behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

স্মৃতির জোনাকিরা : মুক্তিযুদ্ধ আর ব্যক্তিগত স্মৃতির অবাক খতিয়ান

মনি হায়দার১৩:৪৫, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৬

‘একটা টাকা দিয়ে যান আমি গরিব ইনসান’ পর্বের স্মৃতিতে লুৎফর রহমান রিটন লিখেছেন- ‘একদিন আমি কর্মস্থল থেকে প্রতিদিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের ওয়ারীর এক রুমের বাসায় হুলুস্থুল কাণ্ড চলছে। আমার লুঙ্গিটা পরে, গায়ে আমার পুরনো ছেঁড়া একটা স্যান্ডো গেঞ্জি চড়িয়ে, কোমরে গামছা বেঁধে, মুখে কালি-টালি মেখে ভিক্ষুক সেজেছে নদী। বসে আছে একটা কাঠের পিঁড়ির উপর। পিঁড়িটাকে ওড়না দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে সামনে নিয়ে যাচ্ছে শার্লি, আর পিঁড়িতে বসা নদী একটা হাত ডানে বায়ে বাড়িয়ে দিয়ে গান গাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কী?
নদী বললো, বাবা আমি গরিব ইনসান।’

 

স্মৃতির জোনাকিরাকোত্থেকে শুরু করবো?
শুরুর কোন দরজা খুলে দাঁড়াবো? কারণ, আরব্য রজনীর মতো এই বইটিরও হাজার দরজা। কোন দরজা দিয়ে ঢুকবো আর কোন দরজা দিয়ে বের হবো, এক গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি। বইটির নাম- ‘স্মৃতির জানাকিরা’। লিখেছেন রিটন। আর একটু ধাধায় পড়লেন? পুরো নামটাই লিখছি, লুৎফর রহমান রিটন। জানি, বাঙালির কাছে তার আর কোনো পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনটি শব্দের একটি নামের বিনুনিতে প্রত্যেকে চিনে গেছেন, তিনি বাংলা বিহার উড়িষ্যার ছড়া সম্রাজ্যের মহান অধিপতি লুৎফর রহমান রিটন। ফর্সা, কালো-গোফঅলা, আয়ত চোখের একজন, যিনি হাতের তারায় ফোটান ছড়ার খৈ, মুখে তুখোড় গপ্পবাজ, আর স্নেহে বাৎসল্যে নিরুপম একজন অনুপম মানুষ। যার সান্নিধ্যে আসতে পারলে অনেকে আনন্দ পান, গর্ব অনুভব করেন।
রিটন, লুৎফর রহমান রিটন থাকেন বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরের কানাডায়। বিস্ময় লাগে, রিটন ভাই কেনো প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে দূরের কানাডায়? ভেতরে প্রশ্ন থাকলেও কোনোদিন জানতে চাইনি। হয়তো ভেতরে আছে পুঞ্জিভূত বেদনার কোনো গল্প। আর সব গল্প জানতেও নেই। মানুষ জন্ম থেকেই অভিবাসী। সেই অভিবাসী রিটন ভাই সুখে থাকুক, অদম্য কামনা।
শুরুতে যে দরজার প্রসঙ্গ লিখেছি, প্রশ্ন কিসের দরজা? দরজাটা বইয়ের। বিষয়? স্মৃতি। কেমন সে স্মৃতি? সেই স্মৃতি বহুমাত্রিক, সেই স্মৃতি রসগোল্লার রসে চুবানো, সেই স্মৃতি ইতিহাসের দুয়ার খুলে দেবার স্মৃতি, সেই স্মৃতি আমাদের শিল্প সাহিত্যের চেনাজানা মানুষদের মুখোশ খুলে দেবার স্মৃতি, সেই স্মৃতি- প্রেমের অভিমানের- অপত্য বাৎসল্যের, মমতার অটুট বন্ধনের আর শিকড় থেকে বেড়ে ওঠা কালের দুর্দান্ত সব সহযাত্রীদের, শেষ পর্যন্ত এই স্মৃতি তিনজনের- শার্লির, নদীর এবং রিটনের। আবার একলা রিটনেরও। মজার ব্যাপার এই তিনজন মানে- অনেকের সঙ্গে সেতুবন্ধনের ধুমুন্ধার নাচের স্মৃতিও। আসলে, বইটি সর্ম্পকে চট করে এক কথায় বলা মুশকিল। অনেকটা ইংরেজি শব্দ আনপ্রেডিকটিবল-এর মতো। বইটিকে কেবল স্মৃতির বাতিঘর করে লেখেননি ছড়ার রাজ্যের রাজকুমার লুৎফর রহমান রিটন, তিনি বইটিকে দায় ও দায়িত্বের চরিত্র করেও তুলেছেন। অনেক শব্দই লিখলাম অথচ বইটির ভেতরে কী আছে, এখনও জানান দিইনি। পাঠকেরা গোস্মা করতে পারেন। না গোম্বা দরকার নেই- আমরা বইটির দুয়ার খুলে ভেতরে প্রবেশ করি।
না, ভেতরে প্রবেশের আগে আর দু’একটি শব্দ লিখে নিই। ‘ঘড়া’ মানে কলসি। প্রাচীনকালে ঘড়া ভরা মোহর পাওয়া যেত। দাদা দাদীর কাছে ঘড়া আর মোহরের অনেক গল্প শোনা যেতো এক সময়ে। এক একটি মোহরের অনেক অনেক অনেক দাম। লুৎফর রহমান রিটনের বইটির আর একটি নাম হতে পারতো ‘ঘড়া ভরা মোহর’। নামটা একটু পুরোনো হলেও একটা বনেদীর প্রলেপ থাকতো। কথা সেটা নয়, লেখক নিজে স্বার্বভৌম। তিনি নিজেকে যে নামে প্রকাশ করবেন, আমরা অদম্য পাঠকেরা সেটাই মেনে নেবো। তো, রিটনের বইয়ের সূচীপত্রের দিকে তাকাই।
স্মৃতির জোনাকিরা বইটিতে মোট ৬৬ টি স্মৃতির ঘটনা আছে। ঘটনা, একটিও গল্প নয়। মনে রাখতে হবে- গল্প আর ঘটনার পার্থক্য। গল্প গল্পই। আর ঘটনা সত্য, অনিবার্য সত্য। রিটনকে যারা জানেন. দেখেছেন কাছ থেকে তারা অবশ্যই মানেন, রিটন ঘটনায় কতোটা তীর্যক এবং লক্ষ্যভেদী। সুতরাং ‘স্মৃতির জোনাকিরা’ কেউ যদি গল্প হিসেবে পাঠ করতে চান, তার কপালে দুঃখ আছে। শোকও থাকতে পারে। এমন কী আত্মপীড়নে দগ্ধ হতে পারেন। শুরুতেই ৬৬ টি স্মৃতির ক্যানভাস থেকে ‘ফ্লুইড দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ইরেজ করার গল্প’ স্মৃতির ঘটনাটাই লিখি।

১৯৯৩ সাল। রিটন ‘গুডবাই’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি জমা দিলেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে। যথারীতি রিভিউয়ারের কাছ থেকে রিভিউ হয়ে ফিরে এসেছে। একাডেমির কর্মকর্তা বিপ্রদাশ বড়ুয়া জানালেন মুক্তিযুদ্ধের দুটি ছড়া বাদ দিতে বলেছে রিভিউয়ার। রিটন যথারীতি রাজি হলেন না। অগত্যা পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফিরে আসার সময়ে পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার রুমে গেলেন। তিনি সব শুনে এক প্রকার জোর করেই পাণ্ডুলিপি রেখে দিলেন।
দ্বিতীয় পর্বে আবার বিপ্রদাশ বড়ুয়া। খুব দ্রুত আবার রিভিউয়ারের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি ফিরে এসেছে। দ্বিতীয়বারে ছড়া গ্রন্থের নাম পরিবর্তন করে রিটন রেখেছেন ‘নাই মামা কানা মামা’। ছবি এঁকেছেন শিল্পী হাশেম খান। হাশেম খান যেদিন ছড়ার অলংকরণগুলো পাঠালেন, ঘটনাচক্রে সেদিন একাডেমিতে রিটন উপস্থিত ছিলেন। এখন সরাসরি রিটনের স্মৃতির দুয়ারে দাঁড়ানো যাক-
‘আমি লক্ষ্য করলাম ‘স্বাধীনতা’ নামের ছড়ার ইলাস্ট্রেশনটা আলাদা রাখলেন বিপ্রদাশ বড়ুয়া। ঘটনা কী? ঘটনা ভয়াবহ। এই ইলাস্ট্রেশনে হাশেম খান একটা মিছিলের তিনটা প্লাকার্ড এঁকেছেন। একটায় লেখা ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর/ বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। একটায় লেখা স্বাধীন বাংলাদেশ জয় বাংলা। তৃতীয়টায় লেখা- ‘বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই’।
আমাকে বিস্ময়ের অতল সমুদ্রে নিক্ষেপ করে বিপ্রদাশ বড়ুয়া তার ড্রয়ার থেকে ফ্লুইড বের করে হাশেম খানের আঁকা ছবিটাকে এডিট করে ফেললেন! দুই লাইনে লেখা ‘বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই’ থেকে তিনি ‘বঙ্গবন্ধুর’ লেখা অংশটির উপর ফ্লুইড প্রয়োগ করলেন। কিন্তু হ্রস্য-উ কারটা রয়ে গেলো। আমি তো হই হই করে উঠলাম- আরে আরে বিপ্রদা করছেন কী!
বিপ্রদাশ খুব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, হাশেম খানতো এঁকে দিয়েই খালাস। শিশু একাডেমিতে চাকরি করি তো আমি। বিপদে তো পড়বো আমি। প্রকাশনা বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। আমাকে আমার কাজ করতে দাও। অতঃপর শিল্পী হাশেম খানের আঁকা ইলাস্ট্রেশনের প্লাকার্ড থেকে বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার হাতেই ইরেজড হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। ... মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির একজন অসামান্য কথাশিল্পী তিনি। তার লেখা একটি ছোটগল্পের বই আছে ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করি’ নামে। তার ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পসমগ্র’ও বেরিয়েছে দুই খণ্ডে। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯১ সালে। সরকার তাকে একুশে পদকেও ভূষিত করেছে। কিন্তু আমার বিস্ময়টা অন্যত্র। যে বিপ্রদাশ বড়ুয়া ১৯৯৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বহস্তে ইরেজ করে দেন সেই বিপ্রদাশ বড়ুয়াই ১৯৯৭ সালে তার গল্পগ্রন্থের নাম রাখেন ‘ফিরে তাকাতেই দেখি বঙ্গবন্ধু’। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় না এলে তিনি কি ফিরে তাকাতেন, ফিরে তাকালেও কি তিনি বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পেতেন?’
ইতিহাস তো মানুষের ভেতরেই থাকে। আর সব সময়ে যে রাজ-রাজাদের ইতিহাস লেখা হবে- এই যুগে তার কোনো মানে নেই। ইতিহাস এখন ব্যক্তির। সেই ব্যক্তির ইতিহাস থেকে আমারা অনেক শিক্ষা নিতে পারি- সেই শিক্ষাই দিলেন রিটন ‘ফ্লুইড দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ইরেজ করার গল্প’ ঘটনায়।
বইটি ভাই অনেক বড়। কিন্তু আমি পাঠক হিসেবে পাঠকদের আশ্বাস দিতে পারি, লুৎফর রহমান রিটনের বই ‘স্মৃতির জোনাকিরা’ পাঠ করতে বসলে আপনাকে চুম্বকের আকর্ষণে টেনে রাখবে। কারণ, বইটিতে কেবল স্মৃতি নয়, রয়েছে বাঙালির প্রতিদিনের দিন যাপনের গ্লানি, বিষাদ, আনন্দ, নিবিড় স্নেহ, অনুপম ভালোবাসা আর মরা গাঙ্গে জোয়ার আনার জটিল উচ্ছাস। ছিষট্টিটি পর্বের প্রতিটি পর্ব আকর্ষণীয়। আর লুৎফর রহমান রিটনের গদ্য? পরিমিতিবোধের আশ্চর্য এক সৌধ তার গদ্য। আন্তরিক এবং নিবিড়। ফলে, যে কোনো আত্মঅনুসন্ধানী পাঠক এই বইয়ের ঘটনা বা রিটনের স্মৃতি থেকে পাবেন নিজেকে দেখার, জানার, বোঝার দুর্লভ অভিজ্ঞতা। যে অভিজ্ঞতা পাশের মানুষটিকে চিনবার ক্ষেত্রে মন্ত্র হিসেবে কাজ করবে।
গোটা বই জুড়ে নদী ছড়িয়ে আছে নদীর মতো। বাংলাদেশের অন্তর জুড়ে যেমন নদী, রিটনের জীবনের প্রতিটি বিন্দু জুড়ে নদী। নদী, লুৎফর রহমান রিটন আর শার্লির মেয়ে। এই মেয়েটি এসেছিল আকাশ ভরা তারার আলো নিয়ে। যে আলোর অপেক্ষায় ছিলেন রিটন আর শার্লি। বাবার সঙ্গে প্রিয়তম সন্তানের সর্ম্পক কেমন হতে পারে, রিটন আর নদীর বিচিত্র সব ঘটনা পড়ে আপনি, কিংবা যে কেউ আলোড়িত হতে পারেন। এমন কী নিতে পারেন পাঠও। মনে হতে পারে, আমি বাড়িয়ে লিখছি। আপনার মনে হতেই পারে কিন্তু আমার আবেদন থাকবে, অনুগ্রহ করে একবার পাঠ নিন। বইটি বের করেছে কথাপ্রকাশ। দাম মাত্র চারশত পঞ্চাশ টাকা।
এখন আপনাদের কাছে নদী ও রিটনের একটা ঘটনার সামান্য বিবরণ দিচ্ছি-
নদীর বাবা লুৎফর রহমান রিটন গান খুব পছন্দ করেন। আচ্ছা, এই মানুষটা মানে রিটন শিল্পের কোনটা পছন্দ করেন না? ছোটবেলায় আঁকতেন ছবি। পাগল ছিলেন বাংলা সিনেমার। সোহেল রানার ‘এপার ওপার’ ছবিটা দেখেছেন অনেকবার। শুধু এই ছবিটা কেনো, অনেক ছবি অনেকবার দেখেছেন। টিভিতে অনুষ্ঠান করেছেন। গান গেয়েছেন, গান লিখেছেন। কেবল একটা কাজই বাকি- একটা সিনেমা পরিচালনা করা। আশা করি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে সেটাও রিটন করে দেখাবেন। তো সেই রিটনের কন্যা নদী। নদী কেনো গান ভালোবাসবে না?
তো নদী খুব ছোট বেলায় যে কেনো গান শুনে গাইতে পারতো। বাবা-প্রিয় নদীর প্রিয় গান ছিল বাবা বিষয়ক গান। ও টিভির অডিটরিয়ামে দাঁড়িয়ে দর্শকদের সামনে গেয়েছিল এক সময়ের বিখ্যাত গান- বাবা বলে গেলো আর কোনো দিন গান করো না..।
‘একটা টাকা দিয়ে যান আমি গরিব ইনসান’ পর্বের স্মৃতিতে লুৎফর রহমান রিটন লিখেছেন- ‘একদিন আমি কর্মস্থল থেকে প্রতিদিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের ওয়ারীর এক রুমের বাসায় হুলুস্থুল কাণ্ড চলছে। আমার লুঙ্গিটা পরে, গায়ে আমার পুরনো ছেঁড়া একটা স্যান্ডো গেঞ্জি চড়িয়ে, কোমরে গামছা বেঁধে, মুখে কালি-টালি মেখে ভিক্ষুক সেজেছে নদী। বসে আছে একটা কাঠের পিঁড়ির উপর। পিঁড়িটাকে ওড়না দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে সামনে নিয়ে যাচ্ছে শার্লি, আর পিঁড়িতে বসা নদী একটা হাত ডানে বায়ে বাড়িয়ে দিয়ে গান গাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কী?
নদী বললো, বাবা আমি গরিব ইনসান।’
ঘটনা হলো টিভিতে এ.টি.এম শামসুজ্জামান ও চম্পার কোনো একটি সিনেমার গান প্রচারিত হতো। গানের দৃশ্যে দেখা যেতো দু’জনে ভিক্ষুক। একটা ভাঙা গাড়িতে চম্পা ছেঁড়া কাপড় পরে এই গানটা গায়, আর ততধিক ছেঁড়া ময়লা জামা-কাপড় পড়ে এ.টি.এম গাড়ি টানতো।
আবার রিটনের লেখায়- ‘পরের দৃশ্যে শার্লি ওড়না টেনে টেনে পিঁড়িতে বসা নদীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর নদী প্রাণপণে গাইছে- একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান- বাবা জলদি টাকা দাও- একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান... জলদি টাকা দাও বাবা...।’
রিটন তো এই মহর্ঘ্য দৃশ্যের মালিক ছিলেন, নিজের চোখে একটি কুসুম মেয়ের নির্দোষ নিবেদন দেখেছেন, আর লেখাটি পাঠ করতে করতে, এই মুহূর্তে লিখতে লিখতে অনুপম দৃশ্যটি আমি দেখতে পাচ্ছি। বাবা মায়ের জীবনে এমন উপভোগ্য এবং স্মরণীয় দৃশ্য খুব কম আসে। রিটন এবং শার্লি বিস্ময়কর সুখ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন এবং নদীকে পেয়েছেন। আহা, সন্তানের জন্য বাবা মায়ের বুকের ভেতরে মমতা আর স্মৃতির কতো যে সমুদ্র থাকে, লুৎফর রহমান রিটনের এই লেখাটার শেষটুকু পাঠ করলে বুঝতে পারবেন প্রিয় পাঠক-
‘আজ ইউটিউবে খোঁজ দ্যা সার্চ করে নদীর প্রিয় গানটাকে খুঁজে পেলাম। শার্লি আর আমি গানটা দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আহারে! আমাদের ছোট্ট ঘরের ছোট্ট নদীটা আজ কতো বড় হয়ে গেছে! ভোরের ফ্লাইটে একা একা আমেরিকা পর্যন্ত চলে যেতে পারে সে মায়ের সাহায্য ছাড়াই। ইমিগ্রেশন পার হতে এখন আর বাবার সাহায্যও লাগে না ওর! নদীহীন ঘরটা কী রকম নিঝুমপুরী মনে হচ্ছে। সকাল থেকে বাড়িটা বিষণ্নতায় কী রকম স্থবির হয়ে আছে! আজ নদী আমেরিকা গেলো, বেড়াতে। ঘরটা শূন্য।’
না, এই প্রসঙ্গে আর একটিও কথা নয়। ঝিম মেরে কেবল অনুভব করুন বাবা আর সন্তানের মধ্যে নিবিড় সর্ম্পকের মৌতাত। দু’টি শব্দের ভেতর দিয়ে একজন বাবা তার সন্তানকে কী মোহনরূপে ধারণ করেন বা অনুভব করে লেখেন- ‘ঘরটা শূন্য’।
আমার ব্যক্তিগত জীবন দুঃখের তার দিয়ে বাঁধা। যেদিকে যাই অপমান আর লাঞ্ছনা মুখ ব্যদান করে স্বাগত জানায়। কিন্তু দমে যাই না। দাঁতে দাঁত পিষে লড়ে যাই। বরিশালের ষাঁড়তো, লড়তে পারি। সেই লড়াইয়ে একটি গান আমার সঙ্গী। গান গাইতে পারি না, অসুর। কিন্তু ওই গানটাকে বুকের ভেতরে বেঁধে নিয়েছি। ‘এতোটুকু আশা’ ছবিতে গানটায় লিপ করেন প্রিয় অভিনেতা ‘আলতাফ’। গানটা গাইতে গাইতে পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি, হাতে একটা ক্রাচ- ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়/ দুঃখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়...।’ ড. মনিরুজ্জামানের লেখা গানে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন আবদুল জব্বার। আলতাফ কোথায় থাকেন, কোথাকার মানুষ- লুৎফর রহমান রিটন ‘একজন আলতাফ এবং তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়...’ লেখাটিতে অন্তরঙ্গ চৈতন্যে প্রিয় শিল্পীর ভেতর বাহির তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে আলতাফের স্ত্রীর সাহস অবাক করে দেয়ার মতো।
পাকিস্তানিরা একটা খচ্চর জাত। আর ওদের মাথায় তুলে রেখেছে এ দেশের কিছু মানুষ। কারণ- ধর্মের বড়ি। এই বড়ি এমন এক মন্ত্রণা দেয়, যার কারণে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে অনেক বাঙালি পাকিস্তানিদের প্রশয় দেয়। এবং এই প্রশয় কেবল দেশে না বিদেশের মাটিতেও। প্রমাণ, লুৎফর রহমান রিটনের স্মৃতি ‘উর্দু আতা হায়?’ কানাডায় রিটনের বাসায় আসে তিন মুসলমান- একজন পাকিস্তানি, একজন ইরানি এবং একজন অবশ্যই বাঙালি। বলাবাহুল্য বাঙালিই পথ দেখিয়ে রিটনের বাসায় নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য, ইসলামের দাওয়াত। পাকিস্তানি লোকটা কথা বলছে উর্দুতে। রিটন কথা বলছেন বাংলায়। পাকিদের ধারণা, বাঙালি মাত্রই উর্দুতে কথা বলতে বাধ্য। কিন্তু ঘুড়ি উল্টো বাতাসে উড়িয়ে দিলেন লুৎফর রহমান রিটন। তার লেখায়-
‘পাকিস্তানী ভদ্রলোক কিছুটা বিস্মিত ও বিরক্ত। কারণ আমি তার উর্দুতে করা প্রশ্নের জবাব বাংলায় দিচ্ছি। সে তার বিরক্তি ও বিস্ময় অনেক কষ্টে চেপে রেখে আমাকে প্রশ্ন করে, উর্দু আতা হ্যায়?
আমিও তৎক্ষণাত পাল্টা প্রশ্ন করলাম, বাংলা আতা হ্যায়?
লোকটা আরও বিস্মিত। দু’জনার মধ্যে অনেক কথা হয়, ইংরেজিতে। কথা বলতে বলতে অনেক কথা হওয়ার এক পর্যায়ে লোকটি বলে, ‘সে যাহাই হউক আইসো আমরা প্রসঙ্গ পাল্টাইয়া ফেলি। তুমিও মুসলমান আমিও মুসলমান। আমরা মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। আপতত সন্ধি স্থাপনের লক্ষ্যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি তার করমর্দন প্রত্যাখান করলাম। প্রশ্ন করলাম- কী বলিলে?
আমি বলিয়াছি যে আমরা মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই।
মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই হইতে পারে কিন্তু আমি মনে করি পাকিস্তানী মুসলমান আর বাংলাদেশী মুসলমান কখনোই ভাই ভাই হতে পারে না।... তুমি এসব কী বলিতেছো?
আমি বলিতেছি যে উনিশ শ’ একাত্তর সালে তোমরা আমাদের ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করিয়াছো। ছয় লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষণ করিয়াছো। ...ইসলামের নামে, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই জিকির তুলিয়া তোমরা বাংলাদেশের মুসলমান ভগ্নি এবং জননীকে ধর্ষণ করিয়াছো। জননীকে ধর্ষণকারী ভগ্নিকে ধর্ষণকারী পাকিস্তানের মুসলমানেরা বাংলাদেশের মুসলমানদের ভাই হতে পারে না।’
আমরা জানি, লুৎফর রহমান রিটন এভাবেই বলেন। সত্য বলেন। সরাসরি বলেন। একজন বাঙালি হয়ে তিনি আরও তীব্র সত্য বলেছেন একজন পাকিস্তানীর কাছে। যে পাকিস্তানী পুনর্বার আর একজন বাঙালির কাছে ধর্ম বিক্রি করতে এসেছিল। বেদনা হচ্ছে- পথপ্রদর্শক একজন বাঙালি। কুলাঙ্গার হয়তো এদেরকেই বলা হয়। রিটনের মতো তেজস্বী মনস্বী বাঙালিরা দেশের বাইরের দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। কিন্তু সব বাঙালি কি পাকিস্তানিদের মুখের উপর এমন করে বলতে পারে? পারে না। কেনো পারে না? ওদের তো প্রকাশ্যে হারিয়েছি, যুদ্ধের ময়দানে- জলে স্থলে অন্তরীক্ষ্যে। ওরা পরাজিত হায়েনা। আমরা বিজয়ী বীর। কেনো আমাদের এই হীনমন্যতা?
মানুষের জীবন, গল্পের বা ঘটনার জীবন। ঘটনা ছাড়া কি জীবনের মুখ ফোটে? ঘটনাইতো আছড়ে পড়ে পায়ের উপর। কেউ ঘটনাকে তুলে বুকের ভেতরে কিংবা বুক পকেটে রেখে দেয়। কিংবা জানেই না, মুহূর্তে একটা ঘটনা বা গল্প তার কাছ দিয়ে হেঁটে গেছে। হাত বাড়ালেইতো ধরতে পারতো। গল্পের সঙ্গে করতে পারতো গল্প। কিন্তু লুৎফর রহমান রিটন তো ছড়ার মহারাজা। ছড়া কি আর এমনি এমনি হয়? ছোট চার লাইনের ছড়ার মধ্যে- ইতিহাস ঢুকিয়ে দেয়া। যেমন দিয়েছেন মহাত্মা অন্নদাশঙ্কর রায়। দিয়েছেন আরও অনেকে। ওদিকে আর না বাড়াই। রিটন জানেন ছড়ার ভেতর এবং বাইরের বারুদ শক্তি। সেই যে আবদুল হাই করে খাই খাই, সব কিছু খায় তবু বলে কিছু খাই নাই...। চারপাশের ভোলী তস্কর আর বুভুক্ষদের জন্য আর কি লাগে? লুৎফর রহমান রিটন আরও জানেন, গল্প কয় প্রকার ও কি কি? তিনি জানেন- গল্প সাজাতেও।




লুৎফর রহমান রিটন অসীম মমতা আর গভীর যত্ন নিয়ে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, এ দেশের কোমলমনা শিশু কিশোরদের জন্য। ছোটদের কাগজ। অনিন্দ্য সুন্দর ছিল পত্রিকাটা। আজিজ মার্কেটের সেই রুমে কতোবার গিয়েছি, রিটন ভাইয়ের তুমুল ব্যস্ততা দেখেছি পত্রিকাটিকে ঘিরে। পত্রিকা প্রকাশ করলেই তো হবে না, লাগবে টাকা। বিজ্ঞাপন প্রযোজন। সিঙ্গারের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুশীল সূত্রধরের কাছে গেছেন। সূত্রধর বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। সূত্রধরের সঙ্গে রিটনের সম্পর্ক বহুমাত্রিক, নানা ঘটনার সূত্র ধরে। একবার বিজ্ঞাপনের জন্য রিটন গিয়েছেন সূত্রধরের কাছে। সূত্রধর খুব ব্যস্ত। রিটনকে বললেন, আমি আজ খুব ব্যস্ত। ওর্য়াক অর্ডার দিতে পারছি না। আপনি বিজ্ঞাপন ছাপুন। পরে দেখা যাবে।
পত্রিকার জগতে চেনাজানা থাকলে এ রকম হয়। তো রিটন সিঙ্গারের বিজ্ঞাপন ছাপলেন এবং ওয়ার্ক অর্ডারের জন্য সূত্রধরের কাছে গেলেন। প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেন সূত্রধর। সম্পাদকের কাছে কাগজঅলা টাকা পাবে। শিরে সংক্রান্তি। মান অপমান সব সময়ে রাখলে চলে না। যেহেতু সম্পাদক!
রিটন বিব্রত। কিন্তু উপায়হীন। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা খুবই বিব্রতকর। খুবই লজ্জিত আমি। দেখেন যদি দিতে পারেন তাহলে খুবই উপকার হয়..।
সুশীল উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও ইশারা করলেন উঠতে। বললেন- আসুন আমার সঙ্গে।’
কোথায় নিয়ে গিয়েছিলো সূশীল সূত্রধর ‘ছোটদের কাগজ’ সম্পাদক লুৎফর রহমান রিটনকে? হিসাব বিভাগে? সিঙ্গারের চেয়ারম্যান মাহবুব জামিলের কাছে, যা ভাবছিলেন, বা আপনারা যা ভাবছেন, মোটেই নয়। আমরা রিটনের লেখার কাছে ফিরে যাই-
‘আমাকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ির প্যাসেসটায় এসে ডান দিকের অংশে না গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন সুশীল। আমি তাকালাম তার দিকে। সে চেয়ারম্যানের দরজার দিকে না তাকিয়ে তাকালেন সিঁড়ির দিকে এবং ডান হাতের নির্দেশনায় আমাকে দেখিয়ে দিলেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পথ। এবং হাতের নির্দেশনা অপরিবর্তিত রেখে মুখে শুধু বললেন- প্লিজ।
আমার পৃথিবীটা কী রকম দুলে উঠলো! পা কেমন ভারী হয়ে গেছে...। এই বিবরণ আর নয়, বই থেকে পাঠ নেবেন প্রিয় পাঠক। সূশীল সূত্রধর পর্বের শেষ দুটি লাইন আপনদের জন্য নিবেদন করছি। তাহলে দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে সহজ হবে। রিটন লিখেছেন- ‘আমার ঝাপসা চোখে আবছা ভেসে ওঠে বছর দশেক আগের একটি দৃশ্য, প্রেস ক্লাবের মূল ফটকে কান্না মেশানো কম্পমান কণ্ঠস্বরে অশ্রুসজল নয়নে একটি যুবক আমাকে বলছে- আপনার এই উপকারের কথা আমি কোনোদিন ভুলবো না...। যুবকটি তার কথা রাখেনি।’


১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু নিহত হলে, মানুষতো ভালো বাংলার আকাশে বাতাসে তাঁর নাম নেয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। সেই পোড়াকালে, নিষিদ্ধ ও বিষাক্ত সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত লেখা নিয়ে ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?’ নামে একটি ঐতিহাসিক সংকলন প্রকাশ করেছিল কয়েকজন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন আবদুল আজীজ, ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু, ছড়াকার সিরাজুল ফরিদ, ভীষ্মদেব চৌধুরী এবং লুৎফর রহমান রিটন। শ্বাসরুদ্ধকর রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে যারা এই অদম্য কাজটি করেছিলেন, তাদের স্যালুট জানাই। মিলিটারী শাসনে, টিকটিকির চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে গেলে প্রেস থেকে কাগজ পর্যন্ত কতো সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়েছিল, টান টান উত্তেজনায় ঠাসা গোটা ঘটনা নিয়ে একটি চমৎকার ফিল্ম হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের পরিচালকেরা তো ভালো(!) গল্প খুঁজে পান না। যাইহোক- সেই মর্মান্তিক ও সাহসী সময়ের ঘটনা চমৎকার বিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন রিটন- ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?’ লেখাটিতে। আর যারা সেই দূর্ভেদ্য অন্ধকার কালে এই সংকলেন লিখেছিলেন, অন্নদাশঙ্কর রায়, দিলওয়ার, হায়াৎ মামুদ, রাহাত খান, মাশুক চৌধুরী, ফরিদুর রহমান বাবুল, সুকুমার বড়ুয়া, মোহাম্মাদ মোস্তফা, মাহমুদুল হক, আমিনুল ইসলাম বেদু, নির্মলেন্দু গুণ, তুষার কর, আলতাফ আলী হাসু, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল আজীজ, শান্তিময় বিশ্বাস, আখতার হুসেন, ভীষ্মদেব চৌধুরী, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, জাহিদুল হক, ইউসুফ আলী এটম, সিরাজুল ফরিদ, ফজলুল হক সরকার, মহাদেব সাহা, জাফর ওয়াজেদ, লুৎফর রহমান রিটন, নূর-উদ-দীন শেখ, ওয়াহিদ রেজা, কামাল চৌধুরী এবং খালেক বিন জয়েনউদ্দীন।


বইটির বড় আকর্ষণ ছবি। প্রায় প্রতিটি ঘটনার ছবি আছে। এবং বিস্ময় মানি, অধিকাংশ ছবিয়ালদের নামও নিচে দিয়েছেন। এতো এতো আগের দিনের ঘটনা-রটনার ছবি কে কবে তুলেছিল, তার নিকাশ কেমন করে রাখিল লুৎফর রহমান রিটন? রিটন, নিজের প্রতি যেমন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনি অন্যর জন্যও। 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ