চলতি শব্দের অভিধান || পর্ব-তিন

Send
মোহাম্মদ মামুন অর রশীদ
প্রকাশিত : ০৮:২৬, মার্চ ২২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৬, মার্চ ২২, ২০১৬

পূর্ব প্রকাশের পর


ডাইকাট :
বি. ইং. ভু.উ. নির্দিষ্ট ছাঁচ অনুযায়ী কাগজ কাটাকে ডাইকাট বলে। ডাইসকাট-এর পরিবর্তিত রূপ, শুদ্ধরূপ Dice Cut। প্রকাশনা ও মুদ্রণ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা অর্থাৎ প্রিন্টিং-কাটিং-প্যাকেটিং এর সাথে সংশ্লিষ্টরা থাকে, যা ডাইসকাট থেকে এসেছে। যেমন, ‘আমার ভিটিংকার্ডে ডাইকাট লাগবে’।
ডামাডোল : বিণ. ব্যস্ততা, হট্টগোল, আনন্দের শরগোল, হৈ চৈ। ঢাকঢোল শব্দটির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডামাডোলের ব্যবহার হয়। ‘নির্বাচনী ডামাডোল নেই চট্টগ্রামে খোশমেজাজে বিনা ভোটে নির্বাচিতরা’ সূত্র সকালের খবর, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩।
ডিজুস : বি. ইং. ডিজিটাল জুস-এর সংক্ষিপ্ত রূপ djuice। টেলিনর কোম্পানির ব্রান্ড/প্লান। ২০০৩ সালে প্রথম নরওয়ে ও হাঙ্গেরিতে শুরু হয়। বাংলাদেশে তরুণদের ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি-মিশ্রিত ভাষাকে ডিজুস ভাষা বলা হয়। ‘ডিজুস পোলাপাইনের ডিজুস ভাষা আমরা বুঝি না’
ডিম ধরা : ক্রি. শ্যুটিং-এর ভাষা। সাধারণত নায়িকার শরীরের বিশেষ অঙ্গ ফ্রেমে রাখার জন্য ক্যামেরাম্যানকে পরিচালক এই শব্দের মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।
তারছিঁড়া : বি. অপ্রকৃতিস্থ, অস্বাভাবিক আচরণ করা ব্যক্তি। মানুষের মগজকে যান্ত্রিক চিন্তা করে সেখানে বৈদ্যুতিক তারে সমস্যা হলে যে মস্তিষ্ক বিকৃতি তা বোঝাতে তারছেঁড়া/তারছিঁড়া শব্দটির ব্যবহার শুরু। ‘তারছিঁড়া মানুষের সাথে কথা বলা বিপদ, কখন যে কী উত্তর দেয়’!
তেল দেওয়া : ক্রি. অতিরিক্ত প্রশংসা করা। তেল দেওয়া প্রাথমিক অর্থে চুলে বা শরীরে তেল ব্যবহার করা মনে হলেও চলতি ভাষায় তেল দেওয়া মানে অন্যায্য অতিরিক্ত প্রশংসা করা বা স্তুতি করা।
তেলবাজ : বি. মাত্রাতিরিক্ত প্রসংশাকারী, উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্তূতি কর। তেল দিতে অভ্যস্ত যে।
দেশে যাওয়া : ক্রি. গ্রামের বাড়ি যাওয়া। দেশ মানে বাংলাদেশে যাওয়া নয়, গ্রামের পৈত্রিক ঠিকানায় যাওয়া। সাধারণত ঢাকা থেকে দূরবর্তী জেলার কর্মজীবীরা দেশে যাওয়া শব্দটি অধিক মাত্রায় ব্যবহার করে থাকেন।
দৌড়ের উপরে রাখা : ক্রি. ব্যস্ত থাকা, ব্যস্ত রাখা, বিপদে ফেলানো, ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্থা করা প্রভৃতি। যেমন : ‘ওরে এখন দৌড়ের উপর রাখছি, আমার সাথে বাহাদুরি দেখাইতে আসছিল’।
দাওয়াতী কাজ : ক্রি. তাবলিগ করা। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তাবলিগ জামাত নিজেদের কার্যক্রমকে দাওয়াতী কার্যক্রম বলে অভিহিত করা। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার পথে আসার জন্য আমন্ত্রণ।
ধুত্তুরি/ধ্যাঁত : বি. তাচ্ছিল্য বা বিরক্তি প্রকাশক শব্দ। ‘ধ্যাঁত, সকালটাই মাটি হয়ে গেল’। ‘ধুত্তরি, খালি উটকো লোক জোটে’।
নন চ্যানেল প্রোডাক্ট : বি. ইং. অবৈধ পণ্য। স্বীকৃত আউটলেটের বাইরে বিক্রিত পণ্য, প্রকৃত আমদানিকারক ব্যতীত আমদানিকৃত পণ্য। তবে বাংলাদেশে নন চ্যানেল প্রোডাক্ট বলতে বোঝায় ওয়ারেন্টি নেই এমন পণ্য। ওয়ারেন্টি দানকারী যে কোনো পণ্যকেই কম্পিউটার ব্যবসায়ীরা চ্যানেল প্রোডাক্ট বলে দাবি করেন।
নীড়পাতা : বি. ওয়েবসাইটের homepage বা প্রথম পাতাকে বাংলায় নীড়পাতা বলা হয়।
পিছে আগান : ক্রি. বাসের ভেতরে যাওয়া। ঢাকা ও শহরতলীর বাস কন্ড্রাকটররা এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। পশ্চাতে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। যখন বাসের সিটগুলো পূর্ণ হয় এবং কাছের স্টপেজের যাত্রীরা বাসের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু কন্ড্রাকটর গেটের যাত্রীদের পেছনের ফাঁকা অংশে সরে যেতে এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন, আরো যাত্রীর জন্যে।
পিছে নাম্বার : এটি ঢাকার বাসের হেলপারদের ব্যবহৃত শব্দ। একই গন্তব্যের জন্য স্টেশনে বা স্টপেজে দাঁড়ানো যাত্রীকে বাসে তুলতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হেলপারের বচন। একই রুটের একই কোম্পানির অন্য বাসকে বোঝাতে চালকের উদ্দেশ্যে হেলপারের সাংকেতিক সতর্কবাণী।
পেইন : বি. ক্রি. বিরক্তি, যন্ত্রণা। প্রচলিত অর্থে পেইন মানে ব্যাথ্যা; যেমন, ব্যাকপেইন অর্থ পিঠের ব্যথ্যা কিন্তু চলতি অর্থে পেইন মানে যন্ত্রণা দেওয়া। সাধারণত শিক্ষক বা অভিভাবক কর্তৃক ছাত্রছাত্রীদের অধিক চাপ প্রয়োগকে বা সন্তানের প্রতি অতি নজরদারিকে তরুণেরা পেইন বলে অভিহিত করে থাকে। যেমন, ‘ব্যাপক পেইনের মধ্যে আছি দোস্ত, সারাদিন আব্বার সাথে হাসপাতালে থাকতে হয়’।
পুস্টানো/পোস্টানো : ক্রি. ব্লগে বা ওয়েবসাইটে কোনো কিছু পোস্ট করাকে বাংলা ক্রিয়ারীতি অনুসারে পোস্টানো বলা হয়।

পল্টিমারা/পল্টিদেয়া : ক্রি. মত বদলানো, দলবদল করা। সাধারণত নিন্দার্থে প্রযুক্ত হয়। কর্তার অনুপস্থিতিতে সমালোচনার সময় বদলানো বোঝাতে পল্টিমারা ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করা হয়। যেমন, ‘ও পল্টি মাইরা ওই পক্ষে গেছে।’ ঘুরপাক খাওয়া অর্থে ‘দেখ আমার লাডুম (লাঠিম) কত সুন্দর পল্টি খায়’। ডিগবাজি খাওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয় : ‘সাইকেলটি পল্টি খাইয়ো খাদের মধ্যে পড়েছে’।
পল্টিবাজ : বি. পক্ষ, অবস্থান বা সিদ্ধান্তে যে অনড় থাকে না। বাস্তব সিদ্ধান্তে যে ডিগবাজি খেতে পারে তাকে পল্টিবাজ বলা হয়।
পার্ট নেওয়া : ক্রি. মিথ্যা ওহমিকা দেখানো। অথবা মিথ্যা আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করা। নাটকে পাঠ নেওয়া শব্দটিকে বিকৃত করে অনেকে পার্ট বলে থাকে। মিথ্যা অভিনয় বা ভাবের আধিপত্য প্রকাশ করার। ‘আর অত পাট নিও না, তুমি লুকিয়ে পিরিত করছ, আমরা সব জানি’।
পাতি নেতা : বি. উঠতি নেতা, ছোট নেতা অথবা বড় নেতার আশ্রয়ে থাকা, অস্বীকৃত নেতা । যাদের নেতৃত্ব গুণ নেই কিন্তু আচরণে দাম্ভিকতা রয়েছে, এমন লোকদের বোঝায়। ‘এলাকায় বহুত পাতি নেতা দেখছি, সব উইড়া গেছে’।
প্যাঁচাল পারা : ক্রি. অনবরত অপ্রয়োজনীয় কথা বলা। পাঁচালি বা পাঞ্চালি গানের আখ্যানের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বলা যায় প্যাঁচাল মানে দীর্ঘতর আলাপ/ গল্প। কখনও প্যাঁচাল বলতে অসার বক্তব্যকেও বোঝানো হয়। যেমন ‘ওর প্যাঁচাল শোনার সময় আমাদের নেই’।
ফটকাবাজি : ক্রি. প্রতারণা করা বা অতি ধূর্ত আচরণ।
ফর্মা : বি. ইং. ষোল পৃষ্ঠা। ইংরেজি ফরম্যাট (Format) শব্দের চলতি সংক্ষিপ্ত ও বাংলা রূপ। মুদ্রণ জগতে বইয়ের ষোল পৃষ্ঠাকে ফর্মা বলা হয়। পূর্ণায়তনের কাগজের ডাবল ডিমাই শিটকে বুকসাইজে ষোলভাগে ভাগ করে ছাপালে বাঁধাই কর্মে সুবিধা হয়। এই ছাঁচের ইংরেজি ফরমেট থেকে সংক্ষিপ্ত রূপ ফর্মা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ফাঁপর : বিণ. হি. বিপদ, মুশকিল, হতবুদ্ধিকর বা অস্বস্তিকর অবস্থা। হিন্দি ফোফড়ী শব্দের বাংলারূপ। কাউকে ধমক দেয়া অর্থেও প্রয়োগ করা হয়। যেমন, ‘খুব ফাঁপরে পড়ে গেছে লোকটা’। ‘ওরে এমন ফাঁপর দিবি যে এই মহল্লায় আর না আসে’।
ফার্স্ট ডেট : ইং. প্রথম দেখা। প্রথম মিলনের ঘটনাকে ইংরেজিতে ফার্স্ট ডেট নামে অবিহিত করে থাকে। অর্থাৎ ডেটিং করার প্রথম দিন।

ফাচুকি : বিণ. অপ্রয়োজনীয় আলাপ। ফাসেক শব্দ থেকে বাংলা ফাচুকির আগমন ঘটতে পারে। ‘ফাচুকি আলাপ বাদ দিয়া আমার লগে সত্য কথা কও’।
ফাউলটক : বি./বিণ. অসার কথা, মিথ্যে কথা, বিরক্তিকর কথা, বাড়তি কথা। ইংরেজি ফাউল ও টক একসাথে বসে নতুন অর্থ ও প্রয়োগ তৈরি করেছে।
ফিদা : বিণ. হি. দিওয়ানা, পাগল। হিন্দি সিনেমা প্রভাবজাত শব্দ। সাধারণত কিশোরী-তরুণীরা ব্যবহার করে থাকে।
ফ্যান : বি. ইং. গোঁড়া ভক্ত, সমর্থক, অনুরাগী।
ফোরটুয়েন্টি/ফোরটুয়ান্টি : বি. ইং. ভবঘুরে তরুণ, কর্মহীন কিন্তু ফ্যাশন সচেতন ব্যক্তি, লেফাফা দুরস্ত। এই শব্দটি প্রচলনের একটি ইতিহাস অন্তর্জালে সুলভ : ১৯৭১ সালে সান রাফায়েল হাই স্কুলের ছাত্রদের একটা গ্রুপ গাঁজা খাওয়ার জন্য ৪:২০ সময় লুই পাস্তেউর-এর মূর্তির পাশে মিলিত হত। পুরো প্রক্রিয়াটিকে এরা ৪২০ বলে সাংকেতিক ভাষায় প্রকাশ করত। এরপর সারা দুনিয়ার এ নম্বরটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।
ব্লগর ব্লগর : ক্রি. অন্তর্জালে বকবক করা। অর্থাৎ ব্লগে বেশি কথা বলা বা বেশি কমেন্ট করাকে ব্লগর ব্লগর বলা হয়। একটি জনপ্রিয় ব্লগের একটি ‘ট্যাগ’-এর নাম দেয়া হয়েছে ব্লগর ব্লগর।
ব্লগবকানি : ক্রি. ব্লগে বকবক করা।
বাতিক : বিণ. মুদ্রাদোষ, চোখে পড়ার মতো অভ্যাস, বাজে ভঙ্গি বা কথা যা অভ্যাসে পরিণত। লোকদৃষ্টিতে অস্বস্তি তৈরি করে এমন অভ্যাসই বাতিক। যেমন, ‘সবসময় মাথা চুলকানো তার একটা বাতিক’।
বেইল নাই : বাগ. মূল্য না থাকা, সময় না থাকা। বেলা থেকে বেইল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিবেচনায় সময় না থাকা থেকে শব্দটির অর্থ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেসম্ভব : বিণ. অসম্ভব। একটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হওয়ার পরে তা প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও তা কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়।
বই দেখা : ক্রি. সিনেমা দেখা। শব্দটি বর্তমানে নাগরিক সমাজে মৃত। বই সাধারণত পড়া হয়। তবে যেহেতু একসময় সিনেমাকে লিখিত উপন্যাসের সমরূপ ভাবা হত সে বিবেচনায়, সিনেমা দেখার সমশব্দ হিসেবে বই দেখা শব্দটি ব্যবহৃত হত। এখনো সিনেমা, ফ্লিম, মুভি দেখা শব্দগুলি ব্যবহৃত হলেও বই দেখারও প্রচলন আছে শহরতলীতে, নিম্নমধ্যবিত্ত, মফস্বল এবং পৌড় বয়সীদের পারিবারিক আলোচনায়।
বিন্দ্যাস : বিণ. হি. অতি উৎকৃষ্ট। তরুণীরা প্রধাণত এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। শব্দটির মূল উৎপত্তি মুম্বাইয়ের বস্তি থেকে। বর্তমানে বলিউড- টলিউড দুই স্থানেই এটি অতি ব্যবহৃত একটি বিশেষণ। বিন্দ্যাস নামে একটি চলচ্চিত্রও মুক্তি পেয়েছে কলকাতায়।
বোল্ড করা/হওয়া : ক্রি. ইং. হতভম্ব হওয়া বা করা, মুখের ওপর জবাব দেওয়া, সরাসরি অপদস্ত হওয়া বা করা, সমুচিত জবাব দেওয়া। ক্রিকেটে বোল্ড যেমন স্পষ্ট আউট তেমনি কথার মাধ্যমে স্পষ্ট জবাব দেওয়াকে বোল্ড করা বলা হয়ে থাকে। যেমন, ‘তুমি আমাকে সবার সামনে বোল্ড না করলেও পারতে’।
বাটপার : বি. অতিধূর্ত, কপট, অতি মিথ্যুক। ‘তার মত বাটপার ইইকালে দেখি নাই’।
বানানো : ক্রি. বানানো মানে পেটানো, প্রহার করা। ‘ধোলাইখালে গিয়া মিস্ত্রিগো লগে ফাপর নিলে বানাইয়া দিব’।


 

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-

চলতি শব্দের অভিধান || পর্ব-দুই

চলতি শব্দের অভিধান || পর্ব-এক

লাইভ

টপ