behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই বিশ্বাস করার অধিকার তার আছে : মেলবা প্রিয়া

.০৬:০০, মার্চ ৩১, ২০১৬

মেলবা প্রিয়ামেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত মেলবা প্রিয়া’র কাছে ঢাকার যানবাহনের ভীড় উন্নতির লক্ষণ, অসহ্য বিরক্তির কারণ নয়। তাঁর কাছে মেক্সিকো আর বাংলাদেশ, এই দু’দেশের মানুষের আরো কাছাকাছি আসার জন্য সংস্কৃতির ফারাকই বড় বিষয়। লেখক রাজু আলাউদ্দিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দুই দেশের মানুষ ধর্মকে কতটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সে বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিল ৬ মার্চে। ইংরেজি থেকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন প্রিসিলা রাজ।
রাজু আলাউদ্দিন: প্রথমেই বাংলাদেশে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনি আগেও এদেশে এসেছেন। ইতিমধ্যে এ দেশের অর্থনীতিতে কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েছে আপনার?
মেলবা প্রিয়া: আমার বেড়ে ওঠার সময়ের বাংলাদেশ সম্পর্কে দু’টো গল্প আপনাকে বলি, শুনুন। তারপর এখনকার বাংলাদেশে ফিরব। ‘বাংলাদেশ’এই নামটা যখন আমি প্রথম শুনি তখন এত্তটুকুন ছিলাম (নিজের তর্জনি দেখিয়ে) আমি। আমার মা আমার হাত ধরে ছিলেন। আরেক হাতে একটা বিরাট প্ল্যাকার্ড ধরে ছিলেন যাতে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশকে মুক্ত করো’। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার দ্বিতীয় স্পষ্ট স্মৃতির সময়টাতে আমি হাইস্কুলে পড়ি। তখন অনেক লম্বা ও শক্তিশালী আমি। আমার মা আমাকে দশ কেজি চালের একটা বড় প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছিলেন এবং আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম কারণ বাংলাদেশে তখন ভয়াবহ বন্যা চলছে। আমার বড় হওয়ার সময়টাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে এই দু’টি আমার স্পষ্ট স্মৃতি। আজকে বাংলাদেশ নিজের খাবার নিজে সংস্থান করছে, শুধু তাই না, বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকেও খাওয়াচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ গত পনেরো বছরে ৬.৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অনেকে আছেন যাঁরা মনে করেন আগামী বিশ বছর ধরে বাংলাদেশ এ গতিতেই আগাবে। কাজেই অবিশ্বাস্য বাংলাদেশ। অনেক বছর আগে বাংলাদেশে আসা আর এখন আসা, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এখানকার যানজট নিয়ে কথা বলে কারণ, মাঝে মাঝে এখানে যানজটে দু’ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। কিন্তু একটু ভেবে দেখি এই যানজট কেন? বাংলাদেশে এই যানজট সৃষ্টি হয়েছে কারণ মানুষ এখন গাড়ি কিনতে পারছে। আমরা এই যানজটে পড়ছি কারণ মানুষ এখন মোটরসাইকেল কিনতে পারছে, একটা সাইকেল কিনতে পারছে। এর অর্থ মানুষ এখন আরো বেশি সচ্ছল। আর তার ফলে রাস্তায় অনেক গাড়ি নামছে। আমাদের রাস্তাগুলো নিশ্চয়ই আরো বড় হতে পারত, কিন্তু সেটার প্রক্রিয়াও চলছে। অবকাঠামো একটু ধীরেই তৈরি হয়। মানুষ নিজের জন্য আরো কী কী কিনতে পারছে? বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি এসবই ভাবি। এগুলো সুসংবাদ ছাড়া কিছু নয়।

রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি এর সবকিছুকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন?

মেলবা প্রিয়া: নিশ্চয়ই।

রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশ ও মেক্সিকোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে আপনার আরো কোনো পরামর্শ আছে?

মেলবা প্রিয়া: নিশ্চয়ই। মেক্সিকোর সঙ্গে বাংলাদেশ ভালো বাণিজ্য করছে। আপনারা আমাদের সঙ্গে বর্তমানে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কিছু বেশি অর্থমূল্যের ব্যবসা করছেন। এটা মূলত বস্ত্রপণ্যের ব্যবসা। অন্যদিকে আমরা আপনাদের সঙ্গে করছি মাত্র ৭০ লাখ ডলারের ব্যবসা। সুতরাং তফাৎটা অনেক বড়, অনেক অনেক বড়। একটা সম্ভাবনা আছে, সেটা হলো চলতি সময়ে মেক্সিকো বাংলাদেশে সামান্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারে, যদি বাংলাদেশ সরকার চায়। তবে বহু সুযোগ রয়ে গেছে। গাড়ি রপ্তানিতে মেক্সিকো বিশ্বে চার নম্বর অবস্থানে। সুতরাং বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সেখানে নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করার বিরাট সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মেক্সিকো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছে। এখানে সিমেক্স নামে আমাদের দেশী একটা কোম্পানি আছে যেটি সিমেন্ট উৎপাদন করে। এটি প্রায় তিন কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং তারা বেশ লম্বা সময় ধরে এখানে কাজ করছে। সুতরাং এখানে সম্পর্কটা হচ্ছে আপনারা আরো বেশি বাণিজ্য করবেন এবং আমরাও বড় বিনিয়োগে আসব। সম্পর্কটা মূলত মানুষের সঙ্গে মানুষের। মানুষ যত পরস্পরকে জানবে, তত বিনিয়োগ আসবে।

রাজু আলাউদ্দিন: মেক্সিকোর লেখকদের মধ্যে হোসে ভাস্কনসেলোস এবং অক্তাভিও পাজ ভারতবর্ষ ও রবীন্দ্রনাথের অনেক বড় ভক্ত ছিলেন। আপনার কী মনে হয় তাঁদের এই ভাল লাগা মেক্সিকোর সংস্কৃতিতে কোনো নতুন মাত্রা যোগ করেছে?

মেলবা প্রিয়া: যদি এভাবে বলি, এটা মেক্সিকোর সংস্কৃতিতে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করেনি। তবে সব মেক্সিকান শিশু একটি বই পড়ে তার নাম ‘জাতীয় বই’। মেক্সিকোতে সবাই বিনা পয়সায় বই পায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বইতে আমরা যখন বিশ্বের কথা বলি, তার মধ্যে ভারতবর্ষ বা দক্ষিণ এশিয়ার কথাও কিছুটা থাকে। আমরা যখন বিশ্বসাহিত্যের কথা বলি, তখন রবীন্দ্রনাথ পড়ি। সুতরাং মেক্সিকোর সব শিশুকে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে রবীন্দ্রনাথ পড়তে হয়। বাংলাদেশের সব শিশুকে অক্তাভিও পাজ বা হোসে ভাস্কনসেলোস পড়তে হয় কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু অন্তত আমাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ...তাঁর নোবেল পাওয়া বা আর সবকিছু ছাড়াও, তাঁকে আমরা বিশ্বের সাহিত্য বলতে যা বুঝি তারই একটা অংশ বলে মনে করি। ফলে সব মেক্সিকান শিশু ও বড়দের বাংলা সাহিত্যের স্বর সম্পর্কে একটা ধারণা আছে। যদিও আমরা তা স্প্যানিশেই পড়ি। সুতরাং স্প্যানিশে আমরা যা-ই পড়ি না কেন বাংলা ভাষার ছন্দদীপ্তি আমাদের কানে রয়ে গেছে। এই ছন্দদীপ্তি আমাদের শেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ পাঠের মধ্য দিয়ে।

রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অক্তাভিও পাজ এবং মেক্সিকোর আরো কিছু লেখকের স্থান খুব উঁচুতে। পাজ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই আমরা মনে করি বাংলাদেশের বিপদের কালে মেক্সিকো আমাদের বন্ধু হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। এই বন্ধুত্ব সম্পর্কে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

মেলবা প্রিয়ার সঙ্গে রাজু আলাউদ্দিনমেলবা প্রিয়া: অক্তাভিও পাজ ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই। তবে আমি আপনাকে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সময় আমার মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব বিষয়ে বলতে পারি। মা আমার হাত ধরে হেঁটে যেত আর তার আরেক হাতে ধরা থাকত ‘বাংলাদেশ মুক্ত করো, মুক্ত করো বাংলাদেশ’ লেখা ব্যানার। লাতিন আমেরিকার জন্য মুক্তির সংগ্রাম খুব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। লাতিন আমেরিকা সার্বিকভাবে আর মেক্সিকোর জন্য বিশেষ করে...আজকে এক সভায় দু’টো ভিত্তিমূলক নীতির কথা বলা হচ্ছিল। মেক্সিকোর মানুষ ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়টি হলো ঐক্যবোধ। বাংলাদেশের সংগ্রামের সেই বছরগুলোতে, সেটা মুক্তির সংগ্রাম কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ঐক্যের বোধ ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং অক্তাভিও পাজ হোন, বা একজন সাধারণ মানুষ যিনি হয়ত নামকরা কেউ নন, সকলেই একটি মুক্ত বাংলাদেশ চাইছিলেন এবং তার জন্য লড়ছিলেনও। অবশ্যই এই চাওয়া ছিল এমন এক বাংলাদেশের জন্য যেখানে দুর্ভিক্ষ বা দুর্যোগের অস্তিত্ব থাকবে না।

রাজু আলাউদ্দিন: মেক্সিকো ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির ফারাক সম্পর্কে আমরা সচেতন। কীভাবে আমরা এই তফাৎ সত্ত্বেও পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারব?

মেলবা প্রিয়া: সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে এটাই। এমন একজনের সঙ্গে যদি আপনার দেখা হয় যে ঠিক আপনারই প্রতিফলন, তবে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার যুক্তি কোথায়? আপনি যদি এমন এক দেশে যান যা ঠিক ঠিক আপনার দেশেরই মতো, তবে কেন আপনি সেই দেশে যাবেন? এটাকে কোনো সমস্যা হিসাবে দেখি না আমি। একে আমি সমৃদ্ধি হিসাবে দেখি। কারণ, আপনি ভিন্ন, আর আপনার ভিন্নতাকে আমি জানতে চাই। কারণ, আমি অন্যরকম, আর আপনি সেই অন্যরকমকেই জানতে চান। খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন এখানে এসে বাংলা অনুবাদে মেক্সিকান লেখক ও লাতিন আমেরিকান লেখকদের সব বই দেখলাম। অতএব কেউ না কেউ ইতিমধ্যে ঠিক কাজটি করছে। আরো সব বই প্রকাশ হচ্ছে।

রাজু আলাউদ্দিন: মেক্সিকো দু’শ বছরেরও আগে স্বাধীনতা লাভ করেছিল আর মেক্সিকান বিপ্লব হয়েছে একশ’ বছর আগে। স্বাধীনতা ও বিপ্লবের সুফল কী বলে আপনি মনে করেন? আধুনিক মেক্সিকানরা ঐতিহাসিক এ দুই ঘটনার সুফল কি নিতে পারছেন?

মেলবা প্রিয়া: আমরা সকলেই ইতিহাসের সন্তান। হতে পারে আমরা সেই স্বাধীনতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমরা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলি, কিন্তু কেন এ ভাষায় কথা বলি? স্পেনের উপনিবেশ থাকা বিষয়ে আমরা অনেক নেতিবাচক ও ইতিবাচক কথাই বলতে পারি। কিন্তু কথা আমরা স্প্যানিশেই বলি। স্প্যানিশে কথা বলা একটা ভাল বিষয়। আর বিপ্লব অবশ্যই অনেক প্রতিষ্ঠানকে একত্র করেছিল যারা আধুনিক মেক্সিকো গড়ে ওঠাকে নিশ্চিত করেছে। আমাদের দেশকে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পেয়েছি, কিন্তু এই দেশ এখন প্রতিদিন গড়ে তুলছেন আজকের মেক্সিকোর জনগণ।

রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মীয় চরমপন্থা সারা বিশ্ব জুড়ে আজ সমস্যা। বাংলাদেশের সরকার ধর্মীয় চরমপন্থা মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মেলবা প্রিয়া: ধর্মীয় চরমপন্থা সমাজকে খুব খারাপ অবস্থায় নিয়ে ফেলে, কেননা ঈশ্বরের সময় কখনোই মানুষের সময় নয়। এবং ধর্মের কারণ কখনও জনগণের কারণ নয়। মেক্সিকোতে আমরা রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক করেছি। আমরা মেক্সিকানরা বিশ্বাস করি প্রত্যেক মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই বিশ্বাস করার অধিকার তার আছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা। আমরা আশা করি বাংলাদেশ যেসব পদক্ষেপ নেবে, যে বাস্তবতায় বাংলাদেশের বসবাস, নিজের ভেতর শান্তি খুঁজে নেবে সে এবং জনগণকে কোনো চরমপন্থা গ্রহণের সুযোগ দেবে না যা তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিতে থাকার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ