behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

শান্তিরামের চা নিয়ে কয়েক ছত্র || কিরীটী সেনগুপ্ত

১৪:১৪, জানুয়ারি ১০, ২০১৬

[কবিতা, কবিতা বিষয়ক আলোচনা, লিটেরারি নন-ফিকশন, মেময়ার এবং অনুবাদ— ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় লেখকদের মধ্যে কিরীটী সেনগুপ্ত একটি পরিচিত, আলোচিত এবং স্বীকৃত নাম। তাঁর কাজকর্মের প্রশংসা কেবল ভারতে নয়, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত সাহিত্য পত্রিকাতেও স্থান পেয়েছে বহুবার। তাঁর যৌথ সম্পাদনায় দেশ এবং বিদেশে প্রকাশিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা এবং গল্প সংকলন। তাঁর সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থ, মাই গ্লাস অফ ওয়াইন, নথিভুক্ত এবং সংকলিত হয়েছে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরের রায়ার্স মিউজিয়াম এন্ড লাইব্রেরিতে। বর্তমানে লিটারেচার স্টুডিও রিভিউ পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক। কলকাতা স্থিত, শাম্ভবী প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত তরুণ গল্পকার বিতান চক্রবর্তীর ছোটগল্প সংকলন শান্তিরামের চা বিষয়ে এই প্রথম আলোচনা করলেন বাংলা ট্রিবিউনে।]

 

খণ্ড জীবনের চালচিত্র

পুরো জীবনটাকে যদি একবারে দেখতে পেতাম? ধরুন, এই একচল্লিশে পৌঁছে এক নজরে দেখে নিতে চাই আমার ফেলে আসা সময়। এক-একটি বছরের এক-একটি মুহূর্ত... ঘটনার কেরামতি... প্রবাহের দাবদাহ... দেখার মধ্যে দেখা... আর মায়ার আলিঙ্গন। মন্দ হয় না কিন্তু। আড়ালের রহস্যময়তাকে (পড়ুন, কবিতাকে) চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে একটি সার্থক ছোটগল্প। বিতান চক্রবর্তীর প্রথম ছোটগল্প সংকলন, শান্তিরামের চা, পড়তে পড়তে ঠিক এমনই মনে হল। সাতটি ছোটগল্প। ভিন্ন স্বাদ। ভিন্ন গন্ধ। এবং ভিন্নতর ট্রিটমেন্ট। নিয়ম মেনে, এক-একটি গল্পের মুষ্টিমেয় চরিত্র নিয়েই বিতান রচনা করেছেন আমার-আপনার খণ্ড জীবনের আদিগন্ত চালচিত্র।
গল্পগুলো পড়তে পড়তে অদ্ভুত শিহরণ জাগে। আমি পড়লাম? নাকি শুনলাম? কোনো অদৃশ্য বক্তা যেন আমার সামনে বসেই বলে গেলেন গল্পগুলো। কতকটা অভিনয়ের মাধ্যমে। চরিত্রগুলোর বডি-ল্যাংগুয়েজ, কথাবার্তা, চলন খুব চেনা, খুব জানা। পরিণতি অথবা গন্তব্যও বেশ খানিকটা প্রেডিক্টেবল। কিন্তু সম্পূর্ণ অচেনা তাদের যাত্রা। অসীমের পথে। দুরন্ত এই জীবনকে হাতের মুঠোয় ভরে শ্বাস নিতে নিতেই গল্পকার বিতান পরিচয় করালেন ওঁর চোখের ধার। সাতটির চারটি ছোটগল্প বিষয়ে এই আলোচনা।

‘কতদিন এভাবে বিষাদ ধুয়ে যায়নি চোখের জলে...’

ইংলিশ-ভিংলিশ ছবিটি মনে পড়ে? বলা হয়, দীর্ঘ স্বেচ্ছা-নির্বাসন শেষে অভিনেত্রী শ্রীদেবীর কাম-ব্যাক ফিল্ম। এক ভারতীয় নারী ইংরেজি ভাষায় রপ্ত না হলে তাঁর কর্পোরেট-সংস্কৃতি-লালিত পরিবারের কাছে লাঞ্ছিত হন, দেশ এবং বিদেশের মাটিতে, এ ছবি তারই আলেখ্য। মূল চরিত্রে একজন নারী। হোম মেকার। যদিও ঘরে থেকেই নিজের পছন্দের কাজ করে উপার্জন করেন তিনি। আমি চাই বিতানের বোগেনভিলিয়া গল্পটি অন্য কোনো ভাষায় অনূদিত হোক। বিশেষত ইংরেজিতে। টু বি প্রিসাইস, আমেরিকান ইংলিশে। এই গল্পে একটি শিক্ষিত, বেকার যুবক সময়ের দাবীকে মেনে নিচ্ছে; তার আজন্মলালিত বিশ্বাসের কাছে হার মেনে বেঁচে থাকার চেষ্টায় মরিয়া। ইংরেজিতে কথা না-বলতে-পারা আজও খামতি হিসেবেই ধরে নেওয়া হয় আমাদের রাজ্যে, পশ্চিমবঙ্গে। বেকারত্বের দংশন, অনিবার্য প্রেম-বিচ্ছেদ, আর ঘরে ফেরার মুখে কাঁটা-ঝোপের ঝাঁঝালো আদর— এসব মিলেমিশে এই গল্পটি রোজগেরে-পুরুষ অধ্যুষিত সমজাকে আরও একবার মুখোমুখি দাঁড় করায় একটি অবশ্যম্ভাবী পরিস্থিতির দোরগোড়ায়— ‘আমি আমার সোসাইটিতে বলতে পারব না যে আমার বর বেকার।’ একজন ফেমিনিস্ট এই গল্পটিকে কীভাবে নেবেন, জানতে ইচ্ছে করে। একজন পুরুষ কি জন্মসূত্রেই রোজগেরে হওয়ার স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ?

‘আষাঢ়-শ্রাবণ মানে না তো মন...’

মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে এবং শান্তিরামের চা এই দুই গল্প একটি অপরটির বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটিতে রাতারাতি ধনাঢ্য হওয়ার হাতছানি এবং পরিণতি। আর অপরটিতে মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসিকতা, মূল্যবোধ, আর ট্যাবুতে আটকে থাকা একজন নিম্নবিত্ত পুরুষ। প্রথমটির সিংহভাগ জুড়ে কাঞ্চনা, এক নারী। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে শান্তিরাম স্বয়ং। এই দুটি গল্পের কেন্দ্রে বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়।
'আমি বাচ্চা ভালোবাসি'— আমার বন্ধুরা এমন কথা হামেশাই বলে থাকেন। বিশ্বাস করুন, আমি ওদেরকে রাস্তায় বসে-থাকা কোনো ভিখিরির কালো বাচ্চাকে কোলে তুলে নিতে দেখিনি কখনো। দেখিনি। আর দেখবও না, আমি প্রায় নিশ্চিত। কারণটা ঠাহর করতে পারি যদিও। কালো-ফর্সা একটা মস্ত ব্যাপার আজও। না হলে ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন, বিপণন ক্রমবর্ধমান হয় কী করে? বিগত বেশ কয়েকটি বছর পুরুষের ফেয়ারনেস আলোচিত হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বর্তমান সামাজিক পরিকাঠামোয়। চামড়ার রঙ আর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ কীভাবে সমতুল্য হয় এই কনসেপ্ট বেচেই ফুলে-ফেঁপে উঠছে এক একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। মননশীল বিতান লিখছেন, ‘প্রথমদিকে তার ফর্সা গাল দু-একজন টিপে দিয়ে হাতে এক টাকার কয়েন গুঁজে দিত।’ ভিখিরি কাঞ্চনার মেয়ে টুয়া। একটি বাচ্চা মেয়ে; শৈশবের দিনগুলোতেই যে তার মায়ের কোলিগ। টুয়াও জেনে গেছে ফর্সা গাল আদর টানে, ভিক্ষে আনে। এই পেশায় অনভ্যস্ত টুয়া তাই ওর দুগালে মেখে নেয় প্ল্যাটফর্মের ধুলো। ওর শৈশব ওর যাপনের অস্ত্র। ওর গায়ের ফর্সা রঙ নয়। ওরা তো জন্ম-ভিখিরি নয়। আচ্ছা, জন্মসূত্রে কেউ পেশাদার হয়েছেন কখনো?
চা বিক্রেতা শান্তিরাম। পথ চলতি মানুষ, আর কয়েকজন বাঁধা কাস্টোমার। এভাবেই ওঁর সংসার পালন, স্ত্রী-পুত্র সহ। বিগত কয়েকটি মাস এক কর্পোরেট সংস্থার আকর্ষণীয় প্রস্তাবে এবং জীবন ধারণের মানোন্নয়নের তাগিদে হকার থেকে একধাপে একটি ধোপদুরস্ত টি-পার্লারের সর্বময় কর্তা। হাতে নয়, মেশিনে তৈরি স্বাস্থ্যকর চা পানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই খুশ। যুব সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার কথা ভেবে চা-এর সঙ্গে বিয়ার ক্যান টি-পার্লারে বিক্রি করার প্রস্তাব এবং পরামর্শ দেওয়া হয় কোম্পানির তরফে। শান্তিরামের উভয় সংকট। ‘বিয়ার মদ নয়’— এমন একটি বহুপ্রচলিত যুক্তির কাছে তাঁর সযত্নে পালিত সংস্কার ধাক্কা খায় হঠাৎ। কী করবে শান্তিরাম? ফিরে যাবে ওঁর নিঃস্পৃহ যাপনে? ছেলেকে ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে তাহলে তো আর পড়ানো যাবে না! আর পাঁচটি বাংলা-স্কুলে-যাওয়া সাধারণ ছাত্রের মতো বেড়ে উঠবে ওঁর ছেলে? এসব প্রশ্নের উত্তর সংবেদনশীল লেখকের কলমে উঠে এসেছে ঠিকই, তবু পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন একটি জরুরী বিষয়। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে পারিবারিক শিক্ষা এবং সংস্কৃতির অমোঘ প্রয়োজনীয়তা।

‘আলোতে মানুষকে অবয়ব মনে হয়, আমি দেখেছি...’

আহা! এমন একটি গল্প যদি আমি লিখতে পারতাম...
ছোটগল্পটির শিরোনাম হন্তারক। কবিতা বা গল্প লেখা শেখানো যায়? আমরা বলি ক্রিয়েটিভ রাইটিং। লেখালিখি তো সর্বদাই সৃজনশীল, তাহলে আর ক্রিয়েটিভ শব্দটি জুড়ে দেওয়া কেন? এর উত্তর আমার কাছে নেই। তবু বলি, বাংলা সাহিত্যে যদি কোনোদিনও সৃজনশীল অনুশীলন বিষয়ক আলোচনা হয়, হন্তারক তার পুরোভাগে থাকবে। হলপ করে বলছি এ কথা; দায়িত্ব নিয়েই লিখলাম আমার মন্তব্য।
ম্যাজিক রিয়ালিজম গোত্রের একটি ছোটগল্প। এখানেও একটি শিক্ষিত, বেকার যুবক। নিদ্রাচ্ছন্ন। স্বপ্ন, স্বপ্নে বাস্তব, স্বপ্নিল বাস্তব এবং আটপৌরে দৈনন্দিন নিয়েই এই গল্পের প্রসার। হন্তারক একটি গা-ছমছমে, মনস্তাত্ত্বিক শর্ট ড্রাইভ। ফেরারি পত্রিকায় এই গল্পটির আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলাম—
ইন্টারভিউয়ার সম্পর্কে যুবকটির পর্যবেক্ষণ তারিফে কাবিল— ‘...উনি কেবলই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। এমন ভাব যেন উত্তর শোনার কোনও বাসনাই ওনার নেই। কিন্তু প্রতিটি উত্তরই উনি মন দিয়ে শুনছেন।’ চাকুরী-প্রার্থী এই যুবককে ছেলেমানুষ বলাই যায়। নয়তো ইন্টারভিউয়ারের সামনে বসে তার দুষ্টুমি করার ইচ্ছে জাগে? জিজ্ঞাসা করা হল, ‘আপনার প্রিয় কাজ?’ তার উত্তরও এলো চটপট। ‘কবিতার লাইন পালটে ফেলা।’ দেখুন, লেখক বিতান ‘বিকৃতি’-র পাশ না-মাড়িয়ে লিখেছেন, ‘...পালটে ফেলা।’ অনেকটা সেই ‘উলটে দেখুন, পালটে গেছে’-র মতো। আর উদাহরণ হিসেবেও তুলে দিলেন খাসা একটি লাইন— ‘...বৃষ্টি পড়ুক এখানে বারোমাস/ এখানেও মেঘ গাভির মতন চড়ুক...’।
হন্তারক কোনো বেকার যুবকের লড়াইয়ের গল্প নয়। কোনোভাবেই নয়। লাইফ স্ট্রাগলের কাহিনী নয়। খেতে না-পাওয়ার আলেখ্য নয়। একটি বেকার ছেলের কল্পনা, জাগতিক অবস্থান, সমাজ চেতনা, ইচ্ছে-অনিচ্ছের টানাপোড়েন, কবিতা-মাখামাখি অস্তিত্বের নাতিদীর্ঘ,গভীর মনস্তাত্ত্বিক হিসেব। যে হিসেবের একদিকে এক নির্মোহ পর্যবেক্ষক-তথা-লেখক,আর অপর দিকে অবচেতনের চৈতন্যে জেগে-থাকা কোনো এক যুবক।
বিতান চক্রবর্তীর ছোটগল্প সংকলন, শান্তিরামের চা, মননশীল পাঠক মহলে সাড়া জাগাবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সৃজনশীল এবং সংবেদী লেখকের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ