Vision  ad on bangla Tribune

মুক্তিযুদ্ধ, শরণার্থী ও সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের বয়ান

ফেরদৌস মাহমুদ১৩:১০, জানুয়ারি ২০, ২০১৬
nonameগাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছেন ‘লিখি যাতে আমার বন্ধুরা আমাকে আরো একটু বেশি ভালোবাসে।’ মার্কেসের এমন উত্তরে আমাদের মনে পড়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তিনি বন্ধুদের খুশি করার জন্য না হলেও, তাদের সঙ্গে বাজি ধরে নিজ লেখনী শক্তি দেখানোর তাগিদেই ‘অতসী মামী’ লিখে বাংলা সাহিত্যে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু এভাবে কাউকে খুশি করা বা বাজি জেতার জন্য লেখা শুরু করলেই কি কালজয়ী কোনো কিছু সৃষ্টি সম্ভব? নিশ্চয় সম্ভব না, যদি একজন লেখকের ভেতর সত্যিকারের লেখনি শক্তি না থাকে। এ লেখনি শক্তি থাকে বলেই তা প্রকাশের জন্য লেখকদের ভেতর অস্থিরতা কাজ করে, লেখক দিনের পর দিন লিখে যান, লিখতে না পারলে হতাশ হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে খ্যাতিমান লেখকদের দিকে তাকালে দেখা যাবে তারা সাধারণত কম বয়স থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তবে প্রায় মধ্য বয়সে লেখালেখি শুরু করেও কেউ কেউ যে সাহিত্যাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেননি তা বলা যাবে না। আমেরিকান সাহিত্যিক হেনরী মিলার বা বাংলা সাহিত্যের জগদীশ গুপ্তের মত লেখকরা অনেক দেরিতে লেখালেখি শুরু করেও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। প্রমাণ করে গেছেন, শিল্প-সাহিত্য শুরু করার ক্ষেত্রে বয়স কোনো বিষয় আমাদের হালের মিহির সেনগুপ্ত লেখালেখি শুরু করেন প্রায় মধ্যবয়সে, ৪৫ বছর বয়সে ১৯৯২ সালে শারদীয় দেশ পত্রিকায় ‘বাঙালনামা’ খ্যাত লেখক তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন অথবা ভীমরতি প্রাপ্তর পরচরিতের চর্চা’ লেখা পাঠ করার পরে। ওই লেখা পড়ে তার মনে হয়েছিল, এভাবে তার পক্ষেও কিছু একটা লেখা সম্ভব। তিনি ওই লেখা পাঠের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তপন রায়চোধুরীকে ৭৭ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে ফেলেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তার সাহিত্য চর্চার যাত্রা শুরু হয়। এ চিঠিটি পরে ‘ভাটিপুত্রের পত্র বাখোয়াজি’ নামে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়।
যে বয়সে লেখকদের কলমের গতি অনেকটা পরিমিত হতে থাকে কিংবা ঝিমিয়ে আসতে থাকে, সে বয়সে মিহির সেনগুপ্ত যেন এক তরুণ লেখকের শক্তি নিয়েই শুরু করেছিলেন। মিহির সেনগুপ্ত ইতোমধ্যে ভাটিপুত্রের পত্র বাখোয়াজি, ভাটিপুত্রের অপবর্গ দর্শন, বিষাদবৃক্ষ, সিদ্ধিগঞ্জের মোকামসহ বেশ কয়েকটি ব্যতিক্রমী বইয়ের লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। সাহিত্য সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পেয়েছেন। তার লিখিত বইগুলি বহু সচেতন বাঙালি পাঠকের মনে দাগ কেটেছে।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগের বছর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণকারী মিহির সেনগুপ্ত দেশভাগের ট্রমা উপলব্ধি করেছেন প্রথমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বরিশালের একটি গ্রামে বাস করে এবং পরে বরিশাল শহরে পড়াশোনা করতে গিয়ে। ১৯৬৩ সালে ১৬ বছর বয়সে মিহির সেনগুপ্ত পুরো পরিবারের সাথে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। স্বাভাবিকভাবেই তার লেখায় উঠে আসে ইতিহাসের হারানো জগত, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পরবর্তী সাধারণ মানুষের অবস্থা, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক মনস্তত্ব, জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি কিছু মানুষের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টার কথা। উঠে আসে তাঁর শৈশবের ভৌগোলিক বরিশাল, বরিশালের ভাষা ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, যা পাঠককে ইতিহাসবোধে আচ্ছন্ন করে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ঘটনা অস্বস্তিতে ফেলে, মনে বিষাদ সঞ্চার করে। মিহির সেনগুপ্ত নামের লেখক হয়ে ওঠেন বাঙালির ভৌগোলিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বেদনাকে অনুভূতির মধ্যে লালনকারী লেখক।
 
২.
২০১৫ সালের বইমেলায় বাংলাদেশের ‘কাগজ প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মিহির সেনগুপ্তের বই ‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’। বইটির শিরোনামই বলে দিচ্ছে এতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশিদের আশ্রয়স্থল ভারতের শরণার্থী শিবিরের বড় একটা জায়গা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, মিহির সেনগুপ্ত আমাদের শরণার্থীদের নিয়ে যে গল্প শোনাতে চাইছেন তা কি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহুল চর্চিত কোনো গল্পেরই পুনঃবয়ান নাকি ভিন্ন কিছু? বইটিকে কি উপন্যাস বলা সম্ভব? এ পর্যন্ত মিহির সেনগুপ্তের যত বই বেরিয়েছে, তার কোনো বইকে উপন্যাস বলা যায় না, কেননা তার বইগুলোতে মূলত স্মৃতিচারণ, ভাষা-ভূগোল-ইতিহাস-সংস্কৃতির শিকড় অনুসন্ধান আর নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকটা ডকুফিকশান আঙ্গিকে, কোলাজ শিল্পের ভঙ্গিতে লেখা। যার মধ্যে ভাষা, স্মৃতি ও ইতিহাসের রঙ-রস মিশে একাকার হয়ে যায়। এ বইটিও কি তবে তাই-ই। লেখকের বয়ানেই শোনা যাক বইটি সম্পর্কে-
‘ভাবিয়াছিলাম একটা ডায়েরি লিখিব। কিন্ত লিখিতে গিয়া দেখিলাম তাহাতে সমস্যা অনেক। সন, তারিখ, দিনক্ষণের বিবরণ বা ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ উল্লেখ করিতে হয়। নিত্য তিরিশ দিন ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে আমার পক্ষে যে তাহা সম্ভব হইবে না, তাহা আমি বুঝিয়াছিলাম। অতঃপর সিদ্ধান্ত করিলাম বিশেষ সময়কালের স্মৃতি সম্বল করিয়া একটি লেখা বানাইব।
...যাহাদের তাগিদে লেখাটা লিখিয়াছিলাম তাহারা এই লেখায় উপস্থিত এবং তাহাদের জীবনকথার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই আলেখ্যের প্রধান অংশ। কর্মসূত্রে এবং জীবনের উচ্চাবচ নানা পথে চলার সময় তাহাদের জীবনের সহিত আমার জীবনও জড়াইয়া গিয়াছিল। যাহাই হউক খাতাটা সম্পূর্ণ হইবার পর যখন তাহাদের পড়াইলাম, তাহারা কহিল, ইহা প্রকাশিত হইলে তাহাদের আপত্তি নাই, তবে নামগুলি পরিবর্তন করিয়া দিতে হইবে।’
বইটির নাম ‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’ হলেও এর মধ্যে রয়েছে ১৯৪৭ এর দেশভাগ পরবর্তী পরিস্থিতি, বিশেষ করে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভাঙার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে ২০০১ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনের মধ্যকার যোগসূত্র অনুসন্ধানের আন্তরিক প্রয়াস।
বইটি এগিয়েছে ২০০১ সালে লিখিত কয়েকটি চিঠির ওপর ভর করে। চিঠিগুলো সবই এ বইয়ের প্রধান চরিত্র অনিমেষ চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করে আদান-প্রদান করা হয়। চিঠিগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় একে একে স্বর্ণলতা, আজিজ, আলম মৃধা, সায়ন্তনী, সারদা কাকা, ধর্মদাস বাবু বা বৃন্দার মত চরিত্রদের। অনিমেষ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে অনিমেষের বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, সে সময় তেইশ বছর বয়সী অনিমেষ তার মাকে নিয়ে প্রথমে থাকে কুপার্স ক্যাম্পে শরণার্থী হিসেবে, পরে সে হিঙ্গলগঞ্জের একটি এনজিও পরিচালিত ক্যাম্প হাসপাতালে বেয়ার ফুটেড ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। যুদ্ধ শেষে অনিমেষ ফিরে আসে বাংলাদেশে। পরে ১৯৯২ সালে সে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যায়। কেন এই চলে যাওয়া, তার উত্তর পাওয়া যায় অনিমেষের সঙ্গে বরগুনার আজিজ, স্বর্নলতা বা সারদা কাকার আদান-প্রদানকৃত চিঠিগুলোর মধ্যে।
নপুংশক আলম মৃধার আজিজ নামের মুসলমান ছেলেটি ছিল অনিমেষের বাবারই সন্তান। যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের তাড়া খেয়ে একই ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নেয় অনিমেষের বাবা আর আলম মৃধার স্ত্রী। ওই সময় শীতার্ত অবস্থায় একই কাপড়ের নিচে দুটি শরীরের মধ্যে আকস্মিকভাবে যৌন মিলন হয়। এমন একটি ঘটনার জন্য আসলে তারা কেউ প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তাতে জন্ম হয় আজিজের। অনিমেষের বাবার সঙ্গে আজিজের মায়ের আকস্মিক যৌন মিলনের একটি ব্যাখ্যা যেন পাঠক পেয়ে যান অনিমেষকে লেখা সারদা কাকার চিঠিতে-
‘একজন সুস্থ সবল মানুষ নিয়মিত স্ত্রীসংসর্গ করিবেন, ইহাই স্বাভাবিক। ইহার অন্যথা অনেক সময়েই বিপর্যয় ঘটাইয়া থাকে। আমার মতে, যৌনতা নারী পুরুষের ক্ষেত্রে এতটাই প্রভাবশালী যে উহাকে সম্পূর্ণ অথব দীর্ঘদিনের জন্য বশ করা প্রায় অসম্ভব। কখনো এমনও মনে হয় ইহার যেন যুক্তি-নিরপেক্ষ একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। তাহা যে মানুষ মানুষীকে দিয়া কী করাইতে বা না করাইতে পারে, তাহার বুঝি শেষ নির্ণয় সম্ভব নয়। বস্তুত, যৌনতার ব্যাপারে সংযমটা আদৌ নির্ভরযোগ্য কোনো উপায় নহে।’ [শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-৪৮]
আজিজের মা ছাড়াও আলম মৃধার ছিল পাঁচ বিবি, তাদের ঘরে কখনও কোনো সন্তানের জন্ম হয়নি। আলম মৃধা ডাক্তারি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে জেনে গিয়েছিল তার পুরুষত্বহীনতার কথা। তাই আজিজের জন্মের বিষয়টা আলম মৃধা জেনে গিয়ে অনিমেষের বাবাকে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। আলম মৃধা ছিল চতুর প্রকৃতির লোক। সে একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলত। আলম মৃধার চাতুর্যই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বছর খানেকের মধ্যে অনিমেষের বাবাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।
আজিজ তার জন্মরহস্য বিষয়ে কিছু জানত না, অথচ সে আর তার মা নানাভাবে আলম মৃধা দ্বারা নির্যাতিত হত। এ সমস্ত বিষয় জানা যায় ২০০১ সালে অনিমেষের উদ্দেশে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় আজিজের লিখিত চিঠি থেকে।
‘আমার জন্মের পর আম্মুর আর কোনও গুড়া পয়দা অইলে না। মায়ের যখন বিবাহ হয় তহন তার বয়স একুশ বচ্ছর। তাহার নাকি কীসব খারাপ রোগ বেয়াদি হইয়াছিল। তাহার জন্য সারা রাত্তির সে চেঁচাইয়া কান্দিত। এই কারণে বাপে তাহারে গরু পিডানে পিডাইত। সে একসময় নাকি সাহা জমিদার বাবুগো মেরধা আছিল। তাহার ছিল একটা মেরধাই লাডি। পরে জমিদারিতে আছিল না, মেরধাগিরিও না। তহন এই লাডিহান দিয়া খালি মায়েরে পিডাইতো, আমারেও। জোয়ান হওয়া তামাইত দেখছি হে খালি খালি মায়রে খামরায়, বেইশ্যামাগি, বাইর ভাতারি, খানকি, য়িন্দুর ঝুডা- এইসব কইয়া আর মারতে মারতে শোওয়াইয়া ফেলাইতো।’ [শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-১৩]
 
৩.
শরণার্থী ক্যাম্পে থাকার সময় অনিমেষ টের পায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী জেলখানায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলমাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল, সেখানেও নিজেদের মধ্যে অনেক অসন্তোষ আর দলাদলি ছিল। এই দলাদলি আর অসন্তোষের নেতিবাচক প্রভাব যে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়েছিল তার ইঙ্গিত রয়েছে অনিমেষের অভিজ্ঞতার বর্ণনায়। যার ভেতর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চক্রের প্রবেশও টের পাওয়া যায়! ভারতে শরণার্থী শিবিরের ভেতর এমন পরিস্থিতি আমাদের প্রচলিত ধারণার বাইরে ইতিহাস নিয়ে নতুন ভাবনা বা জিজ্ঞাসা তৈরি করে। এ বইটিতে একজন রাজনৈতিক দূরদর্শী ব্যক্তি ধর্মদাস বাবুর দেখা পাওয়া যায়। অনিমেষের সঙ্গে ধর্মদাশ বাবুর আলোচনা আর বিশ্লেষণে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির নেতৃস্থানীয়দের রাজনৈতিক ও স্বার্থগত দ্বান্দ্বিক প্রসঙ্গ। উঠে আসে প্রথম দিকে ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের সময় কেন বামপন্থীদের গ্রহণ করা হয়নি। এসব প্রসঙ্গে বইটির কিছু প্যারা ও সংলাপ তুলে দেওয়া হলো-
‘বস্তুত সেই অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীসভায় তাজউদ্দীনও তাঁহার অনুগামীরাই ছিলেন সংখ্যালঘু। প্রাথমিক অবস্থায় তাজউদ্দীনকে ক্ষমতা হইতে অপসারণ করার জন্য দলের মধ্যে গোপন প্রচার চলিতেছিল, ক্রমশ তাহা প্রকাশ্যতা লাভ করে। এইসব ঘটনা এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ হইতেই চালু হইয়াছিল। আমরা বাহিরের লোকেরা যখন মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের যথাসাধ্য সহায়তা করিবার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলাম, তখন পর্দার আড়ালে বাঙালি জাতীয়তাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, প্রচ্ছন্ন পাকিস্তানপন্থীরা ধীরে ধীরে তাহাদের চক্রান্তের জাল বিছাইতেছিল। আমি হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলে যখন ধর্মদাস বাবুদের প্রতিষ্ঠিত ক্যাম্প হাসপাতালে কাজ করিতেছিলাম, তখন এই চক্রজাল অনেক নীচের তলা অবধি তাহার ছায়া বিছাইতে সমর্থ হইয়াছে। ... ... ইহারাই ১৯৭৫ সালে মুজিব, তাজউদ্দীন ইত্যাদিদের হত্যা করিয়া ক্ষমতা দখল করিয়াছিল। ইহার অধিক লজ্জা বাঙালির জীবনে আর কী হইতে পারে?’ [শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-১০০]
কিংবা
‘ধর্মদাসবাবু সেইদিন আমাদের ইহাও জানাইয়াছিলেন যে, সব মুক্তিযোদ্ধাই যে ভারতে প্রশিক্ষণ লইয়া মুক্তিযুদ্ধেই যোগদান করিতেছে এমন নয়। তাহাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে, যাহারা প্রশিক্ষণ লইয়া যুদ্ধের নামে ওপারে যাইয়া রাজাকার বা খানসেনাদের সহিত যোগদানও করিয়া থাকে। উদ্দেশ্য? ক্ষমতা, অর্থের লোভ, পাকিস্তানের সহযোগিতা।’’[শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-১০০]
কিংবা,
‘এই যুদ্ধে একেক পক্ষের একেক রকম স্বার্থ কাজ করছে। ভারত সরকার তার স্বার্থ দেখবে, যেমন ওখানকার বামপন্থী ছেলেদের প্রশিক্ষণ বা অস্ত্র প্রদান যে যথাসাধ্য না করারই চেষ্টা করছে দেখা যাচ্ছে। ভয়, পাছে সেই অস্ত্র বা প্রশিক্ষণ নকশালপন্থীদের কাজে লাগে। ফলে ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ যারা পাচ্ছে, তারা আওয়ামী লীগেরই দলভুক্ত কিনা, এটা নিশ্চিত করে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ডাক্তার, এরাও যে ভবিষ্যত বা কিছুকালের মধ্যেই নাৎসি বা এসএস তৈরি হবে না, তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি?’ [শরণার্থীদের মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-১০০]
শরণার্থী ক্যাম্প হাসপাতালে অনিমেষের পরিচয় হয় সায়ন্তনীর সঙ্গে। সায়ন্তনী তরুণী হলেও অনিমেষের চেয়ে বয়সে বড় ছিল। সায়ন্তনী ক্যাম্প হাসপাতালে নার্সের দায়িত্ব পালন করত। সেখানে সে একজন মুক্তিযোদ্ধার সেবা করতে গিয়ে লক্ষ করে, বিন্দা নামের এক নার্সের অবহেলায় এক মুক্তিযোদ্ধার পা কাটা পড়ে। এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে বিন্দাসহ কয়েকজন নার্স সায়ন্তনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এ ষড়যন্ত্রকারীদের সূত্র ধরেই জানা যায় মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে একদল পাকিস্তানপন্থি লোকও অবস্থান করে শরনার্থী শিবিরে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে হাসপাতালের কারও কারও। এদের কারণে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অহেতুক মারা পড়ে কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা কারও কারও পা কাটা পড়ে অকারণেই। এ অবস্থায় ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সায়ন্তনীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয় অনিমেষের। জানতে পারে সায়ন্তনীর জীবনের করুণ প্রেমের কাহিনী কিংবা দাঙ্গায় তার স্বামীর মৃত্যুর স্মৃতি।
আর সায়ন্তনীকে অনিমেষ জানায় তার বাল্যপ্রেমিকা স্বর্ণলতার কথা। কিন্তু সমস্ত কথোপকথন আর নিবিড় বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে বয়সের সীমা অতিক্রম করে এক আদিম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তারা দু’জন। পরে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে অনিমেষ তার বাবার সঙ্গে আলম মৃধার স্ত্রীর যৌন সম্পর্ক যে একটি বিশেষ পরিবেশ আর পরিস্থিতির চাপেই হয়েছিল, তাতে যে তার বাবার কোনো লাম্পট্য প্রবণতা ছিল না তা উপলব্ধি করে। সায়ন্তনীর যৌনতার বিষয়ে স্বাধীনবোধের উপলব্ধি বইটিতে সায়ন্তনীকে অনেক দৃঢ় নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আর এ সমস্ত ঘটনার সমস্ত স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় ২০০১ সালে বাল্যপ্রেমিকা স্বর্ণলতাকে লেখা চিঠির মধ্যে। স্বর্ণলতার কাছে অনিমেষ কোনো কিছুই গোপন রাখে না।
১৯৭১ সালে স্বর্ণলতা গণধর্ষণের শিকার হয়, স্বর্ণলতা জাতে অনিমেষদের চেয়ে নিচু ছিল আর এসব কারণেই যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তার মা ও অন্যান্য আত্মীয়দের আপত্তিতে তাদের মধ্যে বিয়ে হয় না। কিন্তু স্বর্ণলতার প্রতি অনিমেষ প্রেম থেকে যায়, এ প্রেম সে বহন করে চলে সর্বক্ষণ। আর স্বর্ণলতাও অনিমেষের প্রেমকে বহন করে চলে। ২০০১ সালে অনিমেষ যখন পঞ্চশোর্ধ তখন তার মনে হয় স্বর্ণলতাকে বিয়ে করা উচিত ছিল। ততদিনে তার বাবা, মা কেউ বেঁচে নেই। সারা দেশের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। আর এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই সে বাংলাদেশে ফেরার স্বপ্ন দেখে। স্বর্ণলতাকে চিঠি লেখে, স্বর্ণলতাও চিঠির উত্তর দেয়। দু’জনই জীবনের সায়াহ্নে এসে স্বপ্ন থেকে প্রেমাকাঙ্ক্ষা পূরণের। এদিকে আজিজও চায় অনিমেষ যেন দেশে ফিরে স্বর্ণলতা বিয়ে করে। আজিজ জানে না তার সত্যিকারের বাবা কে, কিন্তু অনিমেষ জানে আজিজ তার বাবারই সন্তান। একই বাপের হিন্দু ছেলে আর মুসলমান ছেলের মধ্যকার সম্পর্কে কোনো প্রকারের ফাঁটল থাকে না, বরং একে-অপরের মধ্যে স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক বিদ্যমান।
এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে সমস্ত কিছু যখন অনুকূলে, তখন হঠাৎ-ই অনিমেষ আর স্বর্ণলতার মিলনের আশা বাস্তবায়িত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, ২০০১ সালে দেশে দেখা দেয় নির্বাচনোত্তর কতিপয় ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা সংখ্যালঘু নির্যাতন। যে পরিস্থিতি অনিমেষের দেশে ফেরার পথে বন্ধ করে দেয়।
 
৪.
ঘটনা পরম্পরা বিচারে ‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’কে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব ও পরের সময়কে যাপন করা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানসিক দ্বন্দ্ব, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যকার স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, ঐতিহাসিক কথন বা রাজনৈতিক বয়ান, বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরে-বাইরে থাকা দুই নর-নারীর প্রেমের গল্পের বয়ান, নারী পুরুষের স্বাধীন যৌন ও মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ- সবই বলা সম্ভব। বইটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস, নিবন্ধ, ডায়েরি, চিঠি বা কলামের এক মিশ্রিত রূপ বললে অত্যুক্তি হবে না।
এক্ষেত্রে ২০০১ সালে বসে অনিমেষের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, শরণার্থীদের নিয়ে কিংবা এদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অধিকাংশের আওয়ামী লীগ প্রীতির পাশাপাশি ভারতে যাতায়াত নিয়ে যে বিশ্লেষণ তা শঙ্কার সৃষ্টি করে। এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কের জায়গা থেকেই যায়। বাংলাদেশ কি কেবল সংখ্যালঘু নির্যাতনেরই দেশ? এখানকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্বদের মুখে প্রতিনিয়ত আমরা যে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা শুনি, তা কি কেবলি লোক দেখানো? এ পর্যায়ে মনে হতে পারে ১৯৭১ সালে শরণার্থীদের যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল তা আসলে শেষ হয়নি, এখনো চলমান। প্রসঙ্গক্রমে মিহির সেনগুপ্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সংবাদপত্রের তথ্য ব্যবহার করেছেন। এমনকি এ বইয়ের শেষ অধ্যায়ে তিনি ‘সত্যকে সবার এত ভয়? এত ভয়’ শিরোনামে আবেদ খানের একটি কলামও ব্যবহার করেছেন। যে কলামে তৎকালীন সরকারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দানে ব্যর্থতা আর সংখ্যালঘুদের নির্যাতিত হওয়ার চিত্রই ফুটে ওঠে। মনে হয়, বইটি যেন লিখিত হয়েছে মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ফোকাসে রাখার তাগিদেই।
মিহির সেনগুপ্ত খুব সাবলিলভাবে তার লেখায় বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি কখনও কখনও চলতি ভাষার সঙ্গে সাধু ভাষা মিলিয়ে ব্যবহার করেন, যা বেখাপ্পা মনে হওয়ার কথা থাকলেও তাঁর ভাষা ব্যবহারের কুশলতায় শেষ পর্যন্ত বেখাপ্পা লাগে না। এ প্রবণতা তাঁর আগের অনেক লেখাতে দেখা গেছে, এ বইতেও রয়েছে যা খুব সহজেই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কলকাতার প্রচলিত গদ্যের ভাষা থেকে তার ভাষাকে আলাদা করে তোলে।
‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’ এক বিষাদময় আত্মস্মৃতিমূলক আখ্যান যা বাংলাদেশের এক ভয়াবহ অবস্থা তুলে ধরে। এখানে ১৯৭১ এর পূর্ববর্তী কিংবা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কাল থেকে শুরু করে ২০০১ সময়কালে হিন্দু মুসলিম সমস্যাটা শুধু আসেনি, এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক মনস্তত্ব, জীবনসংগ্রাম, পাশাপাশি স্বপ্ন দ্রষ্টা কিছু মানুষের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা- মোট কথা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতি হওয়ার একাংশের ইতিহাস ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র।
 
 
 

শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ || মিহির সেনগুপ্ত || প্রকাশক: কাগজ প্রকাশন || প্রচ্ছদ: বৈদেহী সেনগুপ্ত || নামলিপি: মোস্তাফিজ কারিগর || প্রথম প্রকাশ: একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫ || মূল্য: ৩০০ টাকা।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ