপেন করে রাখে। কিছুক্ষণ পরপর দেখে লন্ডনে বর্তমান একটিভ কেস কত আর মৃত্যু সংখ্যা কত। মুমুও বাবাকে নিয়ে অস্থির। সারাক্ষণ শুধু উপদেশ—বাহিরে যাবে না, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোবে, পানি বেশি খাও, ফ্রুটস খাও, টাইমলি খাও-ঘুমাও ব্লা ব্লা।
আজ পহেলা বৈশাখ। এই ভোরে মুমুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে মতিকার। ভাইবারে দুইবার কল দিল কিন্তু ওপাশে মুমুর কোনো সাড়া নেই।। হয়তো ঘুম। লন্ডনে এখন রাত ১টা ১৩মি। মতিকা শুয়ে শুয়ে মুমুকে দীর্ঘ এসএমএস লিখছে—
তোর মা প্রতি বৈশাখে ভোরে উঠে নতুন শাড়ি পরত আর শাড়ির রঙে একটা গোল টিপ দিত কপালে। ঈদে তাকে শাড়ি না দিলেও বৈশাখে একটা শাড়ি তার চাই। একবার একটা জলপাই রঙের শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। তোর মায়ের প্রিয় রং। এমন খুশি হতে তাকে কোনোদিন দেখিনি। অল্পতেই খুশি হতে পারত। সেদিন খুশিতে জাপটে ধরে একটা চুমুও খেয়েছিল। আমার খুব মনে হয় মৃত্যুর পর তোর মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হবে। আমরা একসঙ্গে চা খাব আর সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করব। তোর কি মাকে দেখতে ইচ্ছে করে নারে মুমু...
মুমুর ঘুম ভাঙলে যথারীতি মোবাইল চেক করে। ভাইবারে নোটিফিকেশন। বাবার দুটি কল আর দীর্ঘ এসএমএস। এসএমএস পড়তে পড়তে মুমুর চোখের দুকোণ থেকে জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই বাবাকে কল করে মুমু কিন্তু ওপাশে কেউ রিসিভ করে না। ভেবে নেয় হয়তো ঘুম বা ওয়াশরুমে। জানালা থেকে দেখতে পায় লাল টিউলিপ আর হলুদ ড্যাফোডিল ফুটেছে। মুমু ছবি তুলে ভাইবারে বাবাকে পাঠিয়ে দেয় সেই লাল টিউলিপ আর হলুদ ড্যাফোডিল সঙ্গে লিখে দেয় শুভ নববর্ষ বাবা।






