behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সামসুল হক : আমাদের বিপন্নতা, ভেসে যাওয়া || রফিক উল ইসলাম

১৪:৩২, জানুয়ারি ০৪, ২০১৬

সামসুল হকএই নীল অন্ধকার, এই অফুরন্ত কোলাহল পার হয়ে কোথায় আছেন তিনি! আছেন কোথাও। কারণ কবির মৃত্যু নেই। সামান্য অগোচরে, আমি তাঁর সদাজাগ্রত চোখ দুটি স্পষ্ট দেখতে পাই। গভীর লেন্সের আড়াল ভেদ করে এই পৃথিবীর আলো-অন্ধকারে অন্য অনেক পৃথিবীর কথা বলছেন। তুলে আনছেন এমন সব বুদবুদের বিচ্ছুরণ, যা আমাদের চমকে দেয়, ঝলসে দেয় কখনো কখনো।
মূল রাস্তা ছেড়ে গলিপথের ব্যবধান পার হলে আঁধার-বিলাসী সিঁড়ি, দোতলায় ওঠার। কখনো ম্লান বাল্বের আলো, দিনের বেলাতেও। আমাদের যাবার খবর আগে ভাগে পেলেই জ্বালিয়ে রাখতেন। দরজায় বোর্ড আটকানো, যার তাৎপর্য এরকম— পূর্ব অনুমতি ছাড়া কবির সঙ্গে দেখা করার বিধি নেই। পরোয়া করতুম না। ভালবাসার জোর, বিশ্বাসের জোর, ঐ আপাত-কঠিন মানুষটিকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে ফেলেছিল। দোতলায় ছোট্ট একটি বাসস্থান, অনেকটাই অগোছালো, ছড়ানো-ছিটোনো, সেসব পেরিয়ে তাঁর পাশে জায়গা করে নেওয়া। কবে প্রথম, মনে নেই, প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর, সেই ছোট্ট জায়গাটি আগলে রাখতে পেরেছিলুম। অসম্ভব ভালবাসাবাসি, তুমুল দ্বন্দ্ব, রেষারেষি, আবার বুকে জড়িয়ে ধরা— একটি প্রকৃত সম্পর্কের মতোই, আমরা ছিলুম খুবই কাছাকাছি। বলতেন, ‘সিগারেট কোম্পানি ছাড়া আমি আর কারো কাছেই ঋণী নই।’ তখন বুঝিনি, একজন প্রকৃত কবিকে শুধুই দিয়ে যেতে হয়; চাওয়ার অপেক্ষা না করেই। এভাবে নিঃশেষিত হতে হতে, এভাবে আত্মবিসর্জিত হতে হতে, আমাদের সঙ্গে পথ চলা। কাঠিন্যের আস্তরণ ভেঙে, আমরা তখন ভেতরের নরম মোমের মতন মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছি। পাণ্ডিত্যের বোঝা সরিয়ে আমরা তাঁর শিশুর-সারল্যে-বোনা হৃদয়টিকে আবিষ্কার করেছি। সে ছিল বড়ো সুখের সময়, সে ছিল বড়ো দুঃখের সময়। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে বৌদির দেওয়া লিকার-চা (কখনো দুধ-চা খেয়েছি মনে পড়ে না!) এবং রবীন্দ্রগান, সে কি ভোলার কখনো। সাংসারিক প্রয়োজনে বৌদি গান শেখাতেন, আর আমরা মুগ্ধতায় সেই অমৃতধারায় সিক্ত হয়ে উঠতুম।
অসম্ভব খুঁতখুঁতে, জেদী, তেজদীপ্ত এবং একাগ্র এই মানুষটি আমার কাছে ছিলেন বিস্ময়কর। তাই বারবার ছুটে গেছি ছাত্রের মতন। চরম আর্থিক অনটন, অসুস্থতা, অসহযোগিতার উর্দ্ধে অবস্থান করতেন স্বেচ্ছাচারী সম্রাটের মতন। মনে পড়ে ‘ত্রসরেণু’ ( একটি কাব্যগ্রন্থ / আমাদের কবিতাপত্র ‘গ্রামনগর’ থেকে প্রকাশিত) প্রকাশের পর, নানা কারণে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। পরে, উনি নিজে ডেকে পাঠিয়ে সমস্ত বিরোধের অবসান ঘটিয়েছিলেন। এতখানি উদারতা ছিল তাঁর, এতখানি আশ্রয় ছিল আমাদের। মনে পড়ে, একবার ওঁর বাড়িতে রাত্রিবাস কালে, গভীর রাতে নিজে আমাদের মশারী গুঁজে তবেই স্বস্তি পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার ঘরে একটি বিদেশি বোতল আছে। যদি সকালে উঠে দেখি— খানিকটা কমে গেছে, কিছু মনে করবো না। কিংবা আমার টেবিলে সিগারেট-এর প্যাকেট আর দেশলাই আছে। ইচ্ছে হলে রাত্রে ব্যবহার করতে পারো।’ এমন যত্ন জানতেন উনি। কবিতার পংক্তির পর পংক্তি লিখে যাওয়ার মধ্যে যে যত্ন, যে অনুশীলন, যে ছন্দের দোলন, ভালবাসার মধ্যেও যে সেসব উপকরণ ছড়িয়ে দিতে হয়। এ-সব ওঁর কাছেই শেখা। অনেক পাহাড় ডিঙিয়ে, অনেক গণ্ডী ভেঙে এসব শিখতে হয়েছিল আমাদের। আজ বুঝি, কোন শেখাই ব্যর্থ হবার নয়।
‘নির্বাচিত কবিতা’ দেখে যেতে পারলেন না তিনি— এ ক্ষোভ আর যন্ত্রণা কোনোদিন মুছে যাবার নয়। আর সবটুকুর জন্যেই দায়ী আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এ ব্যাপারে প্রথম যেদিন ওঁর কাছে যাই, আমাদের আগ্রহে সাড়া দিয়ে শিশুর মতন ঝরঝরে হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতা মুছে গিয়ে সে এক অন্য মানুষ যেন, তুমুল আড্ডা আর ইয়ার্কিতে মেতে উঠেছিলেন। প্রথমে গিয়েই যে জীর্ণ কবিকে বিছানায় লেপটে থাকতে দেখেছিলুম, ফেরার আগে অন্য এক উৎফুল্ল চনমনে যুবককে যেন ছেড়ে চলে এসেছিলুম। বারংবার বলতেন, ‘আমার কবরের জন্যে জায়গা নেই কোথাও।’ না, সত্যিই ছিল না কোথাও। তাঁর জানাজার ( শেষ প্রার্থনা ) সময় নিজেকে সামলে রাখা তাই দায় হয়ে উঠেছিল আমার পক্ষে। না, তাঁর কবরেও মাটি দিতে পারিনি আমি; দেওয়ার মত মনের জোর এই অস্পষ্ট পৃথিবীর আয়ুকণা থেকে কুড়িয়ে নিতে পারিনি। এই অক্ষমতা আমি আজীবন বয়ে বেড়াবো। জেনে-বুঝেই বয়ে বেড়াবো।
আর যে মহিয়সী এরকম একজন ব্যতিক্রমী দামাল চরিত্রের পুরুষকে আজীবন সঙ্গ দিয়ে গেলেন, লালন করে গেলেন, আমাদের সমস্ত অত্যাচার হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়ে গেলেন, তিনি আমার কাছে দেবী। গাদাগাদা বই-পত্তর ব্যাগে করে বয়ে বয়ে বইমেলায় পৌঁছে দিচ্ছেন প্রকাশকের ঘরে ঘরে, প্রকাশকদের কাছ থেকে কবির প্রাপ্য পুস্তক আদায় করে আনছেন, বাড়িতে ফিরে খাতার মলাট জ্বালিয়ে আমাদের চা করে দিচ্ছেন, টেবিলের সিগারেট প্যাকেট কমে গেলে প্রচণ্ড বকুনি খাচ্ছেন, অবসরে রবীন্দ্রগান শেখাচ্ছেন ছাত্রীদের— এরকম দেবীর জন্যে অন্তত এই পংক্তিগুলি না লেখা হলে এই অনুভব অসম্পূর্ণ থেকে যেত। সেই দেবী কবিপত্নী করবী হক, যাঁর স্মৃতি কোনোদিনই মলিন হবার নয়।

 

‘ওই দুটো মেঘ শারীরিক-খেলা-শেষে

ঝরবে তখন শুরু শিশুদের ভেলা

দুটো বুড়ো-বুড়ি চোখের পিচুটি ঊর্ধ্বে

ছুঁড়লে এখন আবার মেঘের ভ্রুণ’

                                           ( তুরপুন )

 

এভাবেই সামসুল হক ভাঙেন। ভাঙতে জানেন। অন্ধকার চিরে দেখা আলোকবিন্দুর মতন ভেসে যান জীবন থেকে মহাজীবনের দিকে। তাঁর এই চলা থেকে টুকরো টুকরো দ্যুতি আমাদের গ্রাস করে। শূন্যতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অপার রহস্যকে সাপখেলানো বাঁশির সুরে বাজায়। এই চলা চেতন থেকে অবচেতনের দিকে। কখনো অবচেতন থেকে আবার চেতনার পথে।
তাঁর ঘরের জানালাগুলি আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট। ঘরের নুড়ি-পাথর, কারুকাজ,জলছবি সবই মিশে থাকে প্রবাহের ভেতর। টোকা দিলে অতলে ফিসফিস করে। বহির্জগতের স্পন্দন জানলার গরাদ গলে পুরু লেন্সের ওপর বিচ্ছুরিত হয়। রঙে রঙে ঘোর লাগে। এই আলোছায়ায় মিশে যায় অন্তর্গত ব্যাধি। আর ভিত কেঁপে যায়। টুপটাপ পাতা ঝরার নৈঃশব্দের মতন দশ দিক শুন্য থেকে শুন্যতর হয়ে ওঠে। প্রাসাদ ধ্বসে পড়ে। কবি সামসুল হকের ধুলো ওড়ে বাতাসে। ওড়ে, আর আমাদের যাবতীয় শ্মশানভূমির ওপর বৃষ্টি নেমে আসে।

 

‘ব্যাধির কারণে আমি খুদে পদ্য লিখি

আধির কারণে ক্ষুদ্রতম

ভয়হেতু দীপার নিবিড় দেখে আমি ত্রসরেণু’

                                                         ( অরূপরেণুর কাঙ্ক্ষায় )

 

সামসুল হককে আজ এভাবেই চিনতে চাইছি। মাটি থেকে শেকড় তুলে। শুন্যে লোফালুফি করে। এ-জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে, আরেক জীবনের কথকথা শোনাবেন তিনি। হে বিপন্ন সকাল, আমাকে কুয়াশা দান করো। যেন শরীর মুছে শুদ্ধতর আত্মার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি। যেন ভাঙা-ভাঙির এই খেলায় নিজেকেও টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিতে পারি। কবি আর আগুন তো সমার্থক। শুধুই পোড়ায়। চিতা উঠে আসে ঘুমের ভেতর। সমস্ত বর্ণ ধ্বংস করে নতুন এক বর্ণমালায় জীবনকে সাজিয়ে তোলে।

 

‘সব চিতার আগুন কিন্তু সমান অপাপবৃতা

এসো তবে চক্রে বসো মিতা’

                                                      ( অর্বাচীন অগ্নিপুরাণ )

 

চিতার আগুন পেরিয়ে আমরা যাবো কবিতার জন্মকথায়। গার্হস্থ্য ভেঙে যে মানুষটি আজ একা একা শবযাত্রায়, তার কাঁধে কি রক্তের দাগ লেগে থাকে? এই প্রশ্ন থেকেই কবিতার জন্ম। কবি এখানে আবাহক কিংবা অনুবাদক। নিয়ন্ত্রণহীন শুন্য সত্ত্বা থেকে মাথা তুলে অখণ্ড ব্রহ্মের অনুকম্পা স্পর্শ করেন। দ্রবীভূত হন। মহাকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতন স্রোত নেমে আসে পৃথিবীর দিকে। সুখহীন শোকহীন অন্ধকারহীন আলোহীন এক মধ্যভূমির ভেতর কবির ইচ্ছামৃত্যু ঘটে। তখনই কবিতার জন্মকথা উৎসববাহিত হয়। এক একটি মৃত্যুর ভেতর এক একটি জন্ম প্রস্ফুটিত হতে থাকে।

‘ওরা না— জেনেই আজ গায়ত্রীমন্ত্রের সঙ্গে জবাকুসুমের মতো

সুখহীন দুঃখহীন লাল মদ খায়

 

এই তো সৃষ্টির কথা এই তো দ্বন্দ্বের কথা মিলনের কথা

কবির মৃত্যুর কথা কবিতার জন্মকথা এই’

                                                                      ( কবিতার জন্মকথা-১ )

 

অথবা—
‘টেবিলে পায়েস ছিলো সুজাতার কোন বেড়ালটা

তা নিয়ে পিরের শুন্য দরগায় গিয়েছে আজ তা জানার জন্যে

এই সত্যমহাশ্রম

আর স্বর্গ নরকের সঙ্গে চোখ-টেপাটেপি হয় খেলা খেলা

যে-কোনো সুধার সঙ্গে কোনো পরিত্যক্ত ডাকঘরের পিছনে

 

খেলা খেলা মাদারির খেলা আহা

কবির মৃত্যুর কথা কবির জন্মকথা এই’

                                                             ( কবিতার জন্মকথা ২ )

 

এই খেলাতেই কবির সূচি-সমর্পণ। দৃশ্য থেকে অ-দৃশ্যে ফেরা। নিপুণ সূক্ষ্মতায় ক্রমাগত না-এর দিকে যাত্রা। ভার ভেঙে ভেঙে নৈঃশব্দের ওপর নিজেকে সমর্পিত করা। সে এক অলীক অবগাহন। ডুব দিলেই চতুর্দিকে আলো। কবিও আলো হয়ে উঠেছেন। প্রবাহিত হচ্ছেন। নিভে যেতে মন চায় না। যে কোনো শর্তে, সমস্ত বৈভবকে বিসর্জন দিয়েও কবি ধরে রাখতে চান সময়ের সেই অনন্তকে। ছত্রে ছত্রে তারই প্রাণান্ত আকুতি।

 

‘তুমি আমার বোধিবিন্দু নিলে

বোধি থাকুক দাও ফিরিয়ে বিন্দু’

                                                               ( চুরি করেছি ওই বিন্দু যোলায় )

 

তবুও নেই নেই করে কোথাও থাকেন তিনি। থাকতে বাধ্য হন। মুক্ত হয়েও বদ্ধ থাকেন মানুষের আবহমান উচ্চতায়। এখানেই যোগীর সাথে তফাৎ তাঁর। খাঁচা ভাঙতে গিয়ে অন্য এক নন্দিত খাঁচায় অলক্ষ্যে বন্দী হয়ে যান। তবুও ওড়াউড়ি থামে না। ভাসতে ভাসতে এই পৃথিবীর মায়া তাঁকে স্পর্শ করে। টেনে ধরতে চায় শিকড়ের অভিমুখে।

‘বাতাস শরীর হও মানুষের উচ্চতায় এসো

মানুষ তোমার সঙ্গে ট্যুরিস্টের মতো

এই শীতে ঈশ্বরকে কিছুক্ষণ বুঝে আসতে চায়
ভেবে দ্যাখো

এটাই তো গার্হস্থ্য যা বন্ধুতাসম্মত

অভিমান ভুলে প্রিয় এসো মানুষের ক্ষুদ্রতায়’

                                                          ( স্বাভাবিক গার্হস্থ্য )

 

ঝরে পড়ার আগে সুদূরের গান থামে। তার কিছু রেশ থেকে যায়। ফাঁকা হলঘর ঝমঝম বাজতে থাকে। কবি একবার চোখ রাখেন নক্ষত্রমালার ভেতর, একবার কান পাতেন মাটিতে। পারাপারের গল্প শোনা যায়। অচেনা জগৎ থেকে আলো এনে কবি সমর্পণ করতে চান মানুষেরই হাতে। তখনই পায়ে কাদা লেগে যায়। যাবতীয় মুর্ছণা আর হাহাকার তাঁকে ছিন্ন ভিন্ন করে। দু‘চোখ বন্ধ হবার আগে আর-এক-সামসুল ক্রমাগত তাঁর কণ্ঠস্বর দখল করে নেয়। এ যেন পূর্ব নির্ধারিত। নিয়তির মতো ঐ বাঁধা ঘাটে কবিকে টেনে টেনে আনে।

 

‘ভাষার ভিতর দিয়ে ছুটে যায় মুণ্ডুহীন লোক

ভাষার ভিতর দিয়ে তীব্র উড়ে যায় ডানাহীন পাখি

কবিতায় লেখা হতে পারতো না কি এই সব শ্লোক

ধর্মগ্রন্থ প্রণেতাই প্রশ্ন করে যখন চায়ের জল ছাঁকি’

                                                              ( যখন চায়ের জল ছাঁকি )

 

নামতে তো হবেই তাঁকে। এই আকণ্ঠ-কলহাস্য বিস্তৃত মাটিতে। জানু পাততে হবে। আরোহন আর অবরোহনের সন্ধিস্থলের দিকে দু‘হাতের যাবতীয় ফুল অঞ্জলি দিতে হবে। কিন্তু পা রাখবেন কোথায়? পাথরেরা তাঁকে নিয়ে লোফালুফি করে। দাম্ভিক রথের চাকাগুলি বুকের ওপর সমুদ্রের গান গায়। নির্বাক স্বদেশ কিছু চতুর থাবার নিচে শরীর পেতেছে। আমরা যেন মাতৃহীন। পরিচয় খুঁড়তে খুঁড়তে একসময় কঙ্কাল উঠে আসে। ঘুণধরা। পাট-কাঠির মতন প্রতিরোধহীন। তারা বিদ্রুপ করে। ভুরু কোঁচকায়। হৃৎপিণ্ড টেনে এনে তার ওপর গোত্রহীন লেবেল সেঁটে দেয়। বংশলতিকা হারিয়ে আমরা দূরের শূন্য মাঠে শুকনো তৃণভূমির ওপর ছটপট করতে থাকি।

 

‘খান্ কি মানে কি মেনকাও নাকি শকুন্তলা কি খান্ কির মেয়ে

শকুন্তলার ছেলে তো ভরত অর্ধজারজ ভরত আমার ভারত আমার ভারতবর্ষ’

                                                                                          ( জারজের গান )

 

শুরু হয় বহুমুখী ক্ষরণ। এড়িয়ে যেতে পারেন না কবি। মানুষের স্পর্ধার দিকে কিংবা মাথা-নিচু-করা সকালগুলির দিকে মুখ ফেরাতে হয় তাঁকে। যে আঙুলে কবি বন্দি রেখেছিলেন রাধিকামোহন মৈত্রকে, সেইসব আঙুলগুলির ক্রমশ ‘সুমনের গান’- এর দিকে ভেসে যায়। মানুষের অন্তর্গত সাপগুলি তাঁকে দংশন করে, নেশা ধরায়। কখনো গৃহহীন করে। কখনো বাতাসে আছড়ায়। সহস্র বর্ষার চুম্বনে একাকার কবি ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তাঁর কণ্ঠস্বরও ঘুরে দাঁড়ায়। ঝোড়ো প্রকৃতির উদ্দামতা ছাপিয়ে সেই কণ্ঠস্বর এক সময় আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। যেমন, বহুদিন পর হঠাৎ আত্মীয় এলে, ধুম লাগে।

 

‘লিঙ্গের ডগায় ব্যথা হলে তা কি ভুলে থাকা যায়

প্রকৃতিকে প্রশ্ন করি স্মৃতি ও স্বপ্নকে

আমাদের ধর্ম যদি এই প্রশ্নে তেড়ে আসে কামড়াতে আসে’

                                                                           ( কবিতার প্রত্যাশা )

 

আর আছে, সর্বগ্রাসী খিদে। পরিত্যক্ত কুটিরের জন্যে খিদে। পিচের রাস্তা থেকে মুছে যাওয়া হাসমীর রক্তের জন্যে খিদে। ভাঙা ডানায় লেগে থাকা বিকেলের শেষ আলোটুকুর জন্যে খিদেও কবিকে একান্তে চিবোয়। আর কিশোরীর বুকের ভাঁজে লুকানো চিরকুট, অল্প ঘামে ভেজা; সেই ঘামটুকুর জন্যে খিদে? সে তো আবহমান। রক্তে তার অনুরণন বেজে চলে। দিগন্ত থেকে দিগন্তের ওপারে, পৃথিবীর সব শিউলিগাছ সে খবর জানে। চুম্বন আর অশ্রুপাতের মাঝামাঝি কোন পংক্তিতে সেসব লিপিবদ্ধ হয়! এ পৃথিবী শ্রাব্যও নয়, পাঠ্যও নয়। কিশোরীর প্রথম আঁচল নীল ভোরের আলোছায়ায় দুলে দুলে ওঠে।
ধরা যাক, উনুনে হাঁড়ি চাপানো। অল্পসল্প ভাপ উঠছে। বুকের পাঁজর বেরোনো কিছু কিশোর চাকপাক দিয়ে বসে। কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসছে চোখ। আহা, ভাত নামবে। মুক্তোর দানার চেয়েও উজ্জ্বল ভাত। ভাতের গন্ধের ভেতর স্নেহময়ীর আঁচল ছড়ানো। কবি সেই ভাতের গন্ধ ধরে উড়ে যাচ্ছেন অন্য জন্মের কাহিনিতে।

 

ক. ‘এসো গাঢ় এসো আধফোটা এসো সূচি-সমর্পণ

ঘাসে এসো ফড়িঙের চোখে এসো মানুষের বুক ও গলার মাঝখানে

কেন থমকে আছো তীক্ষ্ম শতচক্ষু পুস্তিকামালায়

আজ তো গানের দিন ছায়াকে ঈর্ষার দিন বিকেলের নারী হাত ধরো

                                                                              ( ছায়াকে ঈর্ষার দিন )

 

খ. ‘শুধু জানি ঠা-ঠা সত্য খিদে খুবই জন্মান্তরবাদী’

                                                                       ( ঠা-ঠা সত্য )

 

জন্মান্তরের কথা এলো যখন, তীব্রজল নদীটির কথা বলি। এপারে জীবন আর আলো। ওপারে কুয়াশামাখা বিস্তীর্ণ বনভূমি। কিংবা ঠিক বনভূমিও নয়। আবছা অস্বচ্ছ কিছু, ছায়া ছায়া। মায়ায় গাঁথা। অনুভব করা যায়; স্পষ্ট ছোঁয়া যায় না। মাঝখানে কুলুকুলু প্রবাহিত নদী। শুধু বয়ে যায় অনন্তকাল। কোন্ পাহাড় থেকে নেমে আসে, কোন্ মোহনায় গিয়ে মিশে যায়, বোঝা যায় না। কবিও ভাসেন নদীতে। ভাসতে ভাসতে ওপারের রহস্যে গিয়ে ওঠেন। আবার ফিরে আসেন এপারে। স্রোত কি ফেরাতে চায় তাঁকে, এতই সহজে। কবি জানেন ডুবসাঁতার। দু-পারের লবণাক্ত বালি শরীরে মেখে একা স্থির কিভাবে জ্বলে উঠতে হয়, সেসব মন্ত্র তাঁর হাতের মুঠোয়। ধাবমান নদী তেজী ঘোড়াটির মতন এই উন্মত্ত সহিসের চাবুকের নিচে ল্যাজ নাড়তে থাকে। দর্শক গ্যালারী থেকে মুহুর্মুহু কলরোল ওড়ে। অবিরাম কুয়াশার ভেতর এই পরিক্রমা, ভেসে যাওয়া, শবদেহগুলির চোখে নতুন আলো ফেলে। নদীটির কুলুকুলু ধ্বনি থেকে প্রবাদ মুছে যায়। জন্ম আর মৃত্যু মাঝখানের দেওয়াল ভেঙে ভেঙে কনে দেখা আলোয় পরস্পরকে চুম্বন করে।

 

‘আমার কোনো স্বপ্ন নেই জন্মভস্ম আছে

গান শোনাবার ছলে গর্ভবতীর পেটে ছড়াই

সরাইখানার জাবপাত্রে জন্মানো কি ভালো

ভস্ম মেখে রাত্রে ওরা জন্মাবে দেয়ালে’

                                              ( আমার কোনো )

 

কতকালের এইসব আলো! কবির মুঠোয় পোষা বিড়ালের মতন ধরা দেয়। সেই আলোয় পথ দেখেন কবি; পথ দেখান। একসময়, গাঢ় অন্ধকারে, বুদ্ধের মতন কেউ তাঁকে বোধিবৃক্ষটিকে চিনিয়ে দেয়। ভোরের পাখিরা সেই খবর নিয়ে আসে লোকালয়ের দিকে। এভাবে জীবন থেকে মৃত্যু কিংবা মৃত্যু থেকে পুনর্জীবনের পক্ষে আবর্তিত হতে থাকেন কবি। বারংবার। অন্যান্য পৃথিবীর শুধু গড়িয়ে যায়; গড়িয়ে যেতে থাকে নিজস্ব কক্ষপথে।

 

‘আমি ভিখিরির আদেশ মেনেই কাঁপতে কাঁপতে শুয়েছি তোমার পাপোশে

তবু কি দৈবী সত্যে তোমার ওষ্ঠ চিরিনি খড়্গে

চিরেছি কেননা সেটাই টরম ছন্দ’

 

এখান থেকেই, এই বোধ থেকেই একজন কবির জয়, কবিতার জয়গাঁথার সূচনা।

( নিবন্ধে ব্যবহৃত কবিতাংশ ত্রসরেণু কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত )

সামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ :

১. হৃদয়ের গন্ধ [ দ্বিতীয় সংস্করণ ‘চন্দনবিল’ (১৯৭৯) নামে ] /১৯৬৪

২. নিজের বিপক্ষে / ১৯৬৪

৩. প্রটোপ্লাজম / ১৯৬৬

৪. বাংলাদেশের জন্য / ১৯৭১

৫. চলচ্চিত্র / ১৯৭২

৬. ডায়েরি / ১৯৭৩

৭. মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই পৃথিবী / ১৯৭৪

৮. নিভন্ত মোমবাতির তলায় শাদা ঘোড়া / ১৯৭৫

৯. সোনার ত্রিশূল / ১৯৭৮

১০. পাপপূণ্য / ১৯৮০

১১. খোকা ভাত খাবি আয় / ১৯৮২

১২. কবির ভ্রমণ / ১৯৮৫

১৩. তিনি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় / ১৯৮৫

১৪. ইডেনের তৃণমূল / ১৯৮৬

১৫. গ্রুপ থেরাপি / ১৯৮৮

১৬. চড়ুইপাখির বিচার / ১৯৮৯

১৭. ত্রসরেণু / ১৯৯০

১৮. স্যুটকেসের উপর বসে আছি / ১৯৯১

১৯. প্রক্ষিপ্ত প্রহর / ১৯৯২

২০. আবহাওয়ার মুদ্রাদোষ / ১৯৯৪

২১. নিঃস্বপ্ন পার্বনে যাবো না /১৯৯৭

 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ