behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

রফিক আজাদের সঙ্গে, এই শহরে || চঞ্চল আশরাফ || পর্ব-এক

.১৬:২৯, মার্চ ১৬, ২০১৬




রফিক আজাদরফিক আজাদের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে ১৯৯৫ সালের জুলাই থেকে। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প সবে শুরু হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রশিক্ষক। বেতন ৮ হাজার টাকা। আর মুহম্মদ নূরুল হুদা ছিলেন পরিচালক, বেতন ১০ হাজার টাকা। সকাল থেকে বিকাল অব্দি রফিক ভাই বলতে গেলে আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। তাঁর সঙ্গে আড্ডা হতো। পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বিল্ডিংয়ের দোতলায় প্রকল্পের জন্য সাজানো রঙিন প্লাস্টিকের চেয়ারে, বর্ধমান হাউজের বারান্দায় আর টেরাসে, ছায়াচ্ছন্ন বটতলায়, চা-দোকানের বেঞ্চিতে, আমীরুল মোমেনীনের রুমে, সাকুরায় ব’সে। এখানে একটু ব’লে রাখি, সশরীরে তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার অন্তত ১১ বছর আগে আমি তাঁর কবিতা পড়েছিলাম। মনে পড়ে, ‘সশস্ত্র সুন্দর’ পড়েছিলাম ১৯৮৫ সালে। বইটি কিনেছিলাম নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার খাজা সুপার মার্কেটের ‘বুক ফেয়ার’ নামের একটি দোকান থেকে। তখন আমি তোলারাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র।

সে-সময় আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ১০ বছর পর তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হবে। এ প্রসঙ্গে আরেকটা মজার ঘটনা বলি। ১৯৮৪ সালে বিটিভির একটি নাটকে তাঁর একটি কবিতা সম্ভবত অভিনেতা আল মনসুরের মুখ থেকে শুনি। কবিতাটি এই :

পাখি উড়ে চ’লে গেলে পাখির পালক প’ড়ে থাকে!

পাখি উড়ে গেলে তার নরম পালক
কঠিন মাটিতে প’ড়ে থাকা ঠিক নয়–
এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে;

তুমি চ’লে গেলে দূরে
নিঃস্ব, রিক্ত পাখির পালকসম একা প’ড়ে থাকি।

পরিত্যক্ত পালকের প্রতি মমতাবশত
একদিন, কোনো এক কালে, তুমি কষ্ট পেয়েছিলে;

এটা যে রফিক আজাদের কবিতা, তখন আমি জানতাম না। এই জ্ঞান তখন জরুরি হয়ে ওঠেনি; কেবল এই ক’টা লাইন মনে রাখার চেষ্টায় রাতের খাওয়া শেষ ক’রে শুয়ে থেকে নিজের স্মৃতিসামর্থ্য উজাড় ক’রে দিয়েছি, মনে পড়ে। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর আমার কয়েকজন সহপাঠীকে এই ক’টি লাইন শুনিয়ে কবিতাটি কার লেখা, জানতে চাইতাম। বলতে পারতো না। তারা আসলে সাহিত্যের নিরুপায় ছাত্র ছিল। মানে, কোথাও সুযোগ না-পেয়ে এই বিভাগে এসে পড়েছে। কবিতা দিয়ে তাদের কী হবে! যা হোক, নরেণ বিশ্বাসের কাছে জানতে পারলাম কবিতাটি রফিক আজাদ লিখেছেন। জানলাম, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’য় কবিতাটি আছে। আরও জানলাম তিনি এই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বুক আমার গর্বে ভ’রে উঠলো। ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার পাশে বইয়ের একটা দোকান ছিল। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কিনতে গিয়ে পেলাম না, পেলাম ‘অসম্ভবের পায়ে’। বইটি এখনো আছে আমার শোকেসে।
রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত একটা ঘটনা থেকে। একদিন সকালের সেশনে রিসোর্স পারসন হিসেবে ফরহাদ মজহার এলেন। তিনি বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক ইতিহাস বর্ণনার এক পর্যায়ে বললেন, ‘তিরিশের দশক বাংলা কবিতার অন্ধকার যুগ।’ তখন প্রথমে আমি, পরে অন্য কয়েকজন প্রতিবাদ জানায়। আমি ফরহাদ মজহারকে প্রশ্ন করলাম, ‘আলোকিত যুগ কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘মধ্যযুগই বাংলা কবিতার আলোকিত যুগ।’ বললাম, ‘মধ্যযুগের আলো আর তিরিশের দশকের অন্ধকারটা দেখান।’ তিনি বললেন, ‘অন্ধকার দেখার বিষয় না, ডার্ক ম্যাটার হলো ডার্ক ম্যাটার, এটা নিজেই বুঝিয়ে দেয় যে এখানে দেখার কিছু নাই, কারণ এখানে অন্ধকার ছাড়া কিছু নাই।’ আমি রফিক আজাদের দিকে তাকিয়েছিলাম, যেন তিনি কিছু বলতে চাইছিলেন, পারছিলেন না, প্রশিক্ষক হিসেবে রিসোর্স পারসনের সঙ্গে তর্ক সমীচীন নয়, পরে তিনি এটা আমাকে বলেওছিলেন। বললাম, ‘অন্ধকার বোঝার জন্য আলো লাগে, কিন্তু বাংলা কবিতার ইতিহাস এত দীর্ঘ নয় যে এক অন্ধকারের চেয়ে এক আলোর দূরত্ব পাঁচ শ বছর হতে পারে। আপনাকে তিরিশের অন্ধকারটা বুঝিয়ে দিতে হবে।’
এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাইছি না, আর আমি তো রফিক ভাইকে নিয়ে লিখতে বসেছি। সব আমার তখনকার নোটবুকে আছে। তো, ফরহাদ মজহার তাঁর ডাইহাটসু রকিতে ওঠার আগে আমাকে পিঠ চাপড়ে দিলেন, বললেন, ‘আমার বাসায় এসো। কথা হবে।’ গাড়ি চ’লে যাওয়ার পর রফিক ভাই আমাকে বললেন, ‘শোনো, তোমাকে যে যাওয়ার সময় ফরহাদ পিঠ চাপড়ে গেল, মানে বোঝো? ও কিন্তু আর কাউকে চাপড়ায় নাই, কারণ ও বুঝেছে তোমাকে ক্যাপচার করা কঠিন, সেজন্যই তোমাকে ক্যাপচার করা দরকার। কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ ব’লেই হেসে উঠলেন তিনি আর বললেন, ‘তোমার পারফরমেন্সে আমি খুশি, আসো চা খাওয়াই।’ এরপর থেকে তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে রাখতে পছন্দ করতেন, লক্ষ করেছি।

বাংলা গল্প-উপন্যাস নিয়ে তাঁর বিরক্তি ছিল। বলতেন, ‘বাংলা উপন্যাসে কিছুই থাকে না শেষ পর্যন্ত, নায়িকার রান্নাঘর আর বেডরুম, নায়কের পরকীয়া, দুঃখ, এসব পড়তে অনেকের আরাম লাগতে পারে, আমার লাগে না।’

রফিক ভাই প্রকল্পের কাজ শেষে বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগারিক আমীরুল মোমেনীনের টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতেন আর দু’চারটা ফোন করতেন। লক্ষ করেছি, বেশির ভাগই অর্থ সংক্রান্ত। কোনো-কোনোদিন আমীরুল মোমেনীনের কাছ থেকেও ধার নিতেন। আমাকে নিয়ে সাকুরায় যাবেন, তাঁর কাছে হয়তো দু’শ টাকা আছে, মোমেনীন ভাইয়ের কাছ থেকে আরও দু’শ ধার নিলেন। তারপর বাংলা একাডেমির গেট থেকে রিকশায় উঠতাম আমরা। সাকুরার দেয়াল ঘেঁষে সিগারেটের যে দোকান, সেখান থেকে এক প্যাকেট গোল্ড লিফ নিয়ে তিনি ঢুকতেন। আমাকে বলতেন, ‘দুপুরের পানশালার জানালাও সুখকর, সিপ নিতে নিতে আকাশ দেখো, রাস্তার দিকে তাকিয়ো না।’ তখন ফাতেমা তুজ জোহরার কণ্ঠে নজরুলের গান কিংবা সুচিত্রা মিত্রের স্বরে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নয়তো মান্না দের গলায় ‘যদি কাগজে লেখো নাম’ বাজতো আর রফিক ভাই মাথা নাড়তেন, বাঁ হাতে সিগারেট, ডান হাতে গ্লাস ধ’রে একেকটা চুমুকে দুপুরের পানশালার সুখকর মুহূর্তগুলি উপভোগ করতেন। মনে পড়ে।
একদিন সাকুরার টেবিলে ‘আগাছাবিদ্যা’ (নাম ‘আগাছার কথা’ও হতে পারে) নামের একটি বই রাখলেন। আমি হাসলাম। তিনি বললেন, ‘কবিদের সব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হয়। আগাছা ফেলে দিতে হয়; কিন্তু আগাছা বিষয়ক বই সংগ্রহে থাকা ভালো। কাজে লাগে। তুমি খেয়াল করলে দেখবা, ঝাড়েবংশে আগাছা বাড়ছে।’ হাতে নিয়ে দেখলাম, বইটির প্রকাশক বাংলা একাডেমী (শেষ অক্ষরে তখন ঈ-কার ছিল)। আমি আবার হাসলাম। তিনি বললেন, ‘বাংলা একাডেমি বহু আজে-বাজে বই ছাপলেও এ বইটায় সব ঢাকা পড়ে গেছে।’ আমি বললাম, ‘আগাছাকে বাংলা একাডেমি আগাছা বিষয়ক বই দিয়ে ঢাকতে পারলো তাহলে!’ এবার তিনি হেসে উঠলেন। বললেন, ‘রসিক আছিস বেটা।’
এর সপ্তাখানেক পর সাকুরার টেবিলে, মধ্যাহ্নের সেই জানালার পাশে, তিনি আগাছা বিষয়ক একটি কবিতা পড়তে শুরু করলেন। শোনার পর আমার ভিতর ‘ঝাড়েবংশে আগাছারা বাড়ে’ অনুরণিত হচ্ছিল, ফেরার পথে, রিকশায় এটা বলতেই তিনি বললেন, ‘তুই চাবিটা ঠিকই বাগিয়েছিস, সেয়ানা হয়েছিস বেটা।’ সে কী হাসি, তারপর নিজেই উচ্চারণ করলেন, ‘ঝাড়েবংশে আগাছারা বাড়ে!’

তখন রফিক আজাদের অর্থকষ্ট ছিল, বাংলা একাডেমির গেটের পাশের সিগারেটের দোকানে ৪৬০ টাকা বাকি পড়েছিল। একদিন সিগারেটের দোকানদার তাঁকে দেখে টাকা চাইল, তবে চাওয়ার ধরনটি প্রীতিকর ছিল না। আমীরুল মোমেনীন আর আমি সেখানে ছিলাম। আমি বললাম, ‘মোমেনীন ভাই, আপনাদের সিগারেটঅলারে কিছু শেখান।’
তিনি দোকানদারকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমার টাকা আমার থেকে কাল সকালে নিয়া যাইয়ো, আর ব্যবহারটা ঠিকমতো কইরো, বুজছো?’ রফিক ভাই বললেন, ‘তুমি টাকা দিবা ক্যান, আমিই দিবো। টাকা সে পায় আমার কাছে, আমিই দিবো।’
তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, কথাসাহিত্য অপছন্দ করতেন। বিশেষত বাংলা গল্প-উপন্যাস নিয়ে তাঁর বিরক্তি ছিল। বলতেন, ‘বাংলা উপন্যাসে কিছুই থাকে না শেষ পর্যন্ত, নায়িকার রান্নাঘর আর বেডরুম, নায়কের পরকীয়া, দুঃখ, এসব পড়তে অনেকের আরাম লাগতে পারে, আমার লাগে না।’ আমি বলেছিলাম, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আপনার বন্ধু, উনার গল্প পড়েন নাই?’ বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ইলিয়াসের গল্প পছন্দ করি, তবে সব না। আমি তো ওইগুলি গল্প হিসাবে পড়ি নাই, পড়ছি অভিজ্ঞতা সংগ্রহের জন্য, পুরান ঢাকার জীবন বোঝার জন্য।’ (ক্রমশ)

১৬/০৩/১৬


 

চঞ্চল আশরাফ কবি ও কথাসাহিত্যিক

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ