behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

দাদামশাই ও একটি খুশির কথা || মারিও বার্গাস ইয়োসা

তর্জমা || মিনাজ মুর১৩:৫৮, মার্চ ২৮, ২০১৬

প্রতিবারই ডালপাল থেকে তীক্ষ্ণ শব্দ এল অথবা কোথাও ব্যাঙ ডেকে উঠল এবং বাগানের পেছনে রান্নাঘরের জানালার কাচে ঝন্ ঝন্ শব্দ হল। বৃদ্ধ মানুষটি তার জীর্ণ চ্যাপ্টা পাথরের আসন থেকে সবেগে লাফিয়ে উঠলেন ও লতাগুল্মের ফাঁক দিয়ে উদ্বিগ্নভাবে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু বালকটির তখনো দেখা নেই। তার পরিবর্তে গেটের দিকে মুখ করা ডাইনিং রুমের জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ আগে জ্বালানো ঝাড়বাতির আলো তিনি দেখতে পেলেন। আলোর নিচে পর্দার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চলমান ছায়া যেন পিছলে পড়ছিল, ধীরে ধীরে। সেই ছেলেবেলা থেকেই তিনি ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন। সুতরাং এর মধ্যে সবাই খাবারের পাট চুকিয়ে ফেলেছে কিনা অথবা ঐ উঁচু গাছগুলো থেকে ছায়া পড়েছে কিনা তা নির্ধারণ করার চেষ্টা তার কাছে এখন বৃথা বলে মনে হল।
বসার জায়গায় ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছিল। মাটি আর ফুল থেকে একটি সুন্দর গন্ধ নাকে এল। কিন্তু পোকামাকড়ও বেড়ে যাচ্ছিল। মরিয়া হয়ে মাথার চারদিকে হাত নাড়ছিলেন তিনি, তবুও ডন ইউল্জিয়ো তাদের তাড়িয়ে দিতে সফল হলেন না। প্রতি মুহূর্তে তারা তাদের অদৃশ্য বর্শা কোনো না কোনোভাবে তাঁর কম্পমান চিবুকের মাংসে, কপালে এমনকি চোখের চারপাশের গর্তে বিঁধিয়ে দিচ্ছিল। দিনের বেলা যে-আগ্রহ এবং উত্তেজনা তাকে প্রস্তুত ও জ্বরগ্রস্ত করে রেখেছিল, সেটা যেন অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসছিল। ক্লান্ত লাগছিল তাঁর। একটু বিষণ্নও। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এল। বিশাল বাগানের অন্ধকার বিরক্তকর ঠেকছিল তাঁর কাছে এবং কারো অবিরত ও অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতির কথা চিন্তা করে পীড়িত বোধ করছিলেন— হয়তো পাচক অথবা পরিচারক যে-কেউ হঠাৎ করে তাঁর গোপন জায়গায় এসে বিস্মিত করে দিয়ে বলবে— ‘ডন ইউল্জিয়ো, আপনি রাতে এসময়ে বাগানে কী করছেন?’ তাঁর ছেলে ও শ্যালক আসবে। তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করবে যে এটা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু কেঁপে বিব্রত হয়ে মাথা ঘোরালেন তিনি এবং দেখলেন ক্রিসেনথিমামের সারি, মলমগাছ আর গোলাপঝোপের ভেতর দিয়ে সংকীর্ণ পথটি পেছনের দরজা ছাড়িয়ে কবুতরের খোয়াড় পর্যন্ত চলে গেছে। মনে করতে কষ্টই হল যে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি গোটা তিনবার পরীক্ষা করে দেখেছিলেন যে দরজা বন্ধ, হুড়কো ভাঙা এবং অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে রাস্তার দিকে পালিয়ে যেতে পারবেন।
কী হবে যদি সে এর মধ্যে এসে পড়ে। বিব্রতভাবে ভাবলেন তিনি। বাগানের মাঝ দিয়ে প্রায় ভুলে যাওয়া প্রবেশপথ দিয়ে চুপিসারে ঘরে ঢোকার পরও তাঁর মনে হল এখনো এক সেকেন্ড বা অল্প কয়েক মিনিট আছে, আর তখনই তিনি সময় সম্বন্ধে চেতনা হারালেন এবং মনে হল গভীর ঘুমিয়ে তলিয়ে পড়েছেন তিনি। প্রতিক্রিয়া শুরু হল যখন না জেনেই জিনিসটার ওপর হাত বোলালেন আর সেই কবে নিয়ে আসা ব্রিফকেসটা খুললেন এবং মূল্যবান প্যাকেটটা বের করলেন। আবিষ্কারের বিকেলবেলা যে-রুমালটি পরেছিলেন ঠিক সেরকম সাদা সিল্কের একটা রুমাল দিয়ে এটিকে মুড়ে নিলেন।
গোধূলির ধূসরতম লগ্নে একটি ট্যাক্সি নিলেন তিনি। ড্রাইভারকে বললেন, শহরের বাইরে এদিক-সেদিক কোথাও নিয়ে যেতে। মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। ধূসর এবং লালের মাঝামাঝি রঙের আকাশের দৃশ্যটি গ্রামপ্রান্তরে খুব বেশি রহস্যময় দেখাচ্ছিল। গাড়ি যখন অ্যাসফান্টের রাস্তার ওপর মসৃণভাবে চলছিল, ব্যাগের ভেতরে ডুবে থাকা বৃদ্ধ মানুষটির জীবন্ত দু’টি চোখ— থুলথুলে মুখের ভেতরে একমাত্র সক্রিয় চিহ্ন— ক্যানেলের প্রান্ত বরাবর সমান্তরালভাবে ছুটে চলা হাইওয়ের দিকে পিছলে পড়ল এবং হঠাৎই তিনি ওটা দেখতে পেলেন।
‘রাখো তো’ বলে চিৎকার করলেন তিনি। কিন্তু ড্রাইভার শুনল না। ‘রাখো থামাও’ আবারো বললেন তিনি। যখন গাড়ি থামল এবং পাথুরে ঢিবিতে আবার ফিরে এল, ডন ইউল্জিয়ো পরীক্ষা করে দেখলেন, যা, ঠিক আছে, ওটাই— খুলিটাই। দু’হাতে ওটাকে চেপে ধরে রেখে তিনি ভুলে গেলেন মৃদু বাতাসের কথা, গ্রামাঞ্চলের কথা এবং ক্রমবর্ধমান দুশ্চিন্তার সাথে তিনি পুরোপুরি সেই শক্ত, দুর্বিনীত, শত্রুভাবাপন্ন এবং অপ্রবেশ্য আকার— মাংস ও চামড়া ছাড়ানো, নাকহীন, চোখহীন, জিহ্বাহীন। খুলিটা আকারে ছোট এবং উৎসাহের সাথে ভেবে দেখলেন এটা কোনো শিশুর হবে হয়তো। এটাতে ময়লা আর ধুলা লেগে আছে। এর খোলা করোটিতে স্পি­ন্টারের আঘাতে তৈরি হওয়া একটা মুদ্রাসমান গর্ত রয়েছে। নাকের ছিদ্রপথ একটা পূর্ণাঙ্গ ত্রিভুজের সৃষ্টি করেছে। চিবুকের মতো ঈষৎ হলুদাভ একটি রেখা মুখ থেকে আলাদা করেছে একে। আঙুলগুলো ওটার চোখের কোটরে ঢুকিয়ে দিয়ে আনন্দ পেলেন তিনি আর করোটিটিকে দু’হাতে ঢেকে টুপির মতো করলেন। নিচের গর্তে মুষ্টি ঢুকিয়ে ধরে রেখে, আঙ্গুলগুলো ওটার চোখের কোটরে ঢুকিয়ে, দু’হাতে টুপির মতো করোটিটিকে ঢেকে মজা করলেন তিনি: এরপর জিনিসটাকে জ্যান্ত কল্পনা করে, এক আঙুলের গাঁট ত্রিভুজের ভেতরে আরেকটি মুখের ভেতরে লম্বা ধারালো জিহ্বার মতো করে ধরে, নানারকম ভঙ্গি করে দারুণ মজা নিলেন।  
নিজের আবিষ্কারের কথা কাউকে না বলে দু’দিন ধরে ফুলে ওঠা ব্রিফকেসটি টেবিলের দেরাজে লুকিয়ে রাখলেন তিনি। পরেরদিন বিকেলবেলা নিজের ঘরে ছিলেন। পূর্বপুরুষদের দামি, বিলাসবহুল আসবাবপত্রের মাঝখানে পায়চারি করছিলেন। কদাচিৎ মাথা উঠালেন: বলা যেতে পারে তিনি কার্পেটের মাঝখানে বৃত্তের ভেতরে অশুভ ও যাদুর অবয়বগুলি গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। এমনকি তিনি হয়তো ভালো করে সেগুলো দেখতেও পাননি। প্রথমত, তিনি সিদ্ধান্তহীনতা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন কেননা তাতে করে পারিবারিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে অথবা সম্ভবত তারা তাকে উপহাসও করতে পারে। আর এ-চিন্তাটি তাকে বিরক্ত করল। তিনি একটু অসহায় বোধ করলেন ও কাঁদতে চাইলেন। সেই মুহূর্ত থেকেই তার মাথা থেকে পরিকল্পনাটা আর কখনোই বের হতে পারেনি কিন্তু একবারের জন্য হল: তিনি তখন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অন্ধকার ঘরটির কথা কল্পনা করলেন— কত অসংখ্য প্রবেশপথসহ ঐ ছোট্ট খোয়াড় শূন্য হত না, প্রাণহীন হত না অথচ এখানে বাস করত ধূসর আর সাদা রঙের পাখি যেগুলো মুহূর্তের মধ্যে গাছে তাদের ঠোঁটের ক্ষত রেখে যেত আর মাঝে মাঝে বাগানের গাছের ওপর আর ফুলের ওপর দিয়ে উড়ে যেত। তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে ভাবেন ওরা কত দুর্বল আর অসহায়। বিশ্বাস করেই তার হাতের তালুতে বসত যেখানে তিনি সর্বদা ওদের জন্য কিছু দানা রাখতেন এবং যখন তিনি সেগুলো নিংড়াতেন পাখিগুলো চোখ বন্ধ করে ফেলত এবং একটু স্পর্শেই ওরা কেঁপে উঠত। একটু পর তিনি এ-ব্যাপারে চিন্তা করা বন্ধ করলেন। যখন পরিচারক এসে বলল যে ডিনার প্রস্তুত, এরই মধ্যে তিনি মনস্থির করে ফেললেন। সেদিন রাতে তার ভাল ঘুম হল। পরেরদিন সকালে তিনি ভুলে গেলেন কীভাবে তিনি লাল পিঁপড়ের অশুভ স্বপ্ন দেখলেন আর হঠাৎ তারা কবুতরের ঘর আক্রমণ করল এবং পাখিগুলোকে অস্থির করে তুলল। তিনি জানালা দিয়ে টেলিস্কোপের সাহায্যে দৃশ্যটি দেখেছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে ধূলি পরিষ্কারের কাজটি কিছুটা কঠিন আর তাকে দ্রুতই কাজটি করতে হবে। কিন্তু তাঁর ধারণা ভুল হল। তিনি এর সাথে লেগে থাকা ধুলিকে মামুলি বলেই মনে করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখলেন যে এতে কটু গন্ধ রয়েছে। সম্ভবত ভেতরে বিষ্ঠা লেগে আছে এবং করোটির পেছনে ধাতুর পাতের মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। যখন সাদা রেশমের রুমাল ধূসর রঙে রঞ্জিত হল, ডন ইউল্জিয়োর উত্তেজনা বেড়ে গেল। কিন্তু একসময় বিরক্ত হয়েই তিনি খুলিটিকে ছুড়ে ফেললেন। আবার এটি গড়িয়ে যাবার পূর্বেই তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং বসার জায়গা থেকে উঠে যতক্ষণ পর্যন্ত না খুলিটির কাছে পৌঁছলেন ততক্ষণ পর্যন্ত হামাগুড়ি দিয়ে ওটাকে ধরতে চাইলেন এবং ওটাকে সযত্নে মেঝে থেকে তুলে নিলেন। তারপর অনুমান করলেন যে যদি তিনি তৈলাক্ত কিছু ব্যবহার করেন তবে ওটা পরিষ্কার করা সম্ভব হবে। রান্নাঘর থেকে ফোন করে জলপাই তেলের টিন আনতে বললেন এবং দরজার মাঝখানে পরিচারকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তার হাত থেকে জলপাই তেলের টিনটি নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার সাথে ছিঁড়ে ফেললেন। তিনি মোটেই লক্ষ করলেন না যে বালকটি তাঁর কাঁধের ওপর দিয়ে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে ঘরের চারপাশে তাকাচ্ছিল। ভীষণ উদ্বেগের সঙ্গে তিনি রুমালটিকে জলপাই তেলে ভেজালেন। প্রথমে আলতো ভাবে, পরে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে লাগলেন। শীঘ্রই তিনি নিশ্চিত হলেন যে তাঁর কাজ ঠিকঠাক মতোই এগিয়ে চলেছে। একপশলা ধুলো তার পায়ের কাছে এসে পড়ল। তিনি খেয়াল করেননি যে তাঁর জামার হাতা ও জ্যাকেটের আস্তিন বেয়ে জলপাই তেল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বিস্ময়ে তিনি খুলিটার দিকে তাকালেন: পরিষ্কার, উজ্জ্বল ও অনড়— তাঁর গালের হাড় থেকে ছোট ছোট ঘামের মতো ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরেকবার ওটাকে মুড়ে নিলেন। ব্রিফকেস বন্ধ করে ন্যাশনাল ক্লাব ত্যাগ করেন তিনি। প্লাজা যে মার্টিন থেকে যে-ট্যাক্সি নিয়েছিলেন সেটা ওয়ানসিলায় তাঁর বাড়ির পেছনে তাঁকে নামিয়ে দিল। রাত হয়ে গেছে। মাঝরাস্তায় আধো অন্ধকারে এক মুহূর্ত নীরব থাকলেন তিনি। ভয় হল দরজা না আবার তালাবদ্ধ রয়েছে। তিনি দুর্বলভাবে তার বাহু প্রসারিত করলেন। এবং আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলেন যখন তিনি বুঝলেন যে হাতল ঘুরছিল এবং দরজাটা একটু ফিচফিচ শব্দ করে পথ করে দিচ্ছিল।
সেই মুহূর্তে তিনি ফটকের কাছে কারো কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। চিন্তায় এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে নিজের জ্বরগ্রস্ত কর্মকাণ্ডের কারণ একদম ভুলে গিয়েছিলেন। কণ্ঠস্বরগুলো এবং তাদের গতিবিধি এতই অস্পষ্ট ছিল যে নিজের হৃৎপিণ্ডকেও মনে হল একজন মুমূর্ষু ব্যক্তির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার। প্রথমে মনে হল বসে পড়া উচিত কিন্তু বসলেন এমন টালমাটালভাবে যে শিলাখণ্ড থেকে পিছলে পড়লেন। মুখ থুবড়ে পড়লেন মাটির ওপর। কপালে তীব্র ব্যথা অনুভব করলেন এবং মুখে বিরক্তিকর, ভেজা মাটির স্বাদ পেলেন কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর কোনো চেষ্টাই করলেন না। সেখানেই ঘাসের ভেতরে অর্ধেক ডুবে রইলেন আর কাঁপতে কাঁপতে শ্বাস নিতে লাগলেন। পতিত অবস্থাতেও হাতে ধরা খুলিটি উঠিয়ে দেখার সময় পেলেন তিনি। খুলিটি মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে ধরা ছিল, একদম পরিষ্কার দেখতে।
বাগানের ফটক তাঁর লুকোবার জায়গা থেকে পঞ্চাশ গজের মতো হবে। ডন ইউল্জিয়োর কানে তাদের কথাবার্তার স্নিগ্ধ ধ্বনিসমষ্টি ভেসে এল কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না তারা কী কথা বলছিল। একটু কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। চারদিকটায় একটু নজর বুলিয়ে দেখলেন এবং খাবার ঘরের নিচ পর্যন্ত পৌঁছেছে যে বড় আপেল গাছটির শিকড়, সেটার মাঝখানের বাঁকা অংশ দিয়ে একটা সরু, স্পষ্ট ছায়া দেখতে পেলেন। বুঝলেন ওটা তার ছেলে। পাশে এক স্ত্রীলোক— সচল ও আকারে ছোটখাট, স্বেচ্ছাচারে সমর্পিত। তাঁর ছেলের স্ত্রী। পিটপিট করে চোখ ঘষে উদ্বিগ্নভাবে তাকাতে চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু বালকটিকে দেখার চেষ্টা বৃথা হল। তারপর তাকে হাসতে শুনলেন— বালকের কণ্ঠে স্কটিকের মতো হাসি, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণখোলা, পাখির মতো বাগান অতিক্রম করে গেল। তিনি আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। জ্যাকেট থেকে মোমবাতি বের করলেন এবং ডালপালা হাতড়ে মাটি ও পাথর জড়ো করলেন। পাথরের ওপর সাবধানে মোমবাতি বসালেন এবং পাথরটিকে পথের মাঝখানে প্রতিবন্ধক হিসেবে রাখলেন। তারপর খুব সতর্কতার সাথে মোমবাতির ভারসাম্য বজায় রেখে খুলিটাকে এর ওপরে রাখলেন। মহা উত্তেজনাভরে দৃষ্টি রাখলেন নিরেট, তৈলাক্ত বস্তুটির ওপর এবং এতেই তিনি খুশি হলেন। উষ্ণতা যথার্থ ছিল, মোমবাতির ছোট্ট সাদা অগ্রভাগ করোটির গর্তের বাইরে মলমগাছের শাখার মতো বেরিয়ে আছে। তিনি ওটা না দেখে থাকতে পারলেন না। ছেলের বাবা কণ্ঠ চড়ালেন যদিও তাঁর কণ্ঠ তখনও অস্পষ্ট, বৃদ্ধ বুঝলেন বালককে উদ্দেশ করেই সে বলছিল। তিনজনের ভেতরে কিছু না কিছু কথার বিনিময় হল: পিতার ভারি কণ্ঠ অবিরত উচ্চারিত হচ্ছিল। স্ত্রীলোকটির মধুর কণ্ঠ শোনা গেল। আর শোনা গেল তার নাতির তীক্ষ্ণ চিৎকার। হঠাৎ কোলাহল থেমে গেল। অল্পক্ষণের জন্য নীরবতা নামল। তার নাতি এ-নীরবতা বিদীর্ণ করে চিৎকার করল: ‘মনে কর আজ আমার শান্তির দিন শেষ। তুমি বলেছিলে সাত দিন, আজ শেষ দিন। আগামীকাল আমি চলে যাচ্ছি।’ শেষ কথার সাথেই তার দ্রুত পদশব্দ শোনা গেল। সে কি দৌড়ে আসছে? এটা ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্ত। যে-কষ্ট তাঁর শ্বাসরোধ করছিল, ডন ইউল্জিয়ো তার থেকে মুক্তি পেলেন এবং পরিকল্পনামাফিক কাজ চালিয়ে গেলেন। প্রথম ম্যাচকাঠি ঘর্ষণ নীল ধুয়োর সুতো তৈরি করল। আর দ্বিতীয়টিতে আগুন ধরল। ইউল্জিয়োর নখ পুড়ল বোধ হয়। তবুও তিনি কোনো ব্যথা অনুভব করলেন না। জ্বলন্ত মোমবাতিটি খুলির পাশে রাখলেন। তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন, কারণ যা দেখলেন ঠিক তা তিনি ভাবেননি। হাতের মধ্যে হঠাৎ এমন পট পট শব্দে আগুনের শিখা জ্বলে উঠল যেটাকে মরা পাতার স্তুপে ভারী পদশব্দের মতো শোনাল। খুলিটি পুরোপুরি আলোকিত হয়ে উঠল এবং অক্ষিকোটর, করোটি, নাক ও মুখ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল। ‘পুরোটাই আলোকিত হয়ে গেছে’— বিস্ময়ে বলে উঠলেন তিনি। ফিরে দাঁড়ালেন তিনি এবং রেকর্ডের মতো বার বার বলতে লাগলেন ‘এটা জলপাই তেলের জন্যই হল, এটা জলপাই তেলের জন্যই হল।’ খুলি থেকে নির্গত ধোঁয়াচ্ছন্ন অগ্নিশিখার সামনে স্তম্ভিত ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি ।
সেই মুহূর্তে চিৎকারটা শুনলেন। একটা বন্য চিৎকার— কোনো প্রাণীর শরীরে অগণন বর্শা বিদ্ধ হলে যে-রকম চিৎকার ওঠে, ঠিক সে-রকম। বালকটি তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল— তার দু’বাহু প্রসারিত, আঙুলগুলো কাঁপছিল। ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছিল তাকে। তার চোখ-মুখ খোলা। সে ছিল নির্বাক ও দৃঢ়। তার কণ্ঠ থেকে অদ্ভুত শব্দ বেরোচ্ছিল। আতঙ্কিতভাবে ডন ইউল্জিয়ো বলে উঠলেন, ‘দেখেছে, সে আমাকে দেখেছে।’ কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন যে বালকটি তাঁকে দেখেনি। অগ্নিময় খুলি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি নাতি। তার চোখ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেখানে ভেসে উঠল অন্তহীন, গভীর আতঙ্ক। সব কিছুই একসঙ্গে দেখা গেল: হঠাৎ জ্বলে ওঠা, আর্তনাদ আর নিঃশ্বাস ফেলার মুহূর্তটুকুর ভেতরে যে-ভয় জাগল তাও। উৎসাহভরে ভাবছিলেন, যেভাবে ভেবে রেখেছিলেন ঘটনাগুলো তার চাইতে বেশি সত্য বলে প্রতীয়মান হল যখন তিনি এগিয়ে আসা কণ্ঠস্বর আর পদশব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি শব্দের বিষয়টির প্রতি বেশি আমল দিলেন এবং পথ থেকে লাফিয়ে উঠলেন। ক্রিমেনথিমাস আর গোলাপ ঝাড় মাড়িয়ে গেলেন যেগুলিকে তাঁর মনে হয়েছিল অগ্নিশিখার প্রতিবিম্ব। দরজা থেকে যে-স্থানটি তাঁকে আলাদা করেছিল তা অতিক্রম করলেন। স্ত্রীলোকটির চিৎকারধ্বনি সঙ্গে নিয়েই তিনি দৌড়ে গেলেন। তাঁর পদক্ষেপ ছিল দৃঢ় কিন্তু নাতির চেয়ে হ্রস্ব। না থামলেন, না পেছনে তাকালেন তিনি। রাস্তার বাইরে একটা শীতল বাতাস তাঁর কপাল আর মাথা ছুঁয়ে গেল। চুলও। কিন্তু তিনি তা খেয়াল করলেন না এবং ধীরে ধীরে বাগানের দেয়ালে কাঁধ ঘেঁষে হাঁটতে লাগলেন— মুখে তৃপ্তির হাসি: কেবল একটি শ্বাস ফেললেন গভীর প্রশান্তির।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ