behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ইমরে কারতেশের সাক্ষাৎকারটিকে থাকবে শুধু ভাষা

অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর১৭:৩০, এপ্রিল ০৪, ২০১৬

ইমরে কারতেশগত ৩১ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন হাঙ্গেরির নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ইমরে কারতেশ। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২৯ সালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে। ইহুদি বাবা-মায়ের সন্তান ইমরে কারতেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন। তাঁর লেখনীর প্রায় সবটা জুড়ে আছে যুদ্ধদিনের স্মৃতি। ২০১৪ সালের ১৮ নভেম্বর ‘দ্য হাঙ্গেরি কোয়র্টারলি’র পক্ষে তাঁর এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন টমাস কুপার। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তা বাংলায় অনুবাদ করা হলো। 

টমাস কুপার: আপনি লিখেছেন, হলোকস্ট ভাষাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলবেন?

ইমরে কারতেশ: সমগ্রকতাবাদের অস্ত্র ছিল ভাষা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ভয়াবহ আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনের একটি সুস্বাদু অংশে পরিণত করা হয়েছে ভাষার মাধ্যমে। মোটের ওপর, কোনো বিকৃত-মস্তিষ্ক উন্মাদ লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে এমন নয়। গণহত্যার মতো কাজ কোনো উন্মাদের পক্ষে করে ফেলা সম্ভব নয়। এ কাজের জন্য দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কর্মীবাহিনী দরকার, বলিষ্ঠ জন-সমষ্টির দরকার।

টমাস কুপার: আপনার ‘হলোকস্ট অ্যাজ কালচার’ প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে গেল। আপনি মন্তব্য করেছেন, বিচারের সামনে দাঁড়িয়ে আইখম্যান নাকি বলেছিলেন, তিনি কখনও সেমিটীয়-বিরোধী ছিলেন না এবং তাঁর সামনে উপস্থিত সবাই জোরে হেসে উঠেছিলেন। কিন্তু আপনি বলেছেন, তার কথা নাকি আপনার কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে।
ইমরে কারতেশ: সমগ্রতাবাদী রাষ্ট্র পুরোপুরি নির্ভর করে দক্ষ সংগঠকের ওপর। ‘বেইনালাটি অব ইভল’ বইয়ে হানা আরেন্দত এ সম্পর্কে কথা বলেছেন। আপনি হাঙ্গেরিতে আমার প্রসঙ্গটা কল্পনা করতে পারেন– দেশে ফিরে এসে আমি কাজকর্ম শুরু করলাম। তখন আমি উপন্যাস লিখছি আর ভাবছি আমি বুঝি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চলে এসেছি। তখন কিন্তু সেরকমটিই ছিল আমার অবস্থা, বিশেষ করে প্রথম দিকে। আপনারা অবশ্যই জানেন। আমার উপন্যাস ‘ফেইটলেসনেস’ প্রকাশক ফেরত পাঠালেন। প্রথম কারণ উপন্যাসে কোনো ভিলেন পাওয়া যায়নি। সে এক লম্বা কাহিনী। আপতত বলতে পারি, আমার উপন্যাস অফিসিয়াল আখ্যান হতে পারেনি। ইতোমধ্যে পশ্চিমে আরেকজন এরকম অভিজ্ঞতার কথা লেখা শুরু করেছেন। শুধু একজন নন, অনেকেই: বোরোস্কি, প্রিমো লেভি প্রমুখ।
টমাস কুপার: আপনার ‘ফিয়াস্কো’-র একটা কথা মনে পড়ে গেল। ওখানে এক জায়গায় কথকের মন্তব্য হলো, ব্যাপক গণহত্যা নিশ্চয়ই একটা ক্লান্তিকর কাজ।
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, ঠিকই। এই একই প্রশ্ন আমার মনেও: পুরোপুরি স্বাভাবিক মানুষ কী করে হত্যাকারী হতে পারে। হিসাব রক্ষার কাজে নিয়েজিত একজন কেরানি কী করে নির্যাতনকারী হতে পারে? মনে পড়ছে ইলসে কোচের কথা। লোকে ওকে বুছেনভাল্টের ডাইনি বলত। সেমপ্রন ওকে অশুভ শক্তি আর নিষ্ঠুরতার প্রতীকে পরিণত করেছিল। তবে সেটা তার একটা ব্যঙ্গচিত্রণ মাত্র। তাকে ব্যঙ্গ চিত্রণে দেখানো না হলেও সে তো একজন ব্যক্তি মাত্র। অন্যদের বেলায় কী বলা যাবে? মানুষ কীভাবে হলোকস্টের যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল? আমি সব সময় এ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেন থাকি। এ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে থাকি বলেই জার্মানিতে আমার লেখা পড়া হয়। এ প্রশ্নেটার প্রতি মানসুষের আগ্রহ আছে। সত্যিই, আমি জার্মানি থেকে অনেক চিঠিপত্র পেয়েছি, হাজার হাজার মানুষের চিঠিপত্র। আমার লেখা পড়ে তাদের নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী বুঝতে সুবিধা হয়েছে। সে জন্যই তারা আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। আউসভিৎস তো মানুষেরই তৈরি। সুতরাং আউসভিৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে যে মানুষেরা আউসভিৎস তৈরি করেছে তাদেরকে জানতে হবে, বুঝতে হবে।
টমাস কুপার: আপনার কি মনে হয়, আপনার প্রচেষ্টা জার্মানির মানুষেরা বুঝতে পেরেছেন?
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, আমার সেরকমই মনে হয়। তবে আমি অতিরঞ্জন করতে চাই না। আমি বলতে চাই না, আমার লেখা এক জায়গায় বোধগম্যতা পেয়েছে, আরেক জায়গায় পায়নি। তবে হ্যাঁ, আমার লেখা জার্মানিতে পড়া হয় বলেই আমার বিশ্বাস। খুব বেশি দিন হয়নি, আমাকে জার্মানিতে একটা মুক্ত আলোচনার আয়োজন করতে বলা হয়েছিল। শারীরিক সমস্যার কারণে রাজি হতে পারিনি। তবে প্রস্তাবটা আমার পছন্দ হয়েছিল। কারণ বুঝতে পারি, তারা আমার চিন্তা চেতনাকে আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।
টমাস কুপার: আমি জানি, আপনার সারা জীবনের লেখালেখি জার্মান একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ দান করে দিয়েছেন। এর পেছনে কি এমন বোধ কাজ করেছে যে, আপনার লেখার প্রতি হাঙ্গেরির পাঠকদের চেয়ে জার্মানির পাঠকদের মধ্যে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে?
ইমরে কারতেশ: হতে পারে যে, জার্মানিতে আমার লেখার প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেশি। তবে আমি জোর দিতে চাই অন্যখানে। আমার সব লেখা জার্মান একাডেমি অব সায়েন্সেসকে দিয়ে দেয়ার পেছনে দুটো কারণ আছে। প্রথমত, তারা আমার লেখা চেয়েছেন। প্রায় এক দশক ধরে তারা আমার লেখা চেয়ে এসেছেন। তবে দ্বিতীয় এবং বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, আমার লেখা তাদের কাছে দিলে মনে হবে যোগ্য হাতে পড়েছে। আমার লেখা হাঙ্গেরিতে রাখতে চাইনি এমন নয়। এখানেও রাখতে পারতাম। তবে হাঙ্গেরিয়ান ইনস্টিটিউট কখনওই আমার লেখা চায়নি। তারা চাইলে আমি অবশ্যই দিতাম। তবে জানি, জার্মানিতে দেয়া মানে আমার লেখার সঠিক যত্ন তারা করবেন। তাদের কাছে থাকলে পরবর্তীতে গবেষণা এবং পড়ার জন্য আমার লেখা পাওয়া যাবে।

হাঙ্গেরিতে এ বিষয়ে মুক্ত কোনো আলোচনাই হয়নি। কারণ তখনকার শাসন এরকম কিছু সহ্য করত না। মুক্ত আলোচনা হয়তো তখনকার শাসকের পছন্দের আখ্যানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত।


টমাস কুপার: হাঙ্গেরিয়ান একাডেমিকে আপনার লেখা দেয়ার ব্যাপারে আপনার অনীহা ছিল না– তা তো পরিষ্কার?
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, তারা তো আমার লেখা চাননি। তারা যদি চাইতেন এবং আমি যদি দেখতাম যোগ্য এবং পেশাদার হাতেই পড়ছে আমার লেখা, তাহলে তো এখানেই রেখে দিতাম। গত গ্রীষ্মে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে এক সাংবাদিক এসেছিলেন আমার সাক্ষাৎকার নিতে। হাঙ্গেরিতে চলমান অবস্থা সম্পর্কে আমি কী ভাবছি, জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে আমি উল্লেখ করেছিলাম, হাঙ্গেরির অবস্থা তো ভালোই চলছে। আমি দেশ ত্যাগ করার আগেও ভালোই দেখেছি। আমার উত্তরে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি আশা করেছিলেন, আমি বলব আমি হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি। মানে রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আমার মতামত চাচ্ছিলেন তিনি। আমার লেখা জার্মান একাডেমিকে কেন দিয়েছি, সে বিষয়েও জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি আসল কারণটা বললাম। কিন্ত মনে হলো, তিনি আমার উত্তরটা পছন্দ করতে পারলেন না। তাঁর মতে, হাঙ্গেরি সম্পর্কে আমার মতামত সঠিক নয়। আমি আসল কথা চেপে যাচ্ছি। তবে আমি যা বলেছি সেটাই ছিল হাঙ্গেরি সম্পর্কে আমার আসল মতামত।
টমাস কুপার: মানে আপনার কথার মধ্যে কোনো রকম প্রতীকী ব্যাপার-স্যাপার ছিল না?
ইমরে কারতেশ: মোটেই না। তাঁর প্রশ্নটার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল না। তিনি আশা করেছিলেন, আমি হাঙ্গেরির বিপক্ষে কথা বলব। কমপক্ষে হাঙ্গেরির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খারাপ কিছু বলব আমি। কিন্তু আমি তো তেমন কিছু বললাম না। তিনি আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন আমি যেন বলি, হাঙ্গেরি এখন স্বৈরশাসকের অধীনে চলছে। বাস্তবে তো নয়-ই। তার মানে বোঝা গেল, স্বৈরাচার সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা নেই। যদি লেখার স্বাধীনতা থাকে, কথা বলার স্বাধীনতা থাকে, বিরুদ্ধ মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা থাকে, এমনকি ইচ্ছেমতো দেশত্যাগের স্বাধীনতাও থাকে, তাহলে সে দেশকে স্বৈরাচারী বলা বাতুলতা বই আর কিছু নয়। তাকে আমি সেরকমই বলেছিলাম। বর্তমানে হাঙ্গেরিতে যে সব ঘটনা ঘটছে সেগুলোর সবকিছুতেই আমি সন্তুষ্ট– এমন নয়। অতীতে হাঙ্গেরিতে যা যা ঘটেছে সেগুলোও সব আমার জন্য তুষ্টির ছিল– এমন নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হাঙ্গেরি স্বৈরাচারী দেশ নয়। আজকের হাঙ্গেরিকে স্বৈরাচারী বললে বলার সে ভাষা হবে ফাঁকা আদর্শের ভাষা। সে সাক্ষাৎকারটি অবশ্য তিনি কখনও আর প্রকাশ করেননি। আমার এক বন্ধু এরকম বিষয়কে যথার্থই বলেছেন সেন্সরশিপ। প্রশ্নকর্তার মনের মত উত্তর না দিলেই আর সে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হবে না।
টমাস কুপার: আপনার কি মনে হয়, আপনার লেখার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিদানের চেষ্টা করা হচ্ছে?
ইমরে কারতেশ: এটা অবশ্য একটা জটিল প্রশ্ন। এর বেশি গভীরে যাব না। শুধু বলব, আমি যা-ই বলি না কেন তার রাজনৈতিক চেহারা দেয়া যেতে পারে। ভিক্টর ওরবান যখন কনরাড আডেনরে বক্তৃতা দিলেন আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। আমি আবারো বলছি, আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে হাঙ্গেরি থেকে আমিই একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম। আমার নিজের উপস্থাপনাও ছিল সেখানে। আর ওরকম একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হওয়া তো একটা সম্মানের বিষয়। সুতরাং আমি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। নির্বাচনের আগে তাঁর জন্য ওই সময়টাও ছিল গুরুত্বের। আমার যোগদানের কারণে লোকজন আমার সমালোচনাও করেছিল। হাঙ্গেরির মানুষোরা আমার সমালোচনা করেছিল।
টমাস কুপার: মানে যারা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত ছিলেন না?
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, বামপন্থীরা। তাদের একজন বেশ জোরালোভাবেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি ওই রক্ষণশীল নেতার বক্তব্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারলেন কী করে। কিন্তু তিনি নিজেই তো কাদারের শাসনামলে বছরের পর বছর কাজ করেছেন, সেবা দিয়েছেন। ওই সময়ের প্রতিনিধিদের সব বক্তব্য অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থেকেছেন। সে সময় তো ছিল স্বৈরাচারের সময়। তার কাজ কোনো ভুলের পর্যায়ে পড়ে না। আর আমি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম, সেটাই তার কাছে সমালোচনার মতো হয়ে দাঁড়াল। তার কথার মধ্যে যুক্তির অভাব ছিল। তার মানে এই নয়, আমি বলতে চাচ্ছি আমি ভিক্টর ওরবানের সরকারকে সমর্থন দিই। আবার এও বলছি না, আমি তাঁর সরকারের পুরোপুরি বিরুদ্ধে। তাঁর সভায় আমি তাঁর সমর্থক হিসেবে যাইনি। আমি গিয়েছিলাম তাঁর একজন শ্রোতা হিসেবেও।
টমাস কুপার: আর আপনার উপস্থিতিটাকেই সমর্থন বলা হচ্ছে?
ইমরে কারতেশইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, কারো কারো দ্বারা তো বটেই। তবে আমার লেখা এবং জার্মান একাডেমি সম্পর্কে যা বলছি তাতে কোনো রকম প্রতীকী ব্যাপার নেই। আমি হাঙ্গেরির বিপক্ষে কখনও কথা বলিনি। অবশ্য অনেক কিছু ঘটেছে বা এখনও ঘটছে; সেগুলো সবই আমার পছন্দ হয়েছে এমন নয়। তবে আমার পক্ষ থেকে নিন্দাও জানানোর মতো নয়। আমি হাঙ্গেরির বিপক্ষে কোনো রকম নিন্দাও জানাইনি কখনও। গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রশ্নে রাজনৈতিক সংলাপ আসলে কোনো সংলাপই নয়। আমাদের ইতিহাসের অনেক অংশই অমিমাংসিত রয়ে গেছে; আমরা সেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারিনি। এরকম দৃষ্টিভঙ্গির তরফ থেকে ১৯৪৮ সালে জার্মানিতে একটা বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। তখন সন্তানেরা তাদের বাবা-মাকে যুদ্ধ সম্পর্কে নানা রকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল। হাঙ্গেরিতে এ বিষয়ে মুক্ত কোনো আলোচনাই হয়নি। কারণ তখনকার শাসন এরকম কিছু সহ্য করত না। মুক্ত আলোচনা হয়তো তখনকার শাসকের পছন্দের আখ্যানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত।
টমাস কুপার: ভাষার গা থেকে কিভাবে আদর্শ চুইয়ে পড়ে তারই একটা উদাহরণ নাকি এটা?
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, হলোকস্ট কৌশলগত আখ্যানের একটা অংশে পরিণত হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট আদর্শের একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ‘ফেইটলেসনেস’-এর জন্য কিশোর কথককে বেছে নেয়ার বেশ কয়েকটা কারণ ছিল। এটাও একটা। আখ্যান বর্ণনা করার জন্য আমি যথাযথ ভাষা খোঁজার চেষ্টা করছি যাতে দেখাতে পারি ভাষা কীভাবে স্বৈরাচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। জানেন তো, কাগজের ওপর শব্দ বসিয়ে আপনার অভিজ্ঞতাকে যদি কাজে লাগাতে চান, দেখবেন অভিজ্ঞতা পেছনে পড়ে থাকবে; কাগজের ওপরের শব্দগুলোই টিকে থাকবে। সবাই তাদের কথার মধ্যে শব্দগুলোর উল্লেখ করবে, বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে, বিতর্কে ব্যবহার করবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বিস্মৃতিতে পড়ে রইবে। টিকে থাকবে শুধু ভাষা। সুতরাং ভাষাকে ঠিকমতো সাজানো চাই। আউসভিৎসের পর সঠিক ভাষা কেমন হতে পারে? অবশ্য আমি আমার মতো করে ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করেছি।
টমাস কুপার: মানে আদর্শমুক্ত ভাষা?
ইমরে কারতেশ: আমার ভাষা হলো অভিজ্ঞতাকে হুবহু তুলে ধরার ভাষা। সাহস কিংবা বীরত্বের ভাষা নয়; যাপিত জীবনের ভাষা। কারণ আমি হলোকস্ট যাপন করেছি সেভাবেই। আমি এ ভাষা নিয়েই হলোকস্ট যাপন করেছি। আমি আমার অভিজ্ঞতা ডকুমেন্ট আকারে তুলে ধরতে চেয়েছি। তবে উপস্থাপনের মাধ্যম হয়েছে ফিকশন।
টমাস কুপার: তার মানে আপনি যখনই হাতে কলম তুলে নিয়েছেন তখনই আপনার অতীতকে ডকুমেন্ট হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন?
ইমরে কারতেশ: অবশ্যই আমার অভিজ্ঞতাকে লিখে রাখার জন্য। তবে কাগজের ওপরে শব্দগুলো আলাদা মনে হয়েছে; দূরের মনে হয়েছে। এভাবেই আমার কথাগুলো কথাসাহিত্য হয়ে যায়। অভিজ্ঞতাকে তো আর সৃষ্টি করা যায় না; সৃষ্টি করা যায় আখ্যান।
টমাস কুপার: মানে অবশ্যই পুরোপুরি কথাসাহিত্য?
ইমরে কারতেশ: হ্যাঁ, কথাসাহিত্য এবং ডকুমেন্ট। অতীতকে ডকুমেন্টে ধরা যায়; কিন্তু সেটার মূল্য কী? আমাদের অতীত কিংবা বর্তমানকে ডকুমেন্ট কীভাবে সমৃদ্ধ করে? ডকুমেন্ট এভাবে কোনো আখ্যানের হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং অংশ হয়ে যায়। কথাসাহিত্যেরও অংশ হয়ে যায়। আর কথাসাহিত্য তো বাস্তবতা থেকে একটু দূরে যেতেই পারে। কথাসাহিত্যকে বুঝে দেখার জন্যই ডকুমেন্টকে ব্যবহার করি। কথাসাহিত্যকে বিবেচনায় রাখার জন্যই আমরা জীবন এবং বাস্তবতাকে ব্যবহার করি। তবে জীবন এবং বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখার জন্য আমরা কথাসাহিত্যকে ব্যবহার করে থাকি।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ