behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বাংলা একাডেমি তার সক্ষমতার অপচয় করছে বইমেলা করে : মজিদ মাহমুদ

১৫:০৬, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৬

মজিদ মাহমুদপ্রশ্ন : অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে আপনি কীভাবে দেখেন বা আপনার মতে এই মেলা কেমন হওয়া উচিৎ?
উত্তর : ব্যাপারটা হয়েছে কী জানেন, বলা চলে, আমরা তো প্রায় জন্ম থেকেই এই বইমেলা দেখে আসছি; ফলে এটি একটি অভ্যস্থতা ও বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতির যে কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একটি ত্যাগ ও আবেগ জড়িত থাকে; এই বইমেলার সঙ্গেও তা জড়িয়ে পড়েছে; এর ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলা তাই বাতুলতা- কখনো কখনো আত্মঘাতী। যে ভাষাগত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্তক ঘটনা, তার নীরব হন্তারকরা তো এখনও সক্রিয় রয়েছে। এমনকি যে শ্রেণি ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, ঠিক সেই শ্রেণি এখন আর তাদের সন্তানদের বাংলা বই পড়তে দিতে চান না; কারণ বাঙালি জাতির সামনে এখন যেমন প্রত্যক্ষ শত্রু নাই, তেমনি যারা আজ বাংলাকে কেবল জনগণকে বশে রাখার আবেগ হিসাবে ব্যবহার করছেন, তাদেরও বিরোধিতা করবার মতো কেউ তেমন নেই। আমিও মেলাকে আর পাঁচজন বাংলাদেশি বাঙালি লেখকের মতো এটি প্রশ্নহীন আবেগঘনভাবে দেখি; যা হচ্ছে তা-ই হয়ে যাক টাইপের; ঈদ-পার্বণগুলো আমরা যেভাবে পালন করি; ব্যক্তি বিশেষের পছন্দের ওপরে কিছু নির্ভর করে না।
প্রশ্ন : মেলায় প্রকাশিত বই মার্চ মাসেই খুঁজে পাওয়া যায় না, এত বই কোথায় যায়? মানে একদিকে প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে অন্যদিকে বইয়ের দোকান কমে আসছে- এই স্ববিরোধ কেনো?
উত্তর : কোথায় বই দেখলেন? কেবল কাগজ-কালির ৯/৬ ইঞ্চির কাঠামো তো আর বই নয়। বই তো আলাদা কিছু, যা বহির্জগতে ও মানুষের অন্তর্জগতের সংঘাতে গড়ে ওঠে, যে সব মুহূর্তগুলো প্রতিনিয়ত হারিয়ে যেতে চায়; যে সব সংকট আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে- তার কোনো একটি প্রান্ত যিনি তার নিজের মধ্যে সংগঠিত করে তোলেন, এবং অন্যের হৃদয়ে তা সঞ্চারিত করতে পারেন, তা যে ফর্মেই প্রকাশিত হোক না কেন- তাই তো বই; বই তো কেবল কাগজ-কালির মধ্যে থাকে না। যারা বই লিখছেন কিংবা যারা বই ছাপছেন, তাদের অধিকাংশই অন্য কোনো কাজ পচ্ছেন না বলে হয়তো এই কাজটি করছেন; তারা যদি জানেন খাবনামা-ফালনামা প্রকাশ করলে বেশি লাভ হবে তাহলে তারা তা-ই করবেন।

প্রশ্ন : গ্রন্থমেলা করে বাংলা একাডেমি তার সক্ষমতার অপচয় করছে কিনা? করে থাকলে এই মেলার দায়িত্ব কারা নিতে পারে?
উত্তর : অবশ্যই, আমি মনে করি বাংলা একাডেমি তার সক্ষমতার অপচয় করছে বইমেলা করে। যখন বাংলা ভাষাই নানাভাবে হুমকির সম্মুখীন, যখন বইয়ের শারীরিক অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তখন বাংলা একাডেমির ভাবনা ও কাজের জায়গা আরও লক্ষ্যভেদী হওয়া উচিত। পুস্তক ব্যবসায়ীদের হাতেই এটি ছেড়ে দেয়া দরকার; বাংলা একাডেমি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তাদের সহযোগিতা করতে পারে; একটা নীতিমালা তৈরি হতে পারে- যেখানে বাংলা একাডেমির এই পুলিশী দায়িত্ব নেয়ার কোনো দরকার নাই। এতবড় মেলায় লোকবল ও সময় ক্ষয়ের চেয়ে ভালো কিছু বই প্রকাশ ও সেগুলোর বিপনন ঢের ভালো। আমাদের মাথার মধ্যে এমনই একটা বাজে বিষয় বাসা বেঁধেছে যে, বইকে যেন ঢাকা বাণিজ্যিক মেলার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে হবে।

প্রশ্ন : শোনা যায়, বেশির ভাগ প্রকাশক বই বিক্রি করে বইমেলার আনুষ্ঠানিক খরচই তুলতে পারেন না। বইমেলা বছর বছর এই আর্থিক ক্ষতিকে সম্প্রসারিত করছে কিনা?
উত্তর : আমার তো মনে হয় না; তা-ই যদি হবে তাহলে এই লুজিং কনসার্নের সঙ্গে তারা বছরের পর বছর থাকতে পারতেন না। অধিকাংশ বই ব্যবসায়ীরাই তো ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে; তাদের শুরুটা কী ছিল, কোনো জারিপ কী আমাদের কাছে আছে। আবার অনেকেই জাতে ওঠার জন্যও কাজটি করতে চান- সেখানে তো আর লাভ দেখলে চলবে না, সেটি একটি প্রেস্টিজ কনসার্ন। আর এক শ্রেণি করছেন, আগেই বলেছি, তাদের আসলে কিছু করার নেই, কিংবা তারা ভবিষ্যতে কিছু একটা করতে চায়; আবার অনেক লেখক ভাবেন, অন্যকে টাকা-পয়সা দিয়ে বই করে পিছে পিছে ঘোরার চেয়ে নিজেরাই একটি পাবলিকেশন্স করাই ভালো। আবার অধিকাংশ পাবলিশারকে দেখবেন, একটি ভালো পাণ্ডুলিপি বা একজন ভালো লেখকের পেছনে সময় না দিয়ে, কিভাবে বই বিক্রি করা যায়, কাদের কাছে গেলে, কাদের ধরলে আখেরে তাদের অর্থ ও ক্ষমতা বাড়বে তাদের পিছুপিছু বেড়ানোর প্রতিযোগিতা করছেন।

প্রশ্ন : মেলার স্টল বিন্যাস কেমন হওয়া উচিৎ? যাতে পাঠক খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত স্টলগুলো খুঁজে পেতে পারেন?
উত্তর : এটি হয়তো একটি কঠিন কাজ। আবার একেবারেই কঠিন নয়; এ ব্যাপারে দক্ষ কোনো পরিকল্পনাবিদ বা কোম্পানিকে আগে থেকে দিলে তারাই এটি করে দিতে পারেন। কয়েকটি সারি ভাগ করে সেইভাবে নাম্বার বণ্টন করলেই তো হয়ে যায়; এর মধ্যেও হয়তো অনেক হিসেব নিকেশ থাকে; আমার অবশ্য তা জানা নেই।

প্রশ্ন : ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশে কীভাবে সৃজনশীল বইয়ে মার্কেট গড়ে তোলা যায়?
উত্তর : আপনাকে মনে রাখতে হবে সালটি ২০১৬; যার কোনো হিসাব আগের দিনের পাঠাগারের আদলে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আগে একটি বই হলে সেটি কেবল একটি পরিবারের সকলেই পড়তে পারতেন না, পাড়ার সমবয়সীরাও ধার করে নিয়ে যেতেন। আজ পিতা জানেন না, পুত্রের পছন্দ, মা জানেন না মেয়ে কী চায়; যোগাযোগ বিপ্লবের ফলে এ ধরনের সকল দৃশ্য জগতের নব রূপায়ন হচ্ছে। সুতরাং, যে কোনো পরিকল্পনার আগে দরকার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধরন জানা। তবে আশার কথা এর মধ্যেও নাকি মফস্বলের বইমেলাগুলোর কাটতি মন্দ নয়। তবে বই একটি সমবায়ী ব্যাপার, বিচ্ছিন্ন মানুষ বইয়ের ক্রেতা বা লেখক হতে পারে না; ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের কদর বাড়লে বইয়ের প্রতি সমাজের পাঠকের আগ্রহ কমে যাবে।

প্রশ্ন : বাজার কাটতি লেখকের প্রভাব ও প্রচারে পাঠক বই সম্পর্কে ভুল বার্তা পায় কিনা?
উত্তর : এটি খুবই জটিল ধরনের প্রশ্ন। জীবন-জগতের গভীর শিল্পসম্মত ও নান্দনিক গ্রন্থের লেখকেরাও হয়তো পাঠক প্রিয়তা চান; অবার কোনো না কোনোভাবে প্রচারের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়, যখনই কোনো বই প্রকাশিত হলো, তখনই মূলত তা প্রচারে আসতে চাইল; তবে এটি খুবই স্বাভাবিক জনপ্রিয় ধরনের রচনা গভীর রচনাকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে; তবে পরিণামে একটু ধীরে হলেও জনপ্রিয় বইকে পিছনে ফেলে শিল্পসম্মত ও অর্থময় রচনাগুলোই সামনে চলে আসে। যে বইগুলো মূলত মেলার পরে, আপনার কথায় মার্চ মাস থেকে যাত্রা শুরু করে, সারা বছর ধরে।

প্রশ্ন : আপনার বই কত কপি ছাপা হয়, কত কপি বিক্রি হয়- তা জানেন কিনা?
উত্তর : আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে, আজ থেকে ৩২ বছর আগে, এ পর্যন্ত আমার ৩২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; তার অধিকাংশেরই একাধিক মূদ্রণ হয়েছে। এমনকি মাহফুজামঙ্গল কাব্যগ্রন্থটি এ যাবৎ ৮ বার মুদ্রিত হয়েছে; প্রথম মূদ্রণের অধিকাংশ বই প্রায় হাজার খানেক ছাপা হয়ে থাকে। কিন্তু এই সব বই বিক্রির পরে আমার কাছে অর্থ আসে সেটা কিন্তু বলতে পারব না। তবে বই বেচে অর্থ পেলে খুশি হই; বলতে ভালো লাগে লেখাই আমার পেশা। তবে অবশ্যই লেখক-পেশা, উকিল কিংবা চাকরিজীবিতার মতো নয়; এ এক অসুস্থ পেশা, যার প্রকাশ ছাড়া আপনার মুক্তি নাই। সত্যিকারের পাঠকের জন্য আমি বাড়ি বাড়ি বয়ে নিয়ে বিনামূল্যে বই দিয়ে আসতে বা কবিতা শুনিয়ে আসতেও রাজি। কারণ আমি বই লিখি আমার কিছু বলার থাকে বলে; তাই পাঠককে আমি বাধ্য করতে পারি না যে আমার চিন্তা তাকে পয়সা খরচ করে কিনে পড়তে হবে।


 

মজিদ মাহমুদ কবি ও প্রাবন্ধিক

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ