behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

সীমানা পেরিয়ে

নাসরিন শাহানা১৪:২০, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬

 

 

সেরা দশ গল্প

 

ধোপাদীঘির পূর্ব পাড় ঘেঁসে নিহারদের বাড়ি, শৈশব, কৈশোর যৌবনের পুরোটা সময় কেটেছে এখানে। একসময় ধোপারা সারি বেধে রোদ চকচকে দুপুর বেলায় কাঠের পিড়িতে আছড়ে আছড়ে কাপর ধুতো, সেই শব্দে পুরো নীলফামারী শহর যেন কেঁপে কেঁপে উঠত। বাড়ির সবার কাছে ব্যাপারটা গা সওয়া হলেও নিহারের দাদি খুব বিরক্ত হতেন, সারা দুপুর জুড়ে বিছানায় শুয়ে দিবা নিদ্রার চেষ্টা করতেন আর তার মরহুম দাদাজানকে গালিগালাজ করতেন  

-আর জায়গা পাইলোনা বুড়া, শহরে এত জায়গা পইড়া থাকতে বাড়ি করল এই ধোপাগো গলিতে, নিজে ত মইরা বাঁচছে আর আমারে সারা জীবন ধইরা জ্বালাইতাছে।

শাশুড়ির কথা শুনে নিঃশব্দে হাসতেন আয়েশা বেগম, নিহারের মা। আয়েশা বেগমের অবশ্য শব্দটা খারাপ লাগত না, সেই শব্দে একধরনের তাল শুনতে পেতেন আয়েশা। এক সময় শব্দটা যখন ক্ষীণ হয়ে আসত ঘরের ভেতরে থেকেও সে বুঝতে পারত সূর্যের তেজ কতটা মরে এসেছে, আসরের নামাজ পরেই সে ঢুকে যেত রান্নাঘরে জলখাবার বানাতে। পাঁচটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই, যে কোন মুহূর্তে নিহারের বাবা আনিস সাহেব বাড়ি চলে আসবেন, উনি কোর্টের উকিল। রিক্সায় চেপে কোর্ট অপিস থেকে বাড়ি আসতে বড় জোর দশ মিনিট সময় লাগে। সত্যি বলতে তিরিশ মিনিটের মাথায় পুরো নীলফামারি শহরটারই শেষ প্রান্তে চলে যাওয়া যায়। চায়ের জলে পাতা দেয়ার পর এক বার ফুটে উঠতেই রিক্সার টু টাং শব্দ শুনতে পেত আয়েশা, তারপর বাইরের দরজা খোলার শব্দ তারও পর শাশুড়ি দরাজ গলা, - আনিস আইলি?

প্রতিদিন প্রায় একই রকম দৃশ্য দেখে বড় হয়েছে নিহার। দোতালার বারান্দায় দাড়িয়ে কাপে চুমুক দিতে দিতে আপন মনে হাসে নিহার বাবার অপিস থেকে ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে করতে। সে আমেরিকা চলে যাবার মাসখানেক পর দাদি মারা গেছেন। আজ সতের বছর পরও দাদির জন্য বুকের ভেতর একধরনের কষ্ট বোধ হয় নিহারের। নাহ এখন আর চকচকে সোনামুখী রোদ ভরা দুপুরে অথবা পরন্ত বিকেলে ধোপাদের কাপড় কাচার শব্দ  শোনা যায়না, নিলফামারী বদলে গেছে। আহারে দাদি বেঁচে থাকলে আরাম করে দুপুরে ঘুমুতে পারতেন,  নাকি পারতেন না, এখন আবার চারদিকে গাড়ি বাস বেবিটেক্সির পপ পপ জ্বালাময়ী শব্দ। এমন সময় বাবার রিকশাটা বাড়ির গেটে থামে দোতলা থেকে দেখতে পায় নিহার, বাবা রিক্সার ভাড়া মিটাচ্ছেন। তার পেছনেই হেটে আসা এক কিশোরী মেয়ের মুখে চোখ আটকে যায় নিহারের। সেই চোখ, সেই মুখের আদল, সেই গায়ের রঙ। রোগা পাতলা ছিপ ছিপে কিশোরী। বারান্দার শিক গলে বিস্ময়ে বাইরে তাকিয়ে নিহার। ছেলে উপর হয়ে কি দেখছে দেখবার জন্য আয়েশা ছেলের পাশ ঘেঁসে দাড়ায়। নীচের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে পাশের খালি চেয়ারটায় বসে আয়েশা। নিহার বারংবার নীচের দিকে এবং মায়ের মুখের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে অস্ফুট স্বরে বলে উঠে

-মা...কে এই মেয়ে??? এ কি...  আয়েশা বেগম খুব স্বাভাবিক গলায় বলেন,

-হাঁ। ও মুনিরার মেয়ে।

তখনও এই বাড়িটায় দোতলা হয়নি। চার চালা টিনের ছাদ আর চারদিকে ইটের দেয়াল। বাড়ির চারপাশ ঘিরে বাউন্ডারি ওয়াল করা আর মাঝখানে বিশাল লোহার সদর দরজা। এক পাশে কালো সাইন বোর্ডের উপর লিখা ‘রহমান ভিলা’। দাদাজানের নাম শমসের রহমান থেকে বাবা নামটা রেখেছিলেন। মাসে একবার অন্তত কে বা কারা ‘র’ এর ফোটা টা মুছে দিয়ে যেত তখন বাড়ির নাম হয়ে যেত ‘বহমান ভিলা’। দাদীজান এই নিয়ে বহুবার পাড়ায় নালিশ ডেকেছেন কোন লাভ হয়েছে বলে মনে পরেনা নিহারের। উপরন্তু মাস থেকে সেটা সপ্তাহান্তে উঠে এসেছে। প্রায় প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর বাবা দেয়ালে লেখার লোক ডাকাতেন, তারা যত্ন করে পুনরায়-পুনরায় লিখে যেতেন ‘রহমান ভিলা’। সপ্তাহান্তে পঞ্চাশ টাকা খরচ ছাড়া আর  বিশেষ কোন লোকসান হয়েছে বলেও নিহারের মনে পড়েনা। সে আমরিকা যাবার সময় এই বহমান ভিলার গেট এ দাড়িয়েই দাদিজান কে বিদায় জানিয়ে গেছে। নিহার তখন নীলফামারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র আর মুনিরা বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। সকালের শিফটে মেয়েদের ক্লাস, দুপুর বারোটায় শেষ হয়ে গেলে একই ভবনে দুপুর একটা থেকে ছেলেদের ক্লাস। দরজার এপাশটায় নিহার চুপিসারে দাড়িয়ে থাকে ঠিক বারোটা থেকে, মাঝে  মাঝে উকি দিয়ে দেখে মুনিরা আর সব বান্ধবীদের নিয়ে  স্কুল থেকে ফিরছে কিনা। সাদা জামা, সাদা পাজামা আর পাট ভাজ করা সবুজ রঙের ওড়না পরা সব মেয়েরা দল বেধে আসত। দূর থেকে মুনিরাকে দেখতে পেয়েই বহমান ভিলার গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যেত নিহার। ধুলো উঠা সদ্য লাল ইটের তৈরি আধা পাকা সড়ক। ধীরে ধীরে মুনিরা ওর বান্ধবীদের নিয়ে এগিয়ে আসছে, নিহারের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা যেন মুনিরা আরও কাছে এলে ও অজ্ঞান হয়ে পরে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সামনাসামনি একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত ওরা। শুধু আড় চোখে দুজন দুজনকে একবার দেখে নিত। নিহার এই এতটুকু আনন্দের প্রায় তিন বছর নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছিল সে কিন্তু এক দুপুরে গলির মোড়ে ছেলেদের প্রশ্নের মুখে পরে স্বীকার করে নেয় নিহার যে মুনিরাকে দেখলে তার পেটের ভেতর কেমন যেন গুরু গুরু শব্দ করে। তার কথায়  সবাই হো হো করে হেসে উঠে ছেলেপেলেরা বিশেষ করে সদ্য কলেজে পড়ুয়া ছেলেরা। নিহার কাচুমাচু গলায় বড় ভাইদের অনুরোধ করে, দয়া করে কেউ যেন মুনিরার দিকে না তাকায়। সে কথায় হাসির রোল আরও তীব্র হয়, নিহারের নিজেকে চরম স্টুপিড মনে হয়। তার কান লাল হয়ে উঠে। ঠিক এমন সময় কেউ একজন বলে উঠে

-আমরা স্কুলের গেট থেকে বেরুলেই বুঝতে পারি মুনিরা আসছে, ওর দিকে আর তাকাই না। তোর ভয় নাই রে নিহার।

নিজেকে আরও স্টুপিড প্রমান করার যেন প্রতিযোগিতায় নামে নিহার, সে পাল্টা প্রশ্ন রাখে

-এত মেয়েদের মধ্যে আপনারা কিভাবে বুঝেন, যে এটাই মুনিরা!

সেই বড় ভাই হঠাৎ হাসি থামিয়ে কিছুটা গম্ভীর মুখ করে নিহারের কাছে এগিয়ে আসে, ফিস ফিস করে বলে

-শুন নিহার, ধর আমরা ত তাকায় আছি মেয়েদের দিকে, সবাই হাইটা হাইটা আগায় আসতাছে, বুঝলি, যখন দেখি শুধু একটা ড্রেস আগায় আসতাছে, বুইঝা নেই তর মুনিরা আসতেছে...

কথা শেষ হতেই হাসির রোল তীব্রতর হয়। নিহারের মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বদ আর নিষ্ঠুর ছেলেরা নীলফামারী তে থাকে। একবার এখান থেকে সে আর মুনিরা বের হতে পারলে আর কোনোদিন ফিরবে না নীলফামারী তে। কস্টে আর অপমানে নিহারের চোখ ভিজে উঠে। আর এক বিন্দু দাড়িয়ে না থেকে এক দৌড়ে স্কুলের দিকে চলে যায় সে। মুনিরার গায়ের রঙ এত কাল তার কাছে কখনও মনে হয় নি অথচ পাড়ার ছেলেদের কথায় আজ চোখের জল কিছুতেই ধরে রাখতে পারে না নিহার। ক্লাস ইলেভেনের একটা ছেলে এই ভাবে কাঁদছে দেখলে বাকি জীবন আর স্কুলে আসতে হবে না, সেই ভয়ে স্কুলের ভেতর না গিয়ে স্কুলের কিনার ধরে হাটতে শুরু করে নিহার। কতক্ষণ এভাবে হেটেছে আজ আর মনে করতে পারেনা তবে একসময় যখন নীলসাগরের সামনে এসে দাড়ায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সূর্যের মড়া তেজ নীলসাগরের শেষ মাথায় গিয়ে জমা পরেছে। যতদুর দেখা যায় জল আর জল আর তার ওপারে শিলিগুড়ি। নিহারের ইচ্ছে করে এক্ষণই মুনিরাকে নিয়ে শিলিগুরি পালিয়ে যেতে।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ