behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মুরাকামির লেখক হয়ে ওঠার গল্প: শেষ পর্বদৌড়বিদ-ঔপন্যাসিক || হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : দিলওয়ার হাসান১২:৪৮, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫

পূর্ব প্রকাশের পর

2014102816245576পেশাদার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর আর এক সমস্যা এসে দেখা দিল। শারীরিকভাবে নিজেকে কী করে ফিট রাখব। ক্লাব চালানোর সময় প্রতিনিয়ত কায়িক শ্রম দিতে হয়েছে। কিন্তু সারাদিন বসে বসে লেখার কারণে আমার ওজনও বেড়ে যাচ্ছিল। ধুমপানও খুব বেশি করছিলাম—রোজ ৬০টি সিগারেট। আঙ্গুলগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছিল, আর ধোঁয়ায় শরীরে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করেছিল। এ-অবস্থা আমার জন্য মোটেও সুবিধের ছিল না। ঔপন্যাসিক হিসেবে যদি দীর্ঘজীবন চাই তাহলে শরীর ঠিক রাখার জন্য একটা পথ বের করতে হবে।
শরীরচর্চার অংশ হিসেবে দৌড়ের নানান সুবিধা ছিল। প্রথমত, এ-জন্য কারও সাহায্যের দরকার নেই, দরকার নেই বিশেষ কোনো সরঞ্জামের। বিশেষ কোনো জাগয়ায় যাবারও আবশ্যকতা নেই। এক জোড়া রানিং সু আর ভাল একটা রাস্তা থাকলে প্রাণ ভরে দৌড়ানো সম্ভব।
ক্লাব বন্ধ করে দেয়ার পর জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে চাইলাম। স্ত্রীকে নিয়ে চীবা এলাকার নারাশিনোতে চলে গেলাম। তখন সেটা একেবারে গ্রামাঞ্চল, আশপাশের লেখাধুলার ভাল কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তবে এই এলাকার সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের একটা ঘাঁটি ছিল, রাস্তাঘাট ভাল রকম রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাশের একটা এলাকায় একটা প্রশিক্ষণ অঞ্চল ছিল। খুব সকালে ওখানে গিয়ে হাজির হলে আশপাশে কেউ না থাকলে রাস্তাটা ব্যবহার করতে পারতাম। কী কার্যক্রম নিতে হবে তা নিয়ে আমাকে খুব একটা ভাবতে হয়নি। কেবল দৌড়ে গেছি।
তার অল্প কিছুদিনের মধ্যে ধুমপান ত্যাগেও সক্ষম হই। কাজটা সহজ ছিল না আমার জন্যে। তবে দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে ধুমপান চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। আমার দৌড়ানোর ইচ্ছা ধুমপানের উইথড্রয়াল সিমটম কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল। যে-জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম তাকে বিদায় জানাতে ধুমপান ত্যাগের বিষয়টি একটি প্রতীকী মহিমা পায়।
স্কুলে জিম ক্লাস বা খেলাধুলার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। কারণ ওসবে যেসমস্ত কাজকর্ম থাকত তা আমার প্রতি ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হতো। তবে যখন পছন্দ মতো কোনো কাজ করতে চাইতাম তা মনপ্রাণ ঢেলে করতাম। যেহেতু আমি ক্রীড়াবিদ বা এধরনের কিছু ছিলাম না, কাজেই হঠাৎ করে গৃহীত কোনো কিছুতে ভাল করতে পারতাম না। দূরপাল্লার দৌড় আমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বেশি মানানসই হতো, যা হয়ত ব্যাখ্যাা করতে পারে কেন আমি আমার রোজকার জীবনের সঙ্গে একে এত সহজে সংযুক্ত করতে পারি। একই কথা বলতে পারি নিজের সম্পর্কে ও পড়াশোনা সম্পর্কে। প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে কলেজ অবধি আমার গোটা শিক্ষাজীবনে এমন কিছু পঠন-পাঠনে আগ্রহী হইনি যা আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে আমার প্রাপ্ত গ্রেড এমন ছিল না যে লোকের কাছ থেকে লুকাতে হবে। এমন স্মৃতি নেই যেখানে কোনো কর্মকাণ্ডের জন্যে আমার প্রশংসা করা হয়েছে, যেমন ধরুন ভাল গ্রেড বা কোনো কিছুতে ভাল ফল প্রদর্শন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহীত কোনো কিছু ছাড়া আমি পড়াশোনায় আগ্রহী হইনি যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি ‘সমাজের সদস্যতে’ পরিণত হয়েছি। কোনো বিষয়ে আমাকে আগ্রহী করে তুললে আর নিজের জায়গা থেকে পড়াশোনা করতে পারলে আমি জ্ঞান আহরণে যৌক্তিক রকম পারদর্শী হয়ে উঠতাম।
পেশাদার লেখক হয়ে ওঠার সবচেয়ে ভাল দিকটি ছিল—আগে-ভাগে বিছানায় যেতে পারা আর আগে-ভাগে উঠে পড়া। যখন ক্লাব চালাতাম তখন প্রায়শই ভোরের আগে শুতে পারতাম না। ক্লাব বন্ধ হতো রাত ১২টা নাগাদ। হলে কী হবে—কাজ থাকত; পরিস্কার করতে হতো সবকিছু, রশিদ-টশিদ দেখতে হতো, তারপর আলাপ-আলোচনা করবার থাকলে সেরে নিতে হতো, অতপর রিলাক্সের জন্যে খানিকটা পান। এসব করতে-করতে রাত তিনটে বেজে যেত, আর সূর্য তখন উঠি উঠি করত। প্রায়শই তখন কিচেন টেবিলে বসে লেখালেখি করতাম আর তখন ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটে উঠত। দিবসের কর্মকাণ্ড শুরু করার জন্যে উঠে পড়তে হতো, তখন সূর্য আকাশের অনেক উপরে থাকত।
ঔপন্যাসিক হিসেবে জীবন শুরু করার পর আমি ও আমার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেই সকাল-সকাল বিছানায় যাব আর সূর্য ওঠার আগেই শয্যা ত্যাগ করব। আমাদের কাছে ওটা ছিল আরও বেশি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক পন্থা। আমরা আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, যে সব লোকের সঙ্গে আমরা দেখা-সাক্ষাৎ করতে চাই কেবলমাত্র তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব আর যাদের সঙ্গে চাই না দেখা-সাক্ষাৎ করব না। আমাদের মনে হয়েছিল অন্তত কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও এই নম্র ইচ্ছে পূরণের ব্যাপারটা হতে দিতে হবে।
আমার এই নতুন সাধারণ আর দৈনন্দিন জীবনে সকাল ৫টায় ঘুম থেকে উঠতাম আর শুতে যেতাম রাত ১০টার আগে। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের লোকের দিবসের ভিন্ন ভিন্ন সময় চমৎকার সময় থাকে। তবে আমি আদ্যপান্ত হয়ে উঠেছিলাম ভোরবেলারকার মানুষ। সেই সময়টাকে আমি উৎসবিন্দু হিসেবে ধরতে পারি। তারপর কী করব না-করব তা নিয়ে ভাবি আর টুকিটাকি কাজ সেরে ফেলি যার জন্যে খুব বেশি একটা মনোযোগ দেয়ার দরকার হয় না। দিনের শেষে বিশ্রাম নেই, পড়ি অথবা গান শুনি। ওই ছক আমাকে রাতের বেলায় তেমন একটা কিছু করতে দেয় না, কখনো কখনো অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা সমস্যা-সংকুল হয়ে পড়ে। ক্রমাগত নিমন্ত্রণ-টিমন্ত্রণ উপেক্ষা করলে লোকজন তো রাগ করতেই পারে। তবে ওই অবধি এসে আমার মনে হয়, অপরিহার্য সম্পর্ক তাদের সঙ্গেই গড়ে তোলা উচিত যারা নির্দিষ্ট কোনো মানুষ নয় বরং অনির্দিষ্ট সংখ্যক পাঠক। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাজ একটা থেকে আর একটায় যেতে উন্নতি সাধন করবে ততক্ষণ আমার পাঠকবর্গ যে-জীবনই আমি বেছে নেই না কেন, তাকে স্বাগত জানাবে। একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে সেটাই কি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়? পাঠকের চেহারা তো আমি দেখতে পাই না। এদিক থেকে বিবেচনা করলে পাঠকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধারণাগত। কিন্তু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ওটা আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্য কথায় বলতে গেলে, সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়।
যখন ক্লাব চালাতাম তখনও কথাটা অনুধাবন করতাম। অনেক খদ্দের আসত ক্লাবে। তাদের মধ্যে ১০ জনের ১ জনও যদি ওখানে এসে আনন্দ পেত তাহলেই তা যথেষ্ট হতো। ১০ জনের একজন যদি বারবার আসা খদ্দের হয় তাহলে ব্যবসা টিকে যাবে। কথাটা ঘুরিয়ে বললে এটা দাঁড়ায় যে, ১০ জনের ৯ জনও যদি ক্লাবটি অপছন্দ করে তাতেও কোনো ক্ষতি নেই। এটা উপলব্ধি করার পর আমার কাঁধ থেকে একটা ভারি বোঝা নেমে যায়। এখনও আমাকে নিশ্চিত হতে হয় ওই একজন খদ্দের জায়গাটা সত্যিই পছন্দ করেছিল কিনা। আর তা করতে গিয়ে আমার দর্শন স্পষ্ট করে তুলতে চাই আর ধৈর্যের সঙ্গে মেনে চলতে চাই তা যা-ই হোক না কেন। ব্যবসা চালাতে গিয়ে এই শিক্ষাই আমি গ্রহণ করেছি।
‘অ্যা ওয়াল্ড শিপ চেজ’ লেখার পর আমি ব্যবসায়ী হিসেবে যা শিখেছিলাম সেই ধারাতেই লিখতে শুরু করি। আর প্রতিটি কাজেই ১০-এ ১ হারে আমার পাঠক সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই পাঠক, যাদের অধিকাংশই তরুণ, আমার পরবর্তী বই প্রকাশের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে তারপর বইয়ের দোকানগুলোতে বিক্রিবাট্টা বেড়ে গেলে তা কিনে ফেলবে। এটাই হচ্ছে আমার জন্যে আদর্শ অবস্থা। নিদেনপক্ষে একটা স্বস্তিকর আবহ। যা লিখতে চাই তা-ই হুবহু লিখতে পারি। এ অবস্থায় যদি জীবনধারণ সম্ভব হয় তাহলে আমার আর কোনো চাওয়ার নেই। অন্য উপন্যাস ‘নরওয়েজিয়ান উড’ প্রকাশ হয়ে ২০ লাখ কপি বিক্রি হলে পরিবর্তন সামান্যই হয়, তবে এর পরে ১৯৮৭ সালে ওই পরিবর্তনকে বড়ই বলা যায়।
প্রথম যখন দৌড় শুরু করি বেশি দূর পর্যন্ত বা দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করতে পারতাম না। বিশ-ত্রিশ মিনিটের বেশি দৌড়ানোও সম্ভব হতো না। ওইটুকুতেই হাঁফিয়ে উঠতাম, বুক ধড়ফর করত আর পা ধরে আসত, কাঁপত। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যয়াম করাও সম্ভব হতো না। অন্যরা আমাকে দৌড়াতে দেখছে এটা ভেবেও প্রথম-প্রথম অস্বস্তিতে ভুগতাম। কিন্তু যখন ভাল করে দৌড়াতে শুরু করলাম, আমার শরীর এটা মেনে নিচ্ছিল যে এটা ধাবিত হচ্ছে, আর আমি ধীরে-ধীরে আমার সহিষ্ণুতা বাড়াতে পারছিলাম। সত্যিকার দৌড়বিদের গঠন লাভ করেছিলাম, নিশ্বাস-প্রশ্বাস আরও স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল, হৃদস্পন্দনও শান্ত হয়ে আসছিল। প্রতিদিনকার দৌড়ে গতি কিংবা দূরত্ব কোনো ব্যাপার ছিল না। যা ছিল তা হচ্ছে বাদ না দিয়ে প্রতিদিন দৌড়ানো।
অতএব, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, গৃহকর্ম আর লেখার মতো দৌড়ানোও আমার নিত্যদিনের রুটিনে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। ওটা যেহেতু সাধারণ অভ্যাসের পর্যায়ভূক্ত তা নিয়ে আমার কোনো অস্বস্তি ছিল না। একটা স্পোর্টস শপে গিয়ে খানকতক রানিং গিয়ার ও সুদৃশ্য কয়েক জোড়া জুতা কিনে ফেললাম। একটা স্টপওয়াচও কেনা গেল আর দৌড়ানোর ওপর একটা বই পড়তে লাগলাম।
এখন পেছন পানে তাকিয়ে দেখি, ভাগ্য আমার ছিল প্রসন্ন কেননা শক্তিশালী, স্বাস্থ্যসম্মত শরীরের অধিকারী ছিলাম। ফলে বিগত প্রায় ২৫ বছর ধরে আমার পক্ষে প্রতিদিন দৌড়ানো সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে আবার বেশ কিছু প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছিলাম। কোনো দিনই দৌড়াতে গিয়ে চোট পাইনি কিংবা আহত হইনি। আমি বড় কোনো দৌড়বিদ ছিলাম না, তবে নিঃসন্দেহে বলবান দৌড়বিদ ছিলাম। ওইসব প্রাপ্তিতে আমি গর্ব অনুভব করি।
১৯৮৩ সালে প্রথম আমি রোড রেসে অংশগ্রহণ করি। খুব বেশি পাল্লার দৌড় প্রতিযোগিতা সেটা ছিল না—মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। তবে সে-ই প্রথমবারের মতো আমার শার্টের পকেটে পিন দিয়ে নাম্বার লাগিয়ে দেয়া হয় আর আমাকে অধীর আগ্রহে অন্যান্য দৌড়বিদের সঙ্গে এই কথা শুনবার জন্যে প্রতীক্ষা করতে হয় ‘অন ইওর মার্কস, গেট সেট, গো’। পরে আমার মনে হয়েছে, ও হে, ব্যাপারটা তো মন্দ নয়। ওই মে মাসেই লেক ইয়ামানাকার পাশে ১৫ কিলোমিটারের এক প্রতিযোগিতায় অংশ নেই। জুন মাসে পরীক্ষা করার সাধ জাগে কতদূর দৌড়াতে পারি। তা আমি টোকিওর ইম্পেরিয়াল প্যালেস অবধি দৌড়ে গিয়েছিলাম। মোটামুটি সুন্দর পদক্ষেপে ২২.৪ মাইলের মধ্যে সাতবার দৌড়ে ছিলাম, পায়ে একটুও চোট লাগেনি। শেষে আমার ধারণা হয়েছিল ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নেয়াও সম্ভব আমার পক্ষে। পরে বুঝতে পেরেছিলাম ম্যারথনের কষ্টকর অংশটুকু শুরু হয় ২১ মাইলের পর থেকে। (২৬-এর ম্যারাথন ইতোমধ্যেই শেষ করেছি আমি)।
আশির দশকের মাঝামাঝিতে তোলা আমার একটা ছবির দিকে তাকালে দেখা যাবে দৌড়বিদসুলভ শরীর-স্বাস্থ্য আমার ছিল না। বিস্তর দৌড়াইনি, প্রয়োজনীয় মাসল ছিল না; হাত দু’টো ছিল ক্ষীণ আর পা বিশীর্ণ। এ কথা ভেবে মুগ্ধ যে, এ ধরনের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছি। (এখন অনেক দৌড়াদৌড়ির পর আমার মাসলের অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।) তদুপরি প্রতিদিনই আমার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হতো তা অনুভব করতাম, যা আমাকে সত্যিই সুখী করেছিল। অনুভব করেছিলাম আমার বয়স তিরিশের ওপরে হলেও শরীরের কিছু সম্ভবনা তখনও ছিল। যতই দৌড়ানো গেছে ততই প্রাণশক্তি লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
এসবের সঙ্গে আমার খাবার-দাবাড়ও পরিবর্তন হয়ে গেছে। সবজির সঙ্গে মাছ খাওয়া শুরু করি যা ছিল আমিষের প্রধান উৎসব। মাংস কখনোই আমার পছন্দের খাদ্য ছিল না। ভাত ও মদ খাওয়া কমিয়ে দেই আর প্রাকৃতিক উপাদান থেকে বেশি খাদ্য সংগ্রহ করি। মিষ্টি কোনো সমস্যা ছিল না, কেননা মিষ্টির প্রতি অনুরাগ কখনো ছিল না আমার।
যখন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি মনে হয় সহজে ওজন করা যায় এমন একটা শরীর আমার জন্যে লুকানো এক আশীর্বাদ। শরীরের মেদ যদি বাড়াতে না চাই তাহলে আমাকে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, কী খাই না-খাই তা খেয়াল রাখতে হবে আর রক্ষা করতে হবে সংযম। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে তাদের ব্যায়াম করার দরকার নেই, দরকার নেই কী খাচ্ছে-দাচ্ছে সেদিকে তাকানোর। এ কারণে বয়স বাড়লে তাদের শরীরিক শক্তি হ্রাস পায়। ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা যাদের ভেতর আছে নিজেদের তাদের ভাগ্যবান বলে মনে করা উচিত, কেননা লালবাতি তারা স্পষ্ট দেখতে পায়। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে, সব সময় সবকিছুকে এ ভাবে দেখা যায় না।

ম্যারাথন দৌড় সবার ক্রীড়া নয়, আর সেই রকম উপন্যাস রচনাও সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্যে কেউ আমাকে সুপারিশ করেনি অথবা পরামর্শও দেয়নি। বরং অনেকে আমাকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছে

আমার ধারণা এই কথাটা উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রেও খাটে। যেসব লেখক মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন তারা অনায়াসে লিখতে পারেন, তারা যা-ই করুক আর না-করুক। প্রাকৃতিক ঝর্ণা থেকে নেমে আসা জলের ধারার মতো তাদের কলম থেকে বাক্যরা নেমে আসে। সামান্য চেষ্টা বা চেষ্টা না করেই তারা তাদের লেখার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত আমি ওই দলে পড়ি না। নিজের সৃজনশীলতা খুঁজে বের না করা পর্যন্ত আমাকে ক্রমাগত একটা ছেনি দিয়ে পাথরের গায়ে আঘাত করতে হয়েছে। যতবারই নতুন উপন্যাস শুরু করেছি ততবারই আমাকে অন্য একটা গর্ত খুঁড়তে হয়েছে। বহুবছর আমি এই জীবন সহ্য করে নিয়েছি। অতএব পাহাড়ের গায়ে গর্ত তুলে ফেলা আর পাথরের স্তর দিয়ে বয়ে চলা পানি খুঁজে বের করবার ক্ষেত্রে আঙ্গিকগত ও শারীরিকভাবে দক্ষ হয়ে উঠেছি। যখনই লক্ষ্য করেছি একটা উৎস মরে গেছে, আমি অন্যটায় চলে গেছি। মানুষ যদি মেধার প্রাকৃতিক উৎসে আস্থা রাখে, হঠাৎ সে আবিষ্কার করবে তার সূত্র বা উৎস ফুরিয়ে গেছে তখন সে অসুবিধায় পড়বে।
অন্যকথায় বলতে গেলে—ওটার মুখোমুখি হওয়া : জীবন মূলত অন্যায্য। তবে অন্যায্য অবস্থার মধ্যেও আবার ন্যায্যতা সম্ভব।
লোকজনকে যখন বলি, প্রতিদিন দৌড়াই তারা বেশ অভিভূত হয়। তারা বলে, ‘আপনার মনের জোর অনেক বেশি নিশ্চয়ই।’ নিশ্চয়ই, এ রকমের প্রশংসা পাওয়া মন্দ ব্যাপার নয়। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলার চেয়ে অন্তত ভাল। কিন্তু আমার মনে হয় না, শুধু মনের জোরের বলে কেউ এটা করতে পারে। দুনিয়াটা এত সহজ নয়। সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে হয়, প্রতিদিন আমার দৌড়ানোর সঙ্গে মনের জোরের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার ধারণা, একটা কারণে ২৫ বছরে দৌড়াতে সক্ষম হব—কারণ এটা আমার ধাঁত সওয়া। অথবা, নিদেনপক্ষে ওসবে আমি কোনো ব্যাথা-ট্যাথা পাই না। স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ যেটা করতে পছন্দ করে তা-ই করে যায়, অপছন্দের জিনিস সে করতে চায় না।
সেই কারণে অন্যদের দৌড়ানোর ব্যাপারে কোনো সুপারিশ কখনো করি না। কারও আগ্রহ থাকলে সে দূরপাল্লার দৌড় শুরু করবে। কারও আগ্রহ না থাকলে শত বোঝানোর পরও সে ও কাজে এগুবে না। ম্যারাথন দৌড় সবার ক্রীড়া নয়, আর সেই রকম উপন্যাস রচনাও সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্যে কেউ আমাকে সুপারিশ করেনি অথবা পরামর্শও দেয়নি। বরং অনেকে আমাকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছে। ইচ্ছে হওয়ার পর আমি তা করেছি। লোকজন যারা দৌড়বিদ হয় তারা ওর জন্যেই জন্ম নিয়েছে।
দূরপাল্লার দৌড় আমার জন্যে যতই জুতসই হোক না কেন, আমার মধ্যে স্থবিরতা এসেছে আর তা করার ব্যাপারে এসেছে অনীহা। না দৌড়ানোর জন্যে সম্ভাব্য সব ধরনের অজুহাত দাঁড় করিয়েছি। দৌড় থেকে অবসর গ্রহণের পর অলিম্পিক দৌড়বিদ তোশিহিকো সেকো’র সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম এবার। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার পর্যায়ের একজন দৌড়বিদের পক্ষে কী বলা সম্ভব— থাক আজ দৌড়াবো না? তিনি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে যে কণ্ঠস্বরে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তা থেকে বেশ স্পষ্টই বোঝা গিয়েছিল আমার প্রশ্নের মূর্খতার বিষয়টি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নিশ্চয়ই, সব সময়।’
যখন সেইসব ঘটনার কথা স্মরণ করি, মনে হয় কী বিষাদাক্রান্ত প্রশ্নই না করেছিলাম। জানতাম প্রশ্নটা বিষাদে ভরা, সেকোর পর্যায়ের ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে সরাসরি উত্তর প্রত্যাশা করেছিলাম। আমার জানার আগ্রহ ছিল, শক্তি প্রেরণার বিচেনায় বিশ্বের চাইতে আমরা পৃথক হলেও যখন দৌড়াবার জন্যে আমরা জুতোর ফিতা-টিতা বেঁধে প্রস্তুতি নেই তখন আমরা একই মনোভাব পোষণ করি কিনা। সেকোর উত্তরে বড় ধরনের প্রশান্তি নেমে এসেছিল। ভেবেছিলাম, চূড়ান্ত বিশ্লেষণের পর আমরা সবাই এক।
যখনই মনে হয় আমি দৌড়াতে চাচ্ছি না, নিজেকে একই প্রশ্ন করি : তুমি তো একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতে পার, ঘরে বসে কাজ করতে পার আর নির্ধারণ করতে পার নিজের কাজের সময়। ভিড় ঠাসা ট্রেনে করে ভ্রমণ করতে হয় না তোমাকে, কিংবা বিরক্তিকর সব অফিস-সভায় যোগদান করতে হয় না। তুমি অনুধাবণ করতে পার না কতটা সৌভাগ্যবান তুমি। ওসবের সঙ্গে তুলনা করলে আশাপাশের এলাকায় গিয়ে ঘণ্টাখানেক দৌড়াদৌড়ি কিছুই নয়। ঠিক না? তখনই আমি দৌড়াবার জুতার ফিতা ঠিকঠাক মতো বাঁধি আর নির্দ্বিধায় দৌড়াতে চলে যাই। (আমি একথা বলছি এটা পুরোপুরি জেনে যে, এমন লোকজনের সংখ্যা প্রচুর যাদেরকে ভিড়ভাট্টা অতিক্রম করে রেল ভ্রমণ করতে হয় আর দৌড়ের ওপর থেকে সভায় উপস্থিত থাকতে হয়।)
ওটাই হচ্ছে আমার দৌড়ানোর ইতিহাস। তখন আমার বয়স ছিল তেত্রিশ। অনুভবে এখনও আমি তরুণ যদিও বয়সের দিক থেকে আর তরুণ বা যুবক নই। এটা সেই বয়স যে-বয়সে যীশুখৃস্ট দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ও যে-বয়সে স্কট ফিটজিলাল্ড পর্বতের উৎরাই অবধি গিয়েছিলেন। এটা জীবনের চৌ-মাথার মতো। এটা সেই বয়স যে বয়সে আমি দৌড়বিদ হিসেবে জীবন শুরু করি। আর এটাই ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার বিলম্বিত, কিন্তু সত্যিকার পথ চলার সূচনালগ্ন।

 

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন—

মুরাকামির লেখক হয়ে ওঠার গল্প: পর্ব-১

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ