behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বন্ধুরা, জীবন বড়ো ক্লান্তিকর || মূল : জন বেরিম্যান || অনুবাদ : কুমার চক্রবর্তী

১১:৩৬, জানুয়ারি ১২, ২০১৬

 

জন বেরিম্যান[বেরিম্যান জন্মগ্রহণ করেন ওকলাহোমার ম্যাক আলেস্টার-এ, ২৫ অক্টোবর, ১৯১৪ অব্দে। ১৯৭২-এ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লেখেন— কাব্যগ্রন্থ: দ্য ডিসপোজেজড (১৯৪৮), হোমেজ ট্যু মিসট্রেস ব্রডস্টিট (১৯৫৬, সংশোধিত ১৯৬৮), ৭৭ ড্রিমসঙ্স (১৯৬৪), শর্ট পোয়েমস (১৯৬৭), হিজ ট্রয়, হিজ ড্রিম, হিজ রেস্ট (১৯৬৮), এবং ডিল্যুশন্স, এট সেটেরা (১৯৭২); গদ্য: জীবনী: স্টিফেন ক্রেন (১৯৫০), এবং উপন্যাস: রিকোভারি (১৯৭৩)।]
পুরো মনস্তত্ত্ব জুড়েই ছিল নিষ্প্রদীপ আঁধারের লুক্কায়িত বাস্তবতা কিন্তু নিস্তারের পথ তাঁর জানা ছিল না। স্নায়ুর গভীরে ছড়ানো ছিল শানিত চকচকে ছুরি যার আঘাতে কাটত সংবেদনশীল তন্ত্রীগুলো। বিকারগ্রস্ত আর অন্তর্বাহী বিলাপে পূর্ণ ছিল তাঁর সত্তা যা তাঁকে গভীর-গভীরতর শূন্যগর্ভতায় নিয়ে গিয়েছিল এবং আত্মার ক্রীতদাসত্বের শৃঙ্খলমুক্তির এক মুক্তবেগ সঞ্চার করেছিল। পেছনের প্রেক্ষাপটীয় অন্ধকার তাঁকে তাড়া করেছিল এবং এই কাউন্টারপয়েন্টিং বারেবারেই উন্মাদনায় আক্রান্ত করেছিল তাঁকে যার ফলাফল হিসাবে সময়ের ধারালো পেরেকে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন তিনি। বর্তমানকে মনে করতেন অতীত আর অতীতকে অন্ধকার। সংশয় ও শূন্যতার এই ভেতরের অন্ধকার সারাজীবন তাঁকে বিদারিত করছিল আর তিনি হয়েছেন ভারসাম্যহীন। জন বেরিম্যান, আর এক বিখ্যাত স্বীকারৌক্তিক কবি, আজীবন তাড়িত ও আচ্ছন্ন ছিলেন তাঁর পিতার মৃত্যুতে;— তাঁর পিতা জন অ্যালাইন স্মিথ, ১৯২৬ অব্দের ২৬ জুন আত্মহত্যা করেছিলেন। সে-সময়ে এগারো বছরের বালক পিতার যে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেন, তার থেকে, সেই বিচ্ছেদ ও হারানোর বেদনা থেকে, তিনি আর রেহাই পাননি। তিনি ভুলে থাকতে চেয়েছেন পিতাকে, পরিবর্তন করেছেন নিজ নামের পদবি, মা মার্থার দ্বিতীয় স্বামী জন এংগাস বেরিম্যানের পদবি নিয়ে জন অ্যালাইন স্মিথ জুনিয়র থেকে হয়েছেন জন অ্যালাইন বেরিম্যান, কিন্তু আত্মহত্যাকারী পিতা বারেবারে যেন তাঁকে অবচেতনে প্ররোচিত করছিল, ফলে তিনি এক হ্যামলেট-গূঢ়ৈষায় ভুগছিলেন সারাজীবন। পিতার আত্মহত্যাকালীন সময়ে মা মার্থা জন এংগাস বেরিম্যানের সাথে ভালোবাসায় মত্ত ছিলেন— এই সূত্রপাতে সারাজীবন তিনি, জন বেরিম্যান, অনিশ্চয়তা আর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে তাড়িত হয়েছেন; এবং প্রিন্স অব ডেনমার্ক-এর মতোই ধীরে-ধীরে নিজের জীবনে এক মৃত্যু-ইচ্ছার উদ্বোধন ঘটান যা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বর্ধিষ্ণু। আর এরই পরিণতিতে আটান্নো বছর বয়সে, ১৯৭০ অব্দে, মিনিয়াপোলিসের ওয়াশিংটন অ্যাভিনিউ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। মদ্যপানাসক্ততা থেকে রেহাই না পেয়ে এর দুঃখ থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের মুক্তি দেওয়ার জন্যেও তিনি আত্মহত্যা করেন আর পাশাপাশি এ উদ্দেশ্যও ছিল যে, যে পিতা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল, এবার তাঁর সাথে তিনি মিলিত হবেন। পিতার মৃত্যু তাঁর নিকট এতই মর্মপীড়াদায়ক ও অসহ্যকর ছিল যে তিনি শুধু তাঁর পিতার স্মৃতিকে অবদমিতই করতেন না, বরং তাঁর সংগ্রহগুলিকেও ভুলে থাকতে চাইতেন। পরবর্তী জীবনে বেরিম্যান বলতেন, পিতার মৃত্যুর কারণে তাঁর সমগ্র শৈশবই চুরি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পিতা আত্মহত্যা করেছিলেন, ২৬ জুন, সকালে; তাঁর মা মার্থা স্মিথ স্বামীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল .৩২ ক্যালিবারের পিস্তল, যা থেকে তাঁর বুকে ঢুকেছিল একটি বুলেট।


পিতার মৃত্যুর পরের মাসগুলোতেই বালক বেরিম্যানের জীবন ওলট-পালট হয়ে যায়। তাঁর কাকা জ্যাক, তাঁর মা, সে নিজে, এবং তাঁর ছোটো ভাই রবার্ট জেফারসন, ফ্লোরিডার টাম্পা থেকে কুইন্স-এর জ্যাকসন হাইটে চলে আসেন। বালক বেরিম্যান তাঁর পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত ক্যাথলিক বিশ্বাস পরিত্যাগ করে এপিসকোপালীয় চার্চে যোগদান করেন। ১৯২৮ অব্দের সমাপ্তিসময়ে বেরিম্যানকে কনেকটিকাটের সাউথ-কেন্টে একটি এপিসকোপালীয় বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে, প্রাথমিক অবস্থায়, অন্য স্কুলছাত্রদের সাথে সহাবস্থানে, বেরিম্যানের মারাত্মক সমস্যা হয়। ব্রণে আক্রান্ত এবং কম দৃষ্টিশক্তির কিশোর বেরিম্যান তাঁর সহপাঠীদের দ্বারা উপর্যুপরিভাবেই নিপীড়িত হতেন।
সাউথ-কেন্টে আসার কিছুদিন পর, বেরিম্যান হয়ে পড়েন বিষণ্ন ও স্মৃতিতাড়িত ও গৃহকাতর। সে-সময়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন, তাঁর মা মারা গিয়েছেন এবং তিনি মাকে দেখার জন্যে স্কুল থেকে আসতে পারছেন না। বাস্তবে এ ঘটনার এক ছায়াপাত চোখে পড়ে। তাঁর মা এক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যান; আঙ্কল জ্যাকের অনুরোধে তিনি তার নামের ‘মার্থা’ অংশ পরিত্যাগ করেন। বেরিম্যানের জীবনেও কোনো কিছুই, এমনকি তাঁর মায়ের দেওয়া নামটিও অপরিবর্তিত থাকেনি। অনেক বছর পর, তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যার খ্রিস্টান নাম রাখেন মার্থা,— এটা হয়তো তাঁর আত্মসমর্থন ও সংশোধনের একটি ছুতো ছিল। কিন্তু সবকিছু হারালেও কিছু ফিরে এসেছিল তাঁর জীবনে, ও মৃত্যুতে। মৃত্যুর পর রোমান ক্যাথলিক রীতিতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছিল তাঁর; সেন্ট ফ্রান্সেস ক্যাব্রিনি চার্চে, মিনিয়াপলিসে, তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বেরিম্যান যখন সাউথ-কেন্টে আসেন তখন তাঁর তেরো বছর বয়স, তাঁর মনে হয়েছিল অতীত জীবন চলে গেছে— হারানো বলের মতোই তা ভেসে-ভেসে দূর-সমুদ্রে চলে গেছে, হয়ে গেছে অদৃশ্য, হয়েছে তার সলিল-সমাধি। ১৯৪১ অব্দে লেখা দ্য বল পোয়েম কবিতায় এই ব্যাপারটির উন্মেষ ঘটান বেরিম্যান:
এখন বালক আর কী, যে তার বল হারিয়েছে,
কী; কী তার করার আছে? আমি দেখি তা
উল্লসিতভাবে লাফিয়ে চলে যায় দূরে, রাস্তায় পড়ে থাকে
আর তারপর ঘটে সুখদ সমাপ্তি— এখন তা
পড়ে থাকে জলে! বলার আর সুযোগ নেই
ওই যে রয়েছে অন্য বল:
এক চূড়ান্ত কাঁপানো দুঃখ বালককে অনড়
করে, এখন সে স্থির দণ্ডায়মান, কম্পমান,
সব যৌবনের দিন নিয়ে পোতাশ্রয়ের দিকে
তাকানো— যেখানে রয়েছে পড়ে তার বল।

এখন প্রায় অনেক সমালোচকই মনে করেন, এই কবিতাটি বেরিম্যানের প্রথমদিকের একটি সার্থক সৃষ্টি। বেরিম্যান নিজেও মনে করতেন, কবিতাটি তাঁর এক সবল ও নতুন ধরনের কবিতা যা তাঁকে এক নতুন প্রমিত পরিচয় দেয়। বেরিম্যান-জীবনীকার পল মারিয়ানি কবিতাটি সম্পর্কে লেখেন, কবিতাটি উপস্থাপন করে ‘এক দ্বিগুণ অভিদর্শন: শিশুর প্রথম হারানোর উপলব্ধি— একটি বল সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে— আর বয়স্কের প্রেক্ষাপট থেকে এক অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক উপলব্ধি— সামনের দিকে তাকানো এবং একইসাথে পেছনের দিকে তাকানো— যে-জীবন অপরিহার্যভাবেই এ সমস্ত ক্ষতির জন্যে প্রস্তুত...।’ কবিতাটি আত্মজৈবনিক এক ক্ষরণ: পিতা জন অ্যালাইন স্মিথ বুকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন, কিন্তু মৃত্যুর আগের সপ্তাহগুলোতে তিনি উপসাগরে সাঁতার কাটতেন, অনবরত সাঁতার কাটতেন তিনি। বেলাভূমিতে বসে থাকা তাঁর ছেলে দেখতেন, তাঁর পিতা সাঁতার কাটতে-কাটতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন; উদ্বেগ নিয়ে পিতার জন্যে অপেক্ষা করত ছেলে।
ছোটোবেলা থেকেই মৃগীরোগে প্রায়শই আক্রান্ত হতেন বেরিম্যান, যাকে তিনি বলতেন ‘হিস্টারিয়াগ্রস্ততা’,— যা তাঁর মাকে নিয়ন্ত্রণের এক মনস্তাত্ত্বিক উপায় ছিল। সারাজীবনই তিনি মা বা তার স্মৃতি দ্বারা সন্তাড়িত ছিলেন এবং এই তাড়নায় অনেক সময় হয়ে উঠতেন অস্বাভাবিক, ভেঙে ফেলতেন শরীরের হাড়, যেতেন হাসপাতালে। আত্মহত্যার প্রবণতাও তাঁর মধ্যে দেখা দিয়েছিল কম বয়সে; সাউথ-কেন্টে ছাত্রাবস্থায় তিনি একবার আত্মহত্যায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। এক শীতের দিনে, টেনিস প্রশিক্ষণের জন্যে তিনি যখন দৌড়োচ্ছিলেন, তখন তিনজন ওপরের ক্লাশের ছাত্র তাঁকে উৎপাত করতে শুরু করল, এবং একজন তাঁর দিকে স্নোবল নিক্ষেপ করে বসে, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় দুইবার, ফলে ছেলেটি তাঁর ওপর চড়ে বসে, তাঁকে বরফের ওপর ফেলে দেয় এবং দারুণভাবে উত্যক্ত করে বসে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বেরিম্যান হঠাৎ করেই পাশ-দিয়ে যাওয়া রেললাইনের ওপর দৌড়ে যান এবং অগ্রসরমান রেলগাড়ির নিচে পড়তে উদ্যত হন। অবস্থা দেখে ছেলে তিনজন তাঁকে জোর করে রেললাইন থেকে টেনে সরিয়ে ফেলে। সেদিন নৈশভোজে তিনজনের মধ্যে দুইজন ছেলে তাঁর কাছে এসে এই ঘটনার জন্যে দুঃখপ্রকাশ করে এবং এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়। সে-সময় থেকেই অপরের করুণা বা দয়া পাওয়ার ব্যাপারটাতে তিনি হয়ে ওঠেন সিদ্ধহস্ত যা পরবর্তী জীবনে আরও ঘটেছে তাঁর জীবনে।
সারাজীবন তাড়িত ছিলেন পিতার আত্মহত্যায়, ১৯৩৮ অব্দে তিনি ঘোষণা দেন, তাঁর কাব্যিক উদ্দেশ্য হলো মৃত পিতার ‘নাম ও স্মৃতিকে তালি দেওয়া’, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি তাঁর পিতা জন অ্যালাইন স্মিথের বিষয়ে বিদ্বেষ ছাড়তে থাকেন। তাঁর পিতা যেন তাঁর নিকট হয়ে ওঠে ভ্যাম্পায়ার বা ভূত, ঠিক সিলভিয়া প্লাথের মতোই। ১৯৫৬ অব্দের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর উদ্দিষ্ট ড্রিম সঙ্স-এর জন্যে যথার্থ আঙ্গিক ঠিক করতে গিয়ে তিনি তাঁর পিতার আত্মহত্যা নিয়ে লেখেন একটি খসড়া কবিতা যেখানে তিনি পিতার মৃত্যুবাসনাকে স্বার্থপর কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, পিতা যে উত্তরাধিকার তার দুই পুত্রের জন্যে রেখে যাচ্ছেন তা তিনি ভুলে গেছেন আর তার অনিবার্য অভিঘাত তাঁর ছেলেদের ওপর পড়েছিল মারাত্মকভাবে। বেরিম্যান মোট ৩৮৫টি স্বপ্নগান লিখেছিলেন যার প্রত্যেকটি কবিতা ছয়-পঙ্ক্তির তিনটি স্তবকে বিন্যস্ত যার ১, ২, ৪ এবং ৫ নং পঙ্ক্তি পেনটামিটারে আর ৩ ও ৬ নং পঙ্ক্তি ট্রাইমিটারে রচিত। এই বিন্যাসের কঠোরতা সত্ত্বেও কবিতাগুলো ছিল ঝরঝরে ও সাবলীল, এবং কবিতাগুলোর শৈলী ও অন্তর্গঠন বুলিবিষয়ক ও সাম্প্রতিক। এই কবিতাগুলো দুটি খণ্ডে বেরিয়েছিল: ১৯৬৪ অব্দে সেভেনটি সেভেন ড্রিম সঙস: ৭৭টি স্বপ্নগান এবং ১৯৬৮ অব্দে হিজ ট্রয়, হিজ ড্রিম, হিজ রেস্ট: তার খেলনা, স্বপন, তার অবসর নামে। প্রথম খণ্ডটির জন্যে তিনি পুলিৎজার আর দ্বিতীয় খণ্ডের জন্যে তিনি কবিতায় ন্যাশানাল বুক অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারে ভূষিত হন।
২য় খণ্ডের ভূমিকায় তিনি বলেন: কবিতা, তারপর, যা কিছুই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরুক না কেন, একটি কাল্পনিক চরিত্রের (না কবি, না আমি) জন্যে প্রয়োজন হয়ে পড়ে যার নাম হেনরি, প্রাক্-মধ্যবয়সি এক সাদা-আমেরিকান কখনো বা কৃষ্ণমুখাবয়বে, যে এক অপরিবর্তনীয় ক্ষতির শিকার এবং যে কখনো-কখনো নিজের সম্বন্ধে কথা বলে উত্তম-পুরুষে, কখনো বা নাম-পুরুষে, এমন কী কখনো-কখনো মধ্যম-পুরুষে; তার এক বন্ধু আছে, নাম তার কখনো নেই যে তাকে ডাকে মি. বোন্স এবং ঈষৎ ভিন্নভাবে। রচিত কবিতাগুলো উচ্চমাত্রার স্বীকারৌক্তিক, যদিও বেরিম্যান ড্রিম সংগস-এর কবিতাগুলোকে মহাকাব্যিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এর প্লট হলো হেনরির ব্যক্তিত্ব যেমন সে জগতে চলাচল করে’— একচল্লিশ থেকে একান্নো বছরের মধ্যে। কবিতাগুলোতে হেনরির ব্যক্তিক ভীতি, তার মদাসক্ততা, তার আত্মঘাতী উন্মুখতা, তার বৈবাহিক সমস্যা, আর তার যৌন অ্যাডভেঞ্চার লিখিত হয়েছে। রেন্ডাল, জারেল, থিয়োডোর রোথ্কে, সিলভিয়া প্লাথ, এবং ডেলমোর শোয়ার্জ, এবং অন্যান্যদের প্রতি কবির শ্রদ্ধার নিদর্শন রয়েছে ২য় খণ্ড— হিজ ট্রয়, হিজ ড্রিম, হিজ রেস্ট-এ। অপরিবর্তনীয় ক্ষতির যে কথা বেরিম্যান বলেছেন, তা হলো তাঁর পিতার মৃত্যু। ১৯৬২ অব্দের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বেরিম্যান লেখেন কবিতা ড্রিম সঙ্স রচনাকালে তিনি মদাসক্ততায় নিজেকে নিমজ্জিত করে দেন। এরূপ অবস্থাতেই তিনি লিখতে শুরু করেন ড্রিম সঙ্স ৪২। এখানে তাঁর অপর সত্তা তাঁর পিতার প্রেতের সাথে মুখোমুখিতায় লিপ্ত হয়, যেনো কাঁধে এক বাঁদর, এক ভূত ভর করেছে তাঁর ওপর যাকে তিনি ঝাড়াতে পারছেন না। এ সময়ে তিনি তাঁর পিতার কবর দেখতে যান এবং এ-বিষয়েও তাঁর রাগ ও উষ্মা কবিতায় প্রতিফলিত হয়; ড্রিম সঙ্স-এর ৩৮৪ সংখ্যক কবিতায় তিনি লেখেন: ‘আমি এই ভয়ংকর ব্যাংকারের কবরের ওপর থুথু ছিটাই/যে ফ্লোরিডা-সকালে তার হৃদয় বিদীর্ণ করেছে গুলিতে।’
অন্য কবিতায় ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ ধ্বনিত, যে ঈশ্বর সমস্ত ভোগান্তির জন্যে দায়ী, যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং রোগ যেমন ক্যান্সাররোগ, যাতে তাঁর বন্ধু ও কবি ভেইন ক্যাম্পবেল ১৯৪০ অব্দে মারা যান। ক্যাম্পবল-এর মৃত্যুর দুই বছর পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, আর বেরিম্যান মদে নিমজ্জিত করতে থাকেন তাঁর দুঃখরাশিকে। তিনি ঘোষণা দেন— স্কচ, বরফ আর জল হলো ‘নতুন ত্রিত্ব’ বা ‘দ্য নিউ ট্রিনিটি।’ কিন্তু এই ঈশ্বর-বিরোধিতারও পরিবর্তন ঘটে। ক্রমাগত মদাসক্ততার কারণে ১৯৭০ অব্দে তিনি সেন্ট মেরি হাসপাতালের নিবিড় মদাসক্ততা নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন এবং সে-অবস্থাতেই তিনি লেখেন ইলেভেন অ্যাড্রেসেস ট্যু দ্য লর্ড: প্রভুর উদ্দেশে এগারোটি বক্তৃতা শিরোনামের এক সিরিজ-কবিতা যাতে তাঁর এই ঈশ্বরমুখী অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়। বেরিম্যান আত্মপ্রাজ্ঞ ও আত্মানুসন্ধানী ছিলেন। তিনি জানতেন, বন্ধু ডিলান টমাসের মতোই মদাসক্তিতে নিজেকে তিনি ক্রমাগত হত্যা করছেন। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মহনন শুরু হয়েছিল অনেক আগ থেকেই, আর এই পর্যায়ে ভাবান্তর থেকেই এক প্রেমময় ঈশ্বরের চিন্তায় তিনি অগ্রসর হন এবং একই সাথে এক ধারাবাহিক মৃত্যু-বাসনায় তাড়িত হতে থাকেন। প্রতিনিয়তই, প্রায় দিনানুদৈনিকভাবেই, জীবন-সমাপ্তির চিন্তায় তিনি বিভোর থাকতেন। তাঁর প্রথম দিকের অন্যতম প্রিয় কবি হার্ট ক্রেনের মতো তিনিও সমুদ্রে ডুবে বা কোনো সেতু থেকে পড়ে মরার কথা তিনি ভেবেছেন। তাঁর এই নিয়ত মৃত্যু-বাসনার মূলে কাজ করেছিল এক স্তরীভূত হতাশাবোধ: প্রেমিকা বা বন্ধুর প্রত্যাখ্যান, মদাসক্তি নিবারণে ব্যর্থতা, লেখালেখিতে ক্রমাগত অসন্তুষ্টি, আর্থিক সমস্যা, ক্লাসরুমে লেখাপড়ার নিম্নমান-সংক্রান্ত উদ্বেগ, পৃথিবীর নানা ঘটনা, পারমাণবিক পরীক্ষা ইত্যাদি। জীবন তাঁর নিকট এতই ক্লান্তিকর ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল যে, তিনি ভাবতেন, মৃত্যুই এর একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।

যুবক হিসেবেও, একাধিকবার বিভিন্ন ঘটনায়, বেরিম্যান, নিজেকে হত্যা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৯৪৬ অব্দের গ্রীষ্মে, তিনি ও তাঁর প্রথম স্ত্রী, আইলিন, হ্যারিংটনে রিচার্ড ও হেলেন ব্ল্যাকমুরের গ্রীষ্মাবকাশ কুটিরে বেড়াতে যান। ডেলমোর শোয়ার্জ বেরিম্যানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ব্ল্যাকমুর ও তাঁর স্ত্রী শুধু ঝগড়া করেই ক্ষান্ত হয় না বরং তাঁদের যুদ্ধ এক বদমেজাজি সমাপ্তিতে গড়িয়ে যায়। বেরিম্যান সেখানে অবস্থানকালে এই কথার সত্যতা অনুভব করেন। কুটিরের পাতলা দেয়ালের এপাশ থেকে বেরিম্যান ও আইলিন শুনতে পেতেন, তাঁদের আমন্ত্রক সারারাত্রি পরস্পর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। তাঁর মনে পড়ে গেল ফ্লোরিডার টাম্পাতে নিজ পিতা-মাতার ঝগড়ার দৃশ্য। একরাতে এরূপ ঝগড়া শুনে বেরিম্যান অসুস্থ হয়ে পড়েন, তিনি সারারাত ঘুমাতে পারলেন না। রাতের পর তিনি হয়ে পড়লেন বিষাদগ্রস্ত, ইচ্ছা করলেন হেঁটে সমুদ্রে নেমে জীবন সমাপ্ত করার। কিন্তু সে যাত্রায় নিজের ইচ্ছাকে দমন করলেন, কিন্তু পরের দিন, তিনি ও আইলিন ব্ল্যাকমুর দম্পতিকে বিদায় জানিয়ে চলে এলেন। এর ছাব্বিশ বছর পর, ১৯৭২-এ— ওয়াশিংটন অ্যাভেনিউ ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার খুব বেশি আগে নয়— হেনরিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং নামীয় রচিত কবিতায় ১৯৪৬ সালের রাতের এ অভিজ্ঞতাকে তিনি প্রতিফলিত করেন। এরপর ১৯৪৯ অব্দের জুলাই মাসে তিনি ও আইলিন কেপকোড-এ ছুটি কাটাতে গিয়ে একরাতে এক ককটেল পার্টিতে তাঁর এক বন্ধুর সাথে যুক্তিতর্ক করে পোশাকসহ সমুদ্রে গিয়ে নামেন। বন্ধুরা খোঁজাখুঁজি করে অর্ধ-ঘণ্টা পর তাঁকে সৈকতে সম্পূর্ণ ভেজা ও অর্ধচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।

বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কবিতায়, বেরিম্যান মুহুমুর্হুভাবে নিজেকে হননের আকুতির কথা বলেছেন। এ সংক্রান্ত কবিতাগুলোর মধ্যে, ১৯৭০ অব্দে রচিত অব স্যুইসাইড কবিতাটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তীব্র ও অন্তর্ঘাতময়। এতে প্রতিফলিত হয়েছে মৃত্যুর প্রতি তাঁর চিরন্তন আকর্ষণ ও আত্মঘাতী তাড়নার উন্মুখতা:

আত্মহত্যা আর পিতার চিন্তা, অধিকার করে রেখেছে আমাকে।
পান করেছি অতিমাত্রায়। স্ত্রী ভয় দেখায় বিচ্ছেদের।
অধিকন্তু সে আমাকে ‘শুশ্রূষা’ করে না। সে ভাবে ‘অযোগ্য’।
মেশামেশি করি না আমরা আর একত্রে।

 

মাকে স্মরণ করতে পারি। প্রাচ্যে একঘণ্টা দেরি।
ওয়াশিংটন ডি.সি.তে আমি
কিন্তু কী কাজে আসবে সে আমার?
আর এ সমস্ত তোষামোদ আর ভর্ৎসনা?

শিলাময় এক-প্রকার প্রেম আর বন্ধুতা
এ সমস্ত পৃথিবীব্যাপী পাগলামোর প্রয়োজন প্রতীয়মান।
এপিকটেটাস কোনোভাবে আমার প্রিয় দার্শনিক।
সুখী মানুষেরা আগে-ভাগেই মরে গেছে।
এখনও মনস্থ করি এই গ্রীষ্মে মেক্সিকো ভ্রমণের।
ওলমেক ইমেজ! চিকেন ইটজা!
ডি.এইচ. লরেন্সের এ বিষয়ে আছে এক বুনো স্বপ্ন।
ম্যালকম লওরির বই প্রকাশের পর প্রিন্সটনে
আমি শিখিয়েছি নীতিবাক্য।
সম্পূর্ণভাবে ছাড়ছি না এখনও। বিকেলে শেখাতে পারি
তৃতীয় সুসমাচার। এখনো করিনি মনস্থির।
কখনো-কখনো মনে হয় অন্যদের রয়েছে সহজ কাজ
আর করতে পারে আরও খারাপ কিছু।

 

খুব ভালো, আমাদের প্রয়োজন শ্রম ও স্বপ্নের। গোগোল
ছিলেন পুরুষত্বহীন, পিট্স্বার্গে একজন আমাকে তা বলেছে।
আমি বলি: কোন বয়সে? তারা বলতে পারল না তা।
এটা এক মারাত্মক ঘৃণার্হ কাজ।

 

রেমব্রান্ট ছিলেন অতিশয় ভদ্র। এখানেই আপত্তি আমাদের। ভদ্র।
আতঙ্ক তাঁকে আক্রান্ত করত। আমাদেরও করে।
আত্মহত্যা বিষয়ে ভাবছি মুহুর্মুহু।
বাহ্যিকভাবে সে কিছু করেনি। আমি লুককে শিক্ষা দেবো।
এই আত্মহনন-ভাবনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টাই তিনি করেছেন। অবসাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আকণ্ঠ মদ্যপান করেছেন, লেখালেখিতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন— কবিতা লিখে তাঁর ওপর ভর-করা-ভূত ঝাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যস্ত থাকলেই আত্মহনন ভাবনা থেকে তিনি মুক্ত থাকেন। নিজ ছেলেমেয়েদের সাথে খেলাধুলায় রত থাকতেন। ঈশ্বরকে চিন্তা করতেন। কিটসের পত্রাবলি, নতুন নিয়ম বাইবেল ও শেক্সপিয়ারের নাটক তাঁকে সান্ত্বনা দিত। একবার তিনি বলেছেন, হেনরি জেমসের ছোটোগল্পগুলো তাঁকে অনেক সময়ে আত্মহনন-চিন্তা থেকে রক্ষা করত এবং এজন্য তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, বছরে হেনরি জেমসের একটিমাত্র ছোটোগল্প পড়বেন যাতে তা শেষ না হয়। কিন্তু এতকিছুর পরও শেষরক্ষা হয়নি।
বেরিম্যান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ওকলাহোমার ম্যাক আলেস্টার-এ, ২৫ অক্টোবর, ১৯১৪ অব্দে। ১৯৭২-এ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লেখেন— কাব্যগ্রন্থ: দ্য ডিসপোজেজড (১৯৪৮), হোমেজ ট্যু মিসট্রেস ব্রডস্টিট (১৯৫৬, সংশোধিত ১৯৬৮), ৭৭ ড্রিমসঙ্স (১৯৬৪), শর্ট পোয়েমস (১৯৬৭), হিজ ট্রয়, হিজ ড্রিম, হিজ রেস্ট (১৯৬৮), এবং ডিল্যুশন্স, এট সেটেরা (১৯৭২); গদ্য: জীবনী: স্টিফেন ক্রেন (১৯৫০), এবং উপন্যাস: রিকোভারি (১৯৭৩)। ১৯৫৪ অব্দে জিওফ্রে মোর দ্য পেঙ্গুইন বুক অব মডার্ন ভার্স-এ বেরিম্যানের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, সমালোচকেরা তাঁর কাজকে সেরিব্রাল উৎসারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জিওফ্রে মোর বলেন, ‘এটা সত্য, আর যেখানে রয়েছে এক ঠাসা বৌদ্ধিক আদিমতা। তাঁর কাজ অতি দুর্দান্ত প্রাণবন্ত...কবিতাগুলো, এক জঘন্য আত্মা দ্বারা সম্ভবত লিখিত।’
বেরিম্যান ক্যামব্রিজ ও কলম্বিয়াতে লেখাপড়া করেন, পরবর্তীকালে লেখক ও পার্টিসান রিভিয়্যুর সমালোচক হিসেবে স্বীকৃতি পান। পড়িয়েছেন হারভার্ট, ওয়েনে স্টেট, প্রিন্সটন এবং মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে । কবিতা লিখে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার যার মধ্যে পুলিৎজার (১৯৬৫), বোলিংগেন (১৯৬৮), এবং ন্যাশানাল বুক অ্যাওয়ার্ড (১৯৬৯) অন্যতম। সাফল্যের জন্য তাঁকে অনেক বড়ো ত্যাগ করতে হয়েছে। কবিতার সমালোচনা ও মূল্যায়নে তিনি ছিলেন অতি সংবেদনশীল। ১৯৭০ সালে দ্য প্যারিস রিভিয়ুকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর এই অতিসংবেদনশীলতার কথা বলতে গিয়ে তরুণ লেখকদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রশংসা ও নিন্দা উভয়ের প্রতি চরম নিরপেক্ষ থাকতে হবে কারণ প্রশংসা তোমাকে শ্লাঘার দিকে আর নিন্দা আত্ম-বেদনার দিকে ঠেলে দেবে, আর এই দু-ই লেখকের জন্যে ক্ষতিকর।’
বেরিম্যান নিজেকে স্বীকারৌক্তিক কবি মনে করতেন না, বরং নিজেকে প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক উৎস নির্ভর লেখক বলে মনে করতেন। তিনি বলেছেন, ‘ধরি, আমি অগাস্তিনের ওপর বক্তৃতা করছি। আমার লাতিন-জ্ঞান খুবই খারাপ কিন্তু আমি লোয়েব সংস্করণের লাতিনগ্রন্থের ওপর কিছু সময় ব্যয় করব। তারপর আমি পাঠাগারে যাব এবং সেন্ট অগাস্তিনের ওপর সাম্প্রতিক ও পুরোনো কাজগুলোকে খতিয়ে দেখব। এখন এসবই তোমার কবিতার জন্য সুসজ্জিতকরণের অংশ হবে, এমনকি গীতিকবিতার জন্যও।’ তিনি আরও বলেছেন: ‘চূড়ান্তভাবে, আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের পারিপার্শ্বিকতায় কবিতাকে উন্মুক্ত রাখি।’ তাঁর কবিতা কনফেশনাল কারণ তা ব্যক্তি ও জৈবনিক উপাত্ত ও উদ্ধৃতিতে ভরপুর এবং তা নিউরোসিস ও স্কিৎজোফ্রেনিয়াগত মনস্তাত্ত্বিক উৎসারে সমৃদ্ধ। কিন্তু দ্য ড্রিম সঙ্স-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে, বেরিম্যান সহজ মুখোশ বা পার্সোনাকে আবিষ্কার করেছেন। তিনি হেনরি, মি. বোন্স ও আমি সমন্বয়ে এক অপবিত্র বা নারকি ত্রিত্বের জন্ম দিয়েছেন যা এক যৌগিক পার্সোনা এবং প্রকারান্তরে যা ট্র্যাজিক, কমিক ও সেন্টিমেন্টাল। তিনি বলেছেন: ‘আমার ছিল এক ব্যক্তিত্ব ও পরিকল্পনা এবং সব ধরনের দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক আসক্তি...কিন্তু একই সাথে আমি ছিলাম যাকে তোমরা বল ওপেন-এন্ডেড।’
জন বেরিম্যানপ্রায় দীর্ঘ এক বছর বেরিম্যান মদ স্পর্শ করেননি, কিন্তু এবার, ৫ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি এক বোতল হুইস্কি কিনলেন। এ সময়ে তিনি সবেমাত্র সমাপ্ত করেছেন কাব্য বিভ্রম, ইত্যাদি, যা তাঁর মৃত্যুর পরপরই প্রকাশিত হবে, এবং লিখেছেন উপন্যাস পুনরুদ্ধার, যাতে মদের সাথে তার অহর্নিশ যুদ্ধ ও মুখোমুখিতার বিষয়টি প্রতিফলিত। এ সময়ে শেক্সপিয়রের সমালোচনামূলক জীবনী লেখার জন্যে পেয়েওছিলেন একটি অনুদান— ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর দ্য হিউমেনিটিস গ্র্যান্ট, যা ছিল বিশ বছর ধরে সবিরাম চলা এক প্রকল্প। উপরন্তু, তিনি ভাবছিলেন শিশুদের জন্যে যীশুর জীবনী লেখার। ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত সবই যেন চলছিল ঠিকঠাক। এ সময়ে কিছু নতুন কবিতার খসড়া করতে গিয়ে তিনি তীব্র অসন্তুষ্টি ও অতৃপ্তিতে ভুগতে থাকেন। এছাড়াও এ সময়ে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ক্লাসগুলো নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েন: তিনি অনুভব করছিলেন, ছাত্ররা অমনোযোগী, নিষ্প্রভ এবং অসহযোগী। শিক্ষকতার জীবনকে তাঁর মনে হলো একঘেয়ে, গতানুগতিক ও কাজ-চালিয়ে যাওয়ার মতো কিছু একটা। পুনরায় মৃত্যু-ভাবনা ও মৃত্যু-বাসনায় আক্রান্ত হন তিনি। ডিসেম্বরের তেরো তারিখে, বেরিম্যান, কোনো মোটেলে গিয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি করে বা তাঁর স্পেনীয় ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করার বিষয়ে ভাবতে লাগলেন। এ সত্ত্বেও দোতলায় উঠে শোবার ঘরে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে তিনি প্রার্থনা করলেন এবং যীশুর জীবনী লেখার বিষয়ে পুনঃপ্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এ সময়ে তিনি নিজেকে শক্তিমান ও মার্জিত হিসেবে মনে করতে লাগলেন।
এর পরের সপ্তাহগুলোতেই তিনি লেখালেখিতে অক্ষম হয়ে পড়লেন— এক ঊষরতায় আক্রান্ত হলেন তিনি। ভাবলেন এবং ভেবে ভীত হয়ে পড়লেন যে, তাঁর নতুন ঈশ্বর-বিশ্বাস এক বিভ্রম। শীতকালীন সম্ভাব্য ক্লাশগুলো তাঁর বিরক্তি উৎপাদন করতে লাগল। জানুয়ারির পাঁচ তারিখে তিনি এক বোতল হুইস্কি কিনলেন এবং সেদিনেই তার অর্ধেকটা খেয়ে ফেললেন। যদিও তাঁর ছিল দীর্ঘ শিক্ষকতার পেশা, পড়িয়েছেন ওয়েনে স্টেট, হারভাট, প্রিন্সটন এবং সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু বেরিম্যান ১৯৫৪ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে নিগৃহীত ও অপদস্থ হয়েছিলেন, তা তিনি ভুলতে পারেননি কখনও। সেখানেও সর্বনাশের কারণ ছিল মদ্যপান। সেবার সেখানে প্রচুর মদ্যপানের পর শেষরাতে, মাতাল বেরিম্যান টলমল পায়ে তাঁর ঘরে ফিরছিলেন। বাড়ির মালিক তাঁর এই অবস্থা দেখে তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে দিলেন না। বেরিম্যান চিৎকার আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগলেন এবং একপর্যায়ে একটানে পেন্ট খুলে পোর্চের সামনে পায়খানা করে দিলেন। বাড়িওলার স্ত্রী তখন পুলিশকে ফোন করলেন, পুলিশ এসে বেরিম্যানকে গ্রেফতার করল, এবং সে রাত তাঁকে জেলে কাটাতে হলো। পরের দিন স্থানীয় পত্রিকায় ঘটনা প্রকাশিত হলে স্ক্যান্ডালের কারণে বেরিম্যানকে তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
জানুয়ারির পাঁচ তারিখে বেরিম্যান বোতলের অর্ধেক হুইস্কি পান করলেন এবং ওয়াশিংটন অ্যাভেনিউ ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে জীবন সমাপ্তির জন্য মনস্থ করলেন। তিনি আরেকটি আইওয়া-ঘটনা ঘটুক তা চাচ্ছিলেন না, এবং তা তিনি সহ্যও করতে পারতেন না। পাঁচ তারিখ অপরাহ্ণে রান্নাঘরের টেবিলে একটি লিপি রেখে— যাতে রেখা ছিল ‘আমি একটা উপদ্রব’। তারপর তিনি ঘর থেকে বের হয়ে যান। সম্ভবত তিনি ব্রিজের ওপর গিয়েছিলেন, কিন্তু লাফ দিলেন না, বরং ঘরে প্রত্যাগমন করলেন আর লিখলেন শেষ কবিতা:
স্পেনিশ ব্লেড ধারালো, ব্রিজের
উঁচু রেলিঙে চড়ে বসার পর
আমার গলা কাটতে ঝুঁকে পড়ে, ডান হাতে ধরা ছুরি
আঘাত করি নিজেকে পড়ে না-যাওয়া পর্যন্ত
অবশিত, রুখতে পারি না করোটি
পতনোন্মুখ থেকে, কিন্তু ভয়হীন

 

যতক্ষণ না স্ত্রী আমার ঘরের বাহির না করে
যতক্ষণ না পুলিশ আমাকে ক্যাম্পাস অতিক্রম করে
ব্রিজে উঠতে আজ্ঞা দেয়।
আর পর্যবেক্ষণের জন্যে আমাকে হাততালি দেয়, দর-কষায় আমার চাকরির—
আমি আছি এখন খুপরিতে, চাকরির দর কষাকষিতে—
সাধু, আমি তার অভাব বোধ করি;

 

কিন্তু এখানে কালকের ক্লাস-নেওয়ার ভয়ংকরতা
ছাত্ররা ছেড়ে দেয় শিক্ষা-পাঠক্রম,
প্রশাসন শুনানি নেয়, আমাকে হয় চিকিৎসাগত ছুটি
বা পদত্যাগ যে-কোনো একটি
করতে বলে— কিটিকেট, তারা কিন্তু করে না আমাকে চাকরিচ্যুত—
দুইদিন পর, জানুয়ারির ৭ তারিখ খুব ভোরে, এক মারাত্মক ঠান্ডা দিনে, বেরিম্যান তাঁর স্ত্রীকে অফিস ঘর পরিষ্কার করতে ক্যাম্পাসে যাচ্ছে বলে বেরিয়ে পড়েন ঘর থেকে। যাওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘তুমি আমাকে নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হয়ো না।’ সকাল সাড়ে ন’টার দিকে তিনি ব্রিজে পৌঁছান। তিনি সঙ্গে আনেননি তাঁর স্পেনিশ ছুরি যার কথা শেষ কবিতায় তিনি বলেছেন; হয়তো তাঁর নিকট তা মনে হয়েছে বাহুল্য। যেভাবে মরতে চান তার জন্য আর কী প্রয়োজন তাঁর। উত্তর-পার্শ্বে বুক-সমান উঁচু রেলিঙে চড়ে বসেন তিনি। বিপরীত দিকে গ্লাসে-ঢাকা হাঁটাপথ থেকে ছাত্ররা অবাক আর অবিশ্বাস্যভাবে দখল যে বেরিম্যান তাদের ইশারা করছেন, তারপর ঢালু হয়ে ভর নিয়ে অন্তর্হিত হলেন। তিনি প্রায় একশো ফুট নিচে বাঁধের ওপর পড়েছিলেন। তাঁর শরীর প্রথমে লাফিয়ে উঠে তারপর গড়িয়ে যায়। পুলিশ তাঁর পকেট বইয়ে রক্ষিত একটি অলিখিত চেক থেকে কবিকে সনাক্ত করে। তাঁর ভেঙে-যাওয়া হর্ন-রিম্ড-চশমার অগ্রভাগেও তাঁর নাম লেখা ছিল।
যদিও তিনি স্বীকার করেননি, তবু, জন বেরিম্যানকে বিবেচনা করা হয় স্বীকারৌক্তিক কবি হিসেবে, কারণ নিউরেসিস ও স্কিৎসোফ্রেনিয়াশ্লিষ্ট মনোবস্থা থেকে তাঁর কবিতা উত্থিত যা অতিমাত্রায় ব্যক্তিক ও জৈবনিক প্রাসঙ্গিকতায় ভাস্বর। এভাবেই তাঁর কবিতা ব্যক্তিক উপাদানে ধারিত। যখন তিনি তাঁর দীর্ঘ কবিতা হোমেজ টু মিসট্রেস ব্রডস্টিট: শ্রীমতি ব্রডস্টিট-এর প্রতি শ্রদ্ধা ১৯৫৬ সালে লিখে জাতীয়ভাবে খ্যাতি অর্জন করেন— কবিতায় মার্কিন উপনিবেশের প্রথম মহিলা কবি অ্যান ব্রডস্টিট-এর প্রেতাত্মার সাথে কবির কথোপকথনের বিষয় ধারিত— তখন থেকেই তাঁর কবিতায় স্বীকারৌক্তিক উপাদান পরিলক্ষিত হয়। তাঁর কবিতায় প্রায়শই উপলব্ধির এক অভিজ্ঞতার অন্বেষণ চোখে পড়ে যাকে বলা যায় এমন কিছু যা ‘সুসঙ্গত, সরাসরি ও বৌদ্ধিক।’
স্বীকারৌক্তিক কবিরা তাঁদের জীবন ও মনস্তত্ত্বের অন্বেষণ হিসেবে আধুনিক সাহিত্যিক কলা-কৌশল প্রয়োগ করে থাকেন যাতে প্রতিফলিত হয় ব্যাজস্তুতি, কোলাজ, শব্দপ্রক্ষেপ এবং প্রশস্ত উল্লিখন। বেরিম্যান তাঁর ড্রিম সঙ্স-এ এসবের ব্যবহার ও পরীক্ষা করেছেন, যেমন লাওয়েল করেছেন তাঁর লাইফ স্টাডিস (১৯৫৯) আর রোথ্কে করেছেন তাঁর ওয়াড্স ফর দ্য ওয়াইন্ড (১৯৫৮)-এ। আধুনিকবাদী কবিতা থেকে স্বীকারৌক্তিক কবিতা এখানেই পৃথক হয়ে যায়— নৈর্ব্যক্তিকতাকে বাদ দিয়ে স্বীকারৌক্তিক কবিতা গভীর আত্ম-পরীক্ষণ এবং খোলামেলা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
জীবন তাঁর নিকট ছিল বিপ্রতিপন্ন, সংশিত এবং ক্লান্তিকর। এই একঘেয়ে বিপর্যস্ত ক্লান্তির কথা তিনি বলেছেন তাঁর কবিতায়— ৭৭টি স্বপ্নগান-এর ১৪-সংখ্যক কবিতায় তিনি বলেছেন:
বন্ধুরা, জীবন বড়োই ক্লান্তিকর। আমরা বলতে পারি না তাও।
বস্তুত, আকাশ চমকায়, বিশাল সমুদ্রও আকাঙ্ক্ষায় হয় যে আকুল,
আমরাও আকুল ও উজ্জ্বল,
অধিকন্তুু যা বালক হিসেবে বলেছে আমাকে
(পৌনঃপুনিকভাবে) ‘কখনও যদি স্বীকার করো যে
তুমি ক্লান্ত একঘেয়েমিতে তার অর্থ

 

তোমার নেই অন্তর্গত ঐশ্বর্য।’ আমি এখন জেনে যাই
আমার তো নেই কোনো অন্তর্গত ঐশ্বর্য, কারণ আমিও ভীষণ ক্লান্ত।
মানুষ আমাকে ক্লান্ত করে,
সাহিত্য, বিশেষত মহৎ সাহিত্য, আমাকে ক্লান্ত করে
হেনরিও ক্লান্ত করে আমাকে তার প্রতিশ্রুতি ও বোধে
যা অ্যাকিলিসের মতোই খারাপ,

 

যে ভালোবাসে মানুষ আর শৌর্যপূর্ণ শিল্প, যা
আমাকে করে ক্লান্ত। আর শান্ত পাহাড়, ইন্দ্রজাল,
যেন এক ক্লান্তি ও বিষণ্নতা, আর যেকোনোভাবেই এক কুকুর
তাকে নিয়ে গেছে আর তার ল্যাজ সুবিবেচিতভাবে দূরে
পর্বতে বা সমুদ্রে বা আকাশে, পেছনে
ফেলে যায়: আমাকে, ইতস্তত, আন্দোলিত।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ