behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ফুটবলের আনন্দ || মারিও বার্গাস ইয়োসা

অনুবাদ : আল মনসুর১২:৫৬, মার্চ ২৮, ২০১৬

ফুটবল মাঠে ইয়োসাবছর দুই আগে ব্রাজিলের নৃবিজ্ঞানী রবার্তো দে মাত্তার এক চমৎকার বক্তৃতা শুনেছিলাম। তাঁর সেই বক্তব্যে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ফুটবলের জনপ্রিয়তা আসলে বৈধতা, সমতা এবং স্বাধীনতার প্রতি মানুষের সহজাত আকাঙ্খা প্রকাশ করে। তাঁর যুক্তির মধ্যে বেশ চাতুরি ছিল, শুনতে ভালোই লেগেছে। তাঁর মতে জনগণ ফুটবলকে দেখে থাকে একটা আদর্শ সমাজের আদলে। সে সমাজ পরিচালিত হয়ে থাকে পরিষ্কারভাবে বোধগম্য সরল আইন দ্বারা। সে আইনগুলো প্রত্যেকে বুঝতে পারে, মেনেও চলে। আবার অমান্য করলে সঙ্গে সঙ্গে দোষীর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে সে সব আইনে। ফুটবলের মাঠ হলো একটা সমতাবাদের জায়গা। এখানে কোনো রকমের পক্ষপাতিত্ব এবং বিশেষ সুবিধার স্থান নেই। এখানে সাদা দাগঅলা ঘাসের মাঠে ব্যক্তিকে মুল্যায়ন করা হয় তার কর্মের ভিত্তিতে, মানে তার দক্ষতা, উৎসর্জন, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অন্যদের মনের ওপরে দাগ কাটতে পারার ক্ষমতার ভিত্তিতে। গোল করার ক্ষেত্রে, দর্শকদের হাততালি কিংবা দর্শকদের মাঝ থেকে বিভিন্ন রকম বাঁশির শব্দ শোনার ক্ষেত্রে নামযশ, কিংবা প্রভাবশালী ক্ষমতা গণ্য করার মতো তেমন কোনো বিষয়ই নয়। ফুটবল খেলোয়ার স্বাধীনতার একটিমাত্র বিষয়কে চর্চা করে থাকে। সমাজের পক্ষ থেকে নাগরিকদেরও স্বাধীনতার এই বিষয়টি চর্চা করার অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। তার মানে সমাজের সদস্যরা যা কিছু তা-ই ইচ্ছে মতো করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছে যেন সকলের সমর্থনপ্রাপ্ত আইনের পরিপন্থী না হয়।

এই বৈশিষ্ট্যই শেষ পর্যন্ত সমবেত দর্শকদের আবেগকে নাড়া দিতে পারে। দর্শকরা তাদের আবেগ ঢেলে দিতে পারে খেলার মাঠে। টেলিভিশনের সামনে বসে তারা মগ্ন মনোযোগে খেলার গতি অনুসরণ করতে পারে। নিজ নিজ ফুটবল আদর্শকে নিয়ে তর্কযুদ্ধও চালিয়ে যেতে পারে। তাদের মধ্যে চলতে থাকে গোপন ঈর্ষা, ফুটবলের জগতের জন্য অবচেতন স্মৃতিবিধুরতা; তারা মনে করে থাকে, এরকম জগতই পারে ঐক্য, আইন আর সাম্যের সন্ধান দিতে। তারা আরো মনে করে থাকে, তাদের বসবাসের জগত তো অন্যায়, দুর্নীতি, অরাজকতা আর সংঘর্ষের ভাগার।
এই সুন্দর মতবাদ কী সত্য হতে পারে? যদি সত্য হয়েই থাকে, তবে মানবতার ভবিষ্যতের জন্য সমবেত দর্শকদের সহজাত গভীরতার ভেতর নিবিড় অবস্থানে থাকা এই সভ্য অনুভূতিগুলোর চেয়ে অন্য কোনো কিছুই বেশি ইতিবাচক হতে পারে না। কিন্তু সাধারণত যেমন দেখা যায়, তত্ত্বকথার অসম্পূর্ণতা তুলে ধরার মাধ্যমে বাস্তবতা সব সময় তত্ত্বকথাকে ছাড়িয়ে যায়। তত্ত্বকথা সব সময়ই যুক্তিনির্ভর, বিচারক্ষম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। এমনকি যে সব তত্ত্বকথা যুক্তিহীনতা এবং পাগলামির কথা উপস্থাপন করে থাকে সেগুলোও এরকমই। তবে মানব সমাজে এবং মানব আচরণে অবচেতন, যুক্তিহীন এবং খাঁটি স্বতঃস্ফূর্ততা সব সময়ই একটা ভূমিকা পালন করে যাবে। সে কথা অবশ্যম্ভাবী এবং অপরিমেয়।
আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়ামের মাঝে অনুষ্ঠিতব্য এবারের বিশ্বকাপের (স্পেন ১৯৮২) প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে আমি এই কথাগুলো কোনো রকমে লিখে যাচ্ছি নাও ক্যাম্পের একটা আসনে বসে। লক্ষণ অনুকূল মনে হচ্ছে: দীপ্তিমান সূর্য, বহুবর্ণিল ভীড়ের মাঝে দর্শকরা স্প্যানিস, কাটালান, আর্জেন্টিনো এবং কিছুসংখ্যক বেলজিয়ান পতাকা নাড়াচ্ছে, হৈহুল্লোড়ে ভরা আতশবাজি; চারদিকে উৎসবের আমেজ আর খেলাকে চাঙ্গা করার জন্য উপস্থাপিত নাচ এবং শারীরিক কলাকৌশল প্রদর্শনের প্রতি হাততালি পড়ছে।
নাও ক্যাম্পের পেছনে ফেলে আসা বাইরের জগতের চেয়ে এখানকার জগত অনেক বেশি আকর্ষণীয়, কয়েক ডজন উঠতি বয়সীর শারীরিক কসরত এবং নাচের প্রতি দর্শকদের হাততালি অনেক বেশি মোহনীয়। দক্ষিণ আটলান্টিক কিংবা লেবাননে চলমান যুদ্ধের মতো কোনো যুদ্ধ এখানে নেই। ফুটবল বিশ্বকাপ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ভক্ত দর্শকের মনে যুদ্ধকে দ্বিতীয় স্থানে ফেলে দিয়েছে। এখানে উপস্থিত দর্শকদের মতোই সারা বিশ্বের দর্শকরা আপাতত পরবর্তী দুঘণ্টা অন্য কিছু ভাববেই না। তাদের মনে স্থান পাবে শুধু টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়াম দলের বাইশজন খেলোয়ারের মাঝে বল আদান প্রদান আর বল মারার কৌশল।
সম্ভবত এই অসাধারণ সাম্প্রতিক চিত্রের পক্ষের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কোনো সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানী প্রদত্ত ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক কম জটিল। কেননা আমজনতার ধর্মের পর্যায়ে উন্নীত ফুটবলের জন্য মানুষের প্রবল আবেগ এবং সকলের মনোযোগ অবশ্যই চোখে পড়ার মতো। ফুটবল মানুষকে এমন কিছু দিয়ে থাকে যা তারা অন্যখান থেকে কদাচিত পেয়ে থাকে: মজা করার সুযোগ, নিজেদেরকে আনন্দ দেয়ার, উত্তেজনা অনুভব করার কিংবা প্রাত্যহিক জীবনে পাওয়া যায় না এমন কিছু প্রবল আবেগ অনুভব করার সুযোগ।
মজা করতে চাওয়া, নিজেদেরকে আনন্দ দিতে চাওয়া, আনন্দে সময় কাটাতে চাওয়া নিশ্চয়ই একটা বৈধ আকাঙ্খা, কিংবা বলা যায় খাওয়া এবং কাজ করতে চাওয়ার মতোই একটা আইনসম্মত অধিকার। কারণ অনেক জটিল হয়ে থাকলেও আজকের বিশ্বে অনেকের জন্যই ফুটবল অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে এই ভূমিকাটা অনেক বেশি সফলতার সঙ্গেই গ্রহণ করে ফেলেছে।
ফুটবল এক সঙ্গে অনেক মানুষকে বিনোদন দিয়ে থাকে। সেদিক থেকে ফুটবলের রয়েছে বিশাল জনপ্রিয়তা। তবে আমরা, মানে ফুটবলের আনন্দপায়ীরা ফুটবলের এই বিশাল জনপ্রিয়তায় কিছুতেই বিস্মিত হই না। কিন্তু এমন অনেক মানুষ আছেন যারা ফুটবলের এই জনপ্রিয়তাকে বুঝতে পারেন না। তারা ফুটবলের সমালোচনাও করে থাকেন। তারা ফুটবলকে শোচনীয় মনে করে থাকেন। কারণ হিসেবে তারা বলে থাকেন, ফুটবল সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে তাদেরকে দূরে রাখে। যারা এরকম কথা বলে থাকেন তারা ভুলে যান, আনন্দ পাওয়াটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা আরো একটি কথা ভুলে যান, বিনোদনের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো– বিনোদান জিনিসটা স্বল্পস্থায়ী, সাধারণ বুদ্ধিতে ধরার মতো এবং অনপকারী। বিনোদন খুব তীব্র হতে পারে আবার নিমগ্নও হতে পারে। আর বিনোদন হিসেবে ফুটবল তো অবশ্যই প্রবলভাবে তীব্র এবং নিমগ্ন। ফুটবল খেলা দেখা এমন একটা অভিজ্ঞতা যেখানে কারণ এবং ফলাফল একই সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। যারা ফুটবলের ভক্ত তাদের কাছে খেলাধূলা মানে বাহ্য বস্তুর র প্রতি ভালোবাসা। সেটাকে বলা যেতে পারে চমৎকার একটা দৃশ্য এবং এই দৃশ্য শারীরিক এবং ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা কিংবা তাৎক্ষণিক আবেগের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। এ রকমের কোনো দৃশ্য বই কিংবা নাটকের মতো স্মৃতির ওপরে কোনো স্থায়ী রেখা ফেলে যায় না, আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে না, নিঃস্বও করে না। ফুটবলের আবেদন এখানেই; সেটা উত্তেজনাকর এবং ফাঁকা। সে কারণে বুদ্ধিমান এবং বুদ্ধিহীন, সংস্কৃতিবান এবং সংস্কৃতিরহিত মানুষ একইরকমভাবে উপভোগ করে থাকে ফুটবল। তবে সে যা-ই হোক, এখানে ক্ষান্ত দেয়া দরকার। রাজা এসে গেছেন। দুদলই বের হয়ে এসেছে। বিশ্বকাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়ে গেছে। খেলা শুরু হতে যাচ্ছে। লেখা আপাতত এই। চলুন নিজেদের একটু বিনোদন দেয়া যাক।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ