পাঠক ঠিকই নিজের পছন্দের বই খুঁজে নেয় : ইমতিয়ার শামীম

১৪:০০, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৬

ইমতিয়ার শামীমপ্রশ্ন : অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে আপনি কীভাবে দেখেন বা আপনার মতে এই মেলা কেমন হওয়া উচিৎ?
উত্তর : অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূল বীজ রোপন করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। তবে মেলার সঙ্গে মানুষের আবেগ ও চেতনা যুক্ত হয়, আত্মীকতা দেখা দেয় একুশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। কাজেই, এখন এটি ‘মূলত প্রকাশকদেরই মেলা’ হলেও একসময় এতে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’র চেতনাই বড় হয়ে দেখা দিত। তাই একে ঘিরে ভাষার, ভাষায় জ্ঞানচর্চার ও ভাষাসাহিত্য বিকাশের এবং এসবের গণসম্পৃক্তির একটি সম্ভাবনা দানা বেঁধে উঠছিল। তবে ১৯৯২ সাল থেকে গ্রন্থমেলার চরিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। আর এখন তা একটি গতানুগতিক বই বিক্রির বাজার হওয়ার পথে। এই মেলার যেহেতু একটি যথেষ্ট কর্তৃত্বপরায়ণ কর্তৃপক্ষ আছে আর আমাদের তরুণ সমাজেরও যেহেতু তেমন সংঘবদ্ধতা নেই যা দিয়ে মেলার প্রকৃতি-চরিত্রকে প্রভাবিত করা যাবে, সেহেতু মেলা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কারও মতামতেও বোধহয় খুব বেশি আসে যায় না। মেলা কেমন হওয়া উচিত- সে কথা তো অনেক পরের ব্যাপার, আমরা তো মেলার একটা স্থানকে ‘অভিজিৎ-দীপন চত্বর’ই করতে পারলাম না। কোন বিশ্বাসে বলি, এটা অমর একুশে গ্রন্থমেলা?
প্রশ্ন : মেলায় প্রকাশিত বই মার্চ মাসেই খুঁজে পাওয়া যায় না, এত বই কোথায় যায়? মানে একদিকে প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে অন্যদিকে বইয়ের দোকান কমে আসছে- এই স্ববিরোধ কেনো?
উত্তর : হ্যাঁ, সংখ্যার হিসেবে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’য় প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে। কিন্তু একটি বই, যেমনটা শুনি, খুব কম কপিই ছাপা হয়। আবার অনেকে বই ছাপেন নিজ উদ্যোগে। তারা হয়তো মেলায় ২০/২৫ কপি আনেন, আর কিছু কপি শুভেচ্ছাস্বরূপ বিলি করেন। বই প্রকাশ তাদের কাছে ক্ষমতায়নের স্মারক। এইসব বই আপনি দোকানে পাবেন না। তারপর ধরুন, শিশুদের বই প্রচুর প্রকাশ পায়। এসব বই পরে প্রকল্পে যায়। কিছু ক্ষমতাবানরা কেনেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেন। এগুলো দোকানে পাবেন না। অনেক প্রকাশক অনেক বই পরিকল্পিতভাবে ‘বই ক্রয় প্রকল্পের’ জন্যেই প্রকাশ করেন। এগুলোও দোকানে তেমন পাবেন না। এর বিপরীত চিত্রও কিন্তু আছে। দ্যুতি ছড়াতে শুরু করেছেন, এমন সম্ভাবনাময় অনেক তরুণের লেখা হয়ত কেবল ছোট কাগজের পাতা কিংবা ফেসবুকের ওয়ালে আটকে থাকে। হয়তো বন্ধুবান্ধব মিলে কোনও এক মেলায় উদ্যোগ নেন তার বই ছাপানোর। বন্ধুদের উদ্যমের কারণেই সে বই দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। এটি ঠিক, বইয়ের দোকান কমে আসছে। কেননা পাঠরুচির গতিপ্রকৃতিও পাল্টাতে শুরু করেছে। যারা এই গতিপ্রকৃতিটাকে ধরতে পারছেন, তাদের দোকান কিন্তু ঠিকই চলছে। আজিজ মার্কেটের কথাই ধরুন। অনেক দোকান বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নতুন ২/১টি দোকান আবার সাড়ম্বরে শুরু হয়েছে। দক্ষ পরিচালনার পুরানো দোকানগুলোর বিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে।

প্রশ্ন : বইমেলা করে বাংলা একাডেমি তার সক্ষমতার অপচয় করছে কিনা? করে থাকলে এই মেলার দায়িত্ব কারা নিতে পারে?
উত্তর : বাংলা একাডেমির ঠিক কী কী অক্ষমতা কিংবা সক্ষমতা আছে, সেটা যদি ধরতে পারতাম, তা হলে হয়ত ভাবা যেত বইমেলা করে প্রতিষ্ঠানটি সক্ষমতার অপচয় করছে কিনা। তবে প্রতিষ্ঠানটির যে উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের কথা বলা হয়, সে নিরিখে নিঃসন্দেহে তার শক্তির অপচয় ঘটছে। তার মানে এই নয় যে, একাডেমি একটা মেলা করতে পারবে না। এই ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ও করতে পারে। বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত; যে-প্রেক্ষিতেই হোক না কেন, বই মেলা তার ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি বই মেলা কেন একমাস ধরে তাকে করতে হবে? বাংলা একাডেমি সাতদিনের বা দশদিনের মেলায় ফিরে আসতে পারে।

প্রশ্ন : শোনা যায়, বেশির ভাগ প্রকাশক বই বিক্রি করে বইমেলার আনুষ্ঠানিক খরচই তুলতে পারেন না। বইমেলা বছর বছর এই আর্থিক ক্ষতিকে সম্প্রসারিত করছে কিনা?
উত্তর : শোনা কথা সত্যি হলে নিশ্চয়ই বছর বছর আর্থিক ক্ষতি সম্প্রসারিত হওয়ার কথা। মেলার ব্যাপারে তাদের অনাগ্রহী হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু প্রতি বছর তো দেখি, এ বছর এত টাকার বই বিক্রি হলো, যা আগের বছরের চেয়ে এত বেশি। এর আগে দেখতাম, মেলার সময় বাড়ানোর জন্যে নানা আয়োজন। তারপর এলো পরিসর বাড়ানোর দাবি। মাঝেমধ্যে তারা মেলার কর্তৃত্বও দাবি করছেন। যদিও কর্তৃত্ব দিলে তারা করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে যারা নতুন প্রকাশক, অনভিজ্ঞতার কারণে কিংবা মূলধনের অভাবে হয়ত তাদের অনেক সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়াটাও নিশ্চয়ই একধরণের বিনিয়োগ। এক নতুন প্রকাশক দু বছর আগে আমাকে বলেছিলেন, ভাল বই বিক্রি হয় না এ কথা সত্যি নয়। তাদের প্রকাশনীর বইগুলো খুব ভাল চলছে। তিনি তো বলেছিলেন, ‘বই বিক্রি হয় না, এ কথাটা একটা ক্যামোফ্লেজ আসলে।’
প্রশ্ন : মেলার স্টল বিন্যাস কেমন হওয়া উচিৎ? যাতে পাঠক খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত স্টলগুলো খুঁজে পেতে পারেন?
উত্তর : স্টল বিন্যাস নিয়ে প্রতিবারই জটিলতা দেখা যায়। কিন্তু যদি প্রতিটি প্রবেশ পথের কাছে স্টলবিন্যাসের মানচিত্র ও নির্দেশিকা রাখা হয়, তাতে প্রকাশনীর নাম ও স্টল নাম্বার থাকে, প্রাঙ্গণে নির্দেশিকচিহ্ন থাকে, তা হলে তো মেলার দর্শনার্থীদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়! আমার অবশ্য এখনও মেলা ঘুরে দেখা হয়নি।

প্রশ্ন : ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশে কীভাবে সৃজনশীল বইয়ের মার্কেট গড়ে তোলা যায়?
উত্তর : এই দায়িত্ব, উদ্যোগ ও তৎপরতা তো বই বিক্রেতাদেরই নিতে হবে। সরকার বলেন আর নীতিনির্ধারক বলেন, তারা বড়জোর সাহায্য করতে পারে। তবে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া তা সম্ভব নয়। পাঠাভ্যাসের নিশ্চয়ই নিবিড় একটা সম্পর্ক রয়েছে সৃজনশীল মার্কেটের কার্যকারিতার সঙ্গে।

প্রশ্ন : বাজার কাটতি লেখকের প্রভাব ও প্রচারে পাঠক বই সম্পর্কে ভুল বার্তা পায় কিনা?
উত্তর : কখনও তেমন পেতেই পারে। কিন্তু দেখেন, মানুষের পাঠরুচি কিন্তু বিস্ময়কর। খুব সিরিয়াস পাঠকও গোয়েন্দা কাহিনী পড়ে, আবার সব সময় গোয়েন্দা কাহিনী পড়া মানুষও নিবিষ্ট হয়ে বঙ্কিমের মতো লেখকের বই পড়ে। বই মেলায় বিচিত্র ধারার, বিচিত্র বিষয়ের বই কী পরিমাণ বিক্রি হয়, তা নিয়ে কি কোনও ব্যাপক জরিপ হয়? আলোচনা হয়? হলে দেখা যেত, পাঠক ঠিকই নিজের পছন্দের বই খুঁজে নেয়। তবে হ্যাঁ, গণমাধ্যমগুলো যদি ভিন্ন ধারার বইগুলোকে প্রচারে নিয়ে আসেন, পত্রিকা ও সাময়িকপত্রে গ্রন্থ আলোচনার ধারা গড়ে ওঠে, তা হলে পাঠকের রুচি আরও বিকশিত হতে পারে।

প্রশ্ন : আপনার বই কত কপি ছাপা হয়, কত কপি বিক্রি হয়- তা জানেন কিনা?
উত্তর : প্রকাশক যা জানান, তার বেশি কিছু জানার সুযোগ কি আর আছে, বলেন? তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন না, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’?


 

ইমতিয়ার শামীম কথাসাহিত্যিক

লাইভ

টপ