behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

জীবনানন্দের আশা ও আশঙ্কায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ || পর্ব-১

ফিরোজ আহমেদ১১:৩৪, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬

জীবনানন্দ দাশ (ফেব্রুয়ারি ১৮, ১৮৯৯ - অক্টোবর ২২, ১৯৫৪)আশঙ্কাভরা একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যত নিয়ে। তারিখটা বাংলায় ১৬ চৈত্র ১৩৫৮, ইংরেজিতে তাহলে ১৯৫১ সালের মার্চের শেষ সপ্তায়ে এটি প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। আশ্চর্য যে, জীবনানন্দ দাশ প্রথম বাক্যেই বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশঙ্কার কারণ হিসেবে বলেছেন ‘পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হবার পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কি হবে-কি হতে পারে— ভেবে দেখেছি মাঝে মাঝে।’ শুধুতেই এই ছোট্ট খটকা বাধে, বাংলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে কবির আশঙ্কার প্রধান কারণ ভারত দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় বাংলা নামের ভূখণ্ডটারও খণ্ডিত হওয়া হতে পারতো, কিন্তু তিনি বাংলার ভবিষ্যত আশঙ্কিত হয়েছেন পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হবার ফলে। অথচ পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম বাঙলা উভয় অঞ্চলেই বাংলা ভাষা প্রায় একই বন্দোবস্তের শিকার হয়েছিল পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রে, পরে সে আলোচনায় আমরা কিছুটা যাবো। আপাতত, যে দু’টো প্রধান অনুসিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য ধরে জীবনানন্দ দাশের এই প্রবন্ধটি এগিয়েছে, তা হলো :

ক. রাষ্ট্রভাষা উর্দু হববার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলার শক্তিশালী উপভাষা থাকার পরও সেটি উর্দুভাষী হয়ে পড়তে পারে। ফলে সেখান থেকে বাংলা সাহিত্য আর রসদ পাবে না।

খ. ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হওয়াতে পশ্চিম বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের বাজার হারাবার ফলে পশ্চিম বাঙলাতেও বাংলা সাহিত্য দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়বে।

 

দুই.

পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে পতন বাংলাদেশে হয়েছিল, তা অনেকাংশেই সংস্কৃতিগত নিপীড়নের পরিনাম। এটা সত্যি যে, বাঙালির ওপর পাকিস্তানি জাতিয়তার পরিচয় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা সর্বদাই চলেছিল। সচেতন ‘তমুদ্দিনী’ সাহিত্য তৈরি চেষ্টা ছিল, পাকিস্তানি পরিচয়ে গর্ব বোধ করাতে শেখাবার চেষ্টার একটা আপাত সাময়িক সাফল্য কিছুদূর থাকলেও বাংলাকে ঘৃণা করাবার প্রয়াসের সাফল্য কি খুব বেশিদূর দেখা যাবে? সম্ভবত না। কিন্তু জীবনানন্দের আশঙ্কা, “পূর্ব বাংলার যে সব হিন্দু-মুসলমান আছে, তারা এতদিন বাঙালি বলে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু এখন তাঁরা নিজেদের খুব সম্ভব বাঙালি বলতে পারেন না। তাঁরা পাকিস্তানি। পশ্চিম বাঙলার দেশিয় অধিবাসীরা অবশ্য বাঙালি।” কবির এই আশঙ্কা সম্ভবত একটা অযোগাযোগের, বিচ্ছিন্নতার ফল। পাকিস্তান ছিল একটা রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্থানকে সে কিছুতেই দখল করতে পারেনি। বরং এই দখলের যে চেষ্টাটা পাকিস্তান চালিয়ে গিয়েছে তার শোষণের সাথে সাঞ্জস্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক তৎপরতা হিসেবে, সেটাই পাকিস্তানের পতনকে আরও সুনিশ্চিত করেছে। কম কিংবা বেশি আকারে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সাথে জাতিগত পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বটা ভারতের নানান জাতিগোষ্ঠীর মাঝেও দৃশ্যমান, দৃশ্যমান বর্তমান পাকিস্তানেও।

জীবনানন্দ তাঁর আশঙ্কাটাকে আরও বিস্তৃত করেছেন এই হাহাকারে যে, বাঙালির সংখ্যা কমে গিয়েছে। “বিভাগের আগে দেশে যত বাঙালি ছিল, এখন নতুন বাঙলায় (পশ্চিম বাংলায়) পূর্ব পাকিস্তান থেকে অনেক উদ্বাস্তু এসে পড়া সত্ত্বেও তার চেয়ে ঢের কম বাঙালি আছে। পশ্চিম বাংলা এত ছোট যে চোখে দেখে ও নজির নেড়ে চেড়ে মনে হয়, লোকের চাপে তা উপচে পড়ছে, আর ঠাসাঠাসি চলে না। কিন্তু আসল কথা, বাংলাদেশে বাঙালি ঢের কমে গিয়েছে। মন্বন্তরে গিয়েছিল, কিন্তু এবারে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের আমরা হারিয়েছি।”

বাঙালি কমে যাবার এই বোধটারও জন্ম সেই রাষ্ট্রীয় পরিচয় দিয়ে জাতিগত পরিচয়কে সীমিত করার ভুল থেকে জাত। বাংলায় যখন উর্দু চাপিয়ে দেয়ার একটা প্রক্রিয়া চলছিল, এবং বুদ্ধিজীবীদের একটা ছোট হলেও অংশ এই প্রক্রিয়ার সহযোগী ছিলেন, পশ্চিম বাংলায় ওই একই সময়ে সেটা আরও তীব্রভাবেই ছিল। পক্ষে-বিপক্ষে বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন। কিন্তু সন্দেহাতীতভাবেই, যে মাপের বুদ্ধিজীবীগণ পশ্চিম বঙ্গে হিন্দির পক্ষে ওকালতি করেছেন, তার প্রতিতুলনা বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না। সুনীতিকুমার ঘোষের মত বাংলা ভাষার অদ্বিতীয় ভাষাতাত্ত্বিক দু’হাতে লিখেছেন হিন্দিকে ভারতের মাতৃভাষা করার সমর্থনে, সেই বৃটিশ আমলের শেষ দিক থেকেই। রক্ষাও এই যে, দুই বাংলাতেই বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ এর বিরোধিতা করেছেন। তারপরও পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল পূর্ব বাংলার তুলনায়, তার একটা কারণ হয়তো লেখক-মুদ্রনশিল্প-সাহিত্যিক ঐতিহ্য মিলে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা যতটা শক্তিশালী ছিল, তাতে আগ্রাসনটা ধীরে অনুভূত হয়েছে। অথবা, উদ্বাস্তু মানুষের প্লাবন এবং খণ্ডণজনিত শক্তির হ্রাসের ফলে ভাষা নিয়ে মনোযোগ ছিল তুলনামূলক কম। 

 

তিন.

বাংলাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেও যুক্তি ছিল, কেবল সংখ্যাধিক্যেরে কারণেই তা ঘটেনি, এমনটাই মনে করেন জীবনানন্দ দাশ :

“বাংলাভাষীর সংখ্যা হিন্দিভাষীদের চেয়েও কম। বেশিরভাগ লোকের সুখ-সুবিধা দেখা যদি রাষ্ট্রের কাজ হয়, রাষ্ট্র তাহলে ঠিক কাজই করেছে। এখনকার ভারতবর্ষের মত একটি এত বড় ও কাঁচা রাষ্ট্র প্রজাদের সংখ্যার দিকে লক্ষ্য না রেখে যে অন্য কোনো উপায় নেই, বাংলার বদলে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করে নেতারা সেটা স্বীকার করেছেন। যুক্তির বদলে আরো কিছু সংস্কারেরও প্রমাণ দিয়েছেন।”

কিংবা

“কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের ছোট বড় ব্যাপারে হিন্দিকে অনর্গল স্বাচ্ছল্যে চলতে হবে বলে এ ভাষা এখন থেকে হয়তো সমস্ত দেশেরই বোধ বুদ্ধি ও কর্ম তৎপরতার আশ্রয়ে তৈরি হতে থাকবে। এ ভাষার সম্ভাবনা কত দূর আমি এখনই ঠিক কিছু বলতে পারছি না। তবে হিন্দিও সংস্কৃতের মত বড় ভাষার থেকে জন্মেছে, ফার্সির কাছেও ঋণী। বাংলা নানান কারণে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে।”

প্রকাশের ক্ষমতা বিষয়ে হিন্দি ভাষার তুলনামূলকহীনতা বিষয়ে জীবনানন্দ দাশ নিজের সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন এই প্রবন্ধে বারংবার :

“রাষ্ট্রভাষা লোকগুনতিতে ঠিক হলো— কোন ভাষাতত্ত্ব কমিশনের বিশেষ পরীক্ষা ও আলোচনার ফলে নয়। সে রকম যদি হত, তাহলে আজকের হিন্দি তার নিজের মূল্যের স্পষ্টতায় রাষ্ট্রভাষা হতে পারত বোধ হয় না।”

আগেই বলেছি, সুনীতিকুমারের মত বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান ভাষাতাত্ত্বিকও হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বলেছেন, বিভাগপূর্ব আমল থেকেই। তাঁর বয়ানে শোনা যাক :

“সংযুক্ত-রাষ্ট্রমূলত ভারতের ভাবী স্বাধীনতার যুগে এক একটী ভাষাকে আশ্রয় করিয়া যে-সকল স্বাধীন বা স্বতন্ত্র প্রান্তিক রাষ্ট্র স্থাপিত হইবে, সেগুলির অবস্থানের দ্বারা নানা নূতন কেন্দ্রাপসারী শক্তি কার্য্য করিবে, সেই-সব শক্তি প্রবল হইয়া নিখিল-ভারতীয় একতার পক্ষে হানিকর হইবে, এরূপ আশঙ্কা আছে; এরূপ কেন্দ্রাপসারী শক্তির অন্যতম প্রতিষেধক হিসাবে একটী নিখিল-ভারতীয় সর্বজন-বোধ্য রাষ্ট্র-ভাষার বিশেষ আবশ্যকতা সকলেই স্বীকার করিবেন। ভারতের ভৌগোলিক সংস্থান, ইহার প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক আবেষ্টনী, ইহার এক-সূত্রে-বদ্ধ সংস্কৃতি— এই সবের সংযোগে ভারতের যে একতা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাকে বিখণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন করিয়া দিবার জন্য নানা দিক্ হইতে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে প্রয়াস দেখা দিবে। এইরূপ প্রয়াসকে প্রতিহত করিবার জন্য, ভারতে কতকগুলি কেন্দ্রীয় ও কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি অত্যাবশ্যক হইবে এবং একটী নিখিল-ভারতীয় সর্বজন-বোধ্য রাষ্ট্রভাষা এইরূপ শক্তির মধ্যে অন্যতম রূপে যাহাতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহার চেষ্টা করা উচিত।” (ভারতের ভাষা ও ভাষাসমস্যা, প্রথম প্রকাশ পৌষ, ১৩৫১, রূপা এন্ড কোম্পানি মুদ্রিত ১৯৯২ সালের সংস্করণ থেকে বর্তমান উদ্ধৃতিটি নেয়া হয়েছে, পৃষ্ঠা ৪০।)

হুবহু একই যুক্তিকাঠামোই আমরা পাকিস্তানের বেলাতেও দেখেছি। যদিও পালটা মত ছিল, আরও অনেকের মতই পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন বোসরা স্বাধীন ভারতে বাংলার পক্ষে লাগাতার লিখে গিয়েছেন। ভাষার প্রশ্নে লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রামের পথেও এগিয়েছে কোন কোন রাজ্য। কিন্তু মোটা দাগে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

চার.

রাষ্ট্র চাপিয়ে দিলেই রাতারাতি জাতির নাম বদলে যায় না, সেই সচেতনতা ও আশাবাদ জীবনানন্দের ছিল :

“পূর্ব বাংলার লোকদের আগে বাঙালি বলা হত; তাদের নাম বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে তারা এখন স্বভাবতই পাকিস্তানি। শুধু নাম বা অন্য দু’চারটে ছোট বড় জিনিসেরও পরিবর্তনে অনেকদিনকার রক্ত-মাংস আত্মার পরিবর্তন হওয়া কঠিন। বাংলা, পূর্ব বাংলার লোকদের অনেক শত বৎসরের সাহিত্য ও সমাজ-সংসারের ভাষা। পূর্ব বাংলার মুস্লিমরা কয়েক শো বছর ধরে ওদিককার নানা উপভাষায় লিখে ও বলে যে বিশেষ সার্থকতা দেখিয়েছেন ভাষার সেও সুস্থ অপর্যাপ্ত প্রকাশ যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তার এখনকার আপাতসুস্থতা এদিককার (সাধু ও চলতি) কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারবে ভাবনার বিষয়। বড় উপভাষা যদি ক্ষয় পায় তাহলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কেমন হয়ে দাঁড়াবে!”

কিংবা আরও দেখা যাক :

“পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা ও জনভাষায় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে এমন সময় আসবে যে পূর্ব বাংলার উপভাষাগুলো কারো মুখে কোথাও শুনতে পাওয়া যাবে না। এত ভালো এত বড় বড় উপভাষা এরকমভাবে যদি ফুরিয়ে যায় তাও যেতে পারে; কারণ মানুষের বুদ্ধিবিচার প্রায়ই মূল্য সংরক্ষণ করতে চাইলেও ইতিহাস সাদা চোখে দেখে সব।”

পূর্ব বাংলার ভাষা, জীবনানন্দের ভাষায় বাংলার শ্রেষ্ঠ উপভাষাগুলোর নির্দশন, যার সাথে তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে নিবিড় পরিচয়ে যুক্ত ছিলেন, তাদের নিয়ে তার মূল্যায়নটাও বিশেষভাবে আকর্ষণীয় :

“আমার মনে হয় বাংলার শ্রেষ্ঠ উপভাষাগুলোর বেশিরভাগ পূর্ব (ও উত্তর) বাংলায় এবং সেখানে কয়েক শো বছর ধরে সিদ্ধি লাভ করেছে। পূর্ব বাংলার প্রবাদে-বচনে-ছড়ায়-গীতিকায় ও মুখের ভাষার বিশদ ও ক্রান্তিগভীর তাৎপর্যে তার প্রমাণ রয়েছে। উপভাষাগুলো মাতৃভাষার থেকে উৎপন্ন হয়ে মাতৃভাষাকে নিয়ন্ত্রিত ও নতুন নতুন সূচনা নিয়ে উৎপন্ন হতে সাহায্য করে।”

অথবা

“ঊনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য ও মুখের ভাষা (অন্তত শিক্ষিত সমাজে যা সবচেয়ে বেশি প্রসার পেয়েছিল) প্রায় পুরোপুরি পশ্চিম বাংলা ঘেঁষা ছিল। পূর্ব বাংলায় তখন ও তার অনেক আগের থেকে উপভাষায় সাহিত্য রচিত হয়েছিল, মুখের ভাষা বিকাশ পাচ্ছিল; কিন্তু এদিককার সুধী সাহিত্যিক যা চলতি সমাজের খেয়ালে তা বড় একটা আসেনি। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই এ সব উপভাষায় রচিত সাহিত্যের বিশেষত্ব বাঙালি বোধ করতে পেরেছে।”

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ