behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আলব্যের ক্যামু, দ্য প্লেগ ও কলোনির মানুষ || মাসুদ পারভেজ

১৪:২৯, জানুয়ারি ১৮, ২০১৬

দ্য প্লেগে আমি চেয়েছিলাম বইটির নানা স্তরিক পাঠ চলুক। তার মধ্যে সনাক্ত করা যায় এমন বিষয়ও রয়েছে। সে তো নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে ইউরোপে প্রতিরোধ আন্দোলন। প্রমাণ ঠিক এখানেই। যদিও এমন শত্রুর কোথাও নাম দেওয়া হয়নি। সকল ইউরোপীয় দেশে সবাই তাকে চিনে উঠতে পারে 





ক্যামু দ্য প্লেগ  আখ্যানের কাহিনি শুরু হচ্ছে চল্লিশের দশকের শুরুতে আলজেরিয়ার ওরান নামক একটি শহরকে কেন্দ্র করে। সময়টা দেখলে খুব সহজে বুঝতে পারা যায় বিশ্ব ইতিহাসের কোন কাল ইঙ্গিত করছেন ঔপন্যাসিক। আখ্যানে যাওয়ার আগে লেখক সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা যাক। আলব্যের ক্যামু (১৯১৩-১৯৬০) বংশের দিক থেকে ফরাসি বাবা আর স্প্যানিশ মায়ের রক্ত ধমনীতে নিয়ে আলজেরিয়ায় জন্মান। চারটি উপন্যাস, একটি ছোটোগল্পের সংকলন, ছয়টি প্রবন্ধের বই আর সাতটি নাটক- এই হচ্ছে আলব্যের ক্যামুর সাহিত্য সম্বল। আলব্যের ক্যামু নামের সঙ্গে কিংবা তাঁর সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিতি ঘটলে অস্তিত্ববাদ ব্যাপারটি আলোচনা কিংবা ভাবনা দখল করে। ক্যামু নিজেও যেন অস্তিত্বের গ্রন্থিকে খোলাসা করতে সাজিয়েছেন তার কেতাবের পাতার পর পাতা। এবার তাঁর দ্য প্লেগ  আখ্যানের পাতায় প্রবেশ করা যাক।
আখ্যানের কাহিনি শুরু হচ্ছে যে সময় এবং অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সেখান থেকেই শুরু করা যাক। ‘আলজিরিয়া উপকূলের এই শহরটা স্থানীয় ফরাসি প্রশাসকের সদর দপ্তর মাত্র।’ ক্যামুর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, আলজিরিয়া ১৯৪... এই সময়টায় ফরাসি উপনিবেশ। শহরটার নাম ওরান। তাহলে আখ্যানের শুরুতেই জানা যাচ্ছে, উপনিবেশিত একটি অঞ্চলের মানুষের কেচ্ছা লিখেছেন তিনি। আবার সময়টা তিনি খোলাসা না করে আরেক ধরনের রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে খোঁজার তাগিদ দিলেন। আর তখনই সময়ের হাত ধরে পাঠককে উপলব্ধি করতে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল। আর তাতে খুলতে থাকে আখ্যান। তখন বুঝতে হয় আখ্যানের এই প্লেগ হলো নাৎসি বাহিনী। তবে কি দ্য প্লেগ  নামের অন্তরালে ক্যামু রূপক একটি আখ্যান বয়ান করলেন? তাই যদি হয় তবে বয়ানের এই সময়টায় নাৎসি বাহিনী দ্বারা অত্যাচারিত ফরাসি দেশের চিত্র রূপকতায় তুলে ধরা হলো। তবে কথা হলো ক্যামু ফরাসি কোনো অঞ্চলকে বেছে না নিয়ে ফরাসি উপনিবেশ আলজিরিয়ার একটি অঞ্চলকে কেন নিলেন? ঘটনার সংঘটিত হওয়ার কাল : নাৎসি বাহিনী, দলিত ফরাসি দেশ আর ফরাসি উপনিবেশ আলজিরিয়া। এইরকম এক প্রেক্ষাপটে ঘটছে কাহিনি। কাহিনির বয়ানে ভর করছে অস্তিত্ব সংকট, মানবতাবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদের সম্মিলন। উপনিবেশের চক্রে আটকা পড়া একটি অঞ্চলের মানুষ, লেখকের ভাষায় ‘স্থানীয় আরব অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, বিশেষ করে তাদের জীবন যাত্রার পদ্ধতিতে খবর সংগ্রহ করতে ওরানে এসেছেন’ একজন সাংবাদিক যার নাম রেমঁ রাঁবেয়ার। তিনি প্যারীর একটি নামকরা কাগজের পক্ষ থেকে এসেছেন। স্থানীয় এই আরব অধিবাসীরা উপনিবেশিত আর ওরান শহরটা নিতান্ত শ্রীহীন। ‘এমন একটা শহরের কথা কি কেউ ভাবতে পারে যেখানে পায়রা নেই, যেখানে গাছপালা বা বাগান বলতে তেমন কিছু চোখে পড়ে না- যেখানে কেউ কখনও পাখির ডানার ঝটপটানি বা গাছের পাতার শনশাননি শোনেনি- যে শহর বলতে গেলে এসব দিক থেকে একেবারে নিঃস্ব?’ উপনিবেশের অবস্থা তো এমনই হওয়ার কথা। আর এই অঞ্চলের উপনিবেশিতদের পরিচ্ছন্নতার খবর নিতে আসা সাংবাদিক খবর নেওয়ার আগে শহরটি প্লেগে অবরুদ্ধ হয়। ইতিহাসে চোখ রাখলে ১৮৩০ সালে ফরাসিদের আলজিরিয়া আক্রমণ ও দখলের খবর পাওয়া যায়। তারপর থেকে আলজিরিয়া হলো ফ্রান্সের কলোনি। ভূমধ্যসাগরের দ্ইুপাশে দুই ভিন্ন মহাদেশ ইউরোপ আর আফ্রিকা তারপরেও ইউরোপের ফ্রান্সের কলোনি হলো আফ্রিকার আলজিরিয়া। উপনিবেশিত হওয়ার দীর্ঘ সময় পর ১৯৪৪ সালে আলজিরিয়া বিদ্রোহ করে কলোনি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। আলজিরিয়া যে সময়টায় মুক্ত হওয়ার জন্য বিদ্রোহ করছে সেই সময়টা একটু খেয়াল করা দরকার। তখন নাৎসি আক্রমণে ফ্রান্স দখল হয়ে গেছে। এরপরেও আলজিরিয়া মুক্ত হতে সময় লাগে। সেটা ঘটে ১৯৬২ সালে। উপনিবেশিত আলজিরিয়ানদের অর্থাৎ উত্তর আফ্রিকানদের অর্থনৈতিক জীবনমান ছিল পিরামিডীয়। উপরের স্তরটা ছিল ধনী ফরাসিদের আর ক্রমান্বয়ে নিচে ছিল দরিদ্র শ্বেতাঙ্গরা আর তাদের নিচে আরবরা। আখ্যানের এই আরবদের জীবনমান কিংবা পরিচ্ছন্নতার খবর নিতেই প্যারী থেকে সাংবাদিক রাঁবেয়ারের আগমন ঘটে ওরান শহরে। কিন্তু সাংবাদিকের সে খবর আর নেওয়া হয়নি। তার আগেই শহরে প্লেগের আবির্ভাব ঘটে। তাহলে কি ঔপন্যাসিক খুব সচেতনভাবে উপনিবেশিত আরব অর্থাৎ আলজিরিয়ানদের খবরটা এড়িয়ে গেলেন? ‘১৯৪৪-এ যখন আলজিরিয়া আবদুল কাদেরের ঐতিহ্য অনুসরণ করে বিদ্রোহের পতাকা তুলল, তখন তিনি তার বিরোধিতাই করেছিলেন।’ ক্যামুর এই বিরোধিতার সময় হচ্ছে দ্য প্লেগ  আখ্যান রচনার সময়। ক্যামু যদি বিরোধিতা না করতেন তাহলে কি সাংবাদিক রাঁবেয়ার আরবদের জীবনমান নিয়ে যে খবর সংগ্রহ করতে এসেছিলেন তা পারতেন? ওরান শহরে আরবরা বাস করছে কিন্তু আখ্যানের কোথাও তারা নেই। এমনকি প্লেগে আক্রান্তদের মধ্যেও তাদের নাম নেই আবার স্বেচ্ছাসেবক হয়ে যারা কাজ করছেন তাদের মাঝেও নেই। আরবদের এই না থাকাটা আসলে কী? তাহলে কি ফরাসি কলোনি হয়ে তারা অনেক আগে থেকেই প্লেগে আক্রান্ত? ফরাসিরা তো উপনিবেশিত আরবদের সঙ্গে প্রভু আর ভৃত্যের সম্বন্ধই প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তো ১৯৪০ সালে জার্মান যখন ফ্রান্স আক্রমণ করে আর তার পরের দিনগুলোতে আলব্যের ক্যামু দ্য প্লেগ  লিখছেন তখন যেন মনে করাই হয় প্লেগ এখানে নাৎসি বাহিনীর রূপ নিয়ে এসেছে। ‘গ্যাস্টাপোরা নেমে পড়েছে, বন্দিশালাগুলো ভরে গেছে, নির্যাতন অধিকার করে নিয়েছে সব। মানুষ বিস্মিত হলো, ঘৃণা দেখাল, অবাক হয়ে বলল তারা : কী বিস্ময়কর এ ঘটনা, আমরা আগে দেখিনি। কিন্তু কিছু মনে করবেন না, এটা নাৎসিবাদ; এটা কেটে যাবে। আর তারপর তারা অপেক্ষা করল, আশা করল এবং নিজেদের কাছ থেকে সত্যটা লুকলো- ওটাই বর্বরতা, সর্বোচ্চ বর্বরতা, এমন বর্বরতা যে, দৈনন্দিন সব বর্বরতাকে হার মানায়। এই বর্বরতাই নাৎসিবাদ। হ্যাঁ, ঠিক আছে। কিন্তু এর আগে অর্থাৎ তারা এর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে কী ছিল তারা? তারা ছিল এ বর্বরতার সহযোগী। এর আগে এই নাৎসিবাদকেই তারা সহ্য করেছিল, তাদের পেয়ে নাৎসিবাদই মনে হয়নি তখন একে। কারণ তখন এটি তাদের আক্রান্ত করেনি। তারা তখন চোখ বন্ধ করেছিল। এর আগে তারা এ বর্বরতাকে বৈধতা দিয়েছিল। কারণ তখন তা প্রয়োগ করা হতো অইউরোপীয় মানুষদের ওপর।’ প্লেগকে নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে কিন্তু ফ্রান্স যখন নিজেই আলজিরিয়ায় প্লেগের ভূমিকায় সেটার তুলনা তারা করছে না। এ প্রসঙ্গে আলজিরিয়া জয়ী কর্নেল মন্টাগানাকের কথা চলে আসল : ‘অনেক সময় একটি মেনিয়া আমাকে জেঁকে বসত যে, চারদিক থেকে আমাকে কে যেন ঘিরে রেখেছে। তখন পুঁইশাকের ডগার মতো আমার চারদিকে যে মাথাগুলো পেতাম কেটে ফেলতাম; মানুষের মাথা।’ এটাও কি নাৎসিবাদ নয়?
দ্য প্লেগ সম্পর্কিত ক্যামুর মতামত রঁল্যা বার্থকে লেখা একটি চিঠি থেকে উল্লেখ করা যাক :
‘দ্য প্লেগে আমি চেয়েছিলাম বইটির নানা স্তরিক পাঠ চলুক। তার মধ্যে সনাক্ত করা যায় এমন বিষয়ও রয়েছে। সে তো নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে ইউরোপে প্রতিরোধ আন্দোলন। প্রমাণ ঠিক এখানেই। যদিও এমন শত্রুর কোথাও নাম দেওয়া হয়নি। সকল ইউরোপীয় দেশে সবাই তাকে চিনে উঠতে পারে। এ-কথাটুকু আমি যোগ করব যে, সেই (নাৎসি) অধিকৃতকালে একটি প্রতিরোধের সংকলনে দ্য প্লেগ  থেকে সুদীর্ঘ উদ্ধৃতি ছাপা হয়েছিল এবং সেই ঘটনাটিই, আমি যে কাঠামো গড়েছি তাকে ন্যায্যতা দেয়।’
এই ব্যাপরটি ধরে যদি দ্য প্লেগ  রূপক উপন্যাসের আদল পায় তাহলে তারচেয়েও রূপকতার ব্যাপার আছে এবং স্বভাবতই তা প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে আখ্যানে। সাংবাদিক রাঁবেয়ারের প্রেমিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওরানে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার অবস্থা কি আলজিরিয়দের বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রেক্ষাপটকে হাজির করে না? বিভিন্নভাবে রাঁবেয়ার চেয়েছে অবরুদ্ধ ওরান থেকে তার প্রেমিকার কাছে চলে যেতে। আর এজন্য সে সরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে অবৈধ পথও খুঁজেছে। যদিও বৈধ কিংবা অবৈধতার নির্দেশনা দেয় শাসকগোষ্ঠি। শেষপর্যন্ত রাঁবেয়ার যখন প্লেগে আক্রান্ত ওরান থেকে পালাতে পারে না তখন সে ডা. রিও-এর সঙ্গে প্লেগে আক্রান্তদের সেবা ও মৃতদের সৎকারের মতো স্বেচ্ছাশ্রমে যোগ দেয়।
ঔপন্যাসিক দ্য প্লেগ-এর যে বহুস্তরিক পাঠের আকাঙ্ক্ষা করেছেন সেখানে আছে আলজিরিয়ার আরবদের কথা। যদিও তা উপন্যাসে সরাসরি নেই আর নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে তিনি স্বীকারোক্তি করেছেন সেভাবে তো বলেনই নি। তবে জানা যায়, তিনি আলজিরিয়া থেকে নির্বাসিত হয়েছেন আরবদের পক্ষে বলার জন্য। ১৯৫৫ সালে আলজিরিয় সমাজবাদী আজিজ কেসুর-এর কাছে লেখা একটি চিঠিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায় :
দ্য প্লেগ ...‘আমাদের একত্র বসবাস নিয়তি-নির্দিষ্ট। আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, যে আলজেরিয়-ফ্রান্সের সমস্ত অধিবাসীরাই রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল না। তারা এক শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে আলজেরিয়াতে আছে আর তারা সংখ্যায় লক্ষাধিক। আলজেরিয় সমস্যা এবং তুনিশিয়া বা মরক্কোর সমস্যা আলাদা করার জন্য এটাই যথেষ্ট। তুনিশিয়া বা মরক্কোয় সাম্প্রতিককালে ফরাসি আধিপত্য অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল। ফরাসি কার্যকলাপ আলজেরিয়া থেকে অপসারণ সম্ভব নয় আর হঠাৎ করে ফ্রান্সের উধাও হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাও ছেলেমানুষি। কিন্তু এর বিপরীতে এটাও কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা নয়, যে নয় লক্ষ আরব তাদের নিজেদের দেশে বাস করবে অথচ তাদের কথা কেউ মনে রাখবে না : আরব-জনগণের স্বপ্ন চিরকালের মতো বাতিল হয়ে যাবে, নীরবতায় আর বশ্যতা স্বীকারে, আর তারাও প্রলাপ বকবে। ফরাসিরা আলজেরিয়ার মাটির সঙ্গে অনেক প্রাচীনকালের অবিনাশী শিকড় দিয় যুক্ত, যাকে উন্মুলিত করার কথা চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু আমার মতে, তাতে তাদের এই অধিকার জন্মায় না যে তারা আরবদের জীবন ও সংস্কৃতির মূল উপড়ে নেবে। আমি আমার সারা জীবন দিয়ে (আপনি জানেন, এর মূল্য হিসেবে আমাকে আমার দেশ থেকে নির্বাসিত হতে হয়েছে) এই ধারণাকে প্রতিহত করেছি ব্যাপক এবং গভীর কোনো সংস্কার হবে। ওরা বিশ্বাস করতে পারে না, ওরা অনুসরণ করে ক্ষমতার চিরকালীন আগ্রাসনের স্বপ্ন, আর ভুলে যায় যে ইতিহাস সবসময় এগিয়ে চলে আর সব সংস্কারও।’...
‘আমাদের একত্র বসবাস নিয়তি-নির্দিষ্ট’... বলতে ক্যামু ফরাসি আর আলজিরিয়দের অর্থাৎ অ-আরব ও আরবদের উল্লেখ করছেন। ক্যামুর নির্দেশিত এই নিয়তি কিন্তু তার দ্য প্লেগ  উপন্যাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রথমত বলা দরকার, উপনিবেশ কখনওই নিয়তি নির্দিষ্ট ব্যাপার নয়। এটা ক্যামু ভালোভাবেই জানতেন তারপরেও তিনি চিঠিতে এই কথাটি উল্লেখ করলেন। এ প্রসঙ্গে দ্য প্লেগ  উপন্যাসের ফাদার পানেলু চরিত্রটির আগমন ঘটলো আলোচনায়। ফাদার পানেলুর মতে, “ভাই সব, আপনারা আজ দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হয়েছেন, এবং এ দুর্ভাগ্য আপনাদের প্রাপ্য।”...‘প্রথম কথাগুলো বলার পরেই পানেলু বাইবেলের এক্সোডাস থেকে মিশরের প্লেগ সংক্রান্ত অংশটুকু উদ্ধৃত করে বললেন : “ইতিহাসে কখন প্রথম এই মারী দেখা যায়? ঈশ্বরের যারা শত্রু তাদের ওপর আঘাত হানার জন্যেই ইতিহাসে প্রথম এই বিধ্বংসী রোগের আবির্ভাব হয়েছিল। ফারাও ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তাই এই মারী তাকে নতজানু হতে বাধ্য করেছিল। মানুষের জ্ঞাত ইতিহাসের শুরু থেকেই পরমেশ্বর প্রেরিত এই শাস্তি দাম্ভিকের দম্ভ এবং অন্ধের অন্ধকার দূর করেছে। আপনারাও আজ তাই চিন্তা করুন, আর নতজানু হয়ে প্রার্থনা করুন তার কৃপার জন্যে।”
চিঠিতে ক্যামুর উল্লিখিত নিয়তি তো পানেলুর নতজানু হয়ে প্রার্থনার আহ্বানের কথা! নতজানু হয়ে প্রার্থনার পরও ফাদার পানেলু প্লেগ থেকে শেষ রক্ষা পায়নি। প্লেগ যখন ওরানে ছড়িয়ে পড়েছে তখন ওরানের মানুষ প্লেগ শুরুর দিনগুলোতে যেমন উৎকন্ঠা নিয়ে ছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে একধরনের নির্মোহতার ভেতর বাস করতে শুরু করে। তারা প্লেগকে মৃত্যুর দূত হিসেবে মেনে নিয়ে সরাইখানায়, সিনেমা হলে ভীড় জমাতে থাকে। ব্যাপারটা এমন যেন তারা প্লেগের দুঃশাসন মেনে নিল। আর অল্পকিছু মানুষ প্লেগের বিরুদ্ধে তাদের কর্ম চালাতে থাকে। যদিও তারা জানত তাদের এই সংখ্যা এবং কর্মকাণ্ড প্লেগকে নির্মূলের জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়।
আখ্যানে একটা সময়ের পর প্লেগ আচমকা সরে যায়। ‘মূলকথা, সাধারণের মনে এই ধারণা প্রবল হল যে, মারী নিজের সব বাসনা পূর্ণ করে নিয়ে এবার স্বেচ্ছায় পশ্চাদপসরণ করছে।’ মারী মানে প্লেগ যদি নাৎসি বাহিনী কিংবা ঔপনিবেশিক শাসক হয় তবে কি ইতিহাসে তাদের আচমকা সরে যাওয়ার কোনো নজির আছে? তবে সাধারণের মনে এই ধারণা আসার হেতু কী? শাসক-শোষিতদের ইতিহাসে শাসকের স্বেচ্ছায় পশ্চাদপসরণ হওয়া মানে কোনো কূটচাল আছে। আখ্যানের ভাষাতে যা উঠে এসেছে : ... ‘মৃত্যুবাহী রোগের বীজ কোনদিন মরে না, কোনদিন একেবারে অন্তর্হিত হয় না; তিনি জানেন যে যুগ যুগ ধরে এ-বীজ সুপ্তাবস্থায় আসবাব আর বিছানাপত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, জানেন যে তারা অসীম ধৈর্য নিয়ে মানুষের ঘরে চোরাকুঠুরিতে, তোরঙ্গের মধ্যে রুমালে, আর বইয়ের আলমারির তাকে তাকে অপেক্ষা করে, -তিনি জানেন হয়তো আবার এমন দিন আসবে যখন দুর্ভাগা মানুষকে শিক্ষা দেবার জন্যে এই মারী আবার ঘুম থেকে জেগে উঠে তার বাহন ইঁদুরগুলোকে জাগিয়ে তুলে আবার কোন আনন্দমুখর শহরের পথেঘাটে মরতে পাঠাবে...’
আলব্যের ক্যামুর এই ইঙ্গিতটা কি নয়া ঔপনিবেশিক বলয়ের...


 

দায় :
দ্য প্লেগ, আলব্যের ক্যামু।
উপনিবেশবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ, ফকরুল চৌধুরী সম্পাদিত, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১১।
আলব্যের কামু বিশেষ সংখ্যা, এবং মুশায়েরা, কলকাতা, শারদীয় ১৪১৫।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ