behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

জীবনানন্দের আশা ও আশঙ্কায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ || পর্ব-২

ফিরোজ আহমেদ১২:১৬, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৬

বারংবার আশঙ্কার কথা জানালেও এভাবে আশার দিকটি কিন্তু ঠিকই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন জীবনানন্দ। কিন্তু সেই আশাবাদ বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, সেই দ্বিধা তাকে মূহুর্তমাত্র ত্যাগ করেনি :

“বাংলা পূর্ব-পাকিস্তানের দেশজ ভাষা; এ ভাষার যে স্বরূপ মুখে ও সাহিত্যে পূর্ব বাংলা এতদিন বসে গড়ে তুলেছে তা বিশেষভাবে সেখানকার মুস্লিমদের মুখে ও মননে গড়া জিনিস; সমস্ত বাংলাদেশ সে সব উপভাষা ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। আজকের চলতি বাংলা বা সাহিত্যের বাংলার সঙ্গে সে ভাষার পার্থক্য রয়েছে বটে, কিন্তু একই ভাষা নানা অঞ্চল-বিভিন্নতায় যে রকম পৃথক; সেটা এত কম যে ইংরেজির মত একটি বিদেশী ভাষা তো দূরের কথা হিন্দী বা উর্দুর চেয়েও যে কোন নিরক্ষর বাংলা উপভাষী অনেক সহজে সাধু ও চলতি বাংলা বলতে পারবে; লক্ষ লক্ষ লোক শত শত বৎসর থেকে বলেও আসছে। এ রকম অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান তার দেশজ ভাষা ও সাহিত্য ছেড়ে দিয়ে উর্দু গ্রহণ করা সহজ ও স্বাভাবিক মনে করতে পারবে কি না— কিংবা উর্দু গ্রহণ করা সহজ ও স্বাভাবিক মনে করতে পারবে কিনা— কিংবা উর্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকেও পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে লাভ করতে চাইবে ও পারবে কিনা— পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা নিয়ে এই সব সমস্যা দেখা দিয়েছে। মীমাংসা এখনও কিছু হয়নি। কোন পথে হবে বলা কঠিন। কাগজে যেসব খবর পাওয়া যায় তা কতদূর সঠিক ও সম্পূর্ণ বলতে পারছি না; সংবাদ পড়ে মনে হয় খুব সম্ভব বেশি সংখ্যক পাকিস্তানীই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্থিত দেখতে চান। এঁদের ইচ্ছা ও চেষ্টা সফল হলে পশ্চিম বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের পক্ষেও খুব বড় লাভ।”

সত্যি, পাকিস্তান রাষ্ট্রে উর্দুর বদলে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলে পশ্চিমবাংলার ভাষা ও সাহিত্যের পক্ষে তা লাভজনক হবারই কথা। কিন্তু সামগ্রিক লাভের সে তো অতি তুচ্ছ অংশ! এই লাভটি প্রথমত বাংলা ভাষার, এবং প্রত্যক্ষভাবে পূর্ববাংলার সকল মানুষের জীবনের বিকাশের স্বার্থের সাথে তা সম্পর্কিত। যে গভীর সম্পর্কে ভাষা মানুষের জীবনে যুক্ত থাকে— যাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছিলেন, বাংলা ভাষায় বাঙালী চিত্তের অধিষ্ঠান— সেই গভীর সম্পর্কের দিক দিয়ে চিন্তা করলে আজ আমরা বুঝতে পারি, পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে ততটা শক্তিশালী ছিল না, যতটা শক্তির অধিকারী হয়ে ইতিহাসে কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো কোনো জাতির ভাষা মুছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা ভাষার প্রশ্নই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে বাংলাভাষীদের প্রথম ও প্রধান মল্লভূমি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ওই আশাবাদের চিত্রটুকুর পরই জীবনানন্দ আবার সেই দুরাশার ঘন মেঘ দেখছেন :

“কিন্তু বাংলা যদি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ক্রমে ক্রমে উঠে যায় তাহলে এ ভাষার, এর সাহিত্যের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হবে পশ্চিম বাংলা। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন নিয়োমৎসারিত ভাষা উর্দু থেকে কোন সাহায্য পাওয়া যাবে না— সেখানে বাংলা সাহিত্যেরও বিশেষ কোন চাহিদা থাকবে না। দেশ বিচ্ছিন্ন হবার সঙ্গে সঙ্গেই টান কমে গেছে, কিন্তু সেটা হয়তো সাময়িক বিশৃঙ্খলার জন্য, অনেকটা টাকাকড়ির অব্যবস্থার জন্যে। কিন্তু উর্দু পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হলে বাংলা সাহিত্যের তেমন কোন দরকার থাকবে না সেখানে। পূর্ব পাকিস্তান বা কোনো দেশের পক্ষেই দু’তিনটে ভাষা একসঙ্গে বরদাস্ত করা সহজ নয়। ইংরেজিকে অনেকদিন পর্যন্ত বিশেষ দায়িত্ব-দরকারে চালিয়ে রাখতেই হবে। ইংরেজি-উর্দু শিখে ও রাষ্ট্রে-সমাজে ব্যবহার করে পাকিস্তানের লোকজনের পক্ষে বাংলার তেমন কোনো সার্থক ব্যবহার সম্ভব হবে মনে হয় না। পূর্ব পাকিস্তানের নিজ ভাষা হলেও বাংলা সেখানে ক্ষয় পেয়ে পশ্চিম বাংলার সক্রিয় ভাষার থেকে এত বেশী বিভিন্ন হয়ে পড়বে যে তখন তাকে চেনা কঠিন হবে।”

এই অদ্ভুদ রহস্যটা বুঝতে আমাদের বেগ পেতে হয়— উর্দুকে বাংলার ওপর চাপিয়ে দেয়া আদৌ সম্ভব হলে হয়তো এই ঘটনাগুলো ঘটতো, হয়তো ঘটতো না, কিন্তু আদৌ কি এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার সাফল্যের কোন সম্ভাবনা ছিল?

ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পরও আমরা কিন্তু দেখেছি উর্দুকে পাকিস্তানি তমুদ্দুনের বাহন করার চেষ্টায় শাসকেরা মূহুর্তের জন্য বিরাম দেয়নি। আইনী এবং সাংস্কৃতিক সকল তৎপরতাই চলছিল এই উদ্যোগকে বাস্তবায়নের জন্য। হাতে গোণা কিছু বুদ্ধিজীবীকে তারা দলে ভেড়াতে পারলেও পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসের সুবর্ণ যুগের সূচনাটিও প্রতিবাদে-প্রতিরোধের প্রতিস্পর্ধী বিকাশেই সম্ভব হয়েছিল।

 

পাঁচ.

ভাষার ইতিহাসের দিক দিয়ে যদি আমরা দেখি, ভারত রাষ্ট্রে বরং একই ধরনের তৎপরতা প্রায় বিনা প্রতিরোধে অথবা সামান্য প্রতিরোধে মেনে নেয়া হয়েছে। ১৯৪৪ বা ৪৫ সালে (বাংলা তারিখ দেয়া আছে পৌষ ১৩৫১) সাথে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত সুনীতিকুমার চট্টপাধ্যায়ের ‘ভারতের ভাষা সমস্যার স্বরূপ কি?’ প্রবন্ধে আমরা দেখবো এমনই এক প্রস্তাবনা :

“ইংরেজের কূট ভেদনীতির ফলে পাকিস্তানী মনোভাব সাম্প্রদায়িকতা-বাদী মুসলমানদের মধ্যে প্রকট হইলেও সাধাণ ভারতবাসী এক অখণ্ড ভারতের অস্তিত্বেই আস্থাবান; ভাষা, জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে এক ভারতীয় nation বা জনগণ যে সত্য-সত্যই আছে, এই বোধ বা উপলদ্ধি অল্প-বিস্তর সকলেরই মনে জাগরূক। এখন, এক জাতি বা জনগণের মধ্যে কেবল একটি ভাষা থাকাই উচিত— স্বাজাত্যের বা এক জাতিত্বের সর্বপ্রধান প্রতিষ্ঠা ও লক্ষণ হইতেছে ভাষা-সাম্য, এই রূপ একটি সিদ্ধান্ত বা বিচার বা চিন্তারাধারা আসিয়া আমাদের অনেককে ব্যাকুল বা উদ্বিগ্ন করিতেছে। আমাদের অনেকেরই মধ্যে এই ধারণা দাঁড়াইতেছে যে, এক অখণ্ড-ভারতীয় জনগণের বা ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতীক-স্বরূপ একটী ভারতীয় ভাষা থাকা উচিত। এইরূপ ‘নিখিল-ভারতীয় রাষ্ট্রভাষা’ দুই কারণে আমাদের নিকট ঈপ্সিত হইয়া উঠিয়াচে : এক, এইরূপ একটী ভাষা হয়তো আমাদের ‘খণ্ড, ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত’ ভারতকেও একরাষ্ট্রীয়তার সুদৃঢ় বন্ধনে বাঁধিয়া এক করিয়া দিতে সাহায্য করিবে— বিভিন্ন প্রাদেশিক বা প্রান্তিক ভাষাকে অবলম্বন করিয়া, ভারতীয় একতায় ভাঙ্গন ধরাইবার যে একটা সুপ্ত প্রবৃত্তি আছে, ‘নিখিল-ভারতীয় রাষ্ট্রভাষা’ সেই প্রবৃত্তিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রিত করিতে সাহায্য করিবে; দুই— ভারতের ও ভারতীয়দের প্রতি বিরোধভাবাপন্ন অনেক বিদেশী যে যখন-তখন বলিয়া থাকে, যেহেতু ভারতে সর্বজন-স্বীকৃত এক ‘রাষ্ট্রভাষা’ নাই, সেইহেতু ভারতকে nation বা রাষ্ট্র বা একীভূত জনগণ বলিতে পারা যায় না, ভারতের এক-রাষ্ট্রতা সেইজন্য অসম্ভব কথা, ইহা ভারতীয়দের স্বীকার করিয়া লওয়া চাই; সুতরাং একতা-বিধায়ক রাজশক্তি হিসাবে ইংরেজ চিরতরে যে ভারতে থাকি, ইহা যেন স্বতঃসিদ্ধ; এই প্রকার ভারত-বিদ্বেষী উক্তির প্রতিষেধক হইবে নিখিল ভারত কর্তৃক স্বীকৃত একী ‘রাষ্ট্রভাষা’। হিন্দী (হিন্দুস্তানী) যে এই ঈস্পিত রাষ্ট্রভাষা হইতে পারে, এই প্রস্তাব দেশের সমক্ষে উপস্থাপিত হইয়াছে। এক্ষণে আমাদের দেশের বহু বহু রাষ্ট্রনৈতিক ও চিন্তা নেতার মনে এখন এই প্রশ্ন একটা খুব বড় স্থান লইয়া বসিয়াছে— কতদূর এবং কিভাবে আমরা হিন্দী(হিন্দুস্তানী)-কে ভারতের ‘রাষ্ট্রভাষা’ রূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিব।”

এবং,

“ভারতের উপস্থিত অবস্থা বুঝিয়া বিচার করিলে, রাষ্ট্র ভাষা বা জাতীয় ভাষা রূপে গ্রহীত হইবার জন্য হিন্দী (হিন্দুস্তানী) ভাষার দাবীই সব চেয়ে বেশী। যদি কেবল হিন্দুদের লইয়া ভারতবর্ষ হইত, তাহা হইলে আবার সংস্কৃতকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা রূপে স্থাপিত করা চলিত।”

আরও আছে,

“আর একটী কথা। এক বহুরূপী ভাষা হিন্দী (বা হিন্দুস্তানী) একটী বড় আদর্শের প্রতীক বা চিহ্ন-স্বরূপ হইয়া উঠিয়াছে— হিন্দী ভাষা দাঁড়াইয়াছে অখণ্ড ভারতের একতার আদর্শের এক মুখ্য প্রতীক রূপে।” 

পাঠক, আশ্চর্য হবেন যে, হুবহু এই যুক্তিগুলোই দেশের নামটি ভারতের বদলে পাকিস্তান করে দিলে ঠিকঠাক মতই তা মিলে যাবে। ভারত রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের চাইতে বহু সহস্রগুনে শক্তিশালী, ফলে তার সাফল্য তুলনামূলকভাবে বেশি— এই পার্থক্যটুকু বাদ দিলে উভয় প্রকল্পের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য খুব বেশি ছিল না।

 

ছয়.

রাষ্ট্রের এই ভাষা আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার সাফল্য কতদূর? এই স্পর্শকাতর প্রশ্নটার উত্তরে আমরা না যেয়ে সুনীতিকুমার এবং তাঁর সহগামীদের আরও কিছু প্রস্তাব বিষয়ে আলোচনা করতে পারি ১৯৩৪ সালের এই প্রস্তাবে :

“তারপর একজন সিন্ধী হিন্দু প্রতিনিধি এই সংশোধনী প্রস্তাব করেন যে রাষ্ট্র-ভাষা হিন্দুস্তানী কেবল রোমান অক্ষরে লিখিত হইবে। বাঙ্গালী হিন্দু প্রতিনিধি বিধায়, আমিও এই প্রস্তাব সমর্থন করি, কিন্তু আর সকলেই বিপক্ষে থাকায় এই প্রস্তাবও নাকচ হইয়া যায়। কিন্তু রোমান অক্ষর গ্রহণের কথাটা কংগ্রেসের মধ্যে এইভাবে ধামা-চাপা পড়িয়া গেলেও কংগ্রসের বাহিরে দুই-চারিজন করিয়া ব্যক্তি এই বিষয়ে অনুকূল মত পোষণ করিতেছেন। এই বৎসর (১৯৩৪সালে) ফরিদপুরে বাঙ্গালা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যাপকদের একী সম্মেলন হয়, তাহাতে বাঙ্গালা ভাষা লিখনের জন্য বাঙ্গালা অক্ষরের পরিবর্তে রোমান অক্ষরের প্রচলন অনুমোদন করিয়া একটী প্রস্তাব আসে, ৩২ জন সদস্য প্রস্তাবের বিপক্ষে ও ২৫ জন প্রস্তাবের পক্ষে থাকায় তাহা পরিত্যক্ত হয়। আমার বিশ্বাস, এই ২৫ জনের সংখ্যা ক্রমে ক্রমে বাড়িয়া চলিবে। বঙ্গদেশের এক লদ্ধ প্রতিষ্ঠ ও সর্বজন সমাদৃত লেখক— একাধারে তিনি বৈজ্ঞানিক ও আভিধানিক ও রস-রচয়িতা— তিনি আমায় বলিয়াছেন যে, যদি তাহার হাতে কামাল পাশার মত ক্ষমতা থাকিত তাহা হইলে আইন করিয়া দেশে বাঙ্গালা ভাষায় তিনি রোমান হরফ প্রচলন করাইতেন।”

উল্লেখ্য, কংগ্রেসের আলোচ্য ওই সম্মেলনে এর পূর্বে আরবী হরফেও সকল রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম প্রচারের প্রস্তাব আনেন একজন মুসলমান সদস্য। সেটিও যথানিয়মে বাতিল হয়। কিন্তু দেখার বিষয় হলো রোমান হরফে হিন্দি, এবং পরবর্তীতে রোমান হরফে বাংলাও প্রচলনের উদ্যোগ, যেটি ক্রমশঃ ভদ্রশ্রেণির গূরুত্বপূর্ণ একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। ভারতীয় সংহতির যে যুক্তি সুনীতিকুমার এর আগে দিয়েছেন, তার সাথে রোমান হরফের এই প্রস্তাবকে মিলিয়ে পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি একক হরফের প্রস্তাবও আসলে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক হরফকে কোনঠাসা করারই প্রয়াসে করা হয়েছে। নিরপেক্ষ হরফ হিসেবে রোমান হরফকে গ্রহণযোগ্য করাবার উদ্যোগ, যেটি অহিন্দীভাষী বাকিদের মাঝে বঞ্চনার বোধ দেবে কমিয়ে। কামাল পাশার সাথে এই পরিস্থিতির মৌলিক পাথ্যর্কের দিকটিও পষ্ট থাকার দরকার, তুর্কি ভাষা এর পূর্বে আরবী হরফে প্রকাশিত হত। বিদ্রোহ করে পুরো আরব মধ্যপ্রাচ্য তুরস্কের বলয় থেকে ছিন্ন হওয়ায় আরবী বর্জন করে রোমান হরফ গ্রহণ ছিল একদিকে পাল্টা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে ইউরোপীয় জগতে অন্তর্ভূক্ত হবার আকুতির বহিঃপ্রকাশ। রোমান বর্ণমালা বিষয়ক এই সঙ্কট ভারতীয় উপমহাদেশে অনুপস্থিত ছিল। সুনীতিকুমার কথিত না-বলা বৈজ্ঞানিক ও আভিধানিক ও রস-রচয়িতা কি রাজশেখর বসু!

রোমান হরফে লিপি প্রচলনের বিষয়ে সুনীতিকুমার এতই আশাবাদী ছিলেন যে, এতদূর পর্যন্ত বলেন :

“যতদিন না রোমানলিপি গ্রহীত হয়, ততদিন ভারতের লিপি-বিষয়ক ঐক্য একমাত্র দেবনাগরীর দ্বারাই হইতে পারে। উর্দু-ব্যবহারকারী মুসলমান এবং সিন্ধী ও কাশ্মরী মুসলমান ছাড়া, ভারতের আর সকলকে দেবনাগরী গ্রহণ করানো তত কঠিন হইবে না। তবে বর্তমান লেখকের বিশ্বাস, রোমানলিপি ভারতে আসিবেই; এবং রোমানলিপির গ্রহণ একদিনে হইবে না, অন্ততঃ দুই পুরুষ ধরিয়া পাশাপাশি ভারতীয়লিপি এবং রোমানলিপি চলিবে। পরে, রোমানলিপির আপেক্ষিক সুবিধা বুঝিয়া, লোকে স্বেচ্ছায় ইহা গ্রহণ করিবে।”

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, লিপি বা হরফ নিয়ে একই ধরনের উদ্যোগ পূর্ব বাংলাতেও হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সংহতির সুবিধার্থে আরবি এবং রোমান উভয় বর্ণমালাতে বাংলা প্রচারের প্রস্তাব নানা মাত্রায় উঠেছিল। বাঙালিদের মাঝে পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ছিলেন এগুলোর উৎসাহী প্রবক্তা।

 

সাত.

এই সব প্রকল্পের আপাত-সাফল্য ব্যর্থতার বাইরে আমাদের আর একটি বিবেচনার বিষয় দাঁড়ায় : ভারতে হিন্দি এবং পাকিস্তানে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার যে তৎপরতা চলেছে এবং যতদিন তা না হয়, ততদিন ইংরেজি দিয়েই এই রাষ্ট্র চালাবার যে আশা কিংবা আশঙ্কা সুনীতিকুমার ও জীবনানান্দে দেখা যাচ্ছে, সেই উর্দু ও হিন্দি কিন্তু ভারত বা পাকিস্তানের যোগাযোগের একমাত্র প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়নি এতগুলো দশক পেরিয়েও। বরং ভারতের বেলায় দেখা যায় হিন্দি হয়েছে আম-জনতার মাঝেকার যোগাযোগের মাধ্যম। সেই কারণে চলচ্চিত্রেরও ভাষা। উচ্চ কোটির মানুষের ভাষা আজ ইংরেজি। শুরুর সেই খটকাটা আবার তাই আলোচনায় আসে : জীবনানন্দ বারবার বলছেন, রাষ্ট্রভাষা না হওয়া সত্বেও বাংলা পশ্চিমবঙ্গে টিকে থাকবে, কিন্তু ক্রমশঃ ক্ষয় পাবে। তার সাহিত্যের গণ্ডী সংকুচিত হবে, একদিকে পশ্চিম বাংলা সংকীর্ণ স্থান বলে, অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বাজার সে হারাবে বলে। অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় বাংলা টিকেই থাকবে না, এই তার আশঙ্কা।

কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি, প্রতিরোধের পথেই বাংলা পূর্ব বাংলাতে বিকশিত হয়েছে ওই দশকগুলোতে। হয়তো ওই দশকগুলোই, কিংবা তার প্রভাব ও ছোঁয়াতে সৃষ্ট প্রবণতাগুলোই ভবিষ্যতে পূর্ব বাংলার স্বর্ণজ্জ্বোল সময় হিসেবে চিহ্নিত হবে। পশ্চিম বাংলাতেও জীবনানন্দ দাশের আশঙ্কা অনুযায়ী বাংলা মৃত্যুমুখে পতিত হয়নি, বরং এর আগেই তার যা কিছু অর্জন, তারই ভরবেগের ধারাবাহিকতায় তার সাহিত্যিক বিকাশও বেশ খানিকটা ঘটেছে। সেই আলোচনাও জরুরি।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ