ভাষা বিষয়ক সচেতনতা দিনে দিনে কমছে : হামীম কামরুল হক

১০:৫৬, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৬




হামীম কামরুল হকপ্রশ্ন : অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে আপনি কীভাবে দেখেন বা আপনার মতে এই মেলা কেমন হওয়া উচিৎ?

উত্তর : একুশ একটা শোকের বিষয়, কিন্তু শোক থেকে উঠে আসা ভাষার শক্তি নিয়ে প্রত্যয়ী হওয়ার প্রেরণাটাই মূল ব্যাপার হতে পারতো। ভাষার ভেতর দিয়েই মানুষের প্রকৃত জন্ম হয়। যার ভাষা নেই, তার কোনো অস্তিত্বই নেই। বাংলা ভাষার শক্তিকে উপলব্ধি করা ও তার শক্তি বৃদ্ধি করার কাজটা দিনে দিনে বইমেলার ভেতর দিয়ে আকার পাবে- সেটা তো হয়নি। সেই বিষয়টি এখন মনে হয় অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা ভাষা বিষয়ক সচেতনতা দিনে দিনে কমছে। বাংলা ভাষাকে যাতে অকেজো করে দেওয়া যায়, সেজন্য কিছু লোক বুঝে না বুঝে কাজ করছে। তারপরও, তাদের এসব প্রক্রিয়ার বিপরীতে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার প্রকাশ হিসেবে একুশের গ্রন্থমেলা একটা পরিসরও তৈরি করেছে। আপনি দেখতে পাবেন, যদি আপনি বইমেলা নিবিড়ভাবে ঘুরে দেখেন, দেখবেন বিভিন্ন স্টলে এমন সব বই আছে, যেগুলির কোনো খবরই আমরা জানি না। বাঙালি যে ওই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে একটা বই লিখেছে বা অনুবাদ করেছে- সেটা বেশিরভাগে ক্ষেত্রে আড়ালে পড়ে আছে। ফলে বইমেলা ভালোমন্দ মিলিয়ে ইতিবাচকতার দিকটাই বেশি। আর এই মেলা যেমন আছে তার সঙ্গে কিছু ব্যাপার যোগ করা দরকার- যে যে অসুবিধা এখানে আসা মানুষেরা বোধ করেন, সেগুলির ওপর সরেজমিনে খরব নিয়ে সেটা করা যেতে পারে। তবে পাঠকের অধিকার ভালো বই পড়া, লেখকের দায় ভালো বই লেখা। এই দুয়ের মিলন হওয়া দরকার বইমেলায়। সেটা মনে হয় এখনো ততটা হচ্ছে না।
প্রশ্ন : মেলায় প্রকাশিত বই মার্চ মাসেই খুঁজে পাওয়া যায় না, এত বই কোথায় যায়? মানে একদিকে প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে অন্যদিকে বইয়ের দোকান কমে আসছে- এই স্ববিরোধ কেনো?
উত্তর : কারণ প্রকাশকরা বইমেলা ছাড়া বইটাকে যে বাজারজাত করেত হবে, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পাঠাতে হবে- এ নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ বোধ করেন না। গ্রামে বা মফস্বল থেকে বা দেশের অন্যান্য শহর থেকে বিক্রেতারা যদি নিজের থেকে এসে বই নিয়ে যান তো তারা দেন। বইমেলার পর এজন্যই বইগুলি আর পাওয়া যায় না। জনপ্রিয় গুটিকয়েক লেখক ছাড়া একটি বই ছাপিয়ে তাদের এ নিয়ে আর আগ্রহ বা ‘দম’ থাকে না। বেশিরভাগ লেখকের ৫০ বা ৬০ কপি বই কোনো মতে আনা হয়। কারণ জানেন বইয়ের জন্য জায়গা চাই, বইয়ের ওজনও যথেষ্ট, ফলে অনেক কিছু মিলে তারা বই নিয়ে খুব একটা কষ্ট করতে চান না। সবচেয়ে বড় কথা বই নিয়ে যে পেশাদারি মানসিকতা- সেটা গড়ে ওঠেনি বিধায় বইয়ের এই দশা। কিছু বই ছাপানো, বিক্রি করা, কিছু বই বাঁধাইখানায় পড়ে থাকা, বাকিটা পরে দরকার হলে ছাপানো- এই রকম করে চলে মনে হয়। আর হলো যেটা মনে হয়, ছোট ছোট বইয়ের দোকান কমে বড় বড় বইয়ের দোকানের দিন আসছে। এজন্য আগে বিশটি দোকানে যে পরিমাণ বই পাওয়া যেতো, এখন একটি দোকানে বিশটি দোকানের বই পাওয়া যায়। ঢাকায় পাঠক সমাবেশ, চট্টগ্রামে বাতিঘর, সিলেটে বইপত্র এমন কিছু বইয়ের দোকানের উদাহরণ আছে। আগে পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় কত না বইয়ের দোকান ছিল, এখন সেগুলি নেই। সবখানে একটা জায়গায় বা কোনো একটা কেন্দ্রে বইয়ের জন্য যেতে হয়। এটা ঘটছে।

প্রশ্ন : গ্রন্থমেলা করে বাংলা একাডেমি তার সক্ষমতার অপচয় করছে কিনা? করে থাকলে এই মেলার দায়িত্ব কারা নিতে পারে?
উত্তর : বাংলা একাডেমি যদি বইমেলা তদারকি ছেড়ে দেয়, তাহলে বইমেলা আর বইমেলাই থাকবে না। ঢাকা শহরে নানান সময়ে বিভিন্ন রকমের বইমেলা প্রকাশকরা নিজের উদ্যোগে করে দেখেছেন, তাতে সাড়া খুব মেলেনি। অদূর ভবিষ্যতেও বাংলা একাডেমি ছাড়া এই মেলার দায়িত্ব কেউ নেওয়ার মতো সামর্থ্য অর্জন করবেন না বলেই বোধ হচ্ছে। সুবিধা-অসুবিধা তো অনেকই আছে, সেসব মিলিয়ে এটা চলছে। দিনে দিনে নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তো বইমেলার পরিসর বেড়েছে। এ থেকে বোঝা যায় মেলা তার নিজের প্রয়োজনেই বৃদ্ধি পাবে। আর বাংলা একাডেমিকে তার সঙ্গে তাল মেলাতে হবে।

প্রশ্ন : শোনা যায়, বেশির ভাগ প্রকাশক বই বিক্রি করে বইমেলার আনুষ্ঠানিক খরচই তুলতে পারেন না। গ্রন্থমেলা বছর বছর এই আর্থিক ক্ষতিকে সম্প্রসারিত করছে কিনা?
উত্তর : এটা প্রকাশকরা বলে থাকেন। অন্যদিকে তাদের গাড়িবাড়ি সব হচ্ছে বই বিক্রি করে। কেবল লেখককে রয়্যালিটি দিতে তাদের হাত ছোট হয়ে আসে। আর সবাইকে কিন্তু তারা টাকা দিতে বাধ্য থাকেন। প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রক, বাঁধাইকারক ইত্যাদি, কিন্তু লেখককে? নৈব নৈব চ। কখনোই নয়, গুটি কয়েক খুকুগদ্য, খোকাগদ্য লেখা তথাকথিত জনপ্রিয়, মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হওয়া বইয়ের লেখকদের ছাড়া তারা কাউকে রয়্যালটি দিতে চান না। এঁরা ছাড়া অন্য লেখকরা কোনোমতে বইটা বের করতে পেরেই ধন্য ও কৃতার্থ বোধ করে, যেন প্রকাশক দয়া করে তার বইটা ছেপেছেন, আবার এরপর আবার রয়্যালিটি চাইবো, তওবা তওবা! বই পাঠক কেনে না, বইয়ের বিক্রি কমে গেছে- এসব বাজে কথা বলেই মনে হয়। বাংলা একাডেমির বইমেলা শেষে যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতেও দেখা যায় আগের বছর যে কয় কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে, পরের বছর তারচেয়ে বেশি বই বিক্রি হয়েছে। হ্যাঁ, মাঝের কয়েকটা বছর বইমেলা একটু নিষ্প্রভ ছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। তারপরও বইমেলায় দিনে দিনে প্রকাশকদের ঠাকঠকম কিন্তু বেড়েই চলেছে। প্যাভেলিয়ন বা চার ইউনিটের বা বহু স্টল আছে, তার অঙ্গসজ্জার দিকে তাকালে সেটা বোঝা যায়। এগুলি কি হাওয়া থেকে হচ্ছে?

প্রশ্ন : মেলার স্টল বিন্যাস কেমন হওয়া উচিৎ? যাতে পাঠক খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত স্টলগুলো খুঁজে পেতে পারেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন হওয়া উচিত যাতে স্টলগুলি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। এজন্য তো একটা ম্যাপ দেওয়াই থাকে, কিন্তু সংখ্যাগত বিন্যাস ছাড়া বর্ণানুক্রমিকভাবে প্রকাশনীগুলির নাম পাশে দেওয়া দরকার। তাতে পাঠকরা চট করে সেটা খুঁজে নিতে পারে। এত দিন হয়ে গেল এই বর্ণানুক্রমিকভাবে প্রকাশনীর নামের পাশে তাদের স্টল নম্বর দেওয়ার রেওয়াজটা তৈরি হল না।

প্রশ্ন : ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশে কীভাবে সৃজনশীল বইয়ে মার্কেট গড়ে তোলা যায়?
উত্তর : প্রথমত, পরিবার থেকেই বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। আর একটা বড় আকারে স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠার ভেতর দিয়েই সেটা হতে পারে। যেটা কলকাতায় হয়েছে, বা নানান দেশে আছে। সেটা না হলে স্কুলের শিক্ষকরা ভালো বই পড়ার প্রতি তাদের শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে পারেন। সর্বশেষ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকরা সেটা করতে পারেন। বইয়ের সঙ্গে শিক্ষা জড়িত বা শিক্ষার সঙ্গে বই। দুটো যাকে বলে ভাইসিভার্সা। চাহিদা তৈরি করলে মার্কেটও তৈরি হবে। যে দিনজাপুরে বিশ্ববিদ্যালয় আছে, কিন্তু সেখানে চট্টগ্রামের ‘বাতিঘরে’র মতো একটা বইয়ের দোকন কি আছে? আর উদ্যোক্তাদেরও একটু ঝুঁকি নিয়ে কাজ শুরু করলে দেখা যাবে, দিনে দিনে ক্রেতা তৈরি হচ্ছে। ন্যূনতম বড় শহর যা দেশে যেকটি বিভাগীয় শহর আছে সেখানে অন্তত একটি দোকান হতেই পারে ‘বাতিঘরে’র মতো। উদ্যোক্তরা উদ্যোগ নিন, ঝুঁকি নিন, দোকান তৈরি করুন, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বইয়ের খোঁজখবর রাখুন শিক্ষকরা, পরিবারে মা-বাবারা, তাহলে পথটা তো তৈরি হতেই পারে।

প্রশ্ন : বাজার কাটতি লেখকের প্রভাব ও প্রচারে পাঠক বই সম্পর্কে ভুল বার্তা পায় কিনা?
উত্তর : পাঠক যদি স্টুপিড হয়, তাহলে তো ঠিক বার্তা পেলেও সে বুঝবে না। পাঠককে খুঁজে নিতে হবে ভালো বই আর কোন লেখকদের পড়লে তার সার্বিক লাভ হবে। বই কেনার ক্ষেত্রে নিজেও ঠকব না অন্যকেও ঠকাবো না- এই মানসিকতা থাকা দরকার।

প্রশ্ন : আপনার বই কত কপি ছাপা হয়, কত কপি বিক্রি হয়- তা জানেন কিনা?
উত্তর : না, জানি না। জানতে চেয়েছি যখন প্রকাশকের গাঁইগুঁই শুনেছি। আমতার নামতা শুনেছি। কথা এড়িয়ে গেছেন তারা। আর নিজে থেকে কোনোদিন কেউ জানাতেও চাননি। আমরা যারা লেখালেখি করি তাদেরও সংকোচ আছে নিজের বই বিক্রির সত্য ও বাস্তব অবস্থাটা জানার ক্ষেত্রে। আমি বলব, মূল সমস্যা লেখকরা নিজে। তার সচেতন হলে বাকি সবকিছু, এইযে এখানে এতগুলি প্রশ্ন করা হলো, বইমেলা, বই বিক্রি নিয়ে, এর যতগুলি ফ্যাকড়া আছে, এক লেখকরা সচেতন হলেই এগুলির অর্ধেকটা দূর হয়ে যাবে।


 

হামীম কামরুল হক কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক

লাইভ

টপ