behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ভোট || আনসারউদ্দিন

১৩:৫৯, জানুয়ারি ২৩, ২০১৬

 

পার্টিতে পার্টিতে দেশটা করল মাটি
পার্টি ছেড়ে আমি যাই কোথা
লালপার্টি আর নীলপার্টি
ভোটের কালে পরিপাটি
মাইক পেলে বকুনি ঝাড়ে
বুঝতে নারি নকল খাঁটি
পার্টিতে পার্টিতে দেশটা করল মাটি
পার্টি ছেড়ে আমি যাই কোথা।

এ গানটা গেয়েছিল আমাদের গাঁয়ের শুকুর আলি ঢাকি। শুকুর আলি শুধু পদবিতেই ঢাকি। ঢাক বাজানো তার পেশা নয়। পূর্ব পুরুষদের মধ্যে হয়তো কেউ কোন এককালে ঢাক বাজিয়েছিল। তা থেকেই ঢাকি পদবিটা বংশগত সূত্রে নামের সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছে। শুকুর আলি ঢাকির পেশা ছিল বাড়ি বাড়ি মাছ বিক্রি করা। মাছের বাঁক কাঁধে নিয়ে পেশাদারি হাঁকডাক করত আর মুখে গান রচনা করে গাইত। সুর দিত নিজেই। বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে তার তাৎক্ষণিক গান রচনা করার অদ্ভুত দক্ষতা ছিল। শুকুর আলি ঢাকি এ গান গেয়েছিল আজ থেকে অন্তত বিশ পঁচিশ বছর আগে। তখন পার্টিগত হিংসার কারণে কিংবা বিভিন্ন রকম দুর্নীতি বা বেআইনি কাজের কারণে দেশ এত ধ্বংসের দিকে যায়নি। আমরা হয়তো সেসময় তার গানের অর্থ ততটা অনুধাবন করতে পারিনি। কিন্তু এখন পারছি।
শুকুর আলি ঢাকি আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তুু তার এই গেয়ে যাওয়া গানের জন্য সেলাম জানাতে ইচ্ছে করছে এখন। ইচ্ছে করছে তার ভাঙা চোরা কবরের কাছে গিয়ে বলি— ‘শুকুর আলি, তোমার কথাই ঠিক; সত্যি সত্যি পার্টিতে পার্টিতে দেশটা মাটি হয়ে গেল।’
গ্রাম্য নিরক্ষর মানুষটা কি করবে শুয়ে আমার কথা শুনতে পাবে? দেশ মাটি হওয়ার চেয়ে এরা যে বাস্তব কথা বলেছে শুকুর আলি ঢাকি তাহল, পার্টি ছেড়ে আমাদের যাওয়ার জায়গা কই? সত্যি সত্যি পার্টি ছেড়ে আমাদের কারোরই যাওয়ার জায়গা নেই। এখন দেশের সর্বত্র পার্টি আর পার্টিতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আমাদের গ্রামীণ জীবনেও সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে শিরায় শিরায়, ধমনীতে ধমনীতে পার্টিতন্ত্র প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ চরম আকার নিচ্ছে। ছেলের জন্ম সার্টিফিকেট, রেশন কার্ড, বি.পি.এল-এ নাম লেখানো থেকে শুরু করে ইন্দিরা আবাসনের ঘর, একশো দিনের কাজ কিংবা জরুরি ভিত্তিতে রক্তের কার্ড সংগ্রহ সবকিছুতে অনিবার্যভাবে পার্টির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কারো হয়তো মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে পাশের গাঁয়ে। ছেলে বাবা হয়তো পরম আগ্রহে জানতে চাইল— ‘তুমাদের গাঁয়ের অমুকজনের মেয়ে কীরকম? ভাল? স্বভাব চরিত্র? একটু খোলসা করে যদি বল ভাই!
এক্ষেত্রে একটা গ্রাম্য প্রবাদ আছে। তাহল— ‘গাঁয়ের গুনে গড়ে বিক্রি।’ এখানে ‘গড়ে’ কথার অর্থ হল কুঁড়ো। কোন গোরু যদি কুঁড়ে হয় আর গাঁয়ের লোক যদি তাকে ভাল বলে তাহলে সে গোরু ভাল দামে বিক্রি হবে। কিন্তু এতো নেহাৎ চাষের গোরু কেনা নয়, যে শিং থেকে ক্ষুর অবধি দেখ নিয়ে কিনে ফেলা হল আর বেপড়তা বুঝে বটতলার হাটে বিক্রি করা হল। এ হল বিয়ে থা’র ব্যাপার। ভাল-মন্দ যাই হোক তাকে নিয়ে আস্তকাল কাটাতে হবে। বে-পার্টির লোক যদি এক্ষেত্রে ছেলের বাবাকে বলে— ‘পছন্দ হলে নেবে নাও। গাঁর মেয়ে আমি আর কী বলব, পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবা না।’
ব্যাস, এ কথা শুনেই ছেলের বাবার মাথা ঘুরে গেল। তার মানে বিয়ে ভেঙে গেল। মেয়ের বাবার তাই মাথায় হাত রাজনীতির ফন্দিকলে।
কথায় বলে— ‘বাতাসে বন নড়ে
                    কানা গোরুর জান ছাড়ে।’
আসলে মেয়ের বাবা তো কানা গোরুই। বাতাসে বন নড়লে মাঠ চরতি কানা গোরুর মতই তার চোখে খোঁচা লাগার ভয় ষোল আনা।
এখন এই ভোটের প্রাক্কালে গ্রাম বাংলা তাই সেজে উঠেছে। যে সে ছোট নয়, পঞ্চায়েত ভোট। ভোটে দাঁড়াবে গাঁয়ের লোক, ভোট দেবে গাঁয়ের লোক। যাদের মেম্বার সংখ্যা বেশি হবে তারাই অঞ্চল দখল করবে। সামান্য জি.আর রিলিফ থেকে শুরু করে ইন্দিরা আবাসনের ঘর কে পাবে আর কে পাবে না সব ঠিক হবে ওখান থেকে। তাই ভোটের বাজার খুব সরগরম। গোবরছড়া দিয়ে নিকানো গৈ-গেরামের মাটির দেওয়ালগুলোর জেল্লা ফিরেছে এতদিনে। সেইসব তদওয়ালে দেওয়ালে হাত, কাস্তে, জোড়াফুল,পদ্মফুল পট্ পট্ করে তাকাচ্ছে। কে একজন দাঁড়িয়েছে কাঁঠাল নিয়ে। কে সে? খোঁজ নিতেই জানা গেল ছকুরদ্দি। পার্টির টিকিট পায়নি। তাই অভিমানে পার্টির প্রার্থীকে হারাতে নির্দল। লোকে বলে গোঁজ প্রার্থী। ভোটের কারি-কুরিতে আস্ত মানুষটা গোঁজ হয়ে গেল। আমাদের পাড়া দু’জন ছকুরদ্দি। সংক্ষেপে ছকু। এতদিন চিনতে ভুল হত। এখন হয় না। একজন ছকু মল্লিক, অন্যজন গোঁজ ছকু। গোঁজ ছকুর কাঁঠাল কেউ আঁকতে পারছে না। কুমড়ো হয়ে যাচ্ছে। এমন হলে মানুষ প্রতীক চিনে ভোট দেবে কী করে, হায় আল্লা!
অবশেষে অনেক চেষ্টা চরিত্র করে একজন আঁকিয়ে আনা হল। কাঁঠাল পিছু ত্রিশ টাকা মজুরি। মজুরি কম-বেশি যাই নিক তা নিয়ে কেউ কথা তুলছে না। কারণ সে লোক সত্যিকার আঁকিয়েই বটে। এমনভাবে এঁকেছে তাতে মনে হয় সদ্যগাছ থেকে পেড়ে কেউ ঘরের দেওয়ালে লটকে দিয়েছে। সমস্যা হল হেদা পাগলার ছোট ছেলেটাকে নিয়ে। সেই কাঁঠাল খাবে বলে দিন-দিনমান বসে থাকে দেওয়াল সামনে করে।
হেদা পাগলা গরীব মানুষ। খেতমজুর। সম্বচ্ছর কাজ জোটে না। খেত-খোলায় যখন কাজ পায় তখন দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া জোটে। যখন তা জোটে না তখন অনাহার কিংবা অর্দ্ধাহার। তবুও না হয় অবুঝ ছেলেকে অন্যের গাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে একটা কাঁঠাল এনে দিত। সমস্যা হল এখন চোত মাস। এসময় হয়তো গাছে মোচি আসে। সেই মোচি দিনে দিনে বড় হয়ে পেকে উঠতে আস্ত আষাঢ় মাস এসে যায়। গাছে কাঁঠাল পাকলে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দেশের লোককে জনান দিতে হয় না। তার সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই বেড়াল, বন বেড়াল থেকে শুরু করে পাত কালসি থেকে উঠে আসা শেয়ালের পাল রাতের অন্ধকারে কাঁঠালগাছের তলায় রাত কাটিয়ে যায়। কিন্তু এখন ফাগুন মাস। ভোটের মশরুম। হেদা পাগলার ঐ একরত্তি ছেলেটাকে কে বোঝাবে আষাঢ় মাস আসা ঢের দেরি আছে। বললেই বা সে বিশ্বাস কবে কেন? তার মনে হয়েছে নির্বাচনী প্রতীকরূপে আঁকা কাঁঠাল থেকে ম্ ম্ গন্ধ বেরিয়ে আসছে। এমন একটা পুরুষ্ঠ কাঁঠাল পাকা না হয়ে পারে না।
রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসার সময় আমিও হেদা পাগলার ওই ছেলেটাকে বসে থাকতে দেখি। উদোম গা। গায়ে রাজ্যের ধুলো। মাথার চুলও ধুলোয় ভর্তি। পরনে একটা পেন্টুল আছে বটে। কিন্তু পিছনের দিকটা যেন বাঘে ভাল্লুকে খুবলে খেয়েছে। আমি ওকে বললাম— ‘হ্যাঁরে, বসে আছিস কেন ঘরের কানাচে?’
সে বলল— ‘কাঁঠাল খাব। দাও না পেড়ে।’ বলে সে উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়াল দেওয়ালের দিকে। ওই দেওয়ালেই আঁকা আছে গোঁজ ছকুর কাঁঠাল। কিন্তু বাচ্চা ছেলের কচি হাত অনেকটা উঁচুতে আঁকা কাঁঠাল নাগাল পেল না। আমি আবার বলে উঠি— ‘ওটা সত্যিকার নয় রে খ্যাপা, ভোটের কাঁঠাল। আয় আয় বাড়ি আয়।’
আমার কথার কোন আমল দিল না সে। নেহাৎই নাবালক। কাঁঠালের দিকে তেমনিভাবে তাকিয়ে থককল। ওকে দোষ দিয়েই বা লাভ কি? দেওয়ালে আঁকা ভোটের কাঁঠাল দেখে আমার মত ধেড়ে মানুষেরও অকালে কাঁঠাল খাবার প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। ছেলেটাকে ওইরকমভাবে লোভাতুর দৃষ্টিতে ঘরের কানাচে বসে থাকতে দেখে ভীষণ মায়া হয় আমার। উপযুক্ত ঋতুতে এরকম বায়না ধরলে ওকে একটা আস্ত কাঁঠাল কিনে দিতাম, হেদা পাগলা যখন ছেলেকে দিনের শেষে জোর কাঁধে তুলে বাড়ি নিয়ে যায় তখন সে কী কান্না! তার কান্না আমি বাড়ি থেকেও শুনতে পাই। এমন তারস্বরে চিৎকার করে যে এই সন্ধেবেলায় তার বাবা নয়, যেন বাঘে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এই চিৎকার শুধু আমি কেন, ওই নির্বাচনী প্রতীকের যে মালিক সেই ভোট ছকুর কানেও পৌঁছে যায়। সে তো আর আগে থেকে জানতে পারিনি যে অকালে কাঁঠাল নিয়ে ভোটে দাঁড়ালে এমন একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে।
একজন ভোটের প্রার্থীকে এরকম সমস্যার কথা আগাম ভাবতে গেলে তার আর ভোটে দাঁড়ানো হয় না। গাঁ-ঘরের মানুষের কত সমস্যা। কত সমস্যা নিয়ে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসে এইসব হাজার সমস্যার গোঁফ গজায়। গোঁজ ছকু এই প্রথম ভোটে দাঁড়াল। পার্টির ওপরতলার নেতারা টিকিট দিলে তাকে আজ হেদা পাগলার নাবালক ছেলেকে কাঁদিয়ে কাঁঠাল নিয়ে ভোটে দাঁড়াতে হত না। দাঁড়িয়েছে যখন তখন দেখিয়ে দেবে তাকে বাদ দিয়ে কোন খোদার ফিরিস্তা কী করে পার্টির প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে দেয়। তার নিজস্ব পার্টি প্রতি এমন একটা প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে ভীষণ একগুঁয়েমি করে তোলে। আর এতেই বিরুদ্ধ পার্টির প্রার্থী অনেকটা তোল্লাই পেয়ে যায়। যার জিতবার কথা নয় সে আজকে ভোটে জিতে মেম্বার থেকে প্রধান হবার স্বপ্ন দেখছে।
এতো গেল দেওয়াল লিখনের কথা। ভোটের প্রার্থীপদ দাখিলের ব্যাপারটা এ বছর বেশ গমগমে। আগেরবার দেখেছি একজন প্রস্তাবক আর বড়োজোর দু’জন সমর্থক হলে সমস্যা মেটে। এ বছর আচমকা ছবিটা বদলে গেল। প্রার্থীর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে তোলা হচ্ছে লছিমনে। পিছনে আরো খকন দশেক লছিমন ঠাসা সমর্থক। ট্রাকটর ট্রলি চারখানা। সবশেষে মোটর সাইকেল অন্তত বিশ ত্রিশ। একেবারে সামনে ভাড়া করা ব্যান্ডপার্টি। তার আওয়াজে মাটির তলা থেকে উঁই পিঁপড়ে বেরিয়ে আসছে। পথের ধারে বেঁধে রাখা গোরু-মোষে গোঁজের দড়ি ছিঁড়ে ফেলছে।
বি,ডি,ও অফিসে মনোনয়ন দাখিলের পর খাওয়া-দাওয়ার যে এলাহি ব্যাপার তা আর কাকে বোঝাব। এক একটা প্রার্থী ঘিরে তিন-চারশো সমর্থক। তাদের হৈ-হট্টগোলে বি,ডি,ও অফিসের মাঠ কেঁপে উঠছে। রাস্তার ধার-পাশের হোটেলগুলো তো মনোনয়নের এ ক’দিন নর-রাক্ষসদের দখলে চলে যায়। এসব মহাযজ্ঞের সব খরচা প্রার্থীর। সংখ্যালঘু এলাকা হলে বড়খাসি’র গলায় আড়াই পোঁচের কলমা শোনানো হচ্ছে। অন্যদের বেলায় এককোপের ছোটখাসি। ট্রলিতে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বড় ডেকচি কড়াই। সেব কড়াই থেকে নির্গত যে ধোঁয়া তেমন ধোঁয়া রাবণের চিতা থেকে নির্গত হয়েছে কিনা সন্দেহ।
ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক একটা ভোট এক একটা আশরফির থেকেও মূল্যবান। সেই মহার্ঘবস্তু কুড়িয়ে নেবার লগন বয়ে যায় রাঙা তেরঙ্গা পার্টির নেতা কর্মীদের মত ভোট ছকু ওরফে ছকুরদ্দিন মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরছে। ভোট দানের জিনিস। সেজন্য চাইতে কোন লাজ-লজ্জার কথা নয়। চাওয়ার অধিকার সকলেই আছে। অধিকার আছে বলে ভোট চাওয়ার নামে অত্যাচার মেনে নেওয়া যায় না। সারাদিনের খাটা-খাটুনির পর গাঁ-ঘরের চাষি ভুষো খেতমজুরের দল রাতে দু’মুটো খেয়ে আল্লা বলে বিছানায় গা এলিয়েছে কি এমনি প্রার্থীসহ ভোটের লোকজন আছসালা মু আলায়কুম।
মানুষ তো মানুষ, শুনেছি শয়তানে সালাম দিলেও নাকি তার জবাব দিতে হয়। শুয়ে শুয়ে তো আর সালামের জবাব দেওয়া যায় না; সে কারণে উঠে বসতে হয়। ফুঁ দিয়ে নেভানো নম্ফর আবার নতুন করে জ্বালতে হয়। আর তা জ্বালতেই কর্ম ক্লান্ত মানুষটির চোখ ছানাবড়া। এতলোক এই গরিবের বাড়ির উঠোনে! কী ব্যাপার? বস বস।
বসতে দেবার জায়গা নেই অতলোকের। তবু মুখের খাতিরে বলা। শেষমেষ ভোটের কথা। তাতেও অনেক বাক্যি খরচ করতে হয়। যদিও ঘরের মেয়ে আর ভোট দু’টোই দান করতে হয়। কিন্তু সমস্যা হল কাকে দান করবে। সবাই গাঁয়ের মানুষ। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা এঁটে এসেছে এমন সময় অন্য একটা ভোটের পার্টি ঘরের দোরে সালাম দিয়ে দাঁড়াল। জবাব না পেয়ে কেউ কেউ হয়তো ঘরের বেড়ায় ঘা দিয়ে জাগাতে চায়। ফিরাতে চার পাঁচটা ভোটের পার্টি যদি এভাবে হামলা করে তাহলে গাঁ-ঘরের মানুষ যায় কোথায়।
সত্যিই ভোটের বাজারে মানুষের জান লরেজান হয়। রাতদিন মিটিং মিছিল পথসভা জনসভার দাপটে মসজিদের আজান কানে আসে না। এক একটা রাজনৈতিক দল ঘিরে মানুষের জটলা, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে দিনে দিনে। অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে ভাইয়ে ভাইয়ে। যে ভাই তার ছোট ভাইকে একসময় কাঁধে তুলে মহরমের লাঠিখেলা দেখিয়েছে ভিড়ের মধ্যে। বাঁদর নাচ ঘোড়া নাচের খেলা দেখিয়েছে। লোভনীয় খাবার ভাইয়ের মুখে তুলে দিয়েছে, পরম ভালবাসা আর ভাললাগায় চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়েছে দু’গাল সেই ভালবাসার ভাই আজ হঠাৎ করে পর হয়ে গেল। রাস্তায় পরস্পরের মধ্যে দেখা হলেও টুঁ শব্দটি নেই। দু’জনের চলার মাঝে যে পথ থেকে যায় তার মধ্যে দিয়ে রাজার হাতিও গলে যেতে পারে।


গাঁয়ে কে কোন পার্টির সমর্থক তা দিনে দিনে স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিবাড়িতেই পার্টির ন্যাকড়া ওড়ে। বেড়া উঠে যাচ্ছে শরিকি উঠোনে। এই বিশ্বায়নের যুগে আমাদের পায়ের তলার পৃথিবী রাজনীতির যাঁতা কলে এত ছোট হয়ে যাচ্ছে যে একবাড়ির শিশু অন্যবাড়িতে হামা টেনে যেতে পারছে কই? তার সামনে পিছনে বেড়া, লাল তে-রাঙা পতাকার শাসানি। একবাড়ির কুকুর অন্যবাড়ির নির্মম আঘাতে এমন যন্ত্রণাময় চিৎকার করে যাচ্ছে যা শুনিনি কখনো। প্রতিদিন শুনছি বিপক্ষ পার্টির পাটখেত রাতের অন্ধকারে হাঁসুয়ার আঘাতে অকারণে ছিন্নভিন্ন করা হচ্ছে। সদ্য রোপন করা আমনের খেত একই অন্ধকার রাতে মই দিয়ে দাবিয়ে দিয়েছে কেউ। সেই বিপর্যস্থ খেতের আলে বসে হতভাগ্য চাষির বুক ভাঙা আর্তনাদ তোমরা কি কেউ শুনতে পাচ্ছ রাজনীতির কারবারিরা? আমরা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারছি না। আমরা আমাদের অন্তিম আশ্রয় কবরস্থানের মাটিকে লাল তে-রাঙা পতাকায় ভাগ করে ফেলেছি। আমাদের বারোয়ারীতলার প্রাঙ্গনে এখন আশ্চর্য নৈঃশব্দ আমাদের গ্রাম্য দেবতা সেখানে বসে থাকেন ঠায়। একা। বসে থেকে মাইকে উড়ে আসা রাজনৈতিক নেতাদের মিথ্যো ভাষণ শোনেন, আমরা শুনে যাওয়া মিথ্যা অবলীলায় বলতে শিখেছি। আমরা দু’ভাই। আমাদের রাজনীতি আলাদা, নেতা আলাদা, প্রতীক আলাদা। আমার পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা মা চোখে কম দেখেন। অস্থি কউকালসার চেহারা মায়ের। প্রতীক চিনে ভোট দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা দু’ভাই, তাঁর কাছে নিজ নিজ দলের পক্ষ থেকে ভোটের আবেদন রেখেছি। মা আমার ঘুমোতে পারছেন না রাতে। বুঝতে পারছেন না ভোটটা কোথায় দেবেন। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠছেন। আমি দৌড়ে মায়ের কাছে যাই। আমার ভাইও ছুটে আসে। আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে কথা হয় না। মা আমাদের দু’জনের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেন। কিন্তু এতেও আমরা স্বস্তি পাই না। আমাদের চোখ নির্বাচনী প্রতীক ঘিরে সর্বদা ঘুরপাক খায়। মা তাঁর বিছানায় ছট্ ফট্ করেন। একসময় নেমে আসেন বাড়ির উঠোনে। উঠোনময় আড়ষ্ট অন্ধকার। সেই অন্ধকারে শীর্ণ হাত দু’টো শূন্যে তুলে আল্লার কাছে আর্জি জানান— ‘হে আল্লাহ পরওয়ারদিগার এ কোন মুসিবতে ফেললে আমায়। ভোটের আগে এ দুনিয়া থেকে তুলে নাও তুমি।’
মা আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লার কাছে মৃত্যুর আর্জি জানালেও আমি জানি, আকাশ নয়, মৃত্যুর পর এই মাটিতেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হবে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই মায়ের। বারোয়ারী কবরের জমিন রাজনীতির যাঁতাকলে দু’খণ্ডে ভাগ হয়ে গিয়েছে আজ। আমি ভাবতে পারছি না, সেই কবরের জমিনের কোনদিকে থাকবে মায়ের মাথা, আর কোনদিকে পা।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ