behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আবুল মনসুর আহমদের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাপঞ্চাশ বছরের রাজনীতির খতিয়ান

হাবিব আর রহমান১২:১৪, মার্চ ১৮, ২০১৬

শাস্ত্রবাণী নিজেদের ভাষায় রূপান্তরিত করে নিয়ে পড়া বা শোনাও ছিল নিষিদ্ধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও পাপ। সে শাস্তি যেমন-তেমন ছিল না, অগ্নিতাপে গলিত সিসা কানে ঢেলে দেওয়া কিংবা রৌরব নরকে গমনের বিধান দেওয়ার মতো ভয়াবহ। এমনকি মধ্যযুগে রামায়ণ ও মহাভারত বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হলে লেখা হয়েছিল ‘কৃত্তিবেসে কাশীদেসে আর বামুনঘেষে/এই তিন সর্বনেশে’

আবুল মনসুর আহমদ‘‘যে মুসলিম বাংলার ভোটে পাকিস্তান আসিল, ভাগ-বাটোয়ারার সময়ে তাদেরই প্রতি এ বঞ্চনা কেন? কোনও যুক্তি নাই। কিন্তু অবিচার চলিল নির্বিবাদে। নেতাদের অর্থাৎ জনগণের ভাগ্য-নিয়ন্তাদের চোখের সামনে, তাঁদের সম্মতিক্রমে বাটোয়ারায় মুসলিম বাংলাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও ন্যায্য হক হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। অপরের স্বার্থের যূপকাষ্ঠে মুসলিম বাংলার মানে পূর্ব-বাংলার স্বার্থে বলি দেওয়া হইয়াছে।’’
আবুল মনসুর আহমদের ক্ল্যাসিক-প্রতিম বই ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ এত ঘটনাবহুল ও বিপুল তথ্যসমৃদ্ধ যে কেবল ঘটনাসমূহ যদি পরপর সাজিয়ে যাওয়া হয়, তাহলেও একটা মাঝারি আকারের বই হয়ে যেতে পারে। আর লেখক বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্য সম্পর্কে নিজস্ব যেসব অভিমত ও মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন, সে নিয়ে কথা বলতে গেলে রীতিমতো গবেষণা-সন্দর্ভ লিখতে হয়। একজন প্রাবন্ধিকের স্বাভাবিকভাবেই সে সুযোগ নেই, আয়তনটা যদি কিছু বাড়িয়ে নেওয়া হয়ও। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের পথ গ্রহণই বোধ করি সব দিক থেকে ভালো।
অর্ধসহস্র পৃষ্ঠার ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এর যে দিকটা এ আলোচনায় বেছে নিতে চাই, তার সারাৎসার ব্যক্ত হয়েছে এ বই থেকে নেওয়া প্রারম্ভিক উদ্ধৃতিটিতে। বঞ্চনার বহুমাত্রিক ব্যাপারটি ব্যক্ত হতে পেরেছে লেখক-ব্যবহৃত মাত্র দুটি শব্দবন্ধে- ‘প্রাপ্য মর্যাদা’ ও ‘ন্যায্য হক’-এ। কিন্তু বিষয়টি কেবল দেশ বিভাগের অব্যবহিত আগের ও পরের কালের ব্যাপার নয়, কিংবা ভৌগোলিক দিক থেকে শুধু পূর্ব বাংলার ব্যাপারও নয়, এর কালিক ও স্থানিক পরিসর যথেষ্ট বিস্তৃত। ইতিহাসের সত্যটা হচ্ছে এই যে, আগের বাংলা বা পরের পূর্ব বাংলা নয় শুধু, পুরো পূর্ব ভারতই পশ্চিম, উত্তর ও মধ্য ভারতে আর্য ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র এবং আরও পরে মুসলিম আশরাফতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একদিকে ঘৃণ্য বিবেচিত হয়েছে, আর অন্যদিকে হয়েছে শোষিত। এ আলোচনায় অবশ্য কেবল বাংলার কথাই বলা হবে, বিশেষত মুসলিম বাংলার কথা। আমাদের লক্ষ্য ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ সামনে রেখে স্বল্পজ্ঞাত ও প্রায় অজ্ঞাত কিছু বিষয় পাঠকের কাছে তুলে ধরা। লেখাটি থেকে হয়তো কিছু নতুন চিন্তার উপাদানও পাওয়া যেতে পারে।
খ্রিস্টের জন্মেরও অনেক কাল আগে থেকে ভারতে বিদেশি আর্যদের আগমন শুরু হয় এবং উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতে নানা দিক থেকে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত গড়ে ওঠে। একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করার পর তারা পূর্ব ভারতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি মনোযোগ দেয়। এ অঞ্চল যত দিন না তাদের বিজিত হতে পেরেছে, তত দিন তারা একে মনে করেছে ম্লেচ্ছদেশ; আর এর অধিবাসীরা ব্রাত্য, অসুর, পাপ। কালক্রমে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত ও নামে চিহ্নিত বাংলায়ও আর্যীকরণ ঘটেছে। কিন্তু সেন আমলে কর্ণাট থেকে আনীত ব্রাহ্মণদের বসতির আগে এখানে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র জেঁকে বসেনি।
বাংলায় ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র তথা বর্ণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই আর্যদের ভাষা বিধিবদ্ধ হয়ে ‘সংস্কৃত’ নাম ধারণ করে এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে। অতীব সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এই ভাষা স্থানীয় ভাষাসমূহের ওপর প্রভূত প্রভাব রাখলেও এর ব্যবহার ছিল সীমাবদ্ধ শাস্ত্রালোচনা, সাহিত্যচর্চা ও কিছু কিছু রাজকর্মে। নীচু বর্ণের লোকদের এ ভাষাচর্চায় কোনো অধিকার ছিল না। ফলে শাস্ত্রীয় গ্রন্থপাঠেও তারা ছিল বঞ্চিত। বঞ্চনার ক্ষেত্রটি কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, শাস্ত্রবাণী নিজেদের ভাষায় রূপান্তরিত করে নিয়ে পড়া বা শোনাও ছিল নিষিদ্ধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও পাপ। সে শাস্তি যেমন-তেমন ছিল না, অগ্নিতাপে গলিত সিসা কানে ঢেলে দেওয়া কিংবা রৌরব নরকে গমনের বিধান দেওয়ার মতো ভয়াবহ। এমনকি মধ্যযুগে রামায়ণ ও মহাভারত বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হলে লেখা হয়েছিল ‘কৃত্তিবেসে কাশীদেসে আর বামুনঘেষে/এই তিন সর্বনেশে’।
দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম অধিকার ও ইসলামে ধর্মান্তরকরণ শুরু হয় খ্রিস্ট্রীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে। আর বাংলায় শুরু হয় তিন শতাধিক বছর পর ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়া থেকে। আর্য ও মুসলমান উভয়ই বিদেশাগত, কেবল ধর্মে আলাদা। কিন্তু বাংলায় নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার পরও, অর্থাৎ বিদেশিদের ধর্ম-সংস্কৃতি গ্রহণ করলেও তারা কখনো ‘জাতে’ উঠতে পারেনি। ফলে অবজ্ঞাত হতে হতে বাংলার স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান উভয়ের মনে একধরনের হীনম্মন্যতা বোধের সৃষ্টি হয়েছিল। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে, এমনকি আজ পর্যন্তও। এখানে কেবল এই আলোচনার প্রয়োজনে ভাষার প্রসঙ্গটি একটুখানি তোলা হচ্ছে।
বাংলা মাতৃভাষা হলেও নিজেদের এই ভাষা সম্পর্কে গর্বের কোনো মনোভাব সাধারণভাবে ছিল না। সংস্কৃত ও আরবি-ফারসি-উর্দুর মতো কৌলিন্য এর নেই। এ তাই অপাঙ্ক্তেয়। কেননা, সংস্কৃত ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত ভাষা, আর বাংলা ‘মানবভাষা’। অন্যদিকে আরবি আল্লাহর ভাষা, বেহেশতের ভাষা; ফারসি ও উর্দু প্রায় তার যমজ ভাই। এসব অবিরাম প্রচারণার ফলে একধরনের বিশ্বাস বা ধারণার রূপ নিয়েছিল। ফলে বাংলায় শাস্ত্রগ্রন্থ ও কাব্যানুবাদ কিংবা মৌলিক সাহিত্য রচনা অপাঙ্ক্তেয় বিবেচিত হয় কি না এ নিয়ে দ্বিধা-সংকোচ ছিল। কবি শেখর লিখেছিলেন, ‘কহে কবি শেখর করিয়া পুটাঞ্জলি হাসিয়া না পেলাহ লৌকিক ভাষা বলি।’ তা সত্ত্বেও রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণবিজয় প্রভৃতির যে বাংলা অনুবাদ হয়েছিল, সে মুখ্যত মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। তা না হলে এসব কাব্যেও অনুবাদ কবে নাগাদ হতে পারত, কে জানে! হিন্দু বাঙালির মতো মুসলমান বাঙালিরও শাস্ত্রকথার অনুবাদ বা বাংলায় লেখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পাপের ভয় ছিল। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে সংকটের আরেকটা রূপ ছিল। সেটি হলো নিজেদের দেশগত পরিচয়ের সংকট। কেননা তাদের মুখ তখন থেকেই অনেকটা ঘোরানো ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে।
ব্রিটিশ শাসনকালেও এই মনোভাবের সম্পূর্ণ নিরসন হয়নি। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বাংলা গদ্যচর্চারও প্রসার ঘটতে থাকে হিন্দু লেখকদের হাতে। কিন্তু সে গদ্য ছিল সংস্কৃতানুসারী, শব্দব্যবহার ও বাক্যসংগঠনরীতি উভয় ক্ষেত্রেই। এই পরানুকরণ বাংলা ভাষার জন্য গৌরবজনক বিবেচিত হতো। ধীরে ধীরে অবশ্য এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং বাংলা ভাষা আত্মশক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা দেয় অন্য উপদ্রব। এবার থাবা বাড়ায় হিন্দি ভাষা। পশ্চিমবঙ্গে এখন তার শক্তি কম নয়। অন্যদিকে মুসলমান সমাজে বাংলা-আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু (হিন্দি) প্রভৃতি মিশ্র ভাষায় একধরনের কাব্যের চর্চা হতে থাকে। একে কেউ কেউ দোভাষী পুঁথি নামে আখ্যায়িত করেছেন। এসব কাব্যে এমন পঙ্ক্তি বা পঙ্ক্তিসমূহের সন্ধান মেলে যার বা যেগুলোর একটি শব্দও বাংলা নয়। এই প্রকৃতির ভাষা কোনোকালেও কোনো স্থানেই যে বাঙালি মুসলমানের মুখের ভাষা ছিল না, তা নিশ্চিতভাবে বলা গেলেও কবিরা অন্তত এক শ বছর ধরে (১৭৫৭-১৮৬৮) কেন এই ভাষায় কাব্যচর্চা করে গেলেন, সে প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। এ নিয়ে কোনো গবেষণার তথ্যও আমাদের হাতে নেই। পরে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই সমাজের লেখকদের হাতে গদ্যচর্চা শুরু হলে প্রায় সংস্কৃতানুসারীদের মতো একদল লেখক তাঁদের রচনায় দেদার আরবি-ফারসি ইত্যাদি তথাকথিত ‘মুসলমানি’ শব্দ ব্যবহার করতে থাকেন। শব্দ ব্যবহারের এই প্রবণতা নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পূর্বপর্যন্ত মুসলিম লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অবিশ্রান্ত তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং এর সমাজতাত্ত্বিক কারণাবলি নিয়ে অনেকে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে মুসলিম-মানসের বেশ কিছু প্রবণতার পরিচয় মেলে। সেগুলোর একটি হচ্ছে নিজেদের মুসলমানিত্বের আবেগ অনেক সময় সহজ যুক্তিকেও ভুলিয়ে দেয়। আবুল মনসুর আহমদের মতো উদার ও যুক্তিশীল মানুষও ওই আবেগ থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। সে জন্য ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এ মুদ্দত, নয়া পুস্ত, ইন্তেযাম, বরতরফ প্রভৃতির মতো অচলিত শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই প্রবণতা বর্তমানে কারও কারও মধ্যে আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।
সংক্ষিপ্ত এই পটভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আবুল মনসুর আহমদের দেখা ও বিবৃত বঞ্চনার রাজনীতির প্রতি এবার দৃষ্টিপাত করা যাক।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদ লিগ অধিবেশনে কবি ইকবাল তাঁর ইতিহাস-বিখ্যাত যে সভাপতির ভাষণ দেন, তাতে ভারতীয় মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র বাসভূমির ভৌগোলিক আকার-আকৃতি ও সীমারেখাও বর্ণনা করেছিলেন। তাতে বাংলার নামগন্ধও ছিল না।

২.
মহামতি গোখলে বলেছিলেন, ‘What Bengal thinks today, the rest of india will think tomorrow’ ইতিহাসের দিক থেকে কথাটি খুবই গুরুত্ববহ। ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির উত্তুঙ্গ-সূচনাও বটে বাংলাতেই। উপলক্ষ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। প্রশাসনিক ও মুসলমানদের স্বার্থগত সুবিধার অজুহাতে কিন্তু আসলে বাংলায় উদ্ভূত জাতীয়তাবাদী চেতনার বিনাশসাধনের লক্ষ্যে ভারত সরকার বঙ্গ ভঙ্গ করে পশ্চিমবঙ্গকে বিহার-উড়িষ্যার সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসাম যুক্ত হয়ে গঠিত হয় একটি নতুন প্রদেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার ফলে এত দিনের অবহেলিত এই অঞ্চলটিতে উন্নতির যে সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাতে মুসলমানরাই অধিকতর সুবিধা পেত বলে ধারণা করা যায়। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ সে কারণে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে। কিন্তু হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। মুসলমান সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশ বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে ছিল। প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করে। সারা বাংলা অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ, বাদ পড়ে বিহার-উড়িষ্যা।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় মুসলমানরা দুঃখ পায় ও হতাশ হয়, বিশেষ করে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ও পূর্ববঙ্গের অন্য নেতারা। অথচ মুসলিম লীগের বহির্বাংলার নেতাদের মুসলিম-প্রধান নবগঠিত প্রদেশটি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না, লীগের প্রতিষ্ঠা অধিবেশনেই সে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা সলিমুল্লাহর প্রস্তাব ও অনুরোধ সত্ত্বেও নেতারা নতুন প্রদেশের প্রতি সমর্থন জানাননি। এমনকি বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরের বছর ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা অধিবেশনে তিনি চেষ্টা করেও লীগকে দিয়ে মুসলিম-বাংলার প্রতি এই ‘বেইমানির’ প্রতিবাদ করাতে পারেননি। মনসুর আহমদ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি, কেননা বয়স কম হওয়ায় তখনো তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। কিন্তু বাংলার প্রতি ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও আশরাফতন্ত্রীয় অঞ্চলের নেতাদের উন্নাসিকতা ও বঞ্চনার ইতিহাস লিখতে গেলে ঘটনাটির উল্লেখ করতেই হয়। লেখকের বিবেচনায় এই ঘটনা থেকেই বাংলা সম্পর্কে নিখিল ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের ‘অমার্জনীয় ঔদাসীন্য’ প্রকট হয়েছিল। দেখা যাবে, এরপর দিন যত গেছে, ততই তা প্রকটতর হয়েছে।
পরের ঘটনা লক্ষ্ণৌ চুক্তি। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে সম্পাদিত এই চুক্তিতে লীগের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি কংগ্রেস মেনে নেয়। আসন বণ্টনের ব্যাপারেও একটা রফা হয়। মুসলমান নেতারা বোম্বাই বা যুক্ত প্রদেশের মতো রাজ্যে সেখানে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল শতকরা ৩০ ভাগ, সেখানে বেশি প্রতিনিধিত্বের বিনিময়ে মুসলমান-প্রধান অঞ্চলে কম প্রতিনিধিত্ব মেনে নেন। বাংলার ক্ষেত্রে আসনসংখ্যা হলো শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, ফজলুল হক ও তাঁর গোষ্ঠীও এটি সমর্থন করেন। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় কিছু অসন্তুষ্টি দেখা দেয়, কিন্তু তা ছিল নিষ্ফল।
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর বাংলার মুসলিম-স্বার্থবিরোধী ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকে। কিন্তু তার আগের আরও দু-একটি ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করা দরকার। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদ লিগ অধিবেশনে কবি ইকবাল তাঁর ইতিহাস-বিখ্যাত যে সভাপতির ভাষণ দেন, তাতে ভারতীয় মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র বাসভূমির ভৌগোলিক আকার-আকৃতি ও সীমারেখাও বর্ণনা করেছিলেন। তাতে বাংলার নামগন্ধও ছিল না। অথচ একে তিনি বলেছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের ‘জাতীয় দাবি ও চূড়ান্ত আদর্শ’। তিনি একবারও ভেবে দেখেননি যে, সভাপতির ভাষণ তিনি দিচ্ছেন নিখিল ভারত মুসলিম লিগ অধিবেশনে এবং যাদের জন্য দাবি উত্থাপন করছেন, তাদের অধিকাংশ বাস করে বাংলায়।
পরে চৌধুরী রহমত আলি যে পাকিস্তান শব্দটি নির্মাণ করেন, তাতেও বাংলার কোনো কথা নেই। ফলে লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম-প্রধান অঞ্চল নিয়ে যে একাধিক রাষ্ট্রগঠনের প্রস্তাব ছিল, তা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সব বিধিবিধান পদদলিত করে ‘states’-এর ‘s’ বাদ দেওয়া উপরিউক্ত ঘটনাবলিরই কার্যকারণযুক্ত অনিবার্য পরিণতি বলে ভাবতে ইচ্ছা হয়। এ ছিল বাংলার মুসলমানদের জন্য অশনিসংকেত। সেই সংকেত নেতাদের অনেকেই বোঝেননি। যাঁরা বুঝেছিলেন, তাঁদের কিছু করার শক্তি ছিল না। সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম নেতা ফজলুল হক, যাঁর বাঙালিসত্তা ছিল নিখাদ, তখন প্রায় খাঁচাবন্দী অথবা আহত এক ‘শের’। কুশাগ্রবুদ্ধি জিন্নাহ তাঁকে দিয়েই লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করিয়েছিলেন। তিনি তখন মুসলিম লীগার। ১৯৩৭ সালে লীগের সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে বাধ্য হওয়ায় তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি অনিবার্য মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলে। তিনি যখন বুঝতে পারেন জিন্নাহ-নেতৃত্ব মুসলিম বাংলার স্বার্থবিরোধী, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দৃষ্টিটা একটু সংকুচিত করে বাংলার নিজস্ব রাজনীতির দিকে একবার তাকানো যাক। আবুল মনসুর আহমদের বিবেচনায় পলাশী যুদ্ধের মতো এ যুগের ভুলটাও শুরু হয়েছিল বাংলার মাটি থেকেই। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ নির্বাচনের পর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস যুক্ত প্রদেশ, বোম্বাই ইত্যাদি প্রদেশে লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠনে রাজি হয়নি। এই অসম্মতির গুরুতর কোনো কারণ থাকলেও থাকতে পারে। কিছু বাংলায় তা ছিল না। এখানে বেশি আসন পেয়েছিল ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং কংগ্রেসকে কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত রফায় পৌঁছালে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের ভুলে তা ভেঙে যায়। ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এ এর বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়েছে (আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, পৃ. ৮১-৮৪)। এখানে তার পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নেই। এই ঘটনার অনিবার্য পরিণাম লীগের সঙ্গে পার্টির কোয়ালিশন। এভাবে আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক ও প্রজাদরদি একজন বাঙালি নেতাকে সাম্প্রদায়িক লীগের দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় বাংলা কংগ্রেস কোনো যুক্তিতেই অস্বীকার করতে পারে না।
ঘটনাটির পরিণতি কেবল ওটুকু নয়, অনেক দূর প্রসারী। বলা যেতে পারে, বাংলার নিজস্ব রাজনীতির অবসান ঘটে এ সময় থেকেই কংগ্রেস ও সম্ভাবনাময় কৃষক প্রজা পার্টি উভয় দলের। উভয়েই হয়ে পড়ে ‘পশ্চিমমুখী’- কেউ আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র-কবলিত, কেউ আশরাফতন্ত্র-কবলিত বা হিন্দু নেতারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভুলে ভারতীয় জাতীয়তার প্রবক্তা হয়ে ওঠেন, আর বাংলাভিত্তিক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগ দেন। এটা ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। লীগে যোগ দিয়ে তিনি প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি হন, কিন্তু বিস্ময়করভাবে কৃষক প্রজা দলের সভাপতির পদ ছাড়েননি। এভাবে নিজের গড়া দলের কবর তিনি নিজেই খোঁড়েন, এমনকি নিজের রাজনৈতিক জীবনেরও। জিন্নাহর সঙ্গে মুসলিম বাংলার স্বার্থের প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল অনিবার্য। সেটা ঘটতে খুব একটা বিলম্ব হয়নি। ১৯৪১ সালের অক্টোবরে যখন জিন্নাহর কবল থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন তিনি একা, মুসলিম বাংলা তখন তাঁর পেছনে আর নেই। এই পুরো পরিস্থিতি বাংলার দুর্ভাগ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মনসুর আহমদ লিখেছেন, এসব ঘটনায় “বাংলা ‘অখণ্ড ভারতের’ রাজনৈতিক দাবাখেলার ‘বড়িয়া’য় পরিণত হয়।” (পৃ. ১৭৩-৭৩)
গান্ধী ও জিন্নাহ দুজনেই ছিলেন খুবই কর্তৃত্বপরায়ণ। এর বড় দৃষ্টান্ত সুভাষ বসু, ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী- বাংলার এই তিন ব্যক্তিত্বশালী নেতার প্রতি তাঁদের আচরণ। হরিপুরা (১৯৩৮) ও ত্রিপুরা (১৯৩৯) অধিবেশনে দুই দফায় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সুভাষ বসুকে চরম অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল গান্ধীর ‘পছন্দের লোক’ হতে পারেননি বলে। দ্বিতীয়বারে সুভাষের বিজিত প্রার্থী সীতারামাইয়ার পরাজয় গান্ধীর কাছে ‘আত্মপরাজয়’ বলে বিবেচিত হয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায় তাঁরই অদৃশ্য ইঙ্গিতে কার্যনির্বাহী কমিটির সকল সদস্য একযোগে সভাপতি সুভাষের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। কার্যত এ ঘটনার পর সুভাষের পক্ষে দল চালানো ছিল অসম্ভব। রাজনীতির ঘোরালো ‘প্যাঁচ-পয়জারের’ কাছে তিনি পরাস্ত হন।
অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী অতুল্য ঘোষের ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু ঘটেনি। কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও কোষাধ্যক্ষরূপে তাঁর কর্মপরিধি ছিল বিস্ময়কর। তোষামোদের রাজনীতিতে তাঁর ছিল তীব্র অনীহা। কাউকে খুশি করা বা পাইয়ে দেওয়ার ধার তিনি ধারতেন না। কিন্তু রাজনীতির চরিত্র সেখানে ছিল এই, সেখানে তাঁর অনমনীয় ব্যক্তিত্বের জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত ছিল অনিবার্য। নেহরু এবং পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা দুজনের কেউই তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন না। পরিণামে কংগ্রেস ত্যাগ করে নিষ্পাপ শিশুদের জগতে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
সময়ের পরিবর্তনে ভারতীয় রাজনীতিতেও পরিবর্তন ঘটেছে। আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। এ অবস্থায় বাঙালি জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যদিও তা হতে পারেননি নিজের দলের দক্ষিণ লবি গররাজি হওয়ায়। সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় এখন রাষ্ট্রপতির আসনে সমাসীন বটে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পদ সামলানোর মতো রাজনৈতিক বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘মনমোহন’ হয়ে ওঠেননি বা হতে পারেননি।(সূত্র: সুমন সেনগুপ্ত, ‘দিল্লি চলো’, দেশ, ২ ডিসেম্বর ২০১৩)
লীগ নেতা জিন্নাহ ও তাঁর মৃত্যুপরবর্তী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মনোভাব ও আচরণও তো প্রায় কংগ্রেসের অনুরূপ। জিন্নাহর ‘পছন্দের লোক’ না হলে কী ঘটতে পারে, তা ফজলুল হকের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে দেখা গেছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও জিন্নাহ পছন্দ করতেন না। আর লিয়াকত আলি খান তো একদম করতেন না। অথচ তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহের কারণ ছিল না। একের পর এক ঘটনায় তিনি জিন্নাহর মনোভাব বুঝতে পারেন। ১৯৪৭-এর ৫ আগস্ট নাজিমউদ্দিনের কাছে লীগের নেতৃত্ব হারানো, পার্টিশন কাউন্সিলের সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া, বিভক্ত পশ্চিম ও পূর্ব বাংলায় একই বিষয়ে আলাদা বিধান ইত্যাদি ঘটনা তাঁর চোখ খুলে দেয়। মনসুর আহমদ লিখেছেন:
‘‘...দেখা গেলো, কায়েদে-আযম সোহরাওয়ার্দীর হক প্রাপ্য সম্মানটুকুও তাঁকে দেন না। পাঞ্জাব ও বাংলা দুইটা প্রদেশই ভাগ হইয়াছিল। কিন্তু ভাগ হওয়ার ফলাফল দুই প্রদেশে এক হয় নাই। প্রদেশ ভাগের যুক্তিতে বাংলার মুসলিম লীগ ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইল এবং বিভক্ত মুসলিম লীগ পার্টির দ্বারা নয়া লীডার তথা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ব্যবস্থা হইল। পাঞ্জাবের মুসলিম লীগ অখণ্ড রহিল। পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রীও বজায় থাকিলেন। এই একযাত্রায় ভিন্ন ফলের কারণ সোজাসুজি এই যে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ লিয়াকত খাঁর ‘বাধ্য-অনুগত’ ছিলেন না।...পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগকেও তাঁর ‘জি হুযুর তাঁবেদার’ করিতে চাহিলেন। করিলেনও তিনি। (পৃ. ১৬৩)’’
ফলে সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না। ‘জাতির পিতা’র নীরবতা এসব অন্যায়কাজে সমর্থন জোগাল। ইতিহাস কীভাবে এর শোধ নিয়েছে, সে তো সবার জানা। তবে পূর্ব বাংলা প্রসঙ্গে বঞ্চনার আলোচনায় এসব প্রসঙ্গে আবার যেতে হবে।
দেশ বিভাগের ও বাংলা বিভাগের অনিবার্যতা যখন আর ঠেকানো গেল না, তখন আরেকটা সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াল। সেটা কলকাতা শহর নিয়ে। মনসুর আহমদের বিবেচনায় রেডক্লিফ পাকিস্তানের প্রতি যত অন্যায়ই করে থাকুন না কেন, কলকাতার ওপর পাকিস্তানের দাবি অগ্রাহ্য করা সহজ ছিল না। প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগ ‘কিপ ক্যালকাটা’ আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে দলমত-নির্বিশেষে সব বাঙালি মুসলমানেরই সমর্থন ছিল। ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী প্রকাশ্যভাবে এই আন্দোলন সমর্থন করছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর মতো দুঁদে উকিলকে সওয়াল-জবাব করার সুযোগ না দিয়ে যুক্ত প্রদেশের ওয়াসিম নামে একজন অখ্যাত ব্যক্তিকে উকিল নিযুক্ত করা হলো, বাংলা সম্পর্কে যাঁর কোনো বাস্তব জ্ঞান ছিল না। লীগের অনেকেই ও ছাত্রলীগের প্রায় সবাই এর প্রতিবাদ করেন। ফজলুল হক কাগজে বিবৃতি দিলেন। কিন্তু কোনো ফল হলো না। এই সময় নাজিমউদ্দিন গ্রুপের কণ্ঠে অন্য সুর শোনা যেতে লাগল। কলকাতা না-রাখার পক্ষে তাদের অনেক যুক্তি। সেগুলোর মধ্যে বড় যুক্তি কলকাতা ছেড়ে দিলে পূর্ব বাংলা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত সরকারের কাছ থেকে সব দায় শোধ করে দিয়েও তেত্রিশ কোটি টাকা পাবে। সরকারি সম্পদ-সম্পত্তির দাম তাঁরা হিসাব কষে বুঝিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত ফলাফল যা ঘটল তাতে কলকাতাও রাখা গেল না, টাকাও পাওয়া গেল না।
সরকারি সম্পদ-সম্পত্তি বিনিময়ের হিসাবপদ্ধতি দুই ধরনের। একটি মার্কেট ভ্যালু, অন্যটি বুক ভ্যালু। মার্কেট ভ্যালু সবাই জানেন, কিন্তু বুক ভ্যালু জানেন কম লোকই। বুক ভ্যালুতে প্রথম শ্রেণির ইমারতের নির্মাণব্যয় প্রতিবছর শতকরা এক টাকা কমে যায়, আর দ্বিতীয় শ্রেণির ইমারতে কমে যায় দুই টাকা। কলকাতার বাড়িঘর অনেক পুরোনো। সে হিসেবে বহু ইমারতে শূন্য মূল্য দাঁড়ায়। ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান চাচ্ছিল এই বুক ভ্যালু-পদ্ধতি গ্রহণ করতে। আর পূর্ব বাংলা মার্কেট ভ্যালু। চুক্তি হয়েছিল এই বিনিময় মূল্য পাবে কেবল বিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকারসমূহ। পশ্চিম পাকিস্তান হিসাব কষে দেখেছিল মার্কেট ভ্যালু ধরলে পূর্ব পাঞ্জাব সরকারকে তাদের অনেক টাকা দিতে হবে। অন্যদিকে পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে কী ঘটবে সে তারাই বুঝবে! ফলে এবারও আশ্রয় নেওয়া হলো চাণক্যবুদ্ধি ও জোর যার মুল্লুক তার নীতির। বুক ভ্যালুই স্থিরীকৃত হলো। পূর্ব বাংলার ভাগে যা পড়ল তা কেবল শূন্য, তার নাম দেশ। মনসুর আহমদ এ বিষয়ে যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন (পৃ. ১৫৬-৬০), তা পড়লে হতবাক হয়ে যেতে হয়। যে মন্তব্য করে এ প্রসঙ্গ তিনি শেষ করেছেন সেটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ:
‘‘...শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার, পাওয়া নয় দেনা, থাকিল ছয় কোটি। হায় কপাল! তেত্রিশ কোটি যোগের বদলে ছয় কোটি বিয়োগ। নলিনী বাবুর (নলিনীরঞ্জন সরকার) এই ঘোষণায় মি. হামিদুল হক চৌধুরী কেন মূর্ছা গেলেন না, আমরাই বা বাঁচিয়া থাকিলাম কিরূপে, আমি আজিও তা বুঝি নাই। বোধ হয় এই সান্ত্বনায় যে শুধু রেডক্লিফ একা আমাদের ঠকাইতে পারেন নাই, আমরা সকলে মিলিয়াই আমাদেরে ঠকাইয়াছি।’’
রক্ত হিম করা বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে এবং এই জ্বলন্ত সমস্যাকে সঙ্গে নিয়ে দেশ বিভাগের সঙ্গে বাংলা ও পাঞ্জাবকেও যে ভাগ করা হলো, তারও ফলাফল পূর্ব-পশ্চিমে এক রকম হয়নি। এই না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সেই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও আশরাফতন্ত্র। এই ধারণাকে যুক্তি দিয়ে অস্বীকার করা যাবে বলে মনে হয় না। অবচেতনার এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা। মনসুর আহমদ পূর্ব বাংলাপ্রাপ্তিকে বলেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ফাউ’ পাওয়া। ইকবাল-রহমত আলি-জিন্নাহর তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বে বাংলার মুসলমানরা অবচেতনাতেও ছিল না। তথ্য সে কথাই বলে। সুতরাং পূর্ব বাংলা তো তাদের নিজেদের দেশ নয়, ফাউ পাওয়া। ফাউয়ের প্রতি দরদ থাকে না, থাকে খবরদারি ও শোষণের মনোভাব। ফলে পাঞ্জাবের মুসলিম-অমুসলিম লোকবিনিময় সরকারিভাবেই হলো, কিন্তু বাংলায় তেমনটা হলো না। প্রশ্ন উঠতে পারে, পশ্চিম পাকিস্তান না হয় বাংলার মুসলমানদের কথা ভাবল না, কিন্তু ভারত কেন পূর্ব বাংলার হিন্দুদের কথা ভাবল না? কারণ খুঁজলে ওই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রেই পৌঁছাতে হবে বলে মনে হয়।

পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীর আনুগত্য যাচাই করা হলো একজন বিদেশি রিপোর্টারের দ্বারা। বৃদ্ধ ফজলুল হক ও তাঁর মন্ত্রীদের এই অপমান মাথা নত করে মেনে নিতে হলো। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা অনুগত পাকিস্তানি, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা চান না, এই মর্মে সবাই এক যুক্ত বিবৃতি দিলেন।

৩.
পূর্ব বাংলা যদি ফাউই না হবে, তাহলে অতখানি ‘মুসলিম-দরদি’ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্র হাতে পাওয়ার আট মাস পর সময় পেলেন পূর্ব বাংলায় ‘তশরিফ’ আনার? আর এসেই ঘোষণা করে দিলেন যে পাকিস্তানে একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণা আলটপকা ছিল না। এরও পূর্ব ইতিহাস আছে। এ আলোচনায় তার উল্লেখের অবকাশ নেই। মনসুর আহমদও সে ইতিহাস বলেননি। জিন্নাহর ঘোষণায় ঢাকায় যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা তখনকার মতো সামলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন। কিন্তু জিন্নাহর মৃত্যুর পর গভর্নর জেনারেল হয়ে তিনিই আবার ‘উল্টা মারেন’। ফলে, ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির বিস্ফোরণ। পূর্ববঙ্গবাসীকে মাতৃভাষা তথা জাতিসত্তা রক্ষার জন্য রক্ত দিতে হলো। এর শুভ ফল এই হলো যে এখানকার মানুষের পাকিস্তানি রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে চোখ খুলে গেল। এত দিন তাদের, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছিল ধর্মীয় ভাবাবেগের কুয়াশায়। কুয়াশা কেটে গিয়ে সেখানে এল যুক্তি। সেই যুক্তিই তাদের পথ দেখাল।
দ্বিতীয় মারাত্মক ঘটনা হচ্ছে ৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও সরকার গঠনকে ‘বরদাশত’ না করা। অভিযোগ: পাকিস্তানের স্বাধীনতাবিরোধী কাজ করা। অভিযোগ দাঁড় করানোর জন্য আমেরিকান সাংবাদিক কালাহানকে গোপনে নিয়োগ করা হলো। কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হককে করাচিতে তলব করল। সেখানে তাঁকে তাঁর মন্ত্রিপরিষদের সামনে পাকিস্তান বিরোধিতার অভিযোগে দোষী করা হলো। সাক্ষ্য নেওয়া হলো কালাহানের। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীর আনুগত্য যাচাই করা হলো একজন বিদেশি রিপোর্টারের দ্বারা। বৃদ্ধ ফজলুল হক ও তাঁর মন্ত্রীদের এই অপমান মাথা নত করে মেনে নিতে হলো। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা অনুগত পাকিস্তানি, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা চান না, এই মর্মে সবাই এক যুক্ত বিবৃতি দিলেন। কিন্তু এতেও কিছু হলো না। ফজলুল হক তাঁর মন্ত্রীদের নিয়ে ঢাকায় ফেরার আগেই ৯২-ক ধারাবলে গভর্নরের শাসন জারি করা হলো। মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে পূর্ব বাঙ্গালীর রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সৌভাগ্যসূর্য উদিত হইয়াছিল, প্রভাতেই এমনি করিয়া তাতে গ্রহণ লাগিল। পরবর্তী কালের ইতিহাস প্রমাণ করিয়াছে, সে গ্রহণ আজও ছাড়ে নাই।’ (পৃ. ২০৬)
শেষ বাক্যের ‘আজও’ শব্দটির কালসীমা ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ। কেননা, ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে। পরে ১৯৭৫-এ তৃতীয় সংস্করণে প্রথম প্রকাশের ত্রিশটি অধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত দশটি অধ্যায় যুক্ত হয়। তাহলেও ওই ‘আজও’ শব্দের কালসীমা আগের মতোই রয়ে যায়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক চরিত্রের কথা বিবেচনা করে আমরা ওই কালসীমা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মধ্য-ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রলম্বিত করতে পারি। যে পর্যন্ত না পাকিস্তান নামক কেউটের দাঁতের বিষ লেজে নেমে এসেছে। ‘দুর্বল-ভীরু-ম্লেচ্ছ’ বাঙালি যে পদপিষ্ট হওয়ার জাতি নয়, সে-ও যে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে, তা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছে।



ড. হাবিব আর রহমান গবেষক ও লেখক। অধ্যাপক, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ