behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ইয়োসার আত্মজৈবনিক রচনালিমা ভয়ঙ্কর

অনুবাদ : তপন শাহেদ১৩:৫৫, মার্চ ২৮, ২০১৬

ইয়োসালা মাগদালেনা-র ছোট বাড়িটার সামনের আভেনিদা সালাভেরি দিয়ে লিমা-সান মিগেল ট্রাম যাতায়াত করতো। ১৯৪৬-এর শেষের এবং ১৯৪৭-এর শুরুর দিনগুলো আমরা ঐ বাড়িটাতে ছিলাম। বাড়িটা এখনো আছে―বিবর্ণ ও জরাজীর্ণ। আর, এখনো, ঐ পথ দিয়ে যাবার সময় তীব্র আতঙ্কের অনুভূতি আমাকে পেয়ে বসে। ওটায় আমি এক বছরের কিছু বেশি সময় আমি থেকেছি, আর ঐটুকু সময় আমার জীবনে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। বাড়িটা ছিলো দোতলা। নিচতলায় ছিলো একটা ছোটো বসার ঘর, খাবার ঘর, রান্নাঘর, এবং ছোটো একটা উঠান পেরিয়ে ছিলো কাজের মহিলার ঘরটা। দোতলায় ছিলো স্নানঘর, এবং আমার আর বাবা-মার শোবার ঘর; দুটো ঘর একটা ছোটো সিঁড়ির ল্যান্ডিং দিয়ে আলাদা করা।
এখানে আসার মুহূর্ত থেকেই আমার এরকম অনুভূতি হলো যে, আমি আমার পিতা এবং মার মধ্যকার সম্পর্ক থেকে বাদ পড়েছি। যতো দিন যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো আমার পিতা আমার সাথে দূরত্ব বজায় রাখছেন। ওরা দুজন দিনের বেলায় নিজেদের শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতো, আর সেটা আমাকে খেপিয়ে দিতো। কোনো-না-কোনো অজুহাতে আমি বারবার গিয়ে দরজায় টোকা দিতাম। শেষে আমার পিতা ধমক দিয়ে আমাকে শাসালেন, ওরকম যেনো আমি আর না করি। লিমায় সেই শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি হিসেবে তাঁর কথার সেই শীতল ভঙ্গি আর তাঁর চোখের ঠাণ্ডা কঠিন চাহনি আমার সবচেয়ে বেশি করে মনে আছে। শহরটা প্রথম থেকেই আমার অপছন্দ হয়েছিলো। আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ, নানা-নানি, মামাই, লুচো মামা, আমার পিউরার বন্ধুদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদতো। আর, বাড়িতে বন্দি থেকে থেকে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম; বুঝতে পারছিলাম না কী নিয়ে সময় কাটাবো। লিমা যাওয়ার অল্পদিন পরেই আমার পিতা আমাকে লা সাইয়ে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এপ্রিলের আগে ক্লাস শুরু হবে না, আর তখন মাত্রই জানুয়ারি। আমাকে কি পুরো গ্রীষ্মকালটা ঘরবন্দি হয়ে ঢং ঢং শব্দে সান মিগেল ট্রামের অবিরাম আসা-যাওয়া দেখে দেখে কাটাতে হবে?

কাছেই, আমাদের বাড়িটার মতো দেখতে একটা ছোটো বাড়িতে সিজার চাচা ওরিয়েলি চাচি আর তাঁদের তিন ছেলে এদুয়ার্দো, পেপে আর হোর্হেকে নিয়ে থাকতেন। এদুয়ার্দো ও পেপে ছিলো আমার থেকে সামান্য বড়ো, আর হোর্হে আমার সমবয়সী। চাচা এবং চাচি আমাকে স্নেহ করতেন, এবং আমি যাতে নিজেকে তাঁদের পরিবারের অংশ বলেই মনে করি, তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টাই তাঁরা করতেন। এক রাতে তাঁরা আমাকে কাইয়ে কাপোন-এর একটা চীনা রেস্তোঁরায় নিয়ে গিয়েছিলেন; সে-ই প্রথম আমার চীনা-পেরুভিয়ান খাবারের স্বাদ নেওয়া। আমার চাচাতো ভাইয়েরা আমাকে ফুটবল খেলা দেখতে নিয়ে যেতো। কাইয়ে হোসে দিয়াস-এর পুরনো স্টেডিয়ামটার সস্তা সিটে বসে আলিয়ানসা লিমা আর উনিভারসিতানো দে দেপোর্তেস-এর মধ্যকার ক্ল্যাসিক ম্যাচটা দেখার স্মৃতি আমার এখনো স্পষ্ট। এদুয়োর্দো আর হোর্হে ছিল আলিয়ানসার সমর্থক, আর পেপে উনিভারসিতানোর। ওর মতোই আমি ঐ শীর্ষ দলটির পাঁড় সমর্থক হয়ে উঠলাম। শিগগিরই আমার ঘরে দলটির তারকা খেলোয়াড়দের ছবি শোভা পেতে লাগলো; নজরকাড়া গোলরক্ষক গারাগাতে, ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক দা সিলভা, ‘তীর’ নামে পরিচিত সোনালি চুলের তোতো তেরি, এবং বিশেষ করে, অসাধারণ সেন্টার ফরোয়ার্ড সুবিখ্যাত লোলো ফের্নান্দেস; মাঠে সে ছিলো ভদ্রলোক এবং গোলদাতা। প্রতিবেশিদের মধ্যে আমার কাজিনদের ছিলো এক বন্ধুগোষ্ঠী―বারিও। তাদের বাড়ির সামনে একসাথে মিলে তারা গল্পগুজব করতো, একটা ফুটবল নিয়ে তাতে এদিক-সেদিক লাথি মারাও চলতো। ওরা আমাকে খেলতে ডাকতো। কিন্তু আমি কখনোই তাদের বারিওর অংশ হয়ে উঠতে পারিনি। তার একটা কারণ ছিলো, আমার কাজিনদের মতো আমি যখন-খুশি রাস্তায় বেরোতে কিংবা বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে আনতে পারতাম না―সেটা ছিল বারণ। আর, চাচা সিজার ও চাচি ওরিয়েলি আর সেই সাথে এদুয়ার্দো, পেপে ও হোর্হে আমাকে সবসময় কাছে টানতে চাইলেও আমি দূরত্ব বজায় রাখতাম। কারণ, ওরা আমার পরিবার নয়―ঐ লোকটার পরিবার, যে-লোকটা কিনা আমার পিতা।
লা মাগদালেনায় অল্প কদিন কেটেছে, এক রাতে খাবার সময় আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমার পিতা কারণ জানতে চাইলে আমি তাঁকে বললাম, নানা-নানির জন্য আমার মন কেমন করে এবং আমি পিউরায় ফিরে যেতে চাই। সেই প্রথম আমার সাথে তাঁর কথা-কাটাকাটি হলো; মারলেন না, তবে এতো জোরে চেঁচাচ্ছিলেন যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমার দিকে তিনি স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন; সেই রাত থেকে আমি জানলাম যে ঐ ভঙ্গিটা হলো তাঁর ভয়ানক রাগের প্রকাশ। ঐ ঘটনার আগে পর্যন্ত তাঁকে আমার কেবল হিংসে হতো, কারণ তিনি আমার মাকে আমার কাছ থেকে চুরি করেছেন। কিন্তু সেদিন থেকে আমি তাঁকে ভয় পেতে আরম্ভ করলাম। তিনি আমাকে বিছানায় পাঠিয়ে দিলেন। অল্পক্ষণ পর―ততক্ষণে আমি বিছানায় উঠে পড়েছি―শুনলাম, তিনি মাকে বকছেন আমাকে অস্থির একটা বাচ্চা হিসেবে বড়ো করবার জন্যে। আরো শুনলাম, ইয়োসা পরিবারকে নিয়ে চরম রূঢ় সব মন্তব্য করছেন।
তখন থেকে, যখনি মাকে একলা পেতাম, আমি তাকে অতিষ্ঠ করে তুলতে লাগলাম লোকটার সাথে থাকার জন্যে সে আমাকে নিয়ে এসেছে বলে, আর দুজনে মিলে পিউরায় পালিয়ে যাবার জন্য জিদ ধরতে লাগলাম। সে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করতো, ধৈর্য ধরতে বলতো, পিতার স্নেহ আদায় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে বলতো। কারণ, আমার পিতা দেখেছেন আমি তাঁর প্রতি বিরূপ, এবং ব্যাপারটা তাঁকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছে। আমি উল্টো চেঁচিয়ে তাকে বলতাম, ঐ লোকটার কোনো কিছুতেই আমার কিছু এসে যায় না। তাঁকে আমি ভালবাসি না, এবং কখনোই বাসবো না। কারণ, আমি শুধু ভালবাসি আমার মামা আর মামিদের, আর নানা-নানিকে। আমার ঐসব আচরণ মাকে আরো বেশি কষ্ট দিতো, এবং সে কেঁদে ফেলতো।
আভেনিদা সালাভেরির ওপরে, আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে একটা গ্যারেজে ছিলো একটা বইয়ের দোকান। ওটায় বাচ্চাদের বই আর ম্যাগাজিন বিক্রি হতো। আমি আমার হাতখরচের প্রতিটি পয়সা দিয়ে পেনেকা, বিলিকেন আর একখানা এল গ্রাফিকো কিনতাম; শেষেরটা ছিল সুন্দর সুন্দর রঙিন অলঙ্করণসহ আর্হেন্তিনার একটা ক্রীড়া ম্যাগাজিন। সেই সাথে যে-বইই পারতাম কিনতাম―সালগারি, কার্ল মে এবং বিশেষ করে জুল ভার্ন-এর লেখা। জুল ভার্নের মাইকেল স্ট্রোগফ কিংবা জার-এর বার্তাবাহক কিংবা আঠারো দিনে বিশ্বভ্রমণ আমাকে স্বপ্নে আজানা সব দেশে আর অচেনা প্রাণীদের মাঝে নিয়ে যেতো। যতোকিছু কিনতে চাইতাম ততোখানি হাতখরচের টাকা আমি কখনোই পেতাম না। দোকানটির মালিক দাড়িঅলা ছোটখাট মানুষটি সারাক্ষণ বসে থাকতেন, এবং আমাকে কখনো কখনো একটা অ্যাডভেঞ্চারের বই কিংবা ম্যাগাজিন ধার দিতেন, এই শর্তে যে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সেটা আস্ত অবস্থায় ফেরত দেবো। আত্মীয় আর বন্ধুপরিবৃত হয়ে এতোদিন আমার জীবন কেটেছে। সম্ভব সব রকম উপায়ে তারা আমাকে সন্তুষ্ট রাখছে এবং আমার বাজে আচরণকে কৌতুক হিসেবে নিচ্ছে, এটা দেখেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। এখন হঠাৎ দেখলাম, আমি এক একাকিত্বের মধ্যে হারিয়ে গেছি। ১৯৪৭-এ লিমায় প্রথম দিকের সেই দীর্ঘ বিষণœ মাসগুলোয় বই পড়াই ছিলো সেই একাকিত্ব থেকে মুক্তি। সেই মাসগুলোয় কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়ানো আর স্বপ্ন দেখা আমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ালো। ঐ ম্যাগাজিন আর গল্পের বইগুলো যে-কল্পনা আমার মধ্যে জাগাতো তার মধ্যে আমার সেই বন্দি নিঃসঙ্গ জীবনের বিকল্প একটা জীবন আমি খূুঁজে বেড়াতাম। যদি আমার মধ্যে ততোদিনে একজন গল্পকথকের বীজ রোপিত হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই পর্যায়ে সেই বীজ দৃঢ় শিকড় ছড়াতে আরম্ভ করেছে। আর, যদি সে-বীজরোপন ইতিমধ্যে না ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই তখনই সেখানে সেই রোপন ঘটেছিলো এবং তার প্রথম অঙ্কুরোদ্গম শুরু হয়েছিলো।

কখনোই বাইরে না-যাওয়া এবং নিজের ঘরে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর চাইতে আরো বাজে একটা জিনিস হলো নতুন একটা অনুভূতি―ভয়। এই অনুভূতি সেই মাসগুলোতে আমাকে দখল করেছিলো এবং আমার সঙ্গী হয়ে উঠেছিলো। ভয়টা হলো, লোকটা অফিস থেকে বাড়ি ফিরবেন তাঁর চোখের নিচে কালি-পড়া সেই ফ্যাকাসে মুখখানা নিয়ে―কপালে ছোটো ছোটো ফুলে-ওঠা শিরাগুলো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস দিতো। ফিরেই মাকে গালিগালাজ শুরু করবেন, গত দশ বছরে মা কী কী করেছে তার ফিরিস্তি চাইবেন, জানতে চাইবেন আলাদা থাকার সময় মা কোন ধরনের লুচ্চামি রপ্ত করেছিলো, আর সব ইয়োসাকে গালাগালি করবেন, এক এক করে―নানা-নানিকে, মামি আর মামাদের। ওদের সবার গায়ে তিনি হাগেন―হ্যাঁ, হাগেন―ঐ ভোদাই লোকটা, যে কিনা তখন দেশের প্রেসিডেন্ট, তাদের আত্মীয়, তাতে হয়েছেটা কী? স্বাভাবিকভাবেই, তাঁর গায়েও তিনি হাগেন। আমি প্রচ- ভয় পেতাম। আমার পা কাঁপতো। মনে হতো, কুঁচকে একেবারে শূন্যে মিলিয়ে যাই, হাওয়ায় মিলিয়ে যাই। আর, রাগ সীমা ছাড়িয়ে গেলে যখন তিনি মাকে মারার জন্য ছুটে যেতেন, আমার সত্যি সত্যি মরে যেতে ইচ্ছা হতো, কারণ ঐ আতঙ্কের থেকে মরে যাওয়াই আমার কাছে ভালো মনে হতো।
মায়ের সঙ্গেআমাকেও তিনি মারধোর করতেন, প্রায়ই। প্রথমবার মেরেছিলেন এক রবিবারে, লা মাগদালেনার প্যারিশ চার্চে প্রার্থনা শেষ হয়ে যাবার পর। কোনো কারণে আমার শাস্তি চলছিলো, এবং আমার বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। আমি ভেবেছিলাম শাস্তির মধ্যে রবিবারের প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত নয়। মার অনুমতি নিয়ে আমি চার্চে গিয়েছিলাম। চার্চ থেকে বেরিয়েই লোকজনের ভিড়ের মধ্যে নীল ফোর্ডটাকে দেখলাম সিঁড়ির গোড়াটাতেই দাঁড়িয়ে আছে। তাঁকেও দেখলাম, রাস্তার উপর স্থির দাঁড়িয়ে আছেন, আমার অপেক্ষায়। তাঁর মুখের চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারলাম কী ঘটতে চলেছে। কিংবা, আমি সম্ভবত বুঝিনি, কারণ সেটা একেবারে শুরুর দিকের কথা, এবং আমি তখনো তাঁকে চিনতে পারিনি। আমি বোধহয় ভেবেছিলাম, আমার মামারা আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মাঝে মাঝে যেমনটা করতেন, তেমনি আমার মাথায় একটা গাট্টা মারবেন, বা কান টেনে দেবেন এবং পাঁচ মিনিট পর পুরো ব্যাপারটা সবাই ভুলে যাবে। একটা কথাও না বলে তিনি আমার গালে এতো জোরে এক চড় কষালেন যে আমি মাটিতে ছিটকে পড়লাম। তারপর আবার একটা মার দিয়ে গাড়িতে ঠেলে তুললেন। গাড়িতে তিনি ঐ ভয়ঙ্কর নোংরা শব্দগুলো উচ্চারণ করতে শুরু করলেন, যেগুলো তাঁর মারের মতই আমাকে বেদম কষ্ট দিতো। বাড়িতে পৌঁছে আমাকে তিনি মারতে লাগলেন আর মাপ চাইতে বলতে লাগলেন। সেই সাথে শাসাতে লাগলেন যে, তিনি আমাকে সোজা করে ছাড়বেন, ব্যাটাছেলে বানিয়ে তবে ছাড়বেন, কারণ ইয়োসারা তাঁর ছেলেকে যে-রকম মেয়েলি করে বড়ো করেছে সেটা তিনি সহ্য করবেন না।
তখন, আতঙ্কের সাথে সাথে আমার তাঁর প্রতি জাগল ঘৃণা। ‘মেয়েলি’ শব্দটা নিষ্ঠুর, এবং আমার কাছেও তখন তা-ই মনে হয়েছিলো। রাতে বিছানায় এলোমেলোভাবে শুয়ে শুয়ে শুনছিলাম তিনি চিৎকার করে মাকে গালাগালি করছেন। হঠাৎ মনে হলো, জগতের সব অভিশাপ যেন তাঁর ওপর নেমে আসে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মামা হুয়ান, লুচো, পেদ্রো আর হোর্হে যেন একদিন তাঁকে ধরে আচ্ছামতো ধোলাই দেন। কিন্তু ভয় আমাকে ঘিরে ধরলো, কারণ নিজের বাবাকে ঘৃণা করা নিশ্চয়ই সাংঘাতিক পাপ যে-জন্য ঈশ্বর আমাকে শাস্তি দেবেন। লা সাইয়েতে প্রতিদিন সকালে কনফেশন হতো, এবং আমি বারবার কনফেশন করলাম। নিজের বাবাকে ঘৃণা করা আর তাঁর মৃত্যু কামনা করা―যাতে আমার মা আর আমি আবার আমাদের আগের জীবন ফিরে পেতে পারি―এই পাপের জন্য আমার সবসময় বিবেকদংশন হচ্ছিলো। একই পাপ বারবার করতে হওয়ায় আমি প্রত্যেকবার কনফেশন অনুষ্ঠানে ঢুকতাম আর লজ্জায় আমার মুখ ঝাঁ ঝাঁ করতো।
বলিভিয়া বা পিউরা―কোথাও আমি খুব একটা ধার্মিক ছিলাম না। লা সাইয়ে এবং স্যলিজন ব্রাদার্স স্কুলে আমার সহপাঠীদের মধ্যে যে-অজস্র শুদ্ধাত্মা ক্ষুদে ফেরেশতা ছিলো, তাদের একজন আমি কোনোদিন ছিলাম না। তবে লিমায় এই প্রথমবার আমি প্রায় সে-রকমই একজন হয়ে উঠলাম, যদিও তার কারণটা ছিল দুর্বল, কেননা সেটা ছিলো আমার পিতাকে প্রতিরোধ করবার একটা ভদ্রজনোচিত উপায়। ইয়োসাদের মতো ‘বকধার্মিকদের’ নিয়ে তিনি কৌতুক করতেন। কোনো চার্চের সামনে দিয়ে যাবার সময় ক্রুশ আঁকা কিংবা যাজক নামের স্কার্ট-পরা লোকেদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসার ক্যাথলিক রীতি―এ-রকম যে-সব মেয়েলি অভ্যাস ইয়োসারা আমার মধ্যে ঢুকিয়েছে, সেগুলো নিয়ে তিনি কৌতুক করতেন। তিনি বলতেন, ঈশ্বরের সাথে সুসম্পর্ক রাখার জন্য তাঁর কোনো মধ্যস্থতাকারীর দরকার নেই, দরকার নেই মেয়েদের স্কার্ট-পরা ঐ সব অলস, পরাশ্রয়ী জীবগুলোকে। কিন্তু, আমার ও মার ধর্মপরায়ণতা নিয়ে প্রচুর গালমন্দ করলেও আমাদের তিনি প্রার্থনায় যেতে নিষেধ করতেন না। সম্ভবত তাঁর সন্দেহ ছিলো যে, তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মেনে চললেও মা এই নিষেধটি মানবে না। ঈশ্বর এবং ক্যাথলিক চার্চের ওপর তার বিশ্বাস তাঁর প্রতি তার আবেগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিলো। তারপরও, কে জানে? আমার বাবার প্রতি আমার মার মাত্রাতিরিক্ত ও সীমা-ছাড়ানো ভালবাসা―আমার কাছে সবসময় যাকে মনে হয়েছে অত্যাচার-প্রিয় এবং অত্যাচারিত―ছিলো সেই প্রকৃতির, যা ঈশ্বরের বিরোধিতা করতেও পিছপা হয় না, এমনকি তাতে সফল হবার জন্য নরকভোগের শাস্তিও মাথা পেতে নেয়। যা-ই হোক, তিনি আমাদের প্রার্থনায় যেতে দিতেন, এবং কখনো কখনো তিনি নিজেও আমাদের সাথে যেতেন; আমার অনুমান, সেটা তাঁর সীমাহীন ঈর্ষার কারণে। প্রার্থনার পুরোটা সময় ধরে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন; ক্রুশ আঁকতেন না, ‘কনসেকরেশন’-এর সময় হাঁটুও গাড়তেন না। অন্যদিকে, আমি ওসব করতাম এবং একান্ত অভিনিবেশের সাথে প্রার্থনা করতাম―দু’হাত জোড় করা এবং চোখ অর্ধনিমীলিত। যতো ঘনঘন পারতাম আমি কমিউনিয়ন নিতাম। এইসব কর্মকা- ছিলো তাঁর কর্তৃত্বের বিরোধিতা করবার একটা পথ, এবং বোধহয় তাঁকে রাগিয়ে দেবারও।
কিন্তু ব্যাপারটা একই সাথে ছিলো বস্তুত আরো পরোক্ষ এবং সামান্যই সচেতন। কারণ তাঁর প্রতি আমার ভয় এতো প্রবল ছিলো যে, আমার শৈশবের দুঃস্বপ্নে রূপ-নেয়া তাঁর সেই ঝোড়ো ক্রোধকে সচেতনভাবে উস্কে দেবার ঝুঁকি নেবার সাহস আমার ছিলো না। আমার বিদ্রোহের প্রকাশ―যদি তাকে আদৌ ‘বিদ্রোহ’ বলা যায়―ছিলো দূর এবং কাপুরুষোচিত। সেগুলোর ছক-আঁকা চলতো আমার কল্পনায়। তাঁর দৃষ্টির আড়ালে নিরাপদ স্থানে, আমার বিছানায়, অন্ধকারে তাঁর বিরুদ্ধে আমি নানারকম দুষ্কর্ম উদ্ভাবন করতাম, কিংবা সেগুলোর বাস্তবায়ন করতাম এমন মনোভাব এবং ইঙ্গিতে যেগুলো আমি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে বোঝা ছিলো অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পিউরায় হোটেল দে তুরিস্তাসে সেই প্রথম সাক্ষাতের পর আর কখনোই তাঁকে চুমু না দেওয়া। লা মাগদালেনার ছোটো বাড়িটায় আমি মাকে চুমু দিতাম এবং তাঁকে কোনো রকমে শুভরাত্রি বলে উপরতলায় বিছানার দিকে দৌড় দিতাম। প্রথম প্রথম নিজের সাহসে আমি নিজেই ভয় পেতাম; ভয় পেতাম যে তিনি আমাকে ফিরে ডাকবেন, তাঁর স্থির চাহনি আমার ওপর নিবদ্ধ করবেন এবং তাঁর সেই ছুরির মতো তীক্ষ্ম কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করবেন কেন আমি তাঁকেও চুমু দিলাম না। কিন্তু তিনি আমাকে ডাকতেন না। কারণটা নিঃসন্দেহে ছিলো―কাঠের গুঁড়িটা যেমন একগুঁয়ে অহঙ্কারে ঠাসা ছিলো, তেমনি ছিলো সেটা থেকে জন্ম-নেওয়া এই ছোটো টুকরোটাও।
জুলিয়ার সঙ্গেআমরা সারাক্ষণ উদ্বেগের মধ্যে থাকতাম। আমার মনে হতো, যে-কোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবে, কোনো ভয়ানক বিপর্যয়; কোনো-এক সময় রাগের মাথায় তিনি মা বা আমাকে কিংবা আমাদের দুজনকেই মেরে ফেলবেন। ওটা ছিলো জগতের সবচেয়ে অদ্ভুত বাড়ি। একটি মানুষও কখনো বেড়াতে আসতো না, আমরাও কারো বাড়িতে কখনোই বেড়াতে যেতাম না। এমনকি চাচা সিজার এবং চাচি ওরিয়েলির বাড়িতেও আমরা যেতাম না, কারণ আমার পিতা সামাজিক মেলামেশা পছন্দ করতেন না। কাছাকাছি তিনি না থাকলে আমি মার মাথায় ঢোকাতে শুরু করলাম যে, আমার পিতার সাথে তার এই পুনর্মিলনের ফল আসলে একটিই―ভয়ে আমাদের মৃত্যু হওয়া। মা আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করতো যে, তিনি অতোটা খারাপ লোক নন। তাঁর অনেক গুণ আছে। তিনি কখনোই একটি ফোঁটা মদ খান না, ধূমপান করেন না, কোথাও রাত কাটান না। তিনি খুবই নম্র এবং পরিশ্রমী। এগুলো কি বড়ো গুণ নয়? আমি মাকে বলতাম যে, তিনি পাঁড় মাতাল হলেই বরং ভালো হতো। ভালো হতো যদি তিনি জীবনটা উপভোগ করতেন। কারণ তাতে করে তিনি আরো স্বাভাবিক একজন মানুষ হতে পারতেন। আর, তাতে করে মা ও আমি একসাথে বাইরে যেতে পারতাম, আমার বন্ধু-বান্ধব থাকতো, আর তাদেরকে আমি বাড়িতে ডাকতে পারতাম এবং আমিও তাদের বাড়িতে যেতে পারতাম।
লা মাগদালেনায় কয়েক মাস কাটবার পর আমার কাজিন এদুয়ার্দো, পেপে এবং হোর্হের সাথে আচমকা আমার সম্পর্কের ইতি ঘটলো। পারিবারিক এক ঝগড়ার কারণে আমার বাবা আর তাঁর ভাই সিজারের মধ্যে বহু বছরের জন্য সম্পর্কচ্ছেদ ঘটলো। সবকিছু আমার মনে নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে : একদিন চাচা সিজার তাঁর তিন ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে একটা ফুটবল ম্যাচ দেখাতে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমার পিতা বাড়িতে ছিলেন না। ততোদিনে আমি বিবেচক হতে শিখেছি। আমি তাই চাচাকে বললাম, তাঁর অনুমতি ছাড়া যাবার সাহস আমার নেই। চাচা বললেন, খেলার কথাটা তিনি পরে আমার পিতাকে বুঝিয়ে বলবেন। আমরা যখন ফিরলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমার পিতা চাচার বাড়ির বাইরের দরজার সামনের রাস্তায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জানালায় চাচি ওরিয়েলির ভয়ার্ত মুখ দেখা যাচ্ছিলো, যেনো আমাদেরকে কোনো ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন। সেই ভয়ানক ঝগড়ার কথা আমার এখনো মনে আছে। মনে আছে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পিছিয়ে যাওয়া বেচারা চাচার সাথে আমার পিতা কীভাবে চিৎকার করে কথা বলছিলেন। আর চাচা তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন। আরো মনে আছে আমার নিজের ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা; বাড়ি পর্যন্ত সারাটা পথ তিনি আমাকে লাথি মারতে মারতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যখন তিনি আমাকে মারছিলেন, আমি হাউমাউ করে চিৎকার করছিলাম। ভয়ের চোটে আমি বহুবার তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলাম। কিন্তু তাতে তাঁর রাগ কমলো না। তিনি আমাকে মারতেই থাকলেন, সেই সাথে চিৎকার করে হুমকি দিলেন―বয়স হলেই তিনি আমাকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেবেন, যাতে আমি সোজা পথে উঠি। পুরো ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেলে তিনি আমাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখলেন। তখন মার নয়, বরং অতখানি ভয় পাওয়া আর তাঁর সামনে অমন করে নত হবার জন্য নিজের প্রতি রাগ আর বিরক্তিতে আমার সারাটা রাত বিনিদ্র কাটল―নীরবে কেঁদে কেঁদে।
সেই দিন থেকে চাচা সিজার ও চাচি ওরিয়েলির বাড়িতে যাওয়া আর আমার চাচাতো ভাইদের সাথে মেলামেশা আমার জন্য নিষিদ্ধ হলো। ১৯৪৭-এর গ্রীষ্মকাল পার হয়ে আমি ১১তে পড়লাম। ততোদিন পর্যন্ত আমার সম্পূর্ণ একা কাটলো। লা সাইয়ে স্কুলে ক্লাস শুরু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হলো। কারণ তখন কয়েক ঘণ্টা আমি বাড়ির বাইরে কাটাতে পারছি। স্কুলের নীল বাসটা সকাল সাড়ে সাতটায় বাড়ির কাছ থেকে আমাকে তুলে নিতো, দুপুরে বাড়িতে দিয়ে যেতো, দেড়টায় আবার তুলে নিতো এবং পাঁচটায় আবার লা মাগদালেনায় ফিরিয়ে আনতো। আভেনিদা ব্রাসিল ধরে ব্রেনা পর্যন্ত পথটায় বাস থেমে থেমে স্কুলের ছেলেদের তুলে নিতো এবং নামিয়ে দিতো। সেই পথটুকু আমার জন্য ছিলো ঘরের বন্দিত্ব থেকে ক্ষণিকের মুক্তি, আমি অপার আনন্দ পেতাম। আমাদের ষষ্ঠ গ্রেডের শিক্ষক ব্রাদার লিওনসিও ছিলেন এক লালমুখো ফরাসি, বয়স ষাটের কোঠায়, বদরাগি। সাদা এলোমেলো চুলের ভারি গোছা বারবার কপালে এসে পড়তো, আর তিনি ঘোড়ার মতো ঝটকা দিয়ে মাথা নেড়ে সেগুলো যথাস্থানে ফেরত পাঠাতেন। তিনি আমাদেরকে ফ্রে লুইস দে লিওন-এর কবিতা মুখস্থ করাতেন। ক্লাসের আর সবাই স্কুলের পুরনো ছাত্র; কয়েক বছর ধরে তারা একসঙ্গে পড়ছে। নবাগতের স্বাভাবিক অস্বাচ্ছন্দ্য আমি শিগগিরই কাটিয়ে উঠলাম এবং অনেক ভাল বন্ধু জোটালাম। তিন বছর সেখানে আমি পড়েছি। কারো কারো সাথে বন্ধুত্ব এর পরেও টিকে ছিলো। তাদের মধ্যে ছিলো হোসে মিগেল ওভিদো―আমরা একই ডেস্কে বসতাম। পরে সে সাহিত্য-সমালোচক হয় এবং সে-ই প্রথম আমাকে নিয়ে বই লেখে।
কিন্তু এইসব বন্ধু এবং অল্প কজন ভালো শিক্ষককে পেয়েও আমার লা সাইয়ে-র স্মৃতি আমার বাবার উপস্থিতির কারণে মেঘাচ্ছন্ন। তাঁর সর্বব্যাপী ছায়া ক্রমশ বড়ো হচ্ছিলো, সে-ছায়া পদে পদে আমাকে অনুসরণ করতো এবং মনে হতো, আমার সব কাজে নাক গলিয়ে সেগুলো ভ-ুল করে দিচ্ছে। আসল স্কুলজীবনটা থাকে খেলাধূলা আর অনুষ্ঠানাদির মধ্যে। সে-জীবন যাপিত হয় ক্লাসের সময় নয়, বরং তার আগে ও পরে, এখানে-ওখানে বন্ধুদের মিলিত হওয়ায়, কিংবা নিজেদের বাড়িতে। সেখানে সবাই একে অন্যকে খুঁজে বের করে এবং একসাথে হয়ে ম্যাটিনিতে সিনেমা দেখার, কিংবা কোনো পার্টিতে যাবার, অথবা কোনো দুষ্টুমির পরিকল্পনা করে। ক্লাসের সমান্তরালে এইসব কর্মকা- ছেলেদের শিক্ষাকে গভীর করে। এ হলো শৈশবের চমকপ্রদ অ্যাডভেঞ্চার। বলিভিয়া এবং পিউরায় আমি সেটা পেয়েছিলাম, এখন আর নয়। আমি সেই সময়ের স্মৃতি নিয়েই থাকতাম। লা সাইয়ে-র যে-সহপাঠীরা ক্লাসের পরও বাড়ি না গিয়ে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলতে পারতো, এক অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যেতে পারতো, এবং রবিবার ছাড়াও কাছাকাছি সিনেমা হলে গিয়ে সিরিয়াল দেখতে পারতো―যেমন পেরো মার্টিনেজ, কিংবা পেরালেস, কিংবা ভিয়েহা সানেলি, অথবা ফ্লাকো রামোস―তাদেরকে আমার খুবই হিংসে হতো। স্কুল ছুটি হলেই আমাকে বাড়ি ফিরতে হতো, এবং ঘরে বন্দি হয়ে বাড়ির কাজ করতে হতো। বন্ধুদের মধ্যে কখনো কেউ চা খেতে, কিংবা রবিবারের প্রার্থনার পরে তার বাড়িতে যেতে, দুপুরের খাবার খেতে, অথবা ম্যাটিনিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতো, আমাকে বিচিত্র সব অজুহাত দেখাতে হতো। কারণ, ঐ সব কাজের জন্য বাবার অনুমতি চাওয়ার সাহস আমার ছিলো না।
লা মাগদালেনায় ফিরে আমি মাকে অনুনয় করতাম আমাকে রাতের খাবার আগেই দিয়ে দিতে, যাতে আমার পিতা ফেরার আগেই আমি বিছানায় যেতে পারি এবং পরের দিনের আগে তাঁর সাথে কোনোমতে দেখা না হয়। প্রায়ই আমার খাওয়া শেষ হবার আগেই দরজার বাইরে ফোর্ডটার ব্রেক কষার শব্দ শুনতাম এবং তাড়াতাড়ি দৌড়ে উপরে গিয়ে গায়ের সমস্ত জামাকাপড়সমেত বিছানায় লাফিয়ে পড়তাম, তারপর চাদরে মাথা পর্যন্ত ঢেকে ফেলতাম। কান পেতে থাকতাম, কখন তাঁরা খেতে বসবেন অথবা রেডিও সেন্ট্রালে তেরেসিতা আর্চি’র “লা চোলা পুরিফিকাসিওন চকা” (“মেস্তিযা পিউরিফিকেশন চকা”) অনুষ্ঠান দেখবেন, অনুষ্ঠানটা দেখে তিনি হাসিতে ফেটে পড়বেন, আর সেই ফাঁকে আমি বিছানা থেকে পা টিপে টিপে নেমে পাজামা পরে নিতে পারি।
মামা হুয়ান, মামি লরা, তাঁদের মেয়ে ন্যান্সি ও গ্লাদিস, মামা হোর্হে ও মামি গ্যাবি, এবং মামা পেদ্রো লিমায় আছেন কিন্তু ইয়োসা পরিবারের প্রতি আমার পিতার বিরূপতার কারণে তাঁদের কাছে আমরা বেড়াতে যেতে পারছি না―এই চিন্তা বাবার শাসনে থাকার মতোই আমাকে মনকে বিষিয়ে তুলতো। আমার মা অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করতো, “তোমার বাবা তার নিজের মতো। শান্তিতে, আনন্দের সাথে বাঁচতে হলে তাকে আমাদের সন্তুষ্ট করতে হবে।” সেগুলো আমি কানেও তুলতাম না। কেন উনি আমার মামি, মামা আর মামাত ভাইবোনদের সাথে দেখা করতে দেন না? তিনি কাছেপিঠে না থাকলে মা আর আমি যখন একা হতাম, আমি নিরাপত্তার বোধ ফিরে পেতাম এবং আবার স্বচ্ছন্দে উদ্ধত আচরণ করতাম, যেসব আচরণ আমার নানা-নানি আর মামাই প্রশ্রয়-মেশানো মনে সহ্য করতেন। আমরা দুজনে এমন কোথাও পালিয়ে যাবো যেখানে আমার পিতা আমাদের কোনোদিন খুঁজে পাবেন না, এমন দাবিতে প্রায়ই আমি মাকে অতিষ্ঠ করে তুলতাম। এগুলো নিশ্চয়ই তার জীবনকে আরো অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছিলো। একদিন আমি ভীষণ বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। মাকে হুমকি দিলাম, যদি আমরা না পালাই, তাহলে আমি বাবাকে বলে দেবো যে, পিউরায় আসকারাতে নামে যে-স্প্যানিশ লোকটা আমাকে শান্ত করার জন্য বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো, সে-লোকটা প্রিফেক্টের বাড়িতে তার সাথে দেখা করতো। সে কাঁদতে আরম্ভ করলো। আমার নিজেকে জঘন্যরকম নীচ মনে হলো।
অবশেষে একদিন আমরা পালালাম। আমার মনে নেই কোন ঝগড়াটা মাকে ঐ বিরাট সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য করেছিলো। অবশ্য ব্যাপারটাকে ‘ঝগড়া’ বলাটা বাড়াবাড়ি। কারণ, ঘটনা যা হতো তা হলো, তিনি চিৎকার করতেন, অপমান করতেন, উন্মত্ত গালাগালি করতেন আর মা কাঁদত অথবা টুঁ শব্দটি না করে বসে থাকতো। বোধহয়, এটা হলো সেই ঘটনা যেটা আমার মনে সবচেয়ে বাজে স্মৃতিগুলোর একটা হিসেবে রয়ে গেছে। কোথাও থেকে নীল ফোর্ডটাকে করে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম। আমার মা পুরনো কোনো একটা ঘটনার কথা বলছিলো। হঠাৎ সে এলসা নামে আরেকিপার একটি মহিলার নাম বললো। “এলসা?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কোন এলসা?” আমি কাঁপতে আরম্ভ করলাম। “তো, সেই এলসা,” মা তোতলাতে লাগল এবং প্রসঙ্গ পাল্টাতে চেষ্টা করলো। “এক নম্বর বেশ্যা একটা”, তিনি হিসহিস করে উঠলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর আচমকা মাকে জোরে চিৎকার করে উঠতে শুনলাম। মার পায়ে তিনি এমন জোরে চিমটি কেটেছেন যে, সঙ্গে সঙ্গে অনেকখানি জায়গা বেগুনি হয়ে ফুলে উঠেছে। পরে মা সেটা আমাকে দেখিয়ে বললো যে সে আর সহ্য করতে পারছে না। “চলো চলে যাই, মা, চিরদিনের জন্য চলে যাই, চলো পালাই এখান থেকে।”
তিনি অফিসে রওয়ানা দেওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করলাম। হাতেই নেওয়া যায় এরকম হালকা অল্প কয়েকটা জিনিস নিয়ে ট্যাক্সিতে করে আমরা মিরাফ্লোরেস-এর আভেনিদা ২৮ দে হুলিওতে গেলাম। সেখানে মামা হোর্হে ও মামি গাবি থাকতেন। মামা পেদ্রোও সেখানে থাকতেন, তখনো বিয়ে করেন নি, সে বছরই তাঁর ডাক্তারি পড়া শেষ হবে। আবার আমার মামি আর মামাদের দেখা পেয়ে এবং দুধারে গাছের সারিঅলা রাস্তা আর সযত্নে-করা বাগানঅলা ছোটো ছোটো বাড়ি দিয়ে সাজানো সেই সুন্দর জায়গাটায় গিয়ে আমার আনন্দ আর ধরছিলো না। সবচেয়ে বড়ো কথা, আমার পরিবারের কাছে আমি আবার ফিরে এসেছি―ঐ লোকটার থেকে অনেক দূরে―এই অনুভূতির তুলনা নেই। আর জানি যে, তাঁকে কখনোই আর দেখতে হবে না, তাঁর কথা শুনতে হবে না বা ভয় পেতে হবে না। মামা হোর্হে আর মামি গাবির বাড়িটা ছিলো ছোটো। তাছাড়া তাঁদের দুটো বাচ্চা, সিলভিয়া আর হোরগিতো, কেবলই হাঁটতে শিখেছে। তবে কোনোরকমে আমাদের সবার জায়গা হয়ে গেলো। আমি ঘুমালাম একটা আর্মচেয়ারে, আমার আনন্দের আর সীমা রইলো না। এখন আমাদের কী হবে? আমার মা, মামি আর মামার মধ্যে দীর্ঘ কথাবার্তা হলো। আমাকে সেখানে থাকতে দেওয়া হলো না। যাই হোক, ঐ লোকটার কাছ থেকে মুক্তি দেবার জন্য ঈশ্বর, মা মেরি আর লিমপিয়াস দেবতাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার ছিলো না; ঐ দেবতাকে আমার নানি কারমেন খুব মানতেন।
অল্প কয়েকদিন পর ক্লাসশেষে আমি লা সাইয়ে স্কুলবাসে উঠতে যাবো―বাসটা ছাত্র নিয়ে সান ইসিদ্রো এবং লা সালেতে যেতো―আমার হৃৎস্পন্দন থেমে গেলো; তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন। “ভয় পেও না,” তিনি আমাকে বললেন, “আমি কিছু করবো না। আমার সাথে এসো।” খেয়াল করলাম, তাঁকে খুব ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ, যেনো অনেকদিন ঘুমাননি। গাড়িতে বন্ধুভাবাপন্ন স্বরে কথা বলছিলেন। আমাকে বললেন, বাসা থেকে আমার আর মার কাপড়চোপড় নিয়ে তিনি আমাকে মিরাফ্লোরেস নিয়ে যাবেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, তাঁর এই নরম ব্যবহার একটা লুকনো ফাঁদ, এবং আভেনিদা সালাভেরির বাড়িতে নিয়েই তিনি আমাকে পেটাবেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। আমাদের কিছু কাপড় তিনি আগেই স্যুটকেসে ভরে ফেলেছেন। বাকিগুলো ব্যাগে ভরতে তাঁকে আমার সাহায্য করতে হলো। ব্যাগও শেষ হয়ে গেলে একটা নীল কম্বলে অবশিষ্ট কাপড়গুলো নিয়ে চারকোণ বেঁধে নেওয়া হলো। কাজ করছিলাম আর আমার হৃৎপি-টা সুতোয় ঝুলছিলো। কেবলই ভয় হচ্ছিলো, যে-কোনো সময় তিনি আমাকে যেতে দেবার জন্য আফসোস করবেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, আমার মা তার রাতের টেবিলে যেসব ছবি রেখেছিলো তার অনেকগুলো তিনি সরিয়ে ফেলেছেন। অর্থাৎ, আমাকে আর মাকে মুছে ফেলেছেন। অন্য ছবিগুলোতে তিনি পিন ফুটিয়ে রেখেছেন। সবকিছু বাঁধাছাঁদা শেষ হলে তিনি সেগুলো নামিয়ে নীল ফোর্ডটাতে তুলে রওয়ানা দিলেন। ব্যাপারটা এতো সহজে ঘটবে আমার সে-বিশ্বাস ছিলো না, বিশ্বাস ছিলো না তিনি অমন সমঝোতাসূচক আচরণ করবেন। মিরাফ্লোরেসে মামা হোর্হে ও মামি গ্যাবির বাড়ির সামনে পৌঁছে তিনি নিজেই মালপত্রগুলো নামালেন, কাজের মহিলাটিকে ডাকতে দিলেন না। সব নামিয়ে দিয়েই তিনি চলে গেলেন। সেগুলো বৃক্ষশোভিত ফুটপাতে পড়ে রইলো। কম্বলের বাঁধন খুলে কাপড় আর এটা-সেটা জিনিসপত্র বেরিয়ে পড়ে রইলো লনের ওপর। পরে মামা হোর্হে এবং মামি গাবি মন্তব্য করলেন, এই একটি দৃশ্য দেখেই প্রতিবেশিরা আমাদের পরিবারের ভেতরের গোলমাল ভালভাবেই বুঝে নিয়েছে।
অল্প কয়েকদিন পর দুপুরের খাবারের জন্য বাড়ি ফিরে মামা হোর্হে এবং মামি গাবির মুখে অদ্ভুত কিছু-একটা লক্ষ করলাম। কী হয়েছে? মা কোথায়? তাঁরা তাঁদের অভ্যাসমতো খবরটা দিলেন কৌশলে, জানেন যে সেটা হবে আমার জন্যে সাংঘাতিক হতাশাজনক। মা আর বাবার মধ্যে আবার মিটমাট হয়েছে এবং সে আবার তাঁর কাছে ফিরে গেছে। সেই বিকেলে স্কুল থেকে বেরিয়ে মিরাফ্লোরেসে যাবার বদলে আমাকেও যেতে হলো ঐ আভেনিদা সালাভেরিতে। আমার সামনে দুনিয়া ভেঙে পড়ছিলো। এমন কাজ সে কী করে করতে পারলো? আমার মা-ও শেষে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে? সবকিছু বোঝার বয়স তখন আমার হয় নি, সেগুলো শুধুই আমাকে ভোগাচ্ছিলো। আমাদের পলায়ন, তারপর বাবা-মার মধ্যে আবার আরো তিক্ত সমঝোতা―প্রত্যেকবার এসব থেকে বেরিয়ে আমার মনে হতো, জীবন আকস্মিক আঘাতে ভরা, তার কোনো সান্ত¡না নেই। কয়েকটি দিন বা সপ্তাহ শান্ত থেকে তিনি সামান্যতম অজুহাতে আবার মারধোর আর অপমান করা শুরু করবেন, এটা ভালোভাবে জানা থাকার পরেও কেন মা বারবার তাঁর সাথে আপস করতো? সেটা সে করতো, কারণ সবকিছুর পরেও সে তাঁকে ভালবাসতো একগুঁয়ের মতো। সেই একগুঁয়েমি ছিলো তার স্বভাবজাত (তার থেকে আমিও সেটা পেয়েছি)। আরো কারণ হলো, তিনিই ছিলেন তার ঈশ্বরদত্ত স্বামী, আর তার মতো মহিলার আমৃত্যু একটিই স্বামী থাকা সম্ভব ছিলো, যদিও তিনি তার সাথে দুর্ব্যবহার করতেন, এবং যদিও তার কাছে একখানা অস্পষ্ট আধা-নিশ্চিত তালাক-আদেশ ছিলো। তাছাড়া, কোচাবাম্বা এবং পিউরায় গ্রেস লাইনে কাজ করলেও আমার মা বড়ো হয়েছে স্বামীর সংসার করার জন্য, গৃহবধূ হবার জন্য। তাই শুধু নিজের উপার্জনে নিজের ও ছেলের জীবন নির্বাহ করায় নিজেকে সে অসমর্থ মনে করতো। নানা-নানির ঘাড়ে বসে মা-ছেলে খাচ্ছি বলে তার লজ্জাবোধ হতো―অতখানি সচ্ছল তো তাঁরা ছিলেন না। অত বড়ো একটা গুষ্টির বোঝা পিঠে নিয়ে নানা কখনোই অর্থসঞ্চয় করতে পারেননি। আবার এক সময় আমাদেরকে মামা আর মামিদের বোঝা হয়ে উঠতে হতো; লিমায় আর্থিক সচ্ছলতার জন্য তাঁরা নিজেরাই কঠোর সংগ্রাম করছিলেন। এখন আমি সেটা বুঝি, কিন্তু সেই এগারো-বারো বছর বয়সে আমি এসব বুঝতাম না। আর বুঝলেও বুঝতে চাইতাম না। আমি কেবল একটা জিনিস জানতাম এবং বুঝতাম যে, যতোবারই আমার বাবা-মার মধ্যে আপস হবে, আমাকে ফিরে যেতে হবে বন্দিত্বে, একাকিত্ব আর ভয়ে। এটাই ক্রমে ক্রমে আমার মনকে আমার মার প্রতিও তিক্ততায় ভরে দিচ্ছিলো। আমার পিতার সাথে দেখা হবার আগে আমি মার যতো কাছাকাছি ছিলাম, দেখা হবার পর আর কখনোই ততো কাছাকাছি যেতে পারিনি।
মার্কেস ও ইয়োসা দুই বন্ধু১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত সময়ে কয়েকবার আমরা পালিয়েছিলাম, অন্তত ছয়বার। পালিয়ে প্রত্যেকবারই যেতাম হয় মামা হোর্হে ও মামি গাবির বাড়িতে, নয়তো মামা হুয়ান আর মামি লরার কাছে। তাঁরাও মিরাফ্লোরেসে থাকতেন। আর, সেই পালিয়ে-থাকা কয়েকদিনের মধ্যেই আমার অনেক-ভয়ের সেই মীমাংসা ঘটে যেতো। আজ এতো বছর পর সেই বারবার পালানো, লুকিয়ে আশ্রয় নেওয়া, অশ্রুসিক্ত অভ্যর্থনা, আর আন্ট-আঙ্কলদের খাবার ঘর কিংবা বসার ঘরে অস্থায়ী বিছানা পাতা―এসবকে কীরকম হাস্যকর মনে হয়। স্যুটকেস আর বোঁচকার বোঝা সারাক্ষণই থাকতো, লেগে থাকতো আসা আর যাওয়া। লা মাগদালেনার বাসের বদলে হঠাৎ করে কেন মিরাফ্লোরেসের বাস ধরছি, আবার কেনই-বা কদিন পরে আবার লা মাগদালেনার বাসে উঠছি, লা সাইয়েতে ব্রাদার আর সহপাঠীদের কাছে তার ব্যাখ্যা দেয়াও ভীষণ লজ্জাজনক হয়ে উঠেছিলো। প্রায়ই প্রশ্ন শুনতাম, আমি কি আবার এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি গিয়েছি, নাকি যাইনি? কারণ আমাদের মতো আর কেউ অতো ঘন ঘন একবার এ-বাড়ি আরেকবার ও-বাড়ি করে বেড়াতো না।
সময়টা আমার ঠিক মনে নেই। তবে তখন গ্রীষ্মকাল, সুতরাং সেটা নিশ্চয়ই আমাদের লিমা পৌঁছানোর অল্প পরেই হবে। একদিন আমার বাবা গাড়িতে একা আমাকে নিয়ে বের হলেন। পথে তুলে ছেলেকে তিনি গাড়িতে তুলে নিলেন। ওদের সাথে তিনি আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন: “এরা তোমার ভাই।” বড়োজন আমার থেকে এক বছরের বড়ো, নাম এনরিকে। অন্যজন দুবছরের ছোটো, তার নাম এর্নেস্তো। এর্নেস্তোর সোনালি চুল আর হালকা নীল চোখ দেখে যে-কেউ বুঝবে সে বিদেশি। আমরা তিনজনই লজ্জা পাচ্ছিলাম, কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমার পিতা আমাদের আগুয়া দালসে সৈকতে নিয়ে গেলেন, একটা ছাতা ভাড়া করলেন। তারপর সেটার ছায়ায় বসে আমাদের পাঠালেন বালুতে খেলতে আর সমুদ্রে স্নান করতে। একটু একটু করে আমরা ঘনিষ্ঠ হতে আরম্ভ করলাম। তারা কলেজিও সান আন্দ্রেস-এ পড়ে, কথা বলে ইংরেজিতে। সান আন্দ্রেস প্রোটেস্টান্ট স্কুল না? ওদেরকে সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হলো না। পরে মা আমাকে বললো, তার সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর বাবা এক জার্মান মহিলাকে বিয়ে করেন। এনরিকে আর এর্নেস্তো আমার বাবা আর সেই মহিলার সন্তান। কিন্তু কয়েক বছর পরেই সেই বিদেশিনীর সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, কারণ সেই মহিলাও ছিলেন চড়া মেজাজের। বাবার বাজে মেজাজ সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এরপর অনেকদিন আমি আর আমার সেই ভাইদের দেখা পাইনি। আমাদের নিয়মিত পলায়ন তখনো চলছিলো। এবার আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম মামি লরা আর মামা হুয়ান-এর বাড়িতে। স্কুল ছুটির পর বাবা লা সাইয়েতে এসে উপস্থিত। আগেরবারের মতো তিনি আমাকে নীল ফোর্ডে ওঠালেন। তাঁর ভাবভঙ্গিতে ভীষণ জেদের লক্ষণ। আমি ভয় পেলাম। “ইয়োসারা তোমাকে বিদেশে পাঠানোর মতলব করেছে,” জানালেন তিনি। “প্রেসিডেন্টের সাথে আত্মীয়তার সুযোগ নিচ্ছে। ওরা আমাকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করছে, দেখবো কে জেতে।” লা মাগদালেনায় না গিয়ে আমরা গেলাম জেসাস মারিয়ায়। লাল ইটের তৈরি কয়েকটা ছোটো বাড়ির সামনে থেমে আমাকে গাড়ি থেকে নামালেন, দরজায় কড়া নাড়লেন, তারপর আমরা ভেতরে ঢুকলাম। আমার সেই ভাইদের দেখলাম সেখানে। সাথে তাদের মা। সোনালি চুলের মহিলাটি আমাকে এক কাপ চা খাওয়ালেন। “সবকিছু ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত তুমি এখানেই থাকবে,” বাবা বললেন। তারপর চলে গেলেন।
দুদিন সেখানে ছিলাম। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। মনে হলো, মাকে আর কখনো দেখতে পাবো না। উনি আমাকে অপহরণ করেছেন। এখন থেকে এটাই হবে আমার বাড়ি। আমার ভাইরা তাদের একটি বিছানা আমাকে ছেড়ে দিলো, অন্যটা তারা দুজন ভাগাভাগি করে নিলো। রাতে আমার কান্না শুনে তাদের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘরের বাতি জ্বালিয়ে আমাকে ওরা সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। আমি কাঁদতেই থাকলাম। শেষে মহিলাটিও এসে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। দুদিন পর আমার পিতা আমাকে নিতে এলেন। আমার বাবা-মার আবার মিটমাট হয়েছে, মা আমার জন্য লা মাগদালেনার বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। পরে মা আমাকে জানালো, আসলে সে প্রেসিডেন্টের কাছে বিদেশে কোথাও পেরুর কনস্যুলেটে একটা চাকরি চাইবে বলে ভাবছিলো। বাবা সেটা বুঝে ফেলেছেন। আমাকে যে তিনি অপহরণ করেছিলেন, তাতে কি প্রমাণ হয় না যে তিনি আমাকে ভালোবাসেন। বাবা আমাকে ভালোবাসেন, আর, আমারও উচিত তাঁকে ভালোবাসা, কারণ হাজার হলেও উনি আমার বাবা। এটা যখন মা আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলো তখন তাঁর প্রতি আমার মন আরো তিক্ত হয়ে উঠছিলো। তাঁর ঐ বারবার মীমাংসার চেয়ে এই তিক্ততা আরো বেশি।
যদ্দুর মনে আছে, ঐ বছর আমি আমার ভাইদের আর অল্প কয়েকবারই দেখেছিলাম। প্রত্যেকবারই দেখা হয়েছে অল্প কয়েক ঘণ্টার জন্য। পরের বছর তারা তাদের মায়ের সাথে লস এঞ্জেলস চলে যায়। এর্নেস্তো আর তার মা এখনো বেঁচে আছে। সে এখন আমেরিকার নাগরিক, আর্নি নামে পরিচিত এবং ধনী উকিল। স্কুলের পড়ার সময়েই এনরিকে লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়। খুব কষ্ট পেয়ে সে মারা যায়। মারা যাবার সামান্য আগে অল্প কয়েকদিনের জন্য সে লিমায় এসেছিলো। আমি ওকে দেখতে গিয়েছিলাম। ওকে চিনতেই পারছিলাম না। অসুখে ভুগে পলকা আর এতটুকু হয়ে গিয়েছে। লিমায় ওর পাঠানো সুদর্শন আর হাসিখুশি যে-ছেলেটার ছবি কখনো কখনো আমার পিতা আমাদের দেখাতেন, তার সাথে এর কোনো মিলই নেই।
বিদেশিনীর (মা ও আমি ঐ নামেই তাকে ডাকতাম) বাড়িতে আমাকে বন্দি করে রেখে একদিন আচমকা বাবা মামা হুয়ান-এর বাড়িতে উপস্থিত হলেন। বাড়ির ভেতরে না ঢুকে কাজের মহিলাটিকে তিনি বললেন যে তিনি আমার মামার সাথে কথা বলতে চান এবং গাড়িতেই অপেক্ষা করছেন। বহুদিন আগে ১৯৩৫-এর শেষে আমার মাকে আরেকিপা বিমানবন্দরে ছেড়ে চলে যাবার পর থেকে পরিবারের কারো সাথে কথা বলার পরিস্থিতি তাঁর ছিলো না। কিছুদিন পর মামা হুয়ান আমাকে তাঁদের সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছিলেন; একদম সিনেমার মতো ব্যাপার। বাবা তাঁর নীল ফোর্ডের ড্রাইভিং সিটে তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিলেন। তিনি গাড়িতে উঠে বসলে বাবা তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, “আমার কাছে অস্ত্র আছে এবং আমি যে-কোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি।” মামা হুয়ানের সন্দেহ নিরসনের জন্য তিনি পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে দেখালেন। বললেন, প্রেসিডেন্টের সাথে সম্পর্কের সুযোগে যদি তাঁরা আমাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি প্রতিশোধ নেবেন। তারপর তিনি তাঁকে ইচ্ছেমতো গালাগালি করলেন। কারণ তাঁরা আমাকে ওভাবে বড়ো করেছেন, আমাকে নষ্ট করেছেন এবং আমার মাথায় ঢুকিয়েছেন যে তাঁকে ঘৃণা করতে হবে। তাছাড়া বড়ো হয়ে আমি বুলফাইটার এবং কবি হবো, এমন সৌখিন চিন্তাও আমার মাথায় ঢুকিয়েছেন। তাঁর সুনাম নষ্ট হতে বসেছে এবং তিনি চান না তাঁর ছেলে মেয়েদের মতো হোক। এই প্রায়-উন্মত্ত বক্তৃতার মধ্যে মামা হুয়ান প্রায় একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি। বক্তৃতা শেষ করে তিনি জানিয়ে দিলেন, আমার মা আমার সাথে বিদেশে চলে যাবে না, এই নিশ্চয়তা না দেয়া পর্যন্ত তাঁরা আমার মুখ দেখতে পাবেন না। তারপর তিনি চলে গেলেন।
মামা হুয়ানকে তিনি যে-রিভলভারটা দেখিয়েছিলেন, সেটা ছিল আমার শৈশব ও কৈশোরের এক প্রতীক-প্রতিম বস্তু। আমি আমার বাবার সাথে যতদিন ছিলাম ততদিন তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক কীরকম ছিল, রিভলভারটা ছিল তারই প্রতীক। লা পেরলা-র ছোট বাড়িটাতে থাকার সময় এক রাতে আমি ওটা দিয়ে তাঁকে গুলি ছুড়তে শুনেছিলাম। তবে আমার মনে নেই, কখনো নিজ চোখে সেটা দেখতে পেরেছিলাম কিনা। এটা একদম সত্যি যে, আমি ওটা সারাক্ষণই দেখতাম; দুঃস্বপ্নে আর আতঙ্কের মুহূর্তগুলোতে। যতবারই আমি শুনতাম বাবা চিৎকার করে মাকে হুমকি দিচ্ছেন, আমার সত্যিকার অর্থেই মনে হতো, তিনি যা বলছেন সত্যি তা-ই করবেন: রিভলভারটা বের করে পাঁচটি গুলির সবগুলোই ছুড়বেন প্রথমে মাকে তারপর আমাকে খুন করার জন্য।
যাই হোক, সেইসব ব্যর্থ পলায়নের ফল হিসেবে শেষ অব্দি আমার আভেনিদা সালাভেরি-র, এবং পরে, লা পেরলা-র জীবনে একটা ভারসাম্য এসেছিলো; মিরাফ্লোরেসে মামি ও মামাদের সাথে সপ্তাহান্তগুলো কাটানোর সুযোগ আদায় করতে পেরেছিলাম। কোনো এক পলায়নের পর যখন মিটমাটের প্রক্রিয়া চলছিলো, আমার মা তখন আমার পিতাকে এই মর্মে রাজি করাতে পেরেছিলো যে, শনিবারের ক্লাস শেষে আমি লা সাইয়ে থেকে সোজা মামি লরা ও মামা হুয়ানের বাড়িতে চলে যেতে পারবো। সোমবার সকালের ক্লাস শেষে আমি বাড়ি ফিরতাম। মিরাফ্লোরেসে তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি থেকে দূরে, আমার বয়সী অন্য ছেলেদের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারার জন্য সপ্তাহে ঐ দেড়টা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হয়ে উঠলো। সারা সপ্তাহ ধরে ঐ সময়টার কথাই আকুলভাবে কল্পনা করতাম। শনিবারের বিকেল আর রোববারটা মিরাফ্লোরেসে কাটিয়ে আমি যে-সাহস আর সুখস্মৃতিতে পূর্ণ হয়ে উঠতাম তা আমাকে বাকি পাঁচটি ভীতকর দিন টিকে থাকার শক্তি জোগাতো।
যৌবনে ইয়োসাপ্রত্যেক সপ্তাহান্তে আমি মিরাফ্লোরেসে যেতে পারতাম না; রিপোর্ট কার্ডে ঊ (অসাধারণ) কিংবা ঙ (ক্লাসে সর্বোচ্চ) থাকলেই কেবল যাবার অনুমতি মিলত। উ (সন্তোষজনক নয়) অথবা গ (খারাপ) থাকলে আমাকে বাড়ি ফিরে ঘরবন্দি হয়ে সপ্তহান্তটা কাটাতে হতো। যখন থেকে আমার পিতা বুঝে গিয়েছিলেন যে, জগতে আমার সবেচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার হচ্ছে তাঁর কাছ থেকে দূরে মিরাফ্লোরেসে সেই সপ্তাহান্তগুলো কাটানো, তখন থেকে অন্য কোনো কারণে শাস্তি হলে তিনি সোজা বলতেন: “এ সপ্তাহে তোমার মিরাফ্লোরেস যাওয়া হবে না।” তবুও, ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সাল এবং ১৯৫০-এর গ্রীষ্মকাল―এই সময়ের বেশিরভাগটাই আমার কেটেছে দুভাগে বিভক্ত হয়ে; সোমবার থেকে শুক্রবার লা মাগদালেনা কিংবা লা পেরলায়, শনিবার আর রোববার মিরাফ্লোরেসের দিয়েগো ফেরে বারিওতে।
বারিও ছিলো পরিবারের সমান্তরালে আর-একটা পরিবারের মতোই―সমবয়সী তরুণদের একটা দল। তাদের মধ্যে খেলাধুলা নিয়ে আলাপ চলতো কিংবা ফুত্বল অথবা তার ক্ষুদ্র সংস্করণ ফুলবিতো খেলা হতো। ক্লাব রেগাতাস-এর পুলে সাঁতার কাটতে অথবা মিরাফ্লোরেস সৈকতে লা হেরাদুরা-য় বডিসার্ফিং করতে যাওয়া হতো। এগারোটার প্রার্থনার পর পার্কের চারদিকে হাঁটা, লিউরো অথবা রিকার্দো পালমা সিনেমা হলে ম্যাটিনি শোতে যাওয়া, সালাসার উদ্যানের ভেতর দিয়ে খানিকটা হেঁটে আসা সবই চলত। বয়স একটু বাড়লে সিগারেট ফোঁকা, নাচ এবং মেয়ে পটানো শেখা হয়ে যেতো। মেয়েরা একটু একটু করে অভিভাবকদের কাছে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলার কিংবা শনিবার রাতে পার্টির আয়োজন করার অনুমতি পেতো। সেখানে একটা বোলেরো―তার মধ্যে লিও মারিনোর “আমি গুস্তাস”ই বেশি পছন্দ ছিলো―নাচতে নাচতে কোনো ছেলে কোনো মেয়ের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করতো যে সে তেমপ্লাদোস হয়েছে, অর্থাৎ প্রেমে পড়েছে। মেয়েটি বলতো, “ভেবে দেখব”, অথবা “ঠিক আছে”, কিংবা বলত, “পরে, এখন মা দেবে না”। উত্তরটা “ঠিক আছে” হলে মেয়েবন্ধু পাওয়া হয়ে গেলো। তখন তারা পার্টিতে গালে গাল লাগিয়ে নাচতে, একসাথে রোববারের ম্যাটিনিতে যেতে এবং অন্ধকারে চুমু খেতে পারতো। কিংবা আভেনিদা লারকো-র ক্রেম রিকায় আইসক্রিম খেয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে পারতো, এবং ছেলেটির ইচ্ছা হলে মেয়েটিকে সালাসার উদ্যান থেকে সাগরে সূর্যাস্ত দেখার আমন্ত্রণ জানাতে পারতো। মামি লরা এবং মামা হুয়ান মিরাফ্লোরেসের সবচেয়ে বিখ্যাত একটা এলাকায় ছোটো সাদা একটা দোতলা বাড়িতে থাকতেন। পনেরো, আঠারো এবং কুড়ি বছর বয়সী পুরনোদের সাথে ন্যান্সি ও গ্লাদিস ছিলো বারিওর কনিষ্ঠতম প্রজন্মের সদস্য। তাদের সৌজন্যে আমি সেই বারিওতে যোগ দিলাম। আমার এগারো থেকে চৌদ্দ বছর বয়স অব্দি সমস্ত সুখস্মৃতির জন্য আমি ঐ বারিওর কাছে ঋণী। আগে ওটার নাম ছিলো ‘সুখি বারিও’। খবরের কাগজগুলো হিরন হুয়াতিকা দে লা ভিক্তোরিয়াকে (পতিতারা যে-রাস্তায় থাকতো) ঐ নামে ডাকতে শুরু করলে সেটার নাম বদলে রাখা হয় দিয়েগো ফেরে অথবা কোলোন বারিও। কারণ ঐ দুই রাস্তার মোড়টাই ছিলো আমাদের মূল আখড়া।
গ্লাদিস এবং আমার জন্মদিন একই―২৮ মার্চ ১৯৪৮। সেদিন মামি লরা এবং মামা হুয়ান বারিওর ছেলেমেয়েদের নিয়ে পার্টি দিলেন। ঢুকেই দেখলাম ছেলেমেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় নাচছে, আমার দুই মামাতো বোনও নাচতে শিখে গেছে। সেই চমক আমার আজও মনে আছে। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, জন্মদিনের পার্টিটা দেওয়া হয়েছে শুধু মজা করবার জন্য নয়, রেকর্ড চাপিয়ে গান শুনতে এবং ছেলেমেয়েদের “মেলামেশা”র সুযোগ করে দিতে। আমার সব মামি ও মামারা সেখানে ছিলেন। তাঁরা আমাকে আমার বয়সী কয়েকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, যাদের সাথে পরে আমার দারুণ বন্ধুত্ব হয়―তিকো, কোকো, লুচিন, মারিও, লুকেন, ভিক্তর, এমিলিও, এল চিনো। তাদের পাল্লায় পড়ে আমি তেরেসিতাকে নাচের আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হলাম। লজ্জায় আমি মরে যাচ্ছিলাম, নিজেকে মনে হচ্ছিলো একটা রোবট, বুঝতে পারছিলাম না নিজের হাত-পাগুলো নিয়ে কী করবো।
তবে পরে আমি আমার মামাতো বোনদের সাথে এবং অন্য মেয়েদের সাথে নাচলাম। সেই দিন থেকে আমি তেরেসিতাকে নিয়ে প্রেমের স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলাম। সে-ই ছিলো আমার প্রথম প্রেম, ইনগে দ্বিতীয় আর হেলেনা তৃতীয়। ওদের তিনজনকেই আমি খুবই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেম নিবেদন করেছিলাম। আমরা ছেলেরা নিজেদের মধ্যে আগেই ভালো করে প্রেমের প্রস্তাবের মহড়া করে নিতাম। কেউ কোনো মেয়ের প্রেমে পড়লে যাতে সবকিছু প- হয়ে না যায় সেজন্য সবাই কোনো-না-কোনো পরামর্শ দিতো―কী কথা বলা হবে কিংবা কীভাবে বলা হবে। কেউ কেউ সিনেমা হলে প্রস্তাব দেওয়াটা পছন্দ করতো। তাতে ম্যাটিনির অন্ধকারের সুবিধাটা পাওয়া যায়, সিনেমার কোনো আবেগঘন মুহূর্তে কথাটা পাড়া গেলে তো কথাই নেই। তাদের ধারণা, তার একটা সংক্রামক প্রভাব আছে। মারিতসার ব্যাপারে আমি একবার সেই পদ্ধতি প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলাম। ঘনকালো চুলের খুব ফর্সা আর দারুণ সুন্দরী মেয়েটির সাথে সেই অভিজ্ঞতা হয়েছিলো হাস্যকর। দীর্ঘ দ্বিধার পর তার কানে কানে অনেকদিন-ধরে-সাজানো কথাগুলো ফিসফিস করে বললাম, “তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি কি আমার হবে?” সে ঘুরে আমার দিকে তাকালো, মেরি মাগদালেনের মতো কাঁদছে, সিনোমর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডুবে আছে। আমার কথা সে শুনতেই পায়নি। জিজ্ঞেস করলো, “কী? কিছু বললে?” যেখানে শেষ করেছি সেখান থেকে আবার শুরু করা আর সম্ভব ছিলো না। তোতলাতে তোতলাতে কেবল বলতে পারলাম, ‘সিনেমাটা কী দুঃখের, তাই না?’
তবে তেরে, ইনগে আর হেলেনাকে আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম প্রচলিত পদ্ধতিতে; শনিবার রাতের পার্টিতে বোলেরো নাচতে নাচতে। তিনজনের উদ্দেশেই আমি প্রেমের কবিতা লিখতাম, তবে সেগুলো কখনো তাদের দেখাতাম না। সারা সপ্তাহ আমি তাদের স্বপ্নে দেখতাম। আবার দেখা হতে কদিন বাকি আছে গুনতাম, আর প্রার্থনা করতাম শনিবারে যেনো একটা পার্টি হয় আর সেখানে আমি আমার প্রিয়ার গালে গাল লাগিয়ে নাচতে পারি। রোববারের ম্যাটিনিতে আমি অন্ধকারে তাদের হাত আঁকড়ে ধরতাম, কিন্তু চুমু খাবার সাহস পেতাম না। শুধু ‘স্পিন দ্য বট্ল’ কিংবা ‘ফরফিট’ খেলার সময়ই কেবল আমি তাদের চুমু খেতাম। আমার বারিওর বন্ধুদের জানা ছিলো তারা আমার প্রেমিকা। খেলায় হারলে শাস্তি হিসেবে তারা আমাদের দূরে পাঠিয়ে দিতো, যাতে আমরা তিন, চার, এমনকি দশটি করে চুমু খেতে পারি। কিন্তু সেসব চুমু ছিলো গালে। লুচিন চাইতো সবাই ওকে বড়ো বলে ভাবুক। ওর কাছে ওরকম চুমুর কোনো মূল্যই ছিলো না। কারণ গালে চুমু খেলে কোনো শব্দ হয় না। সেটা হয় ঠোঁটে চুমু খেলে। কিন্তু সেই সময়ে মিরাফ্লোরেসের বার-তের বছর বয়সী প্রেমিক-যুগলরা একেকজন ছিলো কমবেশি ছোট্ট নিষ্পাপ ফেরেশতা। সত্যি সত্যি ঠোঁটে চুমু খাবার সাহস তাদের মধ্যে খুব বেশিজনের ছিলো না। স্বাভাবিকভাবেই, আমারও তেমন সাহস হয়নি। শাবক যেভাবে চাঁদের প্রেমে পড়ে, আমার প্রেম ছিল তেমনি―ঐ সুন্দর প্রবচনটা আমরা ব্যবহার করতাম প্রেমোন্মাদ ছেলেদের অবস্থা বোঝাতে। কিন্তু মিরাফ্লোসের মেয়েদের ব্যাপারে আমি ছিলাম অস্বাভাবিকরকম ভীতু।
সপ্তাহান্তটা মিরাফ্লোরেসে কাটানোটা ছিলো এক অবাধ অ্যাডভেঞ্চার, হাজারো উপভোগ্য এবং উত্তেজক ঘটনার সম্ভাবনায় ভরা। ফুলবিতো খেলতে কিংবা পুলে এক চক্কর সাঁতার কাটতে―যে পুল একদা বড়ো বড়ো সাঁতারুর জন্ম দিয়েছিলো―ক্লাব তেরাযাস-এ যাওয়া। সব খেলাই আমার পছন্দ ছিলো, তবে তার মধ্যে আমি সবচাইতে ভালো ছিলাম যেটাতে, তা হলো সাঁতার। ‘ক্রল’টা আমি খুবই ভালো রপ্ত করেছিলাম, এবং আমার একটা আফসোস ছিলো ‘যাদুকর’ ওয়াল্টার লেডগার্ড পরিচালিত একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে না পারা। আমার বয়েসি মিরাফ্লোরেসের কোনো কোনো ছেলে সেটা করেছিলো এবং পরে তারা আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো, যেমন ইসমায়েল মেরিনো কিংবা রাবিত ভিয়ারান। ফুটবলে আমি কখোনোই খুব বেশি ভালো ছিলাম না, তবে অত্যুৎসাহ দিয়ে আমি আমার দক্ষতার অভাব পূরণ করতাম, এবং আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিনগুলোর একটি ছিলো সেই রবিবারটি, যেদিন আমাদের বারিওর তারকা তোতো তেরি আমাকে ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে নিয়ে গিয়ে উনিভার্সিতারিও দে দেপোর্তেস-এর অল্পবয়সি খেলোয়াড়দের হয়ে নামিয়ে দিয়েছিলেন দেপোর্তিভো মিউনিসিপাল-এর কিশোরদের বিরুদ্ধে খেলার জন্য। সেরা দলের ইউনিফর্ম পরে সেই বিশাল মাঠে ঢোকার চেয়ে বড়ো ঘটনা এই জগতে একজন মানুষের জীবনে আর কী ঘটতে পারে বলুন? আর, উনিভার্সিতারিও-র সোনালি চুলের “তীর” তোতো তেরি আমাদের বারিওর―এতে কী প্রমাণ হয় না যে আমাদেরটাই মিরাফ্লোরেসের সেরা বারিও। সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনী হয়ে গিয়েছিলো আমাদের আয়োজিত টানা কয়েকটা সপ্তাহান্ত ধরে চলা এক “অলিম্পিক গেমস” প্রতিযোগিতায়। কাইয়ে সান মার্টিন-এর বারিওর সাথে আমাদের বারিওর সেই প্রতিযোগিতায় ছিলো সাইক্লিং, ফিল্ড অ্যান্ড ট্র্যাক, ফুলবিতো এবং সাঁতার।
বছরের সেরা সময় ছিলো কার্নিভাল। দিনের বেলা আমরা বেরোতাম লোকজনের ওপর পানি ছিটানোর জন্য, আর বিকেলে জলদস্যু সেজে যেতাম মুখোশ-ঢাকা বল নাচে। তিনটা বল হতো বাচ্চাদের জন্য, যেগুলো কিছুতেই ফসকে যেতে দিতাম না : একটা হতো বারানকো-র পার্কে, একটা ক্লাব তেরাযাস-এ, আর একটা লন টেনিস ক্লাব-এ। আমরা রঙ-বেরঙের কাগজের ফিতা আর ঈথার-ভরা পিচকিরি কিনতাম। আর, একই রকমের পোশাক-পরা আমাদের বারিওর দলটা হতো যেমন বড়ো তেমনি ফুর্তিবাজ। ওরকম এক কার্নিভালে দামাসো পেরেস প্রাদো তাঁর বাদকদল নিয়ে এসেছিলেন। ক্যারিবিয়ানে সদ্য-উদ্ভাবিত মামবো লিমাতেও তখন খুব চলছে। তার প্রতিযোগীরা প্লাসা দে আচো-এ আয়োজিত জাতীয় মামবো চ্যাম্পিয়নশীপে অব্দি ডাক পেয়েছিলেন, কিন্তু আর্চবিশপ মনসিয়ঁ গেভারা সেটা নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং হুমকি দিয়েছিলেন যে, কেউ তাতে গেলে তাকে চার্চ থেকে বের করে দেবেন। পেরেস প্রাদোর আগমনে কোরপাক বিমানবন্দর লোকারণ্য হয়ে উঠেছিলো। সেখানেও আমি সবান্ধব উপস্থিত ছিলাম। “এল রুলেতেরো” আর “মামবো নুমেরো সিনকো”র রচয়িতাকে যখন হুড-নামানো একটা কনভার্টিব্ল গাড়ি হোটেল বলিভারে নিয়ে যাচ্ছিলো, আর তিনি ডানে-বাঁয়ে দাঁড়ানো লোকজনকে সম্ভাষণ জানাচ্ছিলেন, আমি আর আমার বন্ধুরা তখন গাড়িটার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছিলাম। প্রতি শনিবার দুপুরে দিয়েগো ফেরের বাড়িটায় পৌঁছেই আমি রাতের পার্টির প্রস্তুতি হিসেবে সিঁড়িতে এবং এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে মামবো নাচের চর্চা শুরু করে দিতাম। মামি লরা আর মামা হুয়ান আমার কা- দেখে হাসতেন।
তেরেসিতা আর ইনগে ছিলো ক্ষণিকের প্রেয়সী―অল্পকয় সপ্তাহের জন্য―বাচ্চাদের খেলা আর পুতুলের ভালোবাসার মাঝামাঝি কিছু-একটা, জিদ যাকে বলেন ভালোবাসার নির্দোষ ঘূর্ণি। তবে হেলেনার সাথে প্রেমটা ছিলো সিরিয়াস, লম্বা সময়ের জন্য এবং স্থির; তার ক্ষেত্রে ‘প্রেমিকা’ শব্দটা কয়েক মাসব্যাপী, এমনকি পুরো এক বছরের সম্পর্ক বোঝায়। সে ছিলো ন্যান্সির ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং কলেজিও লা রিপারাসিওন-এর সহপাঠিনী। দিয়েগো ফেরে থেকে খানিকটা দূরে গ্রিমালদো দেল সোলার-এ―ওখানেও এটা বারিও ছিলো―গেরুয়া রঙের একগুচ্ছ ছোটো ছোটো বাড়ি ছিলো, সেগুলোর একটাতে হেলেনা থাকতো। সেখানকার মেয়েদের সঙ্গে বাইরের কোনো পুরুষের প্রেম করাটাকে ভালো চোখে দেখা হতো না; সেটাকে সীমানা লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু মুশকিল হলো, আমি গভীরভাবে হেলেনার প্রেমে পড়েছিলাম, এবং মিরাফ্লোরেসে পৌঁছেই আমি হেলেনাকে দেখতে গ্রিমালদো দেল সোলার-এ ছুটতাম―আর কিছু না হোক, অন্তত দূর থেকে, ওর বাড়ির জানালায়। ওখানে যেতে আমি সঙ্গ ধরতাম লুচিন আর আমার মিতা মারিওর; দ্বিতীয়জন আবার হেলেনার প্রতিবেশিনী ইল্সে আর লুসির কাছ থেকে প্রেমের অঙ্গীকার পেয়েছিলো। ভাগ্য যেদিন সহায় থাকতো, সেদিন আমরা তাদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে একদ- কথা বলতে পারতাম। কিন্তু পাড়ার বাচ্চাগুলো বাছা-বাছা ঠাট্টা-মস্করা কিংবা পাথরের টুকরো ছোড়ার জন্য চারদিক থেকে কাছিয়ে আসতো। ওরকম এক বিকেলে তাদের সাথে আমাদের ঘুষোঘুষি অব্দি করতে হয়েছিলো, কারণ তারা লাথি মেরে আমাদেরকে তাদের এলাকা থেকে খেদাতে চাইছিলো।
হেলেনার ছিলো সোনালি চুল, উজ্জ্বল নীল চোখ, খুব সুন্দর দু’সারি দাঁত, আর হাসিটা ছিলো দারুণ উচ্ছল। ১৯৮৪তে আমরা লা পেরলা-য় চলে গিয়েছিলাম। সেখানকার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের খোলা প্রান্তরের মাঝখানে ছোটো বাড়িটার বিচ্ছিন্নতা আর একাকীত্বের মধ্যে আমি ওর অভাববোধ করতাম ভীষণ। ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিস-এ কাজ করার পাশাপাশি আমার বাবা তখন জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে সেগুলো বিক্রি করতেন―কয়েক বছর ধরে সেটা ছিলো তাঁর উপার্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কথাটা আমি বলছি খানিকটা দ্বিধার সঙ্গে, কেননা তাঁর জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মতো তাঁর আর্থিক অবস্থাও আমার কাছে ছিলো এক রহস্য। তাঁর উপার্জন কি ভালো ছিলো? তার অনেকটা কি তিনি সঞ্চয় করেছিলেন? তাঁর জীবনযাপন ছিলো যারপরনাই হিসেবি। তিনি কখনোই কোনো রেস্টুরেন্টে যেতেন না, এবং বলাবাহুল্য, খুবই কম যেতেন কোনো ক্যাবারেতে―কাবানা, এমব্যাসি, কিংবা বলিভার গ্রিল―আমার মামা-মামি যেখানে কখনো কখনো যেতেন শনিবারের রাতে নাচতে। হতে পারে, বড়জোর মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দু-একবার সিনেমায় যেতেন, তবে নিজের চোখে আমি সেরকম কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। হয়তো, সপ্তাহান্তে আমি যখন মিরাফ্লোরেসে, তখন তাঁরা যেতেন। সোম থেকে শুক্রবার তিনি সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে অফিস থেকে সোজা বাড়ি ফিরতেন, রাতের খাবার খেয়ে এক-দুই ঘণ্টার জন্য রেডিও শুনতে বসতেন, তারপর বিছানায়। রেডিও সেন্ট্রাল-এ প্রচারিত তেরেসিতা আর্কে-র কমিক সিরিজ “লা চোলা পুরিফিকেসিওন চকা” অনুষ্ঠান শুনে তিনি সবসময়ই হাসতেন, এবং সেটাই ছিলো সেই বাড়িতে খানিকটা মুক্ত বাতাস প্রবাহের একমাত্র উপলক্ষ। আর, আমাদের গৃহকর্তা এবং প্রভুর সাথে তাল মিলিয়ে মা এবং আমিও হাসতাম। একজন ফোরম্যানকে নিয়ে লা পেরলা-র ঐ ছোট্ট বাড়িটা তিনি নিজেই বানিয়েছিলেন।
চল্লিশের দশকের শেষের দিকে লা পেরলা ছিলো বিশাল এক খালি জায়গা। দালান-কোঠা যা ছিলো, সবই সেই আভেনিদা দে লাস পালমেরাস আর আভেনিদা প্রোগ্রেসো-তে। রাস্তার মোড়ের সেই চত্বর আর সাগরমুখী খাড়া গিরিশিরাটার মাঝামাঝি বাকি জায়গায় ছিলো তারের মতো সোজা করে বানানো একটার পর একটা ব্লক। সেখানে রাস্তার আলো আর ফুটপাতও ছিলো, কিন্তু বাড়িঘর একটাও নয়। আমাদের বাড়িটা ছিলো সেই এলাকায় প্রথম বাড়িগুলোর একটা। আর, যে দেড়-দুই বছর আমরা সেই এলাকায় ছিলাম, ছিলাম ধূ-ধূ এক তেপান্তরে। অল্প কয়েক ব্লক দূরে বেলাভিস্তার দিকে একটা লোকবসতি ছিলো। সেখানে ছিলো চীনাদের একটা মুদি দোকান, যাকে এখনও পেরুতে বলে চিনো। অন্য প্রান্তে, সাগরের কাছাকাছি ছিলো পুলিস স্টেশন। জায়গাটার অমন নির্জনতার কারণে মা সারাটা দিন একা একা সেখানে থাকতে ভয় পেতো। এক রাতে ছাদে পায়ের শব্দ শুনে চোর ধরতে আমার পিতা বাইরে বেরোলেন। চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেলে আমি দুটো ফাঁকা গুলির আওয়াজ শুনলাম; অনুপ্রবেশকারীকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর জন্য সেই প্রাচীন রিভলভারটা দিয়ে গুলিদুটো ছুড়েছিলেন তিনি। মামাই তখন আমাদের সঙ্গে থাকেন। রাতের পোশাক পরে সাদা-কালো টাইল্স দিয়ে সাজানো ঠাণ্ডা হলওয়েতে দাঁড়ানো ছোটোখাটো বৃদ্ধাটির ভয়ার্ত মুখ আমার পরিষ্কার মনে আছে। হলওয়ের দুপাশে ছিলো তাঁর আর আমাদের ঘর।
আভেনিদা সালাভেরির ছোট্ট বাড়িতে আমার ছিলো বন্ধু-বান্ধবের অভাব। আর, লা পেরলায় আমার জীবন ছিলো যেন এক অন্ধকূপ। ছোট্ট আন্তঃশহর লিমা-কাইয়াও মিনিবাসে করে আমি লা সাইয়েতে যাতায়াত করতাম। আভেনিদা প্রোগ্রেসোতে বাস ধরে নামতাম আভেনিদা ভেনেজুয়েলাতে, সেখান থেকে স্কুল মাত্র কয়েক ব্লকের হাঁটা পথ। আধা-আবাসিক ছাত্র হিসেবে সেখানে আমি ভর্তি হয়েছিলাম, যাতে দুপুরের খাবারটা লা সাইয়েতে খেতে পারি। বিকেল পাঁচটার দিকে যখন আমি লা পেরলায় বাড়িতে ফিরতাম, অফিস থেকে ফিরতে বাবার তখনো অনেক দেরি। সেই ফাঁকে আমি একটা ফুটবল হাতে খালি-পড়ে-থাকা জায়গাগুলোতে গিয়ে সেটাতে এদিক-সেদিক লাথি মারতাম―একেবারে সেই পুলিশ স্টেশন এবং গিরিশিরা অব্দি। তারপর বাড়ি ফিরতাম। আর, সেটাই ছিলো আমার প্রতিদিনকার একমাত্র বিনোদন। দাঁড়ান, আমি মিথ্যে বলছি। আসলে, আমার সবচেয়ে বড়ো বিনোদন ছিলো হেলেনার কথা ভাবা আর তার উদ্দেশে চিঠি এবং প্রেমের কবিতা লেখা। কবিতা লেখাটা একই সঙ্গে ছিলো আমার পিতার বিরোধিতা করার গোপন উপায়গুলোর একটা। কারণ আমি জানতাম, আমার পদ্যরচনার খবরটা তাঁর কতখানি বিরক্তি উৎপাদন করবে। কেননা, ওই কাজটাকে তিনি উড়নচণ্ডী ছন্নছাড়া স্বভাব আর অকর্ম্মণ্যতার―যা তাঁর কাছে ছিলো সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার―সাথে এক করে দেখতেন। আমার অনুমান, কবিতা লেখাটাকে―যদি আদৌ তার প্রয়োজন থেকে থাকে―তিনি মেয়েদের কাজ বলে মনে করতেন। অবশ্য তাঁর বিচারে কাব্যরচনার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অপ্রমাণিতই থেকে গেছে। কেননা, আমার নিজেরগুলো ছাড়া গদ্যে কিংবা পদ্যে লেখা আর একটা বইও ঐ বাড়িতে ছিলো না। আর, খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছুই তাঁকে আমি কখনো পড়তে দেখিনি। কবিতা লেখার মতো একটা কাজ পুরুষ মানুষে করবে, এটা তিনি মানতেই পারতেন না। ওভাবে খামোখা সময় নষ্ট করাটা তাঁকে ভীষণ আহত করতো। তাছাড়া তাঁর বিচারে, ট্রাউজার পরে এবং অণ্ডকোষ আছে, এমন কারো সাথে ঐ কাজটা কিছুতেই যায় না।
আমি অনেকের অনেক পদ্য পড়তাম এবং মুখস্থ করতাম―বেকুয়ের, চোকানো, আমাদো নেরভো, হুয়ান দে দিওস পেসা, যোরিইয়া―এবং নিজেও লিখতাম, হোমওয়ার্ক শেষ করার আগে এবং পরে, এবং কখনো কখনো সপ্তাহান্তে সাহস করে মামি লালা, মামা হুয়ান কিংবা মামা লুচো-কে সেগুলো পড়ে শোনাতাম। তকে কখনো হেলেনাকে নয়, যে কিনা ছিলো সেই সব কাব্যোচ্ছ্বাসের প্রেরণা ও প্রকৃত উদ্দেশ্য। আমার পদ্যরচনা নজরে পড়লে বাবা আমাকে একটা ড্রেসিং-গাউন পরিয়ে দেবেন, এই চিন্তা ব্যাপারটার মধ্যে একটা ভয়ের আবহ তৈরি করে রাখতো। আবার এ-ও সত্যি যে, সেই কারণেই তা আমার কাছে আরো বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো। হেলেনিতার সাথে আমি বেড়াতে যাচ্ছি, এটা দেখে আমার মামিরা ও মামারা খুব খুশি হয়েছিলেন, এবং মামি লালা-র বাড়িতে আমার মার সাথে তার দেখা হলে মা-ও তাকে ভীষণ পছন্দ করেছিলেন―কী সুন্দর ছোট্ট মেয়েটা, আর কী লক্ষ্মী! কয়েক বছর পরে আমি তাকে দুঃখ করে বলতে শুনেছি, হেলেনিতার মতো মেয়েকে বিয়ে না করে তার ছেলে বোকামি করেছে।
লিওনসিও প্রাদো মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ঢোকা পর্যন্ত হেলেনা ছিলো আমার প্রেয়সী। আমার চতুর্দশ জন্মবার্ষিকীর অল্প কয়েক দিন পরে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে তার সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর সে ছিলো আমার শেষ প্রেয়সীও―সেটা ‘প্রেয়সী’ শব্দটার সেকালের বিচারে ভব্য, সিরিয়াস এবং নির্ভেজাল আবেগগত অর্থে। (তার পরে সেই প্রেমের মধ্যে যা এসেছিলো, তা আরো জটিল এবং কম উল্লেখযোগ্য।) আমি হেলেনার প্রেমে অতো গভীরভাবে মজেছিলাম বলে একদিন আমি আমার রিপোর্ট কার্ড জালিয়াতি করে বসলাম। লা সাইয়ে-র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষক কানোন পারেদেস ছিলেন একজন নবিশ, আমি সবসময়ই তাঁর দারুণ ভক্ত ছিলাম। এক সপ্তাহান্তে তিনি আমার হাতে অসম্মানজনক “উ” লেখা―যার অর্থ, “সন্তোষজনক নয়”―রিপোর্ট কার্ডখানা দিলেন। অতএব, আমাকে এবার লা পেরলা-য় বাড়ি ফিরে যেতে হবে। কিন্তু মিরাফ্লোরেসে আর যাওয়া হবে না, সামনের সপ্তাহে হেলেনার সাথে দেখা হবে না, এটা সহ্য করা সম্ভব ছিলো না। আমি মামা-মামির কাছে রওনা দিলাম। সেখানে আমি “উ”কে ঘষে “ঙ” বানালাম―“ঙ” হলো ক্লাসে সর্বোচ্চ। মনে আশা, আমার চালাকি কেউ খেয়াল করবে না। কয়েক দিন পর কানোন পারেদেস সেটা আবিষ্কার করলেন, এবং আমার সাথে একটা কথা না বলে প্রিন্সিপাল আমার পিতাকে স্কুলে ডেকে পাঠালেন।
এর পরে যা ঘটলো, এমনকি আচমকা আনমনেও যখন আমার তা মনে পড়ে যায়, আমার লজ্জার আর শেষ থাকে না। টিফিনের পরে ক্লাসরুমে ফেরার লাইনে দাঁড়িয়েছি, দেখি দূরে বাবা উদয় হয়েছেন, সঙ্গে প্রিন্সিপাল ব্রাদার অগাস্টিন। আমার পিতা যখন লাইনের দিকে এগোলেন, আমি বুঝতে পারলাম তিনি সব জেনে গেছেন, এবং এক্ষুণি আমাকে তার মূল্য দিতে হবে। আমার মুখে তিনি এক ভয়ঙ্কর চড় কষালেন, সেটা দেখে মাঠের ছেলেরা একেবারে থ’। তারপর আমার এক কান ধরে তিনি আমাকে প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে চললেন। সেখানে গিয়ে, ব্রাদার অগাস্টিন-এর সামনে, শুরু হলো মার। তিনি আমার পিতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। আমার মনে হয়, মার দেখে দয়াপরবশ হয়ে প্রিন্সিপাল আমাকে স্কুল থেকে বের করে দিলেন না, যা আমার প্রাপ্য ছিলো। শাস্তি হিসেবে কয়েক সপ্তাহের জন্য আমার মিরাফ্লোরেস যাওয়া নিষিদ্ধ হলো।
১৯৪৮-এর অক্টোবরে জেনারেল ওদ্রিয়া-র সামরিক ক্যু গণতান্ত্রিক সরকারের অবসান ঘটালো এবং আঙ্কেল হোসে লুইস নির্বাসনে গেলেন। আমার পিতা এই ক্যু-কে এমনভাবে অভ্যর্থনা জানালেন যেনো সেটা তাঁর একটা ব্যক্তিগত জয়; ইয়োসা-রা এখন আর এই বড়াই করতে পারবে না যে, পেরুর প্রেসিডেন্ট তাদের আত্মীয়। লিমা-য় আসার পর থেকে আমার বাবা-মা-র কিংবা মামা-মামির বাড়িতে কোনো রাজনৈতিক আলোচনা শুনেছি বলে আমার মনে পড়ে না, কেবল আপরিস্তাদের সম্পর্কে দু-একটা ছাড়া-ছাড়া মন্তব্য ছাড়া। মনে হতো, আমার চারপাশের লোকজন সবাই ওদেরকে বদমাশ মনে করে। (এই একটি ব্যাপারে আমার পিতা ইয়োসাদের সঙ্গে একমত ছিলেন) কিন্তু বাস্তামান্তে-র পতন এবং জেনারেল ওদ্রিয়া-র উত্থান আমার পিতার জয়গর্বিত স্বগতোক্তির বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। সোজা আমার মায়ের করুণ মুখের দিকে তিনি কথাগুলো ছুড়ে দিতেন এবং ব্যাপারটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন।
ক্যু যেদিন হলো সেদিনই নানা পেদ্রো পিউরা-র প্রশাসকের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন এবং নিজের আত্মীয়-পরিজনকে―নানি কারমেন, মামাই, হোয়াকিন এবং ওরলান্দো―একত্র করে লিমায় নিয়ে এলেন। মামা লুচো এবং মামি ওলগা পিউরা-য় রয়ে গেলেন। পিউরা-র প্রিফেক্ট-এর পদটাই ছিলো আমার নানার শেষ স্থির চাকরি। তখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর এবং তখনো শক্তসমর্থ, আর মাথাও পরিষ্কার। আর তখনই আরম্ভ হলো তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ বেদনাদায়ক অধ্যায়―দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যবিত্তপনায় ধীর নিমজ্জন এবং দারিদ্র্য, যার বিরুদ্ধে তিনি অসমসাহসে লড়ে গেছেন, এদিক-সেদিক কাজ খুঁজছেন, কখনোবা একটা পাচ্ছেনও কিছু সময়ের জন্য―কোনো ব্যাঙ্কের হয়ে অডিট কিংবা লিকুইডেশন-এর কাজ, অথবা প্রশাসনিক এজেন্সিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির জন্য সামান্য কোনো কাজ। এইসব ছোটোখাটো সুযোগই তাঁকে আশায় পূর্ণ করে তুলতো―ভোর থাকতেই বিছানা ছেড়ে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নিয়ে “কাজে” যাবার সময় হবার জন্য অস্থিরভাবে অপেক্ষা করতেন। যদিও সেই “কাজ” বলতে হয়তো থাকতো স্রেফ কোনো মন্ত্রণালয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো আমলার দাপ্তরিক সিলটা তোলা। এইসব ছোটোখাটো কাজ করুণ এবং যান্ত্রিক হলেও তাঁকে বেঁচে থাকবার অনুভূতি জোগাতো এবং ছেলেদের লুকিয়ে-চুরিয়ে দেওয়া সামান্য মাসোহারায় জীবন চালানোর যন্ত্রণা লাঘব করতো। পরে, প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে (আমি জানি, তা ছিলো কাজ করতে সক্ষম হয়েও কাজ খুঁজে না পাবার দারুণ অবিচার, এবং অকর্ম্মণ্য এবং পরজীবী জীবনের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকার অনুভূতির বিরুদ্ধে তাঁর শরীরের প্রতিবাদ) যখন ঐ সব টুকিটাকি কাজও আর করতে পারতেন না, সেই কর্মহীনতা একটু একটু করে তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটিয়েছিলো। বাড়ি থেকে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় হন্তদন্ত হয়ে হাঁটাহাঁটি করে নিজের জন্য ‘কাজ’ তৈরি করতেন। আমার মামারা তাঁর জন্য একটা কাজের চেষ্টা করতেন, কোনো একটা ছোটাখাটো ব্যবসা, যাতে তাঁর নিজেকে একটা অকর্ম্মণ্য বৃদ্ধ মনে না হয়।
নাতি-নাতনিদের কোলে-কাঁখে নেবেন আর চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেবেন, আমার নানা পেদ্রো তেমন ধরনের মানুষ ছিলেন না। বাচ্চাদের তিনি পছন্দ করতেন না, এবং কখনো কখনো―বলিভিয়া-য়, পিউরা-য়, এবং পরে লিমা-য়―তাঁর নাতি-নাতনি এবং তাদেরও সন্তানেরা মিলে যখন একটা বিরাট গোষ্ঠী হয়ে উঠেছে, তিনি হুকুম করতেন সেটাকে ছোটো করতে। কিন্তু তিনি ছিলেন আমার দেখা সবচেয়ে কোমল ও উদার হৃদয়ের মানুষ। যখনই হতাশা আমাকে গ্রাস করে এবং বিশ্বাস করতে ইচ্ছে যায় যে মানবজাতি আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়, তখনই তাঁর কথা আমার মনে পড়ে। জীবনের একেবারে শেষ পর্র্যায়ে কপর্দকহীন বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর চিরকালের নৈতিক চরিত্রে কোনো শৈথিল্য আসেনি, এবং তাঁর সুদীর্ঘ জীবন ধরে ব্যতিক্রমহীনভাবে কিছু নির্দিষ্ট মূল্যবোধ এবং আচরণবিধির প্রতি তিনি বিশ্বস্ত থেকেছেন। সেই মূল্যবোধ ও আচরণবিধি পল্লবিত হয়েছিলো একটি ধর্ম এবং নীতিবোধ থেকে, যা তাঁর কাছে কখনোই তুচ্ছ কিংবা যান্ত্রিক ছিলো না। তাঁর জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের উৎস ছিলো সেই ধর্ম ও নীতিবোধ। নানি কারমেন বহু অনাথ জীবকে আশ্রয় দিয়েছিলো; আমাদেরকেও―জীবনের প্রথম দশ বছর নানাই ছিলেন আমার প্রকৃত পিতা, কারণ তিনিই আমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং খাইয়েছিলেন। যদি এই বিরাট গোষ্ঠীর বোঝা তাঁকে বইতে না হতো, তাহলে তাঁর শেষ জীবন অমন করুণভাবে দারিদ্র্যলাঞ্ছিত হতো না। কিন্তু এ-ও সত্যি যে, চুরিচামারি করলে কিংবা হিসেব কষে জীবন-যাপন করলে, অথবা সকল কাজে আরো কম মর্যাদাবোধ দেখালে ঐ শিখরে তিনি পৌঁছাতে পারতেন না। আমার বিশ্বাস, জীবনে তাঁর সবচেয়ে চিন্তার বিষয় ছিলো, সবকিছু এমনভাবে সামলানো যাতে নানি কারমেন কখনো না জানে যে, অশুভ আর পঙ্কিলও জীবনেরই অংশ। সেই সংগ্রামে নিজের সন্তানদের সহায়তা সত্ত্বেও কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর সফলতা ছিলো আংশিক মাত্র। তবে বহু দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে তিনি তাকে বাঁচাতে পেরেছিলেন, এবং যেসব ঠেকানো তাঁর সাধ্যাতীত ছিলো সেসব থেকে উল্লেখযোগ্য উপশম দিয়েছিলেন। এই কাজে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, আর নানি কারমেন সেটা জানতেনও, আর সে কারণেই, সুখ জিনিসটার অর্থ প্রায়শই অনৈতিকতার সমার্থক হওয়া সত্ত্বেও বিবাহিত জীবনে তাঁরা ছিলেন যারপরনাই সুখী।
যুবাবয়সে আমার নানার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘গ্রিংগো’, সেটা দৃশ্যত তাঁর সোনালি চুলের জন্য। আমার নিজের যতোখানি মনে আছে, তাঁকে দেখেছি মাথায় অল্প সাদা চুল, লালচে মুখ, আর সেই বিরাট নাক যা ইয়োসা পরিবারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আর হাঁটুনিও―পরিবারের সবার মতো দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে। অনেক কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিলো, কিছু স্বরচিত আর কিছু অন্যদের রচনা। সেগুলো তিনি আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন। ছোটোবেলাতেই আমাকে কবিতা লিখতে দেখে তিনি খুশি হয়েছিলেন, পরে খবরের কাগজে আমার নিবন্ধ ছাপা হতে দেখে তাঁর উৎসাহের আর অন্ত ছিলো না, আর আমি যখন এমন অবস্থানে পৌঁছুলাম যে আমার নিজের লেখা বই প্রকাশিত হলো, তখন তা দেখে তাঁর অন্তর তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। যদিও আমি নিশ্চিত যে, আমার প্রথম উপন্যাস লা সিউদাদ ঈ লস পেরোস (নায়কের কাল)―বেরোবার সাথে সাথেই স্পেন থেকে সেটা আমি তাঁদের পাঠিয়েছিলাম―দেখে তিনি বিপদও গুনেছিলেন, ঠিক আমার নানি কারমেন-এর মতোই। নানি আমাকে বলেছিলো যে, আশঙ্কার কারণ হলো―উপন্যাসটি নোংরা শব্দে পরিপূর্ণ। কেননা, তিনি একজন ভদ্রলোক, আর ভদ্রলোকেরা কখনো নোংরা শব্দ বলে না, লেখে আরো কম।
১৯৫৬র নির্বাচনে মানুয়েল প্রাদো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন হোর্হে ফের্নান্দেজ স্টল। তিনি আমার নানাকে অফিসে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি আরেকিপার প্রিফেক্ট হতে রাজি আছেন কি না। নানাকে অতো খুশি আমি কখনো দেখিনি। আবার তাঁর একটা কাজ হয়েছে, ছেলেদের ওপর আর নির্ভর করতে হবে না। তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি আরেকিপায় তিনি ফিরে যাবেন আবার। দারুণ যত্নে তিনি তাঁর যোগদান অনুষ্ঠানের জন্য একটা বক্তৃতা লিখলেন, এবং কাইয়ে পোর্তা-র বাড়ির ছোট্ট খাবার ঘরটায় বসে আমাদের সেটা পড়ে শোনালেন। আমরা সেটা শুনে হাততালি দিলাম। তিনি মৃদু হাসলেন। কিন্তু মন্ত্রী আর তাঁকে ফোন করলেন না, তাঁর ফোনের জবাবও দিলেন না। অনেক পরে তিনি তাঁকে জানালেন যে, প্রেসিডেন্ট প্রাদোর সহযোগী এপিআরএ বাস্তামান্তে ঈ রিভেরো-র সাথে তাঁর সম্পর্কের কারণে তাঁর নিয়োগ-প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। তাঁর জন্য সেটা ছিলো এক কঠিন আঘাত, কিন্তু সেজন্য কাউকে দায়ী করতে তাঁকে আমি কখনোই শুনিনি।
পিউরা-র প্রিফেক্ট-এর পদ ছেড়ে দেবার পর নানি কারমেনকে নিয়ে নানা মিরাফ্লোরেসে আভেনিদা দস দে মায়ো-র একটা ফ্ল্যাটে উঠে এলেন। এই ছোটো বাসাটাতে তাঁদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিলো। এর অল্পকাল পরে আন্টি মামাই লা পেরলো-য় আমাদের কাছে চলে এলেন। ভীষণ অপছন্দ যে-পরিবার, তারই একজন প্রতিনিধিকে নিজের গৃহস্থালির অংশ করে নিতে আমার পিতা কীভাবে রাজি হয়েছিলেন, সেটা এখনও আমার কাছে এক রহস্য। কারণটা বোধহয় ছিলো এই যে, এভাবেই তাঁর অফিসে অবস্থানের দীর্ঘ সময়টায় মা সঙ্গ পাবে। যতোদিন আমরা লা পেরলা-য় ছিলাম, মামাই আমাদের সঙ্গেই ছিলেন।
তাঁর আসল নাম ছিলো এলভিরা। আমার নানি কারমেনের মামাতো বোন ছিলেন তিনি। শৈশবেই তাঁর বাবা-মা তাঁকে পরিত্যাগ করেন এবং উনিশ শতকের শেষের তাকনা-য় আমার নানা-নানির বাবা-মা তাঁকে পোষ্য নেন। তাঁরা তাকে আপন মেয়ের মতোই প্রতিপালন করেন। কৈশোরেই চিলি-র এক অফিসারের সাথে তাঁর বাগদান হয়। বিয়ের দিন কাছিয়ে এলে―পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী তাঁর বিয়ের গাউন ততোদিনে বানানো হয়ে গেছে এবং বিয়ের নিমন্ত্রণও সবার কাছে পৌঁছে গেছে―কিছু একটা তাঁর মধ্যে ঘটলো, কিছু একটা তিনি আবিষ্কার করলেন এবং বিয়ে ভেঙে দিলেন। আমৃত্যু তিনি কুমারিই থেকে যান। ১০৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আমার নানির সঙ্গ তিনি কোনোদিন ছাড়েননি। তাঁর সঙ্গে তিনি প্রথমে যান আরেকিপা, যেখানে নানির বিয়ে হয়, এরপর তাঁর সঙ্গেই ঘুরে বেড়ান বলিভিয়া, পিউরা এবং লিমা। আমার মা এবং মামারা তাঁর হাতেই মানুষ, তাঁরা সবাই তাঁকে ডাকতেন আন্টি মামাই বলে। আমাকে এবং আমার মামাতো ভাই-বোনদেরও তিনি মানুষ করেন। এমনকি আমাদের সন্তানদেরও তিনি কোলে করেছেন। তাঁর বিয়ে ভেঙে দেয়ার রহস্য, যার কারণে তিনি আজীবন কুমারিত্ব বেছে নেন, তিনি ছাড়া একমাত্র জানতো আমার নানি কারমেন। সে রহস্য তাঁরা নিজেদের সঙ্গে কবরে নিয়ে যান। আমাদের পরিবারে মামাই ছিলেন এক অভিভাবকতুল্য ছায়া―সবার দ্বিতীয় মা। কেউ অসুখে পড়লে তার শিয়রে সারা রাত তিনিই জাগতেন, বাচ্চা রাখা থেকে তাদের অভিভাবকত্ব সবই করতেন, সবাই বাইরে গেলে বাড়ির দেখাশোনাও তিনিই করতেন―কখনোই কোনো অভিযোগ করেননি―সবাইকেই তিনি ভালোবাসতেন, আমাদের সবাইকেই লালন-পালন করেছেন। অন্যরা যখন রেডিও শুনতো কেবল তখনই তিনিও শুনতেন। চোখ যতোদিন ভালো ছিলো নিজের তরুণ বয়সের বইগুলো বারবার পড়তেন। এবং অবশ্যই, প্রার্থনা আর সময়মতো রবিবারে গির্জায় হাজির হওয়া। আর এসবই ছিলো তাঁর বিনোদন।
লা পেরলা-য় আমার মাকে তিনি প্রচুর সঙ্গ দিয়েছেন। বাড়িতে তাঁকে পাওয়া আমার জন্য ছিলো এক দারুণ খুশির ব্যাপার। আর, আমার বাবার রাগের প্রকোপও তাঁর উপস্থিতির কারণে কম হতো। প্রতিবার, যখনই বাবা মার ওপর রেগে যেতেন, সঙ্গে গালাগালি আর মারধোর, পা টেনে টেনে ঐ ছোটোখাটো মানুষটি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেন, হাত জোড় করে তাঁকে মিনতি করতেন : “এর্নেস্তো, দোহাই বাবা,” “এর্নেস্তো, যা কিছু তোমার প্রিয়, সবকিছুর দোহাই।” বাবা সাধারণত তাঁর মিনতি শোনার চেষ্টা করতেন এবং শান্ত হতেন।
১৯৪৮-এর শেষে―সেটা ডিসেম্বরের শুরু কিংবা মাঝামাঝি―মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা ততদিনে শেষ হয়ে গেছে, লা সাইয়ে-তে কিছু একটা আমার মধ্যে ঘটলো, যা ঈশ্বরের সাথে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা ধীর কিন্তু চূড়ান্ত প্রভাব ফেললো। ধর্ম ব্যাপারে এতোদিন আমাকে যা শেখানো হয়েছে, তার প্রত্যেকটি আমি বিশ্বাস করতাম ও পালন করতাম, এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব আর ক্যাথলিক ধর্মের সত্যিকার রূপ আমার কাছে এতো বেশি স্পষ্ট ছিলো যে, সেসব সম্পর্কে সংশয়ের ছায়ামাত্রও আমার মাথায় কখনোই ঢুকতে পারেনি। অথচ আমার মতো ছেলের বেলায়ই কিনা অমন ঘটলো! বিশ্বাসী ধার্মিকদের তথা আমাকে আর আমার মাকে নিয়ে আমার বাবার ঠাট্টা-মশ্করা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ়ই করতো কেবল। যে-লোকটা আমার কাছে নিষ্ঠুরতা আর শয়তানির প্রতিমূর্তি, তার পক্ষে অবিশ্বাসী আর ধর্মদ্রোহী হওয়াই তো স্বাভাবিক, নাকি?
লা সাইয়ে-র ব্রাদাররা ধর্মীয় নীতিশিক্ষার ক্লাস আর ধার্মিকতার অনুশীলন দিয়ে আমাদের ভারাক্রান্ত করে রাখতেন, এমনটা আমার মনে পড়ে না। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ধর্মের একটা কোর্স ছিলো, সেটা নিতেন ব্রাদার অগাস্টিন, আর তাঁর বিশ্ব-ইতিহাসের ক্লাসের মতোই সেটা উপভোগ্য ছিলো। সেই ক্লাসের প্রভাবে একখানা বাইবেল কিনেছিলাম। তার সঙ্গে ছিলো রবিবারের গির্জা আর সারা বছরে কয়েক দিন ধ্যান, ব্যস। লা ইনমাকুলাদা কিংবা লা রিকোলেতা-র মতো যে সব স্কুল ধর্মীয় শিক্ষার কড়াকড়ির ব্যাপারে বিখ্যাত ছিলো, তার সঙ্গে এর কোনো তুলনাই চলে না। আমরা ঈশ্বরের ডাক অনুভব করি কি না, সেটা যাচাইয়ের জন্য মাঝে-মধ্যেই ব্রাদাররা আমাদের একখানা ‘হ্যাঁ-না’ প্রশ্নপত্র পূরণ করতে দিতেন। আমি সবসময়ই ‘না’ উত্তর দিতাম, কারণ আমার ইচ্ছে ছিলো নাবিক হবার। আর সত্যি বলতে কী, আমার কোনো-কোনো সহপাঠীর যেমনটা হয়েছিলো, আমার কখনোই তেমন ধর্মীয় আর্তি কিংবা ভয়ের অভিজ্ঞতা হয়নি। আমার মনে আছে, এক রাতে আমাদের বারিওর এক বন্ধু, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো, তারপর ফোঁপাতে লাগলো। লুচিন আর আমি তাকে থামাতে গিয়ে ব্যাপার কী জিজ্ঞেস করলাম। কী আশ্চর্য, তোতলাতে তোতলাতে সে উত্তর দিলো, মানুষ ঈশ্বরের কাছে কী ভয়ানক অপরাধ করে সেটা মনে করে সে কাঁদছে।
১৯৪৮-এর শেষ। কোনো কারণে আমি আমার রিপোর্ট কার্ডটা স্কুল থেকে নিতে পারিনি। আমি গেলাম পরের দিন। স্কুল ছাত্রশূন্য। প্রিন্সিপালের অফিস থেকে রিপোর্ট কার্ডটা নিয়ে চলে আসবো, আমাদের গত বছরের শিক্ষক লিওনসিও এলেন―মুখে হাসি। আমি কী গ্রেড পেয়েছি জিজ্ঞেস করলেন, আর ছুটির সময় কী করবো সেটা জানতে চাইলেন। ছোট্ট বদরাগি বুড়ো বলে তাঁর কুখ্যাতি ছিলো। খারাপ আচরণ করলে মাথায় গাট্টা মারার অভ্যেস ছিলো তাঁর। তবু আমরা তাঁকে ভালোবাসতাম তাঁর সৌম্য উপস্থিতি, রক্তিম মুখ, কপালের ওপর দুরন্ত চুলের গোছা, আর তাঁর ফরাসি-শব্দে-ভরা স্প্যানিশের জন্য। আমাকে তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন, তাঁকে যে বিদায় বলবো সে সুযোগই পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ তিনি বললেন, আমাকে কিছু একটা দেখাতে চান। বললেন তাঁর সঙ্গে যেতে। স্কুলের একেবারে উপরের তলায় আমাকে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে ব্রাদারদের থাকার ঘর, আমরা ছাত্ররা সেখানে কোনোদিন যাইনি। একটা দরজা খুললেন তিনি। সেটা তাঁরই ঘর: ছোটো ঘরটায় একখানা বিছানা, কাপড় রাখার একটা ক্লজেট, ছোটো একটা কাজের টেবিল, দেয়ালে ধর্মীয় ছবি―আঁকা এবং ফটো। আমি খেয়াল করলাম, তিনি বেশ উত্তেজিত। কাপড়ের ক্লজেটে হাতড়াতে হাতড়াতে পাপ, শয়তান এসব নিয়ে দ্রুত কথা বলছিলেন। আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। শেষে একগাদা ম্যাগাজিন নিয়ে তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন। প্রথমখানার নাম ভিয়া, সেটা নগ্ন মেয়েদের ছবিতে পরিপূর্ণ। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম, সাথে লজ্জা। মাথা তুলবো, কিংবা তাঁর কথার উত্তর দেবো, সে সাহস হলো না। কারণ তখনো তিনি দ্রুত কথা বলছেন, কথা বলতে হোঁচট খাচ্ছেন, আর আমার আরো কাছে চলে এসেছেন। ক্রমাগত জিজ্ঞেস করছেন, ম্যাগাজিনগুলোর সাথে আমি পরিচিত কি না, আমি বা আমার বন্ধুরা নিজেরাই ওগুলো কিনে পাতা উল্টে দেখেছি কি না―এইসব। তারপর আচমকা আমি অনুভব করলাম, তাঁর হাত আমার ট্রাউজারের ওপর ঘুরছে। তিনি সেটা ত্রস্ত হাতে খোলার চেষ্টা করছেন, সেই সাথে ট্রাউজারের ওপর দিয়ে আমার পুরুষাঙ্গটা ঘষছেন। তাঁর রক্ত-ছলকে-ওঠা মুখ, কাঁপা-কাঁপা গলা, মুখ থেকে ঝুলন্ত লালা আমার পরিষ্কার মনে আছে। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলাম, “ছেড়ে দিন! আমি যাবো!” মুহূর্তেই ব্রাদার লিওনসিও-র মুখ টকটকে লাল থেকে মৃতের মুখের মতো ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো। তিনি দরজাটা খুলে দিতে দিতে বিড়বিড় করে “তুমি ভয় পেলে কেন?” জাতীয় কিছু-একটা বলছিলেন। আমি এক দৌড় দিলাম সোজা রাস্তার দিকে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ইয়োসাবেচারা ব্রাদার লিওনসিও! ঘটনাটার পরে তিনি নিজেও নিশ্চয়ই ভীষণ লজ্জা পেয়েছেন। পরের বছর ছিলো লা সাইয়ে-তে আমার শেষ বছর। সেবার স্কুলের পাতিও-তে তাঁর সাথে আমার দেখা হলে তিনি আমার সাথে চোখাচোখি হওয়া এড়িয়ে চলছিলেন। তাঁর মুখের অবস্থা দেখে আমি তাঁর লজ্জার পরিমাণ আন্দাজ করতে পারছিলাম।
সেই থেকে ধর্ম এবং ঈশ্বরের ব্যাপারে আমার আগ্রহ ক্রমশ কমতে লাগলো। রবিবারে গির্জায় যাওয়া চলতে থাকলো, কনফেশন এবং কমিউনিয়ন-ও থামলো না, রাতে প্রার্থনাও বন্ধ হলো না, কিন্তু সেসব ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠতে লাগলো। যা করছি মন তাতে রইলো না, আর স্কুলে প্রতিদিনের বাধ্যতামূলক প্রার্থনায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে লাগলাম। শেষে একদিন আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি বিশ্বাস হারিয়েছি। আমি নাস্তিক হয়ে গেছি। কথাটা আমি কাউকে বলার সাহস পেলাম না। তবে কাছেপিঠে কাউকে না দেখলে নিজে নিজে বলছিলাম, আর তাতে লজ্জা বা ভয় হচ্ছিলো না। ১৯৫০-এ লিওনসিও প্রাদো মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ঢোকার পরই কেবল আমি প্রকাশ্যে চারপাশের লোকজনকে সেটা বলার সাহস পেয়েছিলাম। তা-ও সংক্ষেপে―“আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না; আমি নাস্তিক।”
ব্রাদার লিওনসিও-র ঘটানো সেই ঘটনাটার ফলে আমি শুধু ধর্মেই ধীরে ধীরে আগ্রহ হারালাম না, যৌনতার প্রতি আমার বিতৃষ্ণাও বেড়ে গেলো। এই বিতৃষ্ণার শুরু এক বিকেলে পিউরা নদীর পাড়ে, যখন বন্ধুদের কাছে আমি জানলাম বাচ্চারা কীভাবে জন্মায় আর কীভাবে তারা পৃথিবীতে আসে। লা সাইয়ে-তে এই বিতৃষ্ণাটা আমি কখনোই প্রকাশ করিনি। আর আমার বারিওতেও নয়, বিশেষত সেখানে আমার বন্ধুরা বলতো যে যৌনক্রিয়া হলো পুরুষত্বের চিহ্ন, শিশু থেকে পুরুষ হয়ে ওঠার উপায়। আর, এই একটা জিনিস আমার বন্ধুদের মতো আমিও চাইতাম, হয়তো তাদের চেয়েও বেশি করে। তবে যদিও আমি নিজেও যৌনকর্ম নিয়ে কথা বলতাম, এবং গল্প করতাম যে আমি একটা মেয়েকে কাপড় খুলতে এবং হস্তমৈথুন করতে দেখেছি, তবু এ-জাতীয় ব্যাপারগুলো আমার বিস্বাদ লাগতো। আর যখন, কোনো উপলক্ষে বন্ধুদের সাথে তাল দেবার জন্য আমি ওরকম কিছু করতাম, পরের কয়েকটা দিন আমার ভীষণ বিতৃষ্ণা বোধ হতো। যেমন একবার, এক বিকেলে আমি আমার বারিও-র জনাছয় বন্ধুর সাথে গিরিশিরা বেয়ে নেমে মিরাফ্লোরেস সৈকতে সারবেঁধে দাঁড়িয়ে হস্তমৈথুন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলাম। সেটা জিতেছিলো মহাকাশচারীর মতো লুকেন।
সুতরাং, আমার কাছে তখন প্রেমের পড়ার সাথে যৌনতার আদৌ কোনো সম্পর্কই নেই। হেলেনার জন্য আমি যা অনুভব করতাম, তা ছিলো একটা স্বচ্ছ, কায়াহীন, তীব্র এবং নির্ভেজাল আবেগ। তার বেশিরভাগটাই ছিলো তাকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন, আর কল্পনায় দেখা যে, আমরা বিয়ে করেছি, সুন্দর সুন্দর সব জায়গায় ঘুরছি, তাকে নিয়ে আমি কবিতা লিখছি। কল্পনা করতাম এমন সব নাটকীয় মুহূর্ত, যেখানে আমি নায়কের মতো তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করছি, শত্রুর হাত থেকে বাঁচাচ্ছি, আক্রমণকারীদের শাস্তি দিচ্ছি। আর সে পুরষ্কার হিসেবে দিচ্ছে একটা চুমু। সে চুমু হলো জিভের স্পর্শ ছাড়া। আমার বারিওর বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে আমার আলোচনা হয়েছিলো, এবং আমার অবস্থান ছিলো―নিজের প্রেমিকাকে জিভ ছুঁইয়ে চুমু খাওয়া উচিত নয়। নিছক উপভোগের জন্য যেসব মেয়ে পাওয়া যায়―রাস্তার দেখানে-স্বভাবের মেয়ে, নিচু শ্রেণীর ছেমড়িদেরকে ওরকম করে চুমু খাওয়া চলে। জিভ ছুঁইয়ে চুমু খাওয়া হলো অনেকটা আঁচড়ানো-কামড়ানোর মতো। বিকৃতমস্তিষ্ক লোক ছাড়া আর কে-ই বা ভদ্র কোনো মেয়েকে আঁচড়াবে-কামড়াবে?
যৌনতায় বাধা থাকলেও আমি আমার বারিওর বন্ধুদের মতোই সুন্দর জামা-জুতো পরে থাকতে ভালোবাসতাম। আর সম্ভব হলে, রে-ব্যান সানগ্লাস পরে ঘুরে বেড়ানো―ওতে ছেলেরা মেয়েদের কাছে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। আমার পিতা আমাকে কখনো কাপড়-চোপড় কিনে দিতেন না। আমার মামারা বরং তাঁদের ছোটো-হয়ে-যাওয়া কিংবা পুরনো স্টাইলের স্যুট আমাকে দিয়ে দিতেন। কাইয়ে মানকো কাপাক-এর এক দর্জি সেগুলো উল্টে আমার মাপে কেটে সেলাই করে দিতো। তাতে করে আমি সবসময় ভালো কাপড়ে এদিক-সেদিক যেতে পারতাম। সমস্যা হলো, দর্জি যখন স্যুটগুলো উল্টে নিতো, কোটের ডানদিকে যেখানে রুমালের পকেট থাকে সেখানে একটা পুরনো সেলাই দেখা যেতো। আর প্রত্যেকবার আমি দর্জিকে জোরাজুরি করতাম যেন সে একটা অদৃশ্য রিফু দিয়ে ঐ পকেটের চিহ্নটা ঢেকে দেয়। কেননা, সেলাইটা দেখা গেলে লোকে সন্দেহ করতে পারে যে, আমার স্যুটটা পুরনো স্যুট উল্টে বানানো।
আমার হাত-খরচের টাকা দিতেন আমার মামা হোর্হে ও হুয়ান। কখনো কখনো মামা পেদ্রো। তিনি তখন ডাক্তারি পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেছেন উত্তরে সান জাসিন্তো হাসিয়েন্দায়। প্রথম প্রথম পেতাম প্রতি রবিবারে পাঁচ, পরে দশ সোল করে। তা দিয়ে বারিওর বন্ধুদের সাথে শনিবার রাতের পার্টির আগে ম্যাটিনির টিকিট, ভাইসেরয় সিগারেট―সেটা আমরা কিনতাম একবারে একটা করে―কিংবা ভারমাউথ আর পিসকো ব্র্যান্ডি মিশিয়ে বানানো এক গ্লাস কাপিতান স্বচ্ছন্দে কেনা যেতো। ঐ সব পার্টিতে আবার অ্যালকোহল জাতীয় কোনো পানীয় দেওয়া হতো না। প্রথমদিকে আমার পিতাও আমাকে কিছু কিছু হাতখরচের টাকা দিতেন, কিন্তু মিরাফ্লোরেসে যাওয়া শুরু করার পর যখন মামাদের কাছ থেকে সামান্য হাতখরচ পাওয়া শুরু করলাম, তখন থেকে আমি কৌশলে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করলাম। শনিবার সকালে টাকাটা আমাকে দেওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে তাঁকে আমি বিদায় জানাতাম; সেটা ছিলো তাঁর বিরোধিতা করার আমার আরেকটা আপাত-সূক্ষ্ম উপায়, আমার ভীরুতার সাথে মানানসই। সেটা তিনি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন, কারণ ঐ সময় থেকে―সেটা ১৯৪৮-এর শুরু―তিনি আর একটা সেন্তাভোও আমাকে দেননি।
কিন্তু এই অর্থনৈতিক অহঙ্কার প্রদর্শন সত্ত্বেও ১৯৪৯-এ আমি তাঁকে বললাম আমার দাঁত সোজা করার খরচ দিতে। ওরকম চিন্তা আমি ঐ একবারই করেছিলাম। ওগুলো বাইরে বেরিয়ে থাকতো বলে আমার খুব অসুবিধা হতো। দাঁতের জন্য স্কুলে আমাকে সবাই ডাকতো ‘খরগোশ’ বলে, আর খ্যাপাতো। এতোদিন সেটা নিয়ে আমার খুব একটা মাথাব্যথা ছিলো না। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গ আর একটি প্রেমিকা পাবার আশায় যখন আমি পার্টিতে যাওয়া শুরু করলাম, আমার কয়েকজন বন্ধুর দেখাদেখি ‘ব্রেস’ দিয়ে দাঁত সোজা করাটা আমার কাছে একটা আবেগময় উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। এবং হঠাৎই সম্ভাবনাটা হাতের নাগালে চলে এলো। আমার বারিওর বন্ধু কোকো ছিলো এক ডেন্টাল টেকনিশিয়ানের ছেলে। তার বিশেষত্ব ছিলো, সে উপর আর নিচের দাঁত এক-সমান করার ‘ব্রেস’ পরে থাকতো। কোকোর সাথে আমি কথা বললাম, আর সে কথা বললো তার বাবার সাথে। যে ডেন্টিস্টের সঙ্গে তিনি কাজ করতেন, সেই ডা. লানাসের সঙ্গে তিনি ব্যবস্থা করলেন। লিমার শহরতলির জিরন দে লা উনিয়ন-এ ডাক্তারের অফিস। সেখানে তিনি আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন। মহানুভব ডাক্তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ‘ব্রেস’ লাগানোর জন্য কোনো খরচ নেবেন না। শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের টাকাটা আমায় দিতে হবে। সেই বিশাল পদক্ষেপ নেবার বহুদিন আগে থেকেই আমার সৌন্দর্যবোধ আর অহঙ্কারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিলো। ভেতরে ভেতরে ব্যাপারটাকে আমার একটা মর্যাদাহানিকর আত্মসমর্পণ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সৌন্দর্যবোধেরই জয় হলো―আমার গলা নিশ্চয়ই কেঁপে গিয়েছিলো―এবং শেষে আমি ‘ব্রেস’ লাগানোর খরচের কথা বলে ফেললাম।
আমার পিতা ব্যাপারটা ভালোভাবেই নিলেন। বললেন যে, তিনি ডা. লানাসের সাথে কথা বলবেন, এবং সম্ভবত তিনি বলেওছিলেন। কিন্তু ডা. লানাস চিকিৎসা শুরু করার আগেই কিছু একটা ঘটলো―হয়তো আবার একটা গৃহঝঞ্ঝা, কিংবা মার সাথে আমার মামা-মামির কাছে পালানো। তবে সমস্যা মিটে যাবার পর আবার যখন একসাথে হলাম, ব্যাপারটা নিয়ে পিতাও আমাকে আর কিছু বললেন না, আমিও আর তাঁকে সেটা মনে করিয়ে দিলাম না। আমার খরগোশের দাঁত থেকেই গেলো, এবং পরের বছর যখন লিওনসিও প্রাদো মিলিটারি স্কুলে ঢুকলাম, আমার মনের অবস্থা এমন যে দাঁত মুলোর মতো হলেও তখন আমার আর কিছু আসে যায় না।

পরিমার্জিত

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ