পান্থশালার ঘোড়া

Send
কামরুজ্জামান কামু
প্রকাশিত : ০৮:৩২, জানুয়ারি ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৫, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬


কামাল চৌধুরী[কামাল চৌধুরী সত্তর দশকের অন্যতম কবি। ১৯৫৭ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিজয় করা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ মিছিলের সমান বয়সী প্রকাশিত হয় ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে। ’৮১ থেকে ’৯০– টানা নয় বছর কোনো কবিতার বই প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি। এই বন্ধ্যাত্ব কেটে যায় ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর প্রকাশিত হয় কামাল চৌধুরীর দ্বিতীয় কবিতা-সংকলন টানাপোড়েনের দিন । অতঃপর একে একে আরো আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যথা: এই পথ এই কোলাহল (১৯৯৩), এসেছি নিজের ভোরে (১৯৯৫), এই মেঘ বিদ্যুতে ভরা (১৯৯৭), ধূলি ও সাগর দৃশ্য (২০০০), রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল (২০০৩), হে মাটি পৃথিবীপুত্র (২০০৬), প্রেমের কবিতা (২০০৮) এবং পান্থশালার ঘোড়া(২০১০)। ১৯৯৫-এ প্রকাশিত হয়েছে একটি বাছাই সংকলন নির্বাচিত কবিতা । এরই ধারাই ২০১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেছেন কবিতাসংগ্রহ । এছাড়াও কামাল চৌধুরী ২০০৭-এ প্রকাশ করেন কিশোর কবিতা সংকলন আপন মনের পাঠশালাতে। ১৯৯৫-এ আলী রীয়াজ-এর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন সত্তর দশকের কবিদের কবিতা। পুরস্কার: রুদ্র পদক (২০০০)/ সৌহার্দ্য সম্মাননা(পশ্চিমবঙ্গ) (২০০৩)/ কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪)/ জীবনানন্দ পুরস্কার (২০০৮)/ সিটি-আনান্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১০)/ দরিয়ানগর কবিতা সম্মাননা (২০১০)/ বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১২)।]  



মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিব্যক্তিত্ব হিসাবে পাঠক ও সাহিত্যিক সমাজে কামাল চৌধুরীর সুখ্যাতি আছে। তাঁর অভ্যুদয়ের প্রায় দুই দশক পরে আবির্ভূত অন্য এক কবি আজ বসেছেন অগ্রজের নির্মিত ভুবনের সৌন্দর্য বিশ্লেষণে! কিন্তু রূপ এক গোলকধাঁধা! আমি তারে কীবা বিশ্লেষিব! তবু ব্রতী হই। এই ব্রত সুব্রত নহেন, কিম্বা শিবব্রতও তিনি নহেন! তবে? এই ব্রত হইল, কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা কী কী উপায়-নৈপুণ্যের সমন্বয়ে হৃদয়ে কোন ধরণের রসব্যঞ্জনা সৃজন করে, সেই পথটি একবার অনুসরণ করে আসার আকাঙ্ক্ষা। মা ধরিত্রী, দ্বিধা হও, আমি প্রবেশিব।কিন্তু কেম্নে প্রবেশ করি, মাগো, কোন দুয়ার দিয়া? না ছন্দ, না কোনো অলংকারই কবিতা নয়, শব্দের পর শব্দ বসানোও কবিতা নয়, বক্তব্যও কবিতা নয়, অথচ এই সবই থাকে কবিতায়। কবি হলেন সেই যাদুকর, যিনি এই সকলের সমন্বয়ে তৈরি করেন এমন এক ভাষা, যা মানব হৃদয়ে অনুভূতি সঞ্চারে সক্ষম। সম্ভবত, শিল্পী-নিরপেক্ষ কোনো শিল্প হয় না। শিল্পের মধ্যেই থাকে তার কর্তারূপ শিল্পীর অবয়ব। শিল্পীর চিন্তার ধরন-ধারন। একই স্থানে একই কালে শুধু পাত্রভেদেও রূপের ভিন্নতা আসে। তাইতো কবিতা বিভিন্ন রকম।বিভিন্ন ভঙ্গিমা, বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন চেহারা! কামাল চৌধুরীর ‘পান্থশালার ঘোড়া’ বইখানা ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশের পরপরই আমি প্রথম পাঠ করি, আজি দ্বিতীয় পাঠ। প্রত্যেক কবিই তার গ্রন্থের নামকরণে বিশেষ মনোযোগী থাকেন। সুনির্বাচনের মগ্নতায় মেতে ওঠেন। কবি কামাল চৌধুরীও হয়ত তা-ই করে থাকবেন। কিন্তু আমি কোনোদিন কোনো পান্থশালার ঘোড়া দেখি নাই। তবু আমার মনে এই ঘোড়ার একটা ছবি তৈরি হয়। দেখি ধুধু পথের ধারে একটা জিরাবার মত ছাউনি, অলস দুপুরে তার পাশে বেন্ধে রাখা ঘোড়াটা ছোলা আর রাম খাইতেছে! অথচ সাকুরায় বসে লোকেরা হুইস্কি কিম্বা ভদকার সাথেও তো ছোলা খাইতে দেখেছি অনেক। তাহলে ছোলার সাথে মদের কী সম্পর্ক যে, জীবকূলে তাহা সাযুজ্য রচনা করে?


তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য কবির থেকে কামাল চৌধুরীর কবিব্যক্তিত্বের দুইটি বৈশিষ্ট বিশেষভাবে আলাদা করা যায়। একটা হলো উচ্চকিত সময়ের ভিতরে বসেও তিনি তাঁর কাব্যভাষাকে একটা নিচু তারে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে, তাঁর কবিতা আত্ম-কথনের মত শোনা যায়। যেন এক মনস্বী কবি নিজের সাথেই নিজে কথা বলে যাচ্ছেন চেতনার আলো-আঁধারিময় কোনো প্রকোষ্ঠে বসে। তাঁর অপর বড় গুণটি হলো, নিজেরই নির্মিত একেকটি কাব্যগ্রন্থের ভাষাকে ভেঙে নবীন এক ভাষার উন্মোচন করতে পারেন তিনি তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে। তাঁর কবিসত্তা স্ফূর্তি পায় সদা পরিবর্তনশীলতায়। ফলে, তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে অনেক সময় এমন বিভ্রম তৈরি হতে পারে যে, এই ভাষা আজকের কবিতা লিখতে আসা কোনো নবীনের ভাষা কিনা। তারুণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের ভাষাকে সাম্প্রতিকতার সাপেক্ষ করে তোলার জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও শক্তির প্রয়োজন হয়, সব কবির জীবনে সেই অবকাশ হয়ত ঘটে উঠতে পারে না। কিন্তু বিধাতার এই মহার্ঘ উপঢৌকন যার কপালে জোটে, সমসাময়িক কাব্য-পরিমন্ডলে তাঁর জন্য ঈর্ষা জেগে রয়। এই রকম ঈর্ষনীয় হবার সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছেন কবি কামাল চৌধুরী। সেই তিলক তার কপালে শোভা পাক চিরকাল, এ রকম ভাবতে পারাতেই, অন্তত আমার, আনন্দ অধিক।
সে যা-ই হোক, পান্থশালার রামপর্ব সমাপন, এখন ঘোড়াটিকে অনুসরণ করাই মুখ্য কর্তব্য। দেখি এই ঘোড়া আমাদের কোন কোন দেশ ঘুরিয়ে আনে। বলে রাখা ভাল, এই ঘোড়া প্রধানত চারপায়ে চলে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। জীবন বাবুর পরের বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রধান বাহন এই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। অনেক সময় আমার ভাবতে ইচ্ছা করে যে, বাংলায় আধুনিক-পরবর্তী কাব্যরূপের সম্ভাবনা হয়ত-বা অক্ষরবৃত্ত-মুক্তির ভিতরেও নিহিত থাকতে পারে। সে যা-ই হোক, কামাল চৌধুরীর কবিতা অক্ষরবৃত্ত থেকে বের হয়ে প্রায়শ গদ্যের চেহারাও নেয়, আবার মাঝে মাঝে মাত্রাবৃত্তে প্রকাশিত হতেও তিনি আনন্দ পান। যেমন ‘চা-বাগান’ কবিতায় ছয় ছয় করে এগিয়ে চলল মাত্রাবৃত্ত-
‘তবুও আকাশ নিজের স্বভাবে নামে
টিলার দুপাশে ছড়ানো সবুজ নেশা
কুলিদের গ্রামে রাতও নামে সেইভাবে
মহাচোলাইয়ের ক্রোধে ভেসে যায় পেশা।’
কিন্তু পেশা আবার ভাসে কীভাবে! তা-ও মহাচোলাইয়ের ক্রোধে! এই যে একটা বিমূর্ত ধারণার উপর মূর্ত বস্তুর গুণারোপ করার মধ্য দিয়ে ভাষার উপরে স্বেচ্ছাচারের যে একটা দাগ দিয়ে দেওয়ার সাহস, এই সাহসই কি কবিতা! আমি জানি না। কিন্তু কবিতার পরতে পরতে আমি এই দাগগুলিকে উপভোগ করি। এর ফলে সৃষ্ট ব্যঞ্জনা আস্বাদন করি। মাত্রাবৃত্তের কবিতার আরও উদাহরণ আনা যেতে পারে। কিন্তু কবিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পাতার পর পাতা আলোচ্য কবির কবিতা দিয়ে ভরিয়ে তোলায় আমার কিঞ্চিৎ দ্বিধা হয়। তাঁর কবিতা না হয় পাঠক/পাঠিকা তাঁর বই থেকেই বিস্তারিত পড়ে নেবেন। আমি শুধু কবির ছল ও ছলনা, কবির ইশারা, কবির হৃদয়ের তলদেশের রূপটি আবিষ্কার করতে গিয়ে যতটুকু উল্লেখন আবশ্যক হয়ে উঠবে, ততটুকুই উদাহরণের আশ্রয় নিতে চাই।
অন্যান্য ছন্দের দিকে বারে বারেই হাত বাড়িয়ে দিলেও পান্থশালার ঘোড়ার মূল ছন্দ অক্ষরবৃত্তই। বলা যায়, অক্ষরবৃত্তই এই কবির কথা বলার প্রধান বাহন।
‘ যা কিছু পথের তত্ত্ব, ফাঁকা, ক্লান্ত, গোলাকার- তাই নিয়ে
তিন খণ্ড দীর্ঘ রাত্রি ছাপা হচ্ছে টেডেল মেশিনে’
কোনো একটা দীর্ঘশ্বাস কি পাঠকের মর্মে এসে গেঁথে যায়? জীবনের গভীরে এ কোন অসারতা জেগে ওঠে, যা ফাঁকা, ক্লান্ত, দীর্ঘ, গোলাকার? বাংলা কবিতায় ব্যক্তিমনের এই দীর্ঘশ্বাস লুকানোর চেতনা-রূপ পাওয়া শুরু করে সেই তিরিশের দশক থেকে। কিন্তু কামাল চৌধুরীর কবিতায় একইসাথে এই নেতির বিবর থেকে বের হয়ে কোনো দূরতম, গূঢ়তম আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা আছে। শিকড়ের সন্ধান আছে। সেই শিকড় যেন কোনো এক মাঝিপাড়ায় গিয়ে শেষ হয়। কোথায় সে মাঝিপাড়া? সেটা কি কবির স্মৃতিতে? গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় আসা অগণিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের নিচে কি হামেশাই চকচক করে ওঠে এ রকমই কোনো রূপালি স্মৃতির মত আলেয়া? ফলে, তাঁর কবিতা যতোই ব্যক্তিসত্তার উৎসার হোক না কেন, সে উৎসারের ভিতরে গণমানুষের তামাটে চেহারাও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এবং এই উদ্ভাসন ঘটে পরম্পরার ভিতর থেকে, ইতিহাসের নিগর থেকে। আমরা তাঁকে প্রায় আত্মকথনের মত বিড়বিড় করে বলতে শুনি-
‘মসলিনের দু-একটি কাটা আঙুল নড়ে উঠতে দেখে ধারণা করেছি
এই দেশ তাঁতিপাড়া থেকে দূরে নয়।’
যদিও তাঁর স্বর নিচুগ্রামে চলে, কিন্তু সেই নিচুস্বরের ভিতরেও গণমানুষের কলতান আছে, আছে তাদের প্রতি সুগভীর টান। যে দেশ তাঁতিপাড়া থেকে দূরে নয়, ধীবরকালের নৃতত্ত্ব কবিতাটিতে দেখা যাচ্ছে, সেই তাঁতিপাড়া প্রকারান্তরে জেলেপাড়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার আর্ত হাহাকার-
‘আজ আমরা জেলেপাড়া থেকে দূরে।’
দূরে সরে যাওয়ার বেদনা প্রকাশের মধ্য দিয়েই কবি যেন বলে দেন, আসলে যত দূরেই যান না কেন, জেলেপাড়া বা তাঁতিপাড়ার মানুষেরা তাঁর কবি-হৃদয়ে প্রেরণার উৎস হয়ে জাগরূক থাকে। বস্তু নয়, কৃতি নয়, আত্ম-প্রগলভতা নয়, এই কবিসত্তাটি মানুষের জন্য, মানুষের দিকে উন্মোচিত হতে চায়। ফিরে যেতে চায়। কিন্তু,
‘অসংযমী চাদরের নীচে উন্মাদ হয়ে যাবে কি না পান্থশালার ঘোড়া’
সেই সংশয়ও একইসঙ্গে উঁকি দেয় তার মনে। তিনি বলেন,
‘আমরা হয়ত ঘোড়ার পিঠেই উঠব। আমাদের গন্তব্যের মুখে
আবারও ফাঁকা হয়ে যাবে পান্থশালা
কারণ আমরা ফিরছি- কারণ আমরা এখনো জানি না
ফিরব কোথায়?’
গন্তব্য সুস্পষ্ট না হলেও, ফেরার আকুতি বড়ই স্পষ্ট। এই আমরা কারা, যারা ফিরে যেতে চাই? এটা কি আমাদের জাতিসত্তার নিজেরই গভীরে ফেরার বেদনা নয়? এটা কি আমাদের ইতিহাসের, ঐতিহ্যের দিগভ্রান্তির থেকে জন্ম নেওয়া আত্মোপলব্ধির মর্মে ফেরার যাতনা নয়? নিগড়ে নিগূঢ় নিমজ্জনের মত একটা ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি ছাড়া যেন আর কোনো শব্দ নাই পৃথিবীতে। আমি কান পেতে রই।
কিন্তু হায় পরমায়ু! মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি! কামিয়াবির আগেই ফুরায়ে যায়! সেই বেদনার ঠাণ্ডা বাতাস যেন এই ক্ষুদ্র পাঠককেও আজ আর্দ্র করে দেয়। আমি বারবার পড়তে থাকি-
‘একদিকে প্রার্থনার ভাষা
অন্যদিকে পরমায়ুকাল।’
চিন্তা করি, পরম কেন নির্মমের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়? কিন্তু এই বেদনায় পাঠক বেশিক্ষণ স্থির থাকার সুযোগ পান না, যখন পরের দুই লাইনে তিনি বলে ওঠেন,
‘বাতায়ন খুলে দিতে দেখি
ছাই থেকে জন্মেছে সকাল।’
ছাই মানে ভস্ম। আক্ষরিক অর্থে ভস্ম থেকে সকালের জন্ম হওয়ার কোনো বাহ্য যুক্তি নাই। তবে কি এর নিহিতার্থ এই যে, কোনো এক ধ্বংসের ভিতর থেকে পুনর্গঠন সকালের সজীবতা নিয়ে জেগে উঠতে চায় কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায়? পান্থশালার ঘোড়াটা কি এবার আড়মোড়া ভেঙে দৃশ্যকে সচল করে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করবে সকালের সূর্যের দিকে? সেটা অগ্রজ কামাল চৌধুরীই ভাল বলতে পারবেন। কেননা এই পান্থশালাও তাঁর, ঘোড়াটিও তাঁর। আর আমি? আমি তো নট অনলি ছোলা, ঘোড়ার সামনে থেকে পুরা রামের বোতল বগলদাবা করার ধান্দায় গোল হয়ে বসে থাকা রসিয়া!

 


 

প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল। দেশ পাবলিকেশন্স-এর সৌজন্যে


 

লাইভ

টপ