behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রফিক আজাদসময়ের উদরেই বসবাস

শামীম রেজা১৫:০৭, মার্চ ১৩, ২০১৬

রফিক আজাদ

চিরদিন ঘড়ির বাইরে
থাকতে তো চেয়েছি, বন্ধু,
হঠাৎ এমন কী হলো
ঘড়ির ভেতরই ঢুকে যেতে হবে
এই আমাকেই এখন!
বুঝি না জীবনাচার এমনটি হবে

এই ক্ষুদ্র জীবের জীবনে,
আর ধরো যদি এমনটি হয়

ঘড়ি স্তব্ধ হয়ে যাবে- যেতে পারে,
কারু পক্ষে সম্ভব হবে না এর ব্যতিক্রম করা!

 

জন্মাবধি ঘড়িকে অবজ্ঞা করে আজ এই
এতাটা দূরত্বে এসে ফের
ঘড়ির ভেতরে ঢুকে যেতে হবে?
চিরদিন ঘড়িহীন এই জীবনটি তবে
শেষাবধি ঘড়ির ভেতরে যাবে?
এতোদিন পরে, জীবন-সায়াহ্নে
ঘড়িকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না! 

 

তবে কি সময়েরই উদরে অনিবার্য বসবাস?
কিন্তু কথা ছিলো সময়ের বাইরে থাকার চিরকাল?

(ঘড়ির বাইরে, চিরদিন)

রফিক আজাদের ‘ঘড়ির বাইরে, চিরদিন’- তীরবিদ্ধ ভীষ্মের মনের যে চেতন-অবচেতন, অপলক তাকিয়ে থাকা, এই যে সময়ের বিবমিষা, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ, এই যে সময়ের মধ্য থেকে সময়ের বাইরে নিজেকে রাখতে চাওয়া; যা চিরদিন রফিক আজাদ তাঁর কবিতায় ও ব্যক্তিজীবনে সম্মিলন ঘটাতে চেয়েছেন। মৃত্যুর উর্বর চিন্তা করতে গিয়ে ভেবেছি- 'জন্মাবধি ঘড়িকে অবজ্ঞা করে আজ এই/এতটা দূরত্বে এসে ফের/ঘড়ির ভেতর ঢুকে যেতে হবে?' রফিক আজাদ অনিবার্যভাবে জানেন জন্মের পর ‘সময়’-কে বুড়ো আঙুল যতই দেখাই, সময় থেকে অসময়ে যতটাই নিজেকে আগলে রাখতে চাই, স্বেচ্ছাচারিতায় কিংবা ভুল বিহ্বলতায়; তবুও একদিন ‘সময়েরই উদরে অনিবার্য বসবাস?’ হবে ব্যক্তি মানুষের কিংবা কবির। কবিতা বুঝতে যাওয়া একজন পাঠকের কতটা উচিৎ- এই প্রশ্নের উত্তরে আবার প্রশ্ন করা চলে, যতুটুকু বুঝতে পারছি না, ততটুকুই কি আসল কবিতা? কবিতার সমগ্রতায়, বুঝতে না পারা অংশের তো একটা গভীর মূল্য আছেই, যা আমরা প্রথমে বাংলা কবিতায় জীবনানন্দে পাই। রফিক আজাদের নতুন কবিতা ‘ঘড়ির বাইরে, চিরদিন’ নিয়েই আজকে আমার প্রস্তাবনা।
সময়।ঘড়ি –এর কতটুকু জানি, এই শব্দের মর্মার্থ!
Symbol-এ এই ঘড়িকে কোথায় স্থাপন করি। তাইতো Time-এর শাব্দিক অর্থ খুঁজতে Oxford, Advanced Learner’s Dictionary খুলে বসলাম What is measured in minutes, hours, days etc. The changing season mark the passing of time. Time and space. As time went by we saw less and less of each other. Perceptions change over time. The time measured in a particular part of the world. এই সকল শাব্দিক অর্থ দিয়ে ‘সময়’-কে space-কে ধারণ করা সম্ভব নয়। কবির শব্দ ব্যবহারে ‘ব্রহ্ম’ অর্থ ধারণ করে, কোথাও দুই শব্দে যে Sublime তৈরি হয়, যার ব্যাখ্যা শাব্দিকভাবে দেয়া সম্ভব নয়। তাইতো কবিতার আলোচনা ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়– কবিতাও যেমন বিভিন্ন রকমের। পাঠকের রুচি তৈরির জন্য সমালোচক হয়তো সেতু-সংযোগ স্থাপন করে দিতে পারেন– এর বেশি কিছু নয়। পাঠক সমালোচকের সঙ্গে অনুভূতির বিনিময় করতে পারেন মাত্র।
আমি প্রচল ছন্দের কবিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা মানুষ। কিন্তু অপ্রচল ছন্দের, নিরীক্ষাধর্মী লেখা কবিতাও কি আসলে সকলি ভালো কবিতা– মোটেই নয়। আবার প্রচল ছন্দে অনুভূতি ও বোধের সমন্বয়ে লেখা প্রচুর কবিতা কালজয়ী হয়েছে। আসল কবিতার খোঁজে রসিক পাঠক সবসময়ই তৃষ্ণার্ত থাকেন, কোনটা নিরীক্ষাধর্মী, কোনটা ছন্দময় নতুন ফর্মে লেখা এরচেয়ে বড় কথা কবিতাটি কবিতা হলো কি না– এর বিচারই বা কে করবে– সাধারণভাবে বলা চলে কবির অনুভূতি ও বোধের অনুরণন যদি পাঠক হৃদয়ে একইভাবে গ্রথিত হয় তখনই কবিতা হয়ে ওঠে কবিতা। আমি অনুভূতি বিনিময় করতে গিয়ে যে কবিতাটিকে ব্যবচ্ছেদ করতে যাচ্ছি– সেই কবিতাটির তিনটি স্তবক। প্রথম স্তবকে দশটি পঙক্তি, দ্বিতীয় স্তবকে সাতটি পঙক্তি, তৃতীয় স্তবকে দুইটি পঙক্তি। মোট উনিশ পঙক্তির এই বর্ণনামূলক অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাটির মূলসুর নিয়তিতাড়িত মানুষের মৃত্যুচিন্তা। যতই ‘সময়;-কে অবজ্ঞা করে ব্যক্তি জীবনের নিরীক্ষা করি না কেন, একদিন ‘সময়’-এর কাছেই ‘সময়’-এর উদরেই বসবাস করতে হবে আমাদের।

মহাভারতে কৃষ্ণ যেমন বলেছেন, মহাকালের গর্ভে আমরা সবাই নিহত। যতই ভাবি চিরকাল ‘সময়’-এর বাইরে কাটালাম অর্থাৎ জীবন নিয়ে খেললাম, ভাঙচুর করলাম– জীবনকে আস্বাদ করতে গিয়ে আবার নিজের অজান্তে বিষবৃক্ষও রোপন করলাম। আর ভেবেছি সময়কে অর্থাৎ 'জন্মাবধি ঘড়িকে অবজ্ঞা করে আজ এই/এতটা দূরত্বে এসে ফের/ঘড়ির ভেতরে ঢুকে যেতে হবে?' –হ্যাঁ, অবজ্ঞা করে লাভ নেই। কারণ আমার যে সময় কেটেছে, যাকে আমি অগ্রাহ্য করতে চাই সেটাও যে সময়েরই উদরে ছিল, সে সম্পর্কে জ্ঞাত হলেন কবি রফিক আজাদ বয়সের পরিণত সময়ে এসে। তাই তো তিনি ‘জীবনঘড়ি’র যে ফাঁদের কথা বলেন সেই ফাঁদ প্রত্যেকটি মানুষ আপন আপন মনে এড়াতে চায় কিন্তু শেষাবধি ফাঁদে পড়তেই হয়– এবং এক সময় সবকিছুর অবসান ঘটে।

কবি যেহেতু ‘ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা, সত্য দেবতা’, সেখানে সমকালকে, সমকালীন সময়কে কবি ভবিষ্যতের পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন তাঁর নিজস্ব স্বপ্ন-কল্পনায়। বোধতাড়িত কবির সামনে ‘সময়’-কে বোঝবার তীব্র আকুতি এই কবিতায় স্পষ্ট। সৃষ্টির যে নৈবেদ্য, আবহমান অন্তর্বৃত্ত থেকে যে নিরন্তর সংযোগ সংস্থাপন; এ তো ‘সময়’ নামক মহাবিশ্বের মধ্যেই আবদ্ধ। মহাবিশ্বের সঙ্গে ব্যক্তির যে গভীর অবচেতন-সেতুবন্ধন রচনা করে ‘সময়’। চিরদিন, ঘড়িহীন এই কবি তাঁর জীবন সায়াহ্নে বোধিপ্রাপ্ত হলে দেখতে পাব ঘড়ি (সময়) অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়– তার ভিতরেই আমরা একটা জীবন সাঁতরাই ।


 

শামীম রেজা কবি ও কথাসাহিত্যিক

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ