সাদত হাসান মান্টোর আত্মজৈবনিক গদ্যমান্টো কে?

অনুবাদ : সুদীপ বসু১৪:৩৭, মার্চ ০২, ২০১৬

সাদত হাসান মান্টোমান্টো সম্পর্কে অনেক কিছু বলা ও লেখা হয়েছে— তার বিরুদ্ধেই বেশি, যত না তার পক্ষে। এইসব পরস্পরবিরোধী রিপোর্টের ভিত্তিতে যে কোনও বুদ্ধিমান লোকই কোনও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে না। যখন আমি এই লেখাটা লিখছি, তখন আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি মান্টো সম্পর্কে সত্যিকারের কোনও মতামত দেওয়া কতটা দুরূহ কাজ। যদিও আমার ক্ষেত্রে ততটা নয়, কেননা আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন যে মান্টোর খুব কাছের লোক। আসল কথাটাই তবে কবুল করে দিই এখানে— আমি ওর জমজ।
মান্টো সম্পর্কে এখনও অবধি যা লেখা বা বলা হয়েছে আমি তার বিরোধিতা করি না। কেবল একটা ব্যাপার এই যে সেসব প্রকৃত সত্যের থেকে অনেক অনেক দূরে। কেউ কেউ তাকে দুশমন বলে। কেউ বলে টাকমাথা দেবদূত। দাঁড়াও, দাঁড়াও একবার দেখে নেই মান্টো আবার এইসব কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনছে নাকি। না, না ঠিক আছে আমারই ভুল। তার তো এখন মদ গেলার সময়। প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধে ছ’টায় সে ওই তেতো শরবত নিয়ে বসে।
আমরা দু’জন জন্মেছিলাম এক সময়। আর যদ্দুর ধারণা মরবও একসঙ্গে। অবশ্য এমনটাও তো হতে পারে যে সাদত হাসান হয়তো মরে গেল, কিন্তু মান্টো মরল না। এই ভাবনা আমার মন মাঝে মাঝে তোলপাড় করে তোলে। সেই কারণেই আমি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখবার চেষ্টা করি। যদি সে বেঁচে থাকে আর আমি মারা যাই, তবে ঘটনাটা কেমন ঘটবে জানো, খুব মজার। যেন ডিমের খোলাটা পড়ে আছে আস্ত, শুধু ভেতর থেকে হলুদ আর শাদা অংশটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে।
খুব বশি পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চাই না আমি, শুধু এটুকু বলব যে মান্টো হল এক নম্বরের চালাক, শয়তান, ধুরন্ধর লোক যার তুলনা আমি আর জীবনে পাইনি। একের সঙ্গে দুই যোগ করলে তিন হয়। আর ত্রিকোণ সম্পর্কে মান্টোর জ্ঞান ছিল বিস্তর, তবে সে সবের ভেতর আর বেশি ঢুকে লাভ নেই, ইশারাই কাফি।
মান্টোকে আমি জন্ম থেকেই চিনি। ১৯১২ সালের ১১ মে আমার জন্ম। কিন্তু মান্টো সবসময়ই অন্যরকম কিছু একটা করতে চেয়েছে। সে যদি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায় তবে কারো সাধ্যি নেই তাকে খুঁজে বার করে। কিন্তু আমি পারি। আমি তো তার একটা অংশ, আমি তার সমস্ত গতিবিধি নজরে রাখি।

এবার বলি শোনো কেমন করে সে এত বড় গল্প লেখক হল। লেখকরা সাধারণত তাদের জীবনের কোনও আকস্মিক ঘটনা বা তাদের চারিত্রিক লক্ষণগুলিই আসলে লিখে রাখতে চায়। তারা কথায় কথায় শোপেনহাওয়ার, ফ্রয়েড, নীৎসে বা মার্কস আওড়ায় যা আসলে বাস্তবতা থেকে বহু যোজন দূরে। মান্টোর ক্ষমতা আদতে দুটো পরস্পরবিরোধী শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্বের নীট ফল। মান্টোর বাবা ছিলেন অন্যন্ত রুক্ষ মানুষ, অপরদিকে মা ছিলেন কোমলপ্রাণা। অতএব বুঝতেই পারছো, বেচারা মান্টো ওই দুই বিপরীত স্বভাবের অশান্ত তোলপাড়ের মধ্যে কেমন খানখান হয়ে বেঁচে ছিল।
এবার আমি মান্টোর স্কুল জীবনের কথা একটু সংক্ষেপে বলি। সে ছিল বুদ্ধিমান, কিন্তু ভয়ঙ্কর দুরন্ত। লম্বায় ছিল এই ধরো তিন ফুট ছ’ইঞ্চির মতো। সে ছিল বাবামায়ের কনিষ্ঠতম সন্তান। বাপমায়ের ভালোবাসা পেলেও তার তিন দাদার সঙ্গে খূব ইচ্ছে সত্ত্বেও ছোটবেলা দেখা হয়নি মান্টোর, কেননা তারা বিদেশে পড়াশুনা করত। অনেকদিন পরে যখন দেখা হয় তখন সে বেশ নামজাদা লেখক। এরা তিনজন অবশ্য ছিল মান্টোর সৎ ভাই।
এবার মান্টোর গল্পের কথা একটাু বলা যাক। শুনতে খারাপ লাগলেও প্রথমেই বলে রাখি যে মান্টো ছিল এক নম্বরের প্রতারক। তার প্রথম গল্প ‘তামাশা’ জালিয়ানওয়ালাবাগ তাণ্ডব নিয়ে লেখা। যা সে অন্য নাম ছাপিয়েছিল, ধর-পাকড় এড়াবার জন্য।
এরপর হঠাৎই তার মাথায় এই ভূত চাপল যে সে আরও পড়াশোনা করবে। এর আগে অবশ্য ইন্টার পরীক্ষায় দুবার ফেল করেছে, তিনবারের বার পাশ করেছে তাও থার্ড ডিভিশনে। আর সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হল সে ফেল করেছিল উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে। এখন আমি, সত্যি বলতে কি, হাসি চাপতে পারি না যখন চারদিকে বলাবলি হয় যে মান্টো নাকি উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক। কেননা আমি এ ব্যাপারে একদম স্থির নিশ্চিত যে এখনও উর্দু ভাষাটা তার ভালো করে রপ্ত হয়নি। শিকারি যেমন জাল হাতে প্রজাপতি ধরতে ছোটে, সে তেমন ভাষার পেছনে তাড়া করে বেড়ায়। আর ভাষা তাকে ফাঁকি দিয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়। তাই তার লেখায় কোনও সুললিত শব্দঝঙ্কার নেই। বরঞ্চ তার লেখার ছত্রে ছত্রে হাতুড়ির আঘাত রয়েছে, যত আক্রমণ জীবনের কাছ থেকে সে পেয়েছে সব সে গ্রহণ করে নিয়েছে মাথা পেতে।
তার হাতুড়ির ঘা হিংস্র হলেও এলোপাতাড়ি নয়। বরং তার নিশানা অব্যর্থ। সে একজন পাকা তিরন্দাজ। সে এমন একটা লোক যে কখনও সিধে পথে হাঁটে না। হাঁটে বিপজ্জনক দড়ির উপর দিয়ে। প্রতি মুহূর্তে সবাই ভাবে এই বুঝি পড়ে গেল, কিন্তু সে পড়ে না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে সে একদিন এমন মুখ থুবড়ে পড়ে যাক যেন আর কখনও উঠতে না পারে।
আমি আগেই বলেছি যে মান্টো একজন পুরোমাত্রায় প্রতারক ও ফেরেব্বাজ লোক। সে রটিয়ে বেড়ায় যে সে গল্প নিয়ে ভাবে না, গল্পেরা তাকে নিয়ে ভাবে। একদম ফালতু কথা।
সে যখন একটা গল্প লিখতে বসে তখন যে কারো দেখে মনে হবে যে একটা মুরগি যেন ডিম পাড়তে বসল। এবং গোপনে নয়, ফটফটে দিবালোকে। তার বন্ধুরা তার পাশে ঘোরাঘুরি করে, তার তিন মেয়ে হৈ হুল্লোড় করে দৌড়োদৌড়ি লাগিয়ে দেয়, যখন সে একটা বিশেষ চেয়ারে বসে ডিম প্রসব করে, যা নিমিষের মধ্যে ছোটোগল্প হয়ে কিচিরমিচির শুরু করে দেয়। মান্টোর বউ বেশিরভাগ সময়ই তিরিক্ষি মেজাজে থাকে। সে মাঝেমধ্যেই পরামর্শ দেয় এইসব গল্পটল্পের বাতিক ছেড়ে একটা দোকান খুলতে। কিন্তু মুশকিল হল মান্টোর মাথা চুড়ি আর গয়নার দোকানের চেয়েও অনেক বেশি মালপত্রে ঠাসা থাকে সবসময়। আর তাই সে সর্বদাই এই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে যে কোনওদিন না সে কল্পনার হিমঘর হয়ে যায়।
এই নিবন্ধ যখন লিখছি, ভয় হচ্ছে, মান্টো না ক্ষেপে যায় আমার ওপর। মান্টোর সবকিছু আমি নিতে পারি, কিন্তু ওর রাগের মুখোমুখি দাঁড়ানো খুব কঠিন। রেগে গেলে ও দানবীয় আচরণ করতে থাকে। যদিও কয়েক মিনিটের ব্যাপার সেটা, কিন্তু রক্ষা করো, ওই কয়েক মিনিটই যা ভয়ঙ্কর।
গল্প লেখা সম্বন্ধে প্রচুর গুজব ছড়ায় মান্টো, কিন্তু আমি ওর যমজ ভাই হয়ে জানি ও একটা ডাহা মিথ্যেবাদী। ও একবার কোথাও একটা লিখেছিল যে গল্প নাকি ও পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সত্যিটা একেবারে উল্টো।
স্ত্রীর সঙ্গে মান্টোযখন তার গল্প লেখার দরকার পড়ে তখন সে সারারাত তাই নিয়ে ভাবে। প্রথমে কিছুই তার মাথায় খেলে না। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে পড়ে খবর কাগজ, তন্ন তন্ন করে ঘেঁটে দেখে কোনও গল্পের রসদ পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কোনও ফল হয় না। তারপর বাথরুমে যায়। বসে বসে চিন্তা করে, কিন্তু ফল সেই শূন্য। তারপর হতাশার থেকে বউয়ের সঙ্গে বিনা কারণে ঝগড়া বাধায়। তাতও কাজ না হলে রাস্তায় বেরিয়ে একটা পান কেনে। পানটা টেবিলে রেখে দেয় যতক্ষণ না গল্পের কোনও প্লট তার মাথায় হঠাৎ খেলে যায়। তারপর আকস্মিকভাবে সে পেন বা পেনসিল হাতের কাছে যা পায় তুলে নিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করে। ‘বাবু গোপীনাথ’ ‘টোবা টেক সিং’ ‘হাটক’ ‘মাম্মি’ ‘মোজেল’— গল্পগুলো এইরকম ফেরেব্বাজির মধ্যে দিয়েই লেখা।
সবাই বলে যে মান্টো নাস্তিক, ধর্মকর্মের ধার ধারে না। এমনকি আমিও কিছুটা তা ভাবি। আর তাই সে সহজেই নোংরা সব শব্দ ব্যবহার করে অপরিচ্ছন্ন বিষয় নিয়ে লিখে ফেলতে পারে। কিন্তু আমি জানি যে যখনই সে লিখতে বসে প্রথমেই সে যা লেখে তা হল ৭৮৬ সংখ্যাগুলি, যার অর্থ বিসমিল্লা’। আর যে লোকটা এমনিতে প্রকাশ্যে নাস্তিক, কাগজে কলমে কিন্তু সে হঠাৎ নাস্তিক বনে যায়। আর কাগজের মান্টোকে তুমি যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারো, কিন্তু আসল মান্টোকে তুমি হাতুড়ি পিটিয়ে মারতে পারবে না।
এবার খুব অল্প কথায় মান্টোর ব্যক্তিত্ব সম্মন্ধে কিছু বলি। সে একজন মিথ্যুক, চোর, বিশ্বাসঘাতক আর অযথা চেঁচামেচি করে লোক জোগাড় করতে ওস্তাদ।
বহুবার সে তার বউয়ের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে বেশ কয়েকশো টাকা চুরি করেছে। ধরো সে গটগট করে এসে তার বউয়ের হাতে ৮০০ টাকা দিল। তারপর আড়চোখে নজর করতে লাগল বউ টাকাগুলো রাখল কোথায়। আর পরের দিনই একটা নোট হাপিস। আর অবধারিতভাবেই এর জন্য বকুনি খেতে হত চারকবাকরদের।
সবাই জানে যে মান্টো সোজাসাপটা কথা বলার মানুষ, কিন্তু আমি অন্তত তা একেবারেই মানতে নারাজ। মান্টো পয়লা নম্বরের মিথ্যেবাদী। প্রথম জীবনে সে সহজেই পার পেয়ে যেত কেননা তার মধ্যে একটা বিশেষ ‘মান্টো’ ছোঁয়া থাকত। কিন্তু কিছুদিন পরেই তার বউ ধরে ফেলে তার মিথ্যাচারিতা। মান্টো এত অকপটে মিথ্যে বলতে পারে যে, দুর্ভাগ্যক্রমে তার পরিবারের কেউই তার কথার এক বর্ণও আর বিশ্বাস করে না।
মান্টো অশিক্ষিত। কেননা সে মার্কস পড়েনি, ফ্রয়েডের লেখা চোখেও দেখেনি। হেগেলের নাম শুধু শুনেছে। হ্যাভলক এলিসও শুধু একটা নাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হল তার সমালোচকরা বলে যে সে নাকি এঁদের দ্বারা প্রভাবিত। আমি যদ্দুর জানি, মান্টো অন্য কারোর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হওয়াকে ঘেন্না করে। তার ধারণা যারা তাকে শিক্ষা দিতে যায় তারা ইডিয়ট ছাড়া কিছু নয়। কেউ অন্য কাউকে পৃথিবী সম্পর্কে শেখাতে যাবে কেন? সে নিজেই আগে ভালো করে দুনিয়াটাকে বুঝুক। মান্টো নিজেকে শেখাতে গিয়ে বা কোনও কিছু নিজের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন সব উদ্ভট কথাবার্তা বলে যে আমি না হেসে পারি না।
আমি তোমাদের খুব জোর গলায় বলতে পারি যে মান্টো, যার বিরুদ্ধে এত অশ্লীলতার অভিযোগ রয়েছে, আদতে আপাদমাথা ভদ্রলোক। কিন্তু একথাও বলে রাখি এর সঙ্গে যে সে আসলে নিরন্তর ঝাড়পোঁছ করে চলেছে নিজেকে।

 

কৃতজ্ঞতা : রবিশংকর বল

লাইভ

টপ