behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

শবদেহ

জান্নাতুল মাওয়া১৪:৩৭, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৬

 

সেরা দশ গল্প

আজিমপুর কবরস্থানের পাশের রাস্তাটা শর্টকাট, তাই ইচ্ছে না থাকলেও মাঝে মাঝে আমাকে এই রাস্তাটা ধরতে হয়। বড় হবার পর অনেক কাজই করতে হয় অনিচ্ছায়। ইচ্ছা করলেও ডাক ছেড়ে কাঁদা যায়না, অপছন্দের লোকেদের ভেংচি কাটা যায়না।  অনিচ্ছায় হাসতে হয়, মানতে হয় অনেক কিছু। আজকে বাসায় তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার, তাই এই রাস্তা।

সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, রাস্তায় প্যাচপ্যাচে কাদা। চেয়েছিলাম ঠিক ৫ টায় অফিস থেকে বের হব। কিন্তু বসের তখনই মিটিং ডাকতে ইচ্ছা হল। এই প্রাইভেট কোম্পানির বসগুলো বড় অদ্ভুত হয়। ঠিক ছুটির সময়ই বেছে বেছে তাদের মিটিং করতে ইচ্ছা করে। এখন এই ৬ টায়ও মনে হচ্ছে গভীর রাত। কবরের পাশে সরসর শব্দ, গা টা ছমছম করে উঠলো। কেউ যেন ফিসফিস করে বলে উঠলো, "এই তুই কই যাচ্ছিস? তুই না সেই কবেই মরে গেলি। আয় আয়, এখানে জায়গা খালি আছে। আমাদের পাশে এসে শুয়ে পড়।"

 ঊর্ধ্ব শ্বাসে দৌড় লাগালাম। আমি জানি এসবই আমার ভ্রম, তবুও দৌড়াচ্ছি। জীবনটাই যে এমন! ভ্রম জেনেও দৌঁড়াতে থাকি, জানি একদিন এসব কিছুই থাকবেনা, তবুও দৌঁড়  চলছে। একটু থেমে গেলেই যে আরেকজন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে!   

হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের দরজায় এসে দাড়ালাম। কলিংবেলে হাত দেবার আগেই দরজা খুলে গেলো। রিনি সোজাসুজি তাকিয়ে আছে, চোখে বিস্ময়। বললো, কী ব্যপার এভাবে দৌড়ে আসছিলে কেন?

-কে বলল দৌড়ে এসেছি?

-নাজমুল, আমি জানালায় দাড়িয়ে ছিলাম, দেখলাম তুমি দৌড়ে গেট দিয়ে ঢুকছো? কেন!

আমি ভাবতে থাকলাম কী করে এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নটাকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়। বেশ রাগী রাগী গলায়  বললাম,-সারাদিন তুমি জানালায় দাঁড়িয়ে কী করো বলতো?

-কি! সারাদিন জানালায় থাকি মানে! তাহলে আমার স্কুলে কি তুমি যাও? আর এই যে এসব খাবার দাবার কি আকাশ থেকে পড়ে!   

আমি গামছা আর লুঙ্গি নিয়ে টুক করে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। যাক বাবা! প্রশ্নটা এড়ানো গেলো। এবার বাথরুমের ঝাপসা আয়নায় নিজেকে দেখার একলা সময়। মধ্যবিত্তের এই খোপকাটা জীবনে, বাথরুমই হলো চিন্তা ভাবনা করার একমাত্র জায়গা। হঠাৎ মনে হলো আমার পাশে আবছায়া। ছায়াটা নড়ে চড়ে উঠলো, ফিসফিস করে বললো- কী দেখছো? তুমি তো মরে গেছো? মরা মানুষের আবার এত চেহারা দেখতে হয় নাকি?

- তুমি কী চাও বলতো?

-কিছুনা, শুধু বলতে চাচ্ছি এই যে তুমি কাজ করছ, ঘুরছো, ফিরছো; তুমি ভাবছো তুমি বেঁচে আছ। আসলে কিন্তু তুমি মরে গেছ।

-এসব ফালতু কথার মানে কী?

- ফালতু কথা না, তুমি ভালো করে দেখো তোমার চেহারাটা, কেমন মরা মানুষের মুখের মত ফ্যাকাসে! তোমার গা থেকেও পচা গন্ধ বেরোচ্ছে।

- চুপ কর! চুপ কর!  

বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিতে লাগলো রিনি।

-অ্যাই অ্যাই কার সাথে কথা বলছো? কি হয়েছে?

- উফফ! আচ্ছা রিনি তুমি কি আমাকে একটুও একা থাকতে দেবেনা?

রাগ হতাশা, দুশ্চিন্তা সব কিছু কে ঝপাস ঝপাস করে গায়ে পানি ঢেলে ধুয়ে দিতে চাইছি। একটুখানি প্রশান্তি বড় দরকার। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম টেবিলে খাবার নেই। যেহেতু রিনিকে রাগিয়ে দিয়েছি, আমাকেই  খাবার বেড়ে নিতে হবে। সে হয়তো এখন বারান্দার কোন অন্ধকার কোণে চুপচাপ বসে আছে। থাকুক, এত সাধ্য সাধনা করে রাগ ভাঙাতে পারবনা।

ভাত খেতে ভালো লাগছেনা, কারণ আমি ঠাণ্ডা ভাত খাচ্ছি। ভাত গরম করাটাও একটা প্রয়োজনীয় বিষয়। হঠাৎ মনে পড়ল সায়মার কথা। সায়মাকে যখন ভালোবাসতাম আমরা স্বপ্ন দেখতাম, একসাথে অফিস শেষে বাসায় ফিরে দুইজন একসাথে রান্না করবো। অথচ আসলে কী হল? বিয়ে করতে হল রিনিকে, আর এখন অফিস থেকে বাসায় ফিরে নিজের খাবার গরম করে খেতেও আলসেমি লাগে।

প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মিষ্টি একটা গন্ধে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। রিনি পাশে এসে শুয়েছে, খুব সাবধানে আমার গা বাঁচিয়ে। কেন? সাথে সাথে মনে পড়লো, সন্ধ্যায় তাকে আমি বাঁকা কথা বলেছি। এখন রিনির মিষ্টি গন্ধে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আলতো করে ওর গায়ে হাত রাখলাম, সেও আলতো করে সরিয়ে দিল। গত ৫ মাসে আমি শিখে গেছি কী করে রিনিকে বশে আনতে হয়।

রিনির ঘাড়ে আমার তপ্ত নিঃশ্বাস, ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে রিনি।

আমার অমতে জোর করে যখন মা রিনিকে আমার বউ করে নিয়ে আসেন জেদ করে ভেবেছিলাম ওকে ছুঁয়েও দেখবো না। মায়ের শাস্তি হবে। কিন্তু ওই যে, রিনির মিষ্টি গন্ধ! বিয়ের দুদিন পরেই আমি হার মেনে নিলাম। আর এখন সব কিছু ভুলে গিয়ে মাঝে মাঝে রিনির সঙ্গে যখন খুনসুটিতে মেতে উঠি, মনে হয় অদূরে সায়মা তার সেই বিখ্যাত বাঁকা হাসি দিয়ে আমাকে দেখছে। যেদিন সায়মাকে বললাম, আমার পক্ষে মায়ের অমতে বিয়ে করা সম্ভব হচ্ছেনা। আমি যেই ফ্ল্যাটে থাকি ওটা মায়ের দেওয়া। মা বলেছেন তার কথা না শুনলে বাড়ি থেকে বের করে দিবেন। আমি যে চাকরি করি সেটা দিয়ে আবার আলাদা বাসা নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। সায়মা অবাক হয়ে জলভরা চোখে তাকিয়ে ছিল। আস্তে আস্তে বললো, আমরা না ঠিক করেছিলাম একসাথে থাকবো, যত বাঁধা আসুক। আমি চুপ করেছিলাম। সায়মা বুদ্ধিমতী মেয়ে সেও তাই চুপ করে গেলো।

এরপরের কয়েকদিন আমার জন্যে বিভীষিকা। পুরো অফিস জানতো আমাদের কথা। এর আগে আমরা একসাথে অফিস থেকে বেরোতাম, লাঞ্চ করতাম। হঠাৎ সায়মার সাথে কথা বলা বন্ধ, সবার কৌতূহলের পারদ ধাইধাই করে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল। অনেকগুলো চোখ প্রতিদিন আমাকে বিদ্ধ করছে, অথচ চাকরি ছাড়ার উপায় নেই। হয়তো সায়মা চাইছিলো আমি চাকরি ছেড়ে দেই, আর আমি চাইছিলাম সায়মা ছাড়ুক। শত হোক ও একটা মেয়ে, আমারই চাকরির বেশি দরকার। আমি ভেবেছিলাম শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হলো, সায়মা চাকরি ছাড়লো। যেদিন ও চলে যাচ্ছিলো অফিস ছেড়ে, আমার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিলো। সেই হাসিতে কী ছিলো?  ঘৃণা, রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট অথবা আমাকে হারিয়ে দেয়ার গৌরব? ভালোবাসা ছিলনা এক ফোঁটাও।  

 তবুও সায়মার প্রস্থানে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যথাসময়ে বিয়ে করলাম। নিজের আত্মসম্মানবোধ, স্বপ্ন সব কিছুকে পেছনে ফেলে আমার নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য। আমি কাউকে দেওয়া ওয়াদাই রাখতে পারিনাই, এমন কি নিজেকে দেওয়া ওয়াদাও ভাঙছি অহরহ।

 নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের লোভে প্রতিদিন আমি একটু একটু করে মারা যাচ্ছি। কেউ দেখেছেনা, কেউ জানছেনা। কিন্তু শবদেহরা আমাকে ঠিকই চিনে ফেলেছে। তাই বারবার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, তুই আয়, আমাদের পাশে এসে শুয়ে পড়, তুই তো আসলে বেঁচে নেই, বেঁচে থাকার ভান করছিস কেন শুধু শুধু? 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ