behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

তমিজ আলীর আক্ষেপ

রোহিত হাসান কিছলু১৪:২৭, মার্চ ০১, ২০১৬

সেরা দশ গল্প

‘বাবা একটা আয়না হবে?’
আগন্তকের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যান দোকানি ইদ্রিস মিয়া। নিত্য অনাহারে থাকা হাড় লিকলিকে একটা শরীর। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছে। পরনে ধুলা ময়লা মাখা সস্তা একটা পোশাক। কাঁধে একটা ছোট্ট কাপড়ের ঝোলা। বৃদ্ধকে এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় দারিদ্রের সাথে কঠিন সংগ্রাম করছেন। দারিদ্রের প্রবল গ্রাসে তার জীবন জর্জরিত। তিনি কোন সম্মানিত ব্যক্তি নন। মোদ্দাকথা বৃদ্ধকে একনজর দেখেই বোঝা যায় ইনি একজন পেশাদার ভিক্ষুক।

ব্যস্ততার সময় এমন উটকো ঝামেলা। ইদ্রিস মিয়ার মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায়। বৃদ্ধকে কঠিন একটা ধমক দিতে গিয়েও নিজেকে কোনমতে সামলে নেন ইদ্রিস মিয়া। তার নজরে পড়ে বৃদ্ধ লোকটার একটা পা নেই। ডান পায়ের হাঁটুর উপর থেকে কাটা। বৃদ্ধের পরনের লুঙ্গির ছিড়া ফাঁটা দিয়ে কাটা পা’টা দেখা যাচ্ছে। মনটা মায়ায় ভরে উঠে ইদ্রিস মিয়ার। আহারে বেচারা ল্যাংড়া মানুষ। হয়তো কিছু সাহায্য দরকার। নয়তো সকাল থেকে এখন পর্যন্ত পেটে কিছু পড়েনি।

ইদ্রিস মিয়া দ্রুত ক্যাশ বাক্স থেকে একটা দুই টাকার নোট বের করে বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘চাচা মিয়া এই নেন দুই টাকা। একটু ভালো কইরা দোয়া দিয়েন। ব্যবসা পাতি খুব একটা সুবিধার যাইতাছে না!’

‘বাবা আমি তো আপনার কাছে ভিক্ষা চাইনি! আমি একটা আয়না চেয়েছি!’
ইদ্রিস মিয়ার মেজাজ আবারো খারাপ হয়ে গেল। কঠিন করে বৃদ্ধকে একটা ধমক দিতে গিয়েও পারলেন না। কোনমতে নিজেকে সামলে বললেন, ‘দেখেন চাচা মিয়া মেজাজ খারাপ কইরেন না। আয়না দিয়া করবেন কি? রূপচর্চা করবেন?’
‘বাবা একটা আয়না আমার খুব দরকার। তোমার কাছে থাকলে একটু দাও। আমি আয়নার দাম দিয়ে দিব। আমার কাছে বিশ টাকা আছে।’
‘বিশ টাকায় তো আয়না হয়না চাচা মিয়া। একশ টাকার নিচে কোন আয়না নেই।’
বৃদ্ধকে একটু হতাশ মনে হলো। এদিক ওদিক একবার চেয়ে ইদ্রিস মিয়ার দিকে ঝুকে পড়ে হাত জোড় করে বললো,‘বাবা আমার কাছে তো অত টাকা নেই।’
‘টাকা না থাকলে আয়নাও নাই। চাচা মিয়া আপনি যানতো। সকাল সকাল দোকানের মইধ্যে কাবযাব কইরেন না।’
‘তোমাকে বিশ টাকা দিলে আমাকে একবার আয়না দেখতে দিবা? মাত্র একবার আয়নাটা দেখবো। তারপর তোমাকে ফিরিয়ে দিব!’

বৃদ্ধের কথা শুনে দোকানি ইদ্রিস মিয়া ভালো করে একবার তাকায়। ধমকে উঠতে গিয়েও কোন কারণে থেমে যায় ইদ্রিস মিয়া। বৃদ্ধের কন্ঠস্বরে কেমন যেন একটা জোর আছে। বেশ বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। কন্ঠস্বর দিয়ে বিচার করলে বৃদ্ধকে কোনমতেই ভিক্ষুকের দলে ফেলা যায় না। ইদ্রিস মিয়া আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ একটা আয়না বের করে দেয়। 
‘টাকা লাগবে না চাচা মিয়া। আয়না দেখে তাড়াতাড়ি ফুটেন!’

বৃদ্ধ ইদ্রিস মিয়ার হাত থেকে আয়নাটা নেয়। আয়নাটা নিতে নিতে বৃদ্ধ ইদ্রিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আমার নাম তমিজ আলী। আমি একজন ভিক্ষুক। এই আয়নায় আমি আমার মুখটা একবার দেখেই তোমাকে ফিরিয়ে দিব। তুমি চিন্তা করো না। তোমার আয়না নষ্ট হবে না।’
ইদ্রিস মিয়া মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করলো। আপনি যে সম্রাট শাহজাহান না, একজন ভিক্ষুকু সেটা আপনার চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। এখন আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়ার আগে তাড়াতাড়ি নিজের চেহারা দেখে বিদায় হোন।
তমিজ আলী আয়নাটা সযতনে মুখের সামনে ধরে তার ভিতরে তাকান। 
‘আরে! এর ভিতরে তো একজন মানুষের ছবি দেখা যাচ্ছে! কি অবাক ব্যাপার। এমন তো হওয়ার কথা নয়।’
দুই চোখ ভরা বিষ্ময় নিয়ে তমিজ আলীর কান্ডকারখানা দেখছিলো ইদ্রিস মিয়া। কিন্তু তমিজ আলীর কথায় তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ইদ্রিস মিয়া আর নিজেকে থামাতে পারলেন না। 
‘চাচা মিয়া আপনার মাথায় গন্ডগোল আছে। আয়না নয়। আপনার আসলে একজন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।’
তমিজ আলী দোকানি ইদ্রিস মিয়ার দিকে একবার তাকায়। তারপর হাসতে হাসতে বললো,‘আরে না! তুমি জানো না। এই আয়নায় একটা কুকুরের মুখ দেখতে পাওয়ার কথা। কুকুর চেনো? ওই যে রাস্তায় থাকে। ঘেউ ঘেউ করে! লেজ নাড়ে!’
ইদ্রিস মিয়া আর কথা বাড়ায় না। পাগল ছাগলের সাথে সাত সকালে আজইর‌্যা কাবযাব করার সময় তার নেই। পাগল থাকুক পাগলের মত। সকালবেলায় পাগল ঘাটায়া কোন ফায়দা নাই। ইদ্রিস মিয়া দোকানের জিনিসপত্র গোছগাছ করতে থাকে। 
তমিজ আলী আবার আয়নার মধ্যে তাকান। তারপর আপন মনেই বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, ‘আরে আয়নায় দেখি মানুষ দেখা যায়। কুকুরটা গেল কই? নাকি আয়নাটা নষ্ট। তিনি কি আসলে ভুল দেখছেন?’
তমিজ আলী তড়িঘড়ি করে অগোচরে চোখের কোনায় চলে আসা জল হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে মুছে আয়নার দিকে ভালো করে তাকান। এবারেও তো আয়নায় একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে! নাকি কোথায় একটা ভুল হচ্ছে। তমিজ আলী আয়নাটা ঠিক আছে কিনা সেটা পরখ করার জন্য আঙ্গুল দিয়ে টোকা দেন। আয়নায় টক টক করে শব্দ হয়। তিনিু আবার আয়নার মধ্যে তাকান। নাহ! আয়নাটা তো দেখিছি ঠিকই আছে। তবে কি আমি আসলেই একজন মানুষ! হাঃ হাঃ তা কি করে হয়? আপন মনেই হাসে তমিজ আলী। ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি থেকে নেমে ওই সাহেব তো আজ বলেই দিলেন যে তিনি মানুষ নন! অমন সাহেবের কথা তো মিথ্যে হতে পারে না। কত বড় জ্ঞানী মানুষ তিনি। ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করেন তমিজ আলী।

সকালবেলা ট্রাফিক সিগনালে ভিক্ষা করছিলেন তমিজ আলী। সিগনালে লাল বাতি জ্বলতেই রাস্তায় আটকে পড়া গাড়িগুলোর দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ তার খোঁড়া পায়ের ভর দেওয়ার লাঠিটা ভেঙ্গে যায়। তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান একটি বিলাসবহুল গাড়ির বনেটের উপর। মুহূর্তেই গাড়ি থেকে নেমে আসেন স্যুট-বুট পরিহিত এক সাহেব। তমিজ আলী কিছু বুঝে উঠার আগেই সেই সাহেব তমিজ আলীর তলপেটে একটা লাথি মেরে চিৎকার করে বললেন,‘কুত্তার বাচ্চা! চোখে দেখস না!’

শারীরিক যন্ত্রনার চেয়ে মানসিক যন্ত্রনার পাল্লা ভারী হওয়ায় তমিজ আলী ফুটপাতে অনেকক্ষণ লুটিয়ে পড়ে থাকেন। যখন একজন মানুষও তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলো না। তখন তমিজ আলী সেই সাহেবের কথার মধ্যে সত্যতার একটা গন্ধ খুঁজে পান। তখন থেকেই নিজের মুখটা একবার দেখার জন্য আয়নার সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন তিনি।

এখন তমিজ আলী বেশ বুঝতে পারছেন, দেখতে মানুষের মত হলেও তিনি আসলে রাস্তার কুকুরের মতই বেঁচে আছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আয়না নিয়ে আসলেও সে আয়নায় তমিজ আলীর কাঙ্ক্ষিত ছবিটি ভেসে উঠবে না।

ইদ্রিস মিয়াকে ডেকে আয়নাটা ফিরিয়ে দেন তমিজ আলী। মাথা নিচু করে দোকান থেকে বেড়িয়ে আসেন তিনি। একসময়ের বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী চোখের কোটর থেকে পরাজয়ের গ্লানি টপটপ করে ঝরতে থাকে। এতদিনের গর্ব খোঁড়া পা’টার দিকে তাকিয়ে এই প্রথম তমিজ আলী একটা আক্ষেপ করেন। 
‘ইস! একাত্তরে মিঠাপুকুর অপারেশনে গুলিটা যদি পায়ে না লেগে এই বুকে এসে লাগতো!’

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ