behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

যতীন সরকারের কবিতা ভাবনা

সরোজ মোস্তফা১১:৪৫, এপ্রিল ০৬, ২০১৬

যতীন সরকারকবিতা কাকে বলে কিংবা কবিতার বিশ্লেষণ করা যায় কীভাবে, বাংলা কবিতার কয়টা পথ, কারা কারা সে পথের পথিক আর কী-বা সে পথের পরিচয়- এসব ভাবনার একটা সূত্রসমতল খুঁজে পাওয়া যাবে যতীন সরকারের লেখাজোখায়। এও ঠিক সমালোচকের কলমে কবিমনের অস্তিত্ব নেই। কবিমন বহমান নদী। চিন্তক সে বহমান নদীর কতটুকু ছুঁতে পারেন! তবুও সময়ের কবিকে, কল্পনার গতি ও ভাষার লক্ষ্যকে আবিষ্কার করেন চিন্তক। চিন্তকের ধারণায় সময়টা স্পষ্ট হয় কিংবা একটা তর্ক তৈরি হয়। এই তর্ক-বিতর্কে আত্ম-অনুভবজাত কবি নিজের রাস্তাটা স্পষ্ট দেখতে পারেন। কল্পনার নব অনুধ্যানে ধ্বনি-হিল্লোলিত জানালায় নতুন সংস্করণে তাকাতে পারেন। আসলে, কবিতার প্রবহমানতায় সমালোচক কিংবা চিন্তক একটা সুবাস ছড়ান, সে সুবাসে রাঙায়িত হয়ে কবিও একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। যেকোন শিল্পীর মনোবিন্যাসকে উন্মোচন করেন চিন্তুক। সমালোচক বলতে থাকেন, স্বেচ্ছান্ধতা শিল্প নয়। আধুনিক মানসের যুক্তির একটা গদ্যপথ নির্মাণ করতে করতে যতীন সরকারও বাংলা কবিতার পথ ও পথিকের গন্তব্য এবং সম্ভাবনা নিয়েই কথা বলেছেন।
এই সব কথার বিস্তারে সমালোচক হয়তো ব্যক্তি কবিকে টানতে পারেন না। কিন্তু এ না পারার মধ্যেও কবির মননে চিন্তুকের ধারণাগুলো অন্য এক মাত্রা তৈরি করতে পারে। যার প্রভাবে কবি খুঁজে পেতে পারেন আত্মপথ। কবিতার আত্মধ্বনি।

দুই

জীবনের পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যগুলো, কামরাঙা গাছের অবতলে পরে থাকা মুকুলের মতো প্রতিদিনের টুকরো টুকরো অনুভব কবির মননজুড়ে থাকে। কবি আর না লিখে পারেন না। সময়ের স্বপ্ন, বিরক্তি, হতাশা, বিষণ্ণতা, একটা ফুলের গলাকাটা নিঃশ্বাস, হাড়-ভাঙা ব্যথা ও ব্যর্থতা, ঔষধ, হাসিঠাট্টা- সবকিছুকে কবি শাশ্বত কালের ধারণায় লেখেন। কবিতায় লেগে থাকে শাশ্বত কালের আয়না। কাল-অতিক্রমী পাঠক তখন কবিতাটিকে নিজের কবিতা বলে ভাবতে পারেন। কবির কল্পনা একটা সুস্থ হৃদয়, সেই হৃদয়টা ভাষার চাকায় জ্যান্ত। কাল থেকে কালে কবির ভাষাজাত অনুভবটাই জ্যান্ত থাকে।
কবিকে একটা দায়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একটা শান্তির পৃথিবী রচনার জন্য কবিতা লিখতে হয়। মানুষ থেকে কবিতাকে কিংবা কবিতা থেকে মানুষকে সরিয়ে রাখা খুবই কঠিন ব্যাপার। সেলফি জীবনের দার্শনিকতায় দিন এমনই এসেছে যেখানে ঘরে ঘরে নার্সিসাস। পাশের বাড়ির লোকটি কীভাবে বেঁচে আছে আমরা জানি না, জানতেও চাই না। কপাট বন্ধ সমাজে একজন কবি তবু আমের মুকুল দেখতে থাকেন। জাম্বুরা ফুলের সমতলে সুন্দর ও সম্ভাবনা লিখতে থাকেন। নদী দখলের কান্না কবি এড়াতে পারেন না। অর্থনীতির এই বিপুল উপনিবেশে পৃথিবীর কয়েকজন কবি, যাদের আমরা শুধু অকর্মণ্য বলি, তারাই পৃথিবীটাতে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করছেন। মানুষে মানুষে মিলনের একটা ‘পবিত্র-সমতল’ লিখতে চাইছেন।
যতীন সরকার বাঙালি কবিকে জাতিস্মরের মগ্নতায় অবতীর্ণ হতে বলেন। একজন কবি যদি জাতির আয়নাটা না লিখতে পারেন তবে সে অক্ষরমালা মৃত। তিনি বাঙালি কবির চৈতন্যে আফ্রিকান কবি সেংঘর’কে উপস্থিত করেন। সেনেগালের এই আফ্রিকান কবি শুধু নন, ‘সমগ্র আফ্রিকা ভূ-ভাগের কবিরাই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাদেশিক ঐতিহ্য-চেতনায় দীপ্ত’। ‘কেনো’? এই ‘কেনো’-র জবাব খুঁজে বাঙালি কবিকেও দীক্ষা নিতে হবে। কেনো সেনেগালের রাষ্ট্রনায়ক লিওপোল্ড সেংঘর ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে পণ্ডিত হয়েও আপন ‘নিগ্রোতা’কে ভুলে যেতে পারেন না। যতীন সরকার বলেন,

‘ফরাসী ভাষা, সভ্যতা ও শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত থেকেও, বোদলেয়ারের কাব্য সম্পর্কে গবেষণা-নিবন্ধ রচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভ করেও, সেংঘর কিন্তু ফরাসী তথা আধুনিক পাশ্চাত্যের অবক্ষয়ী চৈতন্যে আক্রান্ত হন না, বোদলেয়ারী জগতের বিবরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন না। বোদলেয়ারীয় সর্বগ্রাসী অমঙ্গল-ভাবনার বিপরীতেই অবস্থান নেন কবি সেংঘর। ফরাসী দেশের প্রবাসজীবনে বোদলেয়ারসহ প্রধান প্রধান ফরাসী কবিদের কাব্যপ্রবাহে অবগাহন করে অবশ্যই কাব্যের মর্মবস্তু বা নির্মাণকলা সম্পর্কে পাঠ গ্রহণ করেন তিনি, কিন্তু সে-পাঠ তাঁর ‘আফ্রিকীয়তা’ বা ‘নিগ্রোতা'কে ভুলিয়ে দিতে পারে না। প্রবাসজীবনই বরং তাঁকে নিজের কৃষ্ণ মহাদেশের প্রতি আবেগময় দৃষ্টিপাত করতে শেখায়, স্বকীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে চেতনায় উজ্জ্বল করে তোলে, মাটি আর মানুষের প্রতি নবায়িত মমতা তাঁর কবিসত্তার উদ্বোধন ঘটায়। প্রকৃত কবির চেতনায় বিদেশ এভাবেই স্বদেশকে জাগিয়ে তোলে, স্বদেশের তুচ্ছ বস্তুও প্রবাসী কবির সত্তায় মহীয়ান হয়ে দেখা দেয়।’

তাই সময়ের এই বিপুল তীর্যক অভিঘাত থেকে বাঁচতে যতীন সরকার ভূমির কবিতা লিখতে বলেন। কবিতা লেখার ঔপনিবেশিক প্রকৌশলটা কিংবা দীক্ষাটাকে রেখে দিতে বলেন। কবিতা একটা জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেহারা। ইউরোপীয় প্রকৌশলে কবিতা লিখলে বাঙালি কবির পলিমাটিকে টের পাওয়া যায় না। লেখক বলেন, ‘সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের উদ্ভবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছিল একটি বিদ্রোহী প্রতিবাদী চেতনা, এবং সেই একই চেতনা সক্রিয় ছিল পরাবাস্তববাদে পূর্বসূরী প্রতীকবাদের মধ্যেও। ফরাসি প্রতীকবাদী কবি-শিল্পীরা ফরাসি পুঁজির অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতীকবাদের সাহায্যেই প্রতিবাদের প্রতিরোধ খাড়া করতে চেয়েছিলেন।’ কাজেই প্রতীকবাদের ইতিহাসটা জানতে হবে। ইতিহাস জানলে প্রকরণকে সূত্রমতে ব্যবহার করা যায়। প্রতীকবাদের এই প্রকরণকেই স্বাদেশিক ঐতিহ্য-চেতনায় যেমনটা ব্যবহার করেছেন পাবলো নেরুদা। স্বাদেশিক ঐতিহ্য-চেতনার গভীরতা দিয়েই পরদেশি প্রকরণকে ব্যবহার করতে হবে। আফ্রিকান কবিকে উদ্দেশ্য করে তিনি যেন বাঙালি কবিকেই কথাগুলো শুনাচ্ছেন–

‘সেংঘরের মতো সকল আফ্রিকান কবির সত্তাই স্বদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে দৃঢ়মূল; তাই বিদেশি ‘প্রকরণ’-কে অনায়াসে তাঁরা স্বদেশি ‘প্রসঙ্গে’র উপযোগী করে তুলতে পারেন, বিদেশের স্বাস্থ্যকে অধিগত করে ব্যাধিকে প্রতিহত করতে পারেন। একারণেই আফ্রিকার কবিতা একান্তরূপেই আফ্রিকান; আর আফ্রিকা যেহেতু সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ তথা সকল অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় প্রতিবাদে মুখর, তাই আফ্রিকান কবিতা কেবল আফ্রিকারই নয়,– নিখিল বিশ্বের প্রতিবাদী মানবতার। এই প্রতিবাদী মানবতার রূপকার বলেই সেনেগালের কবি লিওপোল্ড সেদার সেংঘর তাঁর স্বদেশ বা স্বমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৃথিবী নামক এই গ্রহটিরই কবি। অর্থাৎ তিনি বিশেষভাবে ‘জাতীয়’ বলেই একান্তভাবে ‘আন্তর্জাতিক’।’

তিন
সব শিল্পই সম্ভবত, শেষ বিচারে সময় ও জীবনের কথা বলে। আর্টের মূল লক্ষ্য জীবন। গোলাপের পাশ দিয়ে যে মানুষ হেঁটে যায়, সে স্থান বা গোলাপের চেয়ে কবি মানুষের অনুভবগুলোই লেখেন। তাৎক্ষণিকতা কখনই শিল্প নয়। ‘লোক-লোকান্তরে’র অনুভব আর ‘কালের দর্পণ’ কবির দার্শনিকতায় চিত্রায়িত হলেই কবিতা জীবনকে স্পর্শ করে। কিন্তু পরদেশ, পর-প্রকরণের নানামুখি পথে ধাবমান ছিল বাংলা কবিতা। বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিক, আধার এবং আধেয়- সব ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে বাংলা কবিতায়। এই পাশ্চাত্যানুকরণ বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে যতটা, তার চেয়ে বেশি হয়েছে আঙ্গিকের ক্ষেত্রে। এই পাশ্চাত্য প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে। পশ্চিমী প্রভাবসূত্রে বদলে গেছে বাংলা কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর কাঠামো। যতীন সরকার জাগ্রত মূলধারার কবিতার কথা বলেন। চর্যাপদ বাহিত, লালন বাহিত জনসংস্কৃতির যে কবিতা, সে কবিতার প্রায় মৃত্যু হয়েছে। কেনো হয়েছে? এই জন্য দূরমুখী কাব্যাকাঙ্ক্ষাকেই দায়ী করেন এই চিন্তক। বাংলা কবিতার অনিবার্য উত্তরাধিকারকে ধারণ না করার ফলাফল হচ্ছে আজকের বাংলা কবিতা। পাশ্চাত্যের অলজ্জ ঋণের ভেতরে বাংলা কবিতার মূলধারার গণমুখী প্রবাহটি আজ মৃত। ‘বাঙালি কবিরা অবশ্যই কূপমণ্ডুক নন, ‘দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া’– ঈশ্বরগুপ্তীয় এ-প্রতিবন্ধ থেকে তাঁরা মুক্তি অর্জন করেছেন বহু আগেই, তাঁরা বরং ‘কাব্যের কল্পতরু’ জন্মানোর লক্ষ্যে ‘সারা ব্রহ্মাণ্ড খুঁজে’ কাব্য-বীজ সংগ্রহে নিরত।’ ‘আমি আমার পূর্ব-পুরুষের কথা বলছি/ তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল/ তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল’।– আত্মজীবনের এমন প্রতিচ্ছবি লিখতে কবিরা কেমন যেন দূরে সরে যাচ্ছেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক বলেন–
‘আমাদের কবিদের মানস-জগৎ দৈশিক ঐতিহ্য-ভূমিতে সংলগ্ন নয়, প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলার মাটির একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁরা পুরোপুরি না হলেও বহুলাংশে অসংশ্লিষ্ট। শুধু কবিরা কেন, কবিরা যে শ্রেণি ও সমাজের সদস্য, সেই নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও বিদ্বৎসমাজ সামগ্রিকভাবেই বৃহত্তর দেশ ও তার জনমণ্ডলীর সংস্কৃতি-প্রবাহের সঙ্গে অনন্বিত। ঊনিশ শতকে এ-শ্রেণির উদ্ভবলগ্ন থেকেই এ অনন্বয়েরও সূচনা। যে-সাংস্কৃতিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে এ-শ্রেণিটির মানস-গঠন সম্পন্ন, তাতে ঐতিহ্য-চেতনা অবশ্যই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু সে-ঐতিহ্য ছিল একটি কৃত্রিম ও তথাকথিত শিষ্ট ঐতিহ্য।’

পরাবাস্তববাদীতার উল্টো পথেই হাঁটে যতীন সরকারের কাব্যচিন্তা। ‘শব্দই কবিতা’ কিংবা ‘উপমাই কবিতা’ –এই ভাবনাতে তিনি তৃপ্ত নন। তিনি মনে করেন, শিকড়হীন নিরক্ত আবেগে ধ্বনি-শব্দ-ছন্দের যাদুর খেলায় একটা জাতিকে স্বপ্ন দেখানো যায় না। কবিতা একটা জাতিকে স্বপ্ন দেখায়। কবিতায় তিনি একটা সতর্ক স্বাপ্নিক আশাবাদকেই প্রত্যাশা করেন। নৈরাশ্যের বিপুল দিনলিপিতে মানবের মুক্তি আসে না। অনেক আক্ষেপ করে তিনি লিখেন–
‘আমাদের বাংলার কবিরা সাম্যবাদী কবি বলে নিজেদের পরিচিত করতে আগ্রহী নন। সাম্যবাদে কমিটেড হওয়াকে তাঁরা অনেকেই বিবেকের বন্দীত্ব বলে মনে করেন, মুক্ত চিন্তা ও বিশুদ্ধ কবিতার সাধকরূপে তাঁরা থাকতে চান সবরকম কমিটমেন্টের ঊর্ধ্বে। সেই চল্লিশের দশকে একদল কবি সাম্যবাদ অঙ্গীকৃত হয়ে বাংলা কাব্যের ধারায় একটা ক্ষণিক তরঙ্গ তুলে মিলিয়ে গেলেন। এরপর আর এ-ধারার সজীব অগ্রগতি ঘটেনি। আর্কেডিয়া সন্ধানী কোনো নতুন কবিরও আর আমরা সন্ধান পাইনি। তার বদলে আমরা কবিদেরকে ঘুরতে দেখেছি রিরংসার জান্তব ভুবনে, পরাবাস্তবের ভুতুড়ে জঙ্গলে, নৈরাশ্যের ধু ধু মাঠে কিংবা উদ্দেশ্যহীনতার কানাগলিতে।’

চার
একজন সচেতন কবি আস্তে আস্তে শব্দ-ব্যবহার শিখেন। কবিতা লেখার পর কবিকেও সন্দেহ মিশিয়ে খাতায় নামানো ভাবনাটাকে দেখে নিতে হয়। দেখে নিতে হয় ভাবনাটা কবিতা হলো কি-না? শিল্পের কাছে শিল্পীও দায়বদ্ধ। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, জীবনের সত্যটাকে, প্রতারিত সময়টাকে খাতায় নামাতে হয়। পৃথিবীতে কবিই বোধহয় সবচেয়ে শান্তভাবে আপন কবিতাটার জন্য অপেক্ষা করেন। তিনিই বড় কবি যিনি সময়কে খাতায় নামাতে জানেন। তাঁদের ডাকনামে রচিত হয় পৃথিবীর এলবাম। জীবনানন্দ দাশ কেনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবি? কারণ, সাধারণের কথা, সাধারণের কাছে, মাটি ও আত্মার সেই সাধারণ ভাষায় তিনি বলে দিয়ে গেছেন। কবির কাজ, বলে দিয়ে যাওয়া। নিজের কবিতা সম্পর্কে পল সেলান লিখেছেন, ‘আমার কবিতা বার্তা লিখে বোতলে ঢুকিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়ার মতো। আমি জানি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে বার্তা কারো কাছে পৌঁছে না। কিন্তু সৌভাগ্যবশত যদি কেউ সে বার্তা পেয়ে যায়, সে আশায়ই লিখি।’ তাই লেখালেখি করে কবির জীবনটা কখনো নষ্ট হয় না। কবি ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছেন–
‘যে মানুষ অন্য একজন মানুষের পাশ থেকে মসৃণভাবে সরে যায়, পারমাণবিক পৃথিবীর বিরুদ্ধে তার কোনো কথা বলারই অধিকার নেই।
যেন সাধারণ মানুষের দুঃখের সাথে সারাজীবন জড়িয়ে থাকতে পারি। যেন কাজে আসতে পারি তাঁদের।’
কবির কোনো অবসর নেই। সত্যের মতো দৃঢ় একটা আহ্বান, আর প্রতিশ্রুতি আছে। সময় যাপনে কবির অমোচনীয়-ধ্যান হতে পারে আপন ভাষায় শব্দসংযম।

কোন দিকে ছুটে চলেছে বাংলা কবিতার হতচকিত মন। নিজস্ব রুচিবোধ দিয়েই যতীন সরকার বাংলা কবিতার সে মনকে শাসন করেন। ক্যামু কথিত আধুনিক মানুষে সমস্ত শহর ভর্তি হয়ে গেলেও কি কবিতা আপন শেকড় ছেড়ে কথা বলবে? মানুষ কি ভুলে যাবে আত্ম-ভাষার আদর-আবেগ-বিস্ময়। জনস্রোতের ভেতরে ভাষা কখনই ফুরায় না। সামান্য পুলকে শুধু ভিন্ন পথে হাঁটছে বাংলা কবিতা। রফিক আজাদের কবিতায় তিনি আত্মসংস্কৃতির চর্যা খুঁজে পেয়েছেন। একটা বিপুল আশাবাদে তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন,‘অন্ধকারের নিবিড়তাই বাংলাদেশের একমাত্র বাস্তবতা নয়, তিমির হননের গানের সুরও এখানে-ওখানে শ্রুত।’ তাই রফিক আজাদের কবিতা সম্পর্কে তাঁর দ্বিধা মাখানো স্পষ্ট মন্তব্য–
‘এঁদের এ-আগ্রহ কি নিতান্ত সাময়িক ঘটনা বা দুর্ঘটনার অভিঘাত মাত্র? এঁদের আজকের সুস্থ জীবনাগ্রহ কি আবার তথাকথিত বিশুদ্ধ কবিতার বিবরগামী হবে? রফিক আজাদ যে-আর্কেডিয়ায়ার সন্ধানে গিয়েছেন চুনিয়ার আরণ্যক আবাসে, সে-আর্কেডিয়া কি তিনি খুঁজে পাবেন না লোকালয়ের জনপদে? আর্কেডিয়া খুঁজতে খুঁজতে তিনি কি ‘পায়ের তলায় জীবনের শক্ত প্রিয় মাটির ছোঁয়া’ পেয়ে যাবেন না? জীবনের কবিতার রুদ্ধ দরজা খোলার জন্য সঠিক চাবিটি কি হস্তগত হবে না আমাদের কবিদের? চরিত্রবান কবি আর কবিতার উদ্ভব হবে না কি আমাদের উর্বর মাটিতে?
আমার জানা নেই। আমি শুধু বুকের গভীরে লালন করি এমন একটি পাখির ছানাকে, সতর্ক আশাবাদ যার নাম।’

সতর্ক আশাবাদ নিয়ে বাঙালি কবির কাছে তিনি আসলে কী প্রত্যাশা করেন? আমাদের ঊর্বর মৃত্তিকায় সৎ-চরিত্রবান কবি বলতে কী বুঝিয়েছেন তিনি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ- এঁরা কি সৎ-চরিত্রবান কবি নন? অবশ্যই সৎ কবি। তিনি তো এ কথাও বলেন যে বাংলা কবিতার সাথে সাঁকো বাঁধতে পেরেছেন যে কবি তাঁর নাম শামসুর রাহমান। এই সূত্রে তিনি বলতে থাকেন, ‘আমাদের সকল কবিই কি এ-রকম সকলের কবি হয়ে উঠতে পারেন না, সকলের হৃদয়ের সঙ্গে সাঁকো বাঁধতে পারেন না?’ আসলে বাংলা কবিতা নিয়ে তিনি বিশেষ বোধ ও অভীপ্সা লালন করেন। বাঙালি কবির প্রতি তাঁর স্পষ্ট অনুরোধ–
‘শ্রম যদি হয় সংস্কৃতির উৎস, আর শ্রমসংশ্লিষ্ট গণমানুষ যদি হয় সংস্কৃতির স্রষ্টা, তাহলে এ-কথা অবশ্য-মান্য যে, সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ কবিতাকেও হতে হবে গণমানুষের সঙ্গে সংলগ্ন। সে-সংলগ্নতার ফলে কবিতায় উঠে আসবে আশা-আর্তি, বঞ্চনা-অভীপ্সা সহ গণমানুষের সবকিছু। এবং অনিবার্যভাবে এসে যাবে রাজনীতিও। কারণ শ্রম-অপহারক সমস্ত রাজশক্তিকে উৎখাত করে শ্রমজীবী মানুষের নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত তাদের আর্তি ও বঞ্চনার সমাপ্তি ঘটবে না, আশা ও অভীপ্সার মূর্তরূপও দৃশ্যমান হবে না। তাই গণমানুষের একটা নিজস্ব রাজনীতি একেবারেই অপরিহার্য।...
সারা পৃথিবী জুড়েই কি কবিদের এ-রিপাবলিক গড়ে উঠতে পারে না? আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি না যে : বাংলার কবিরাও দৈশিক লোক ঐতিহ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণচেতনাসম্ভূত কাব্যপ্রকরণের স্বীকরণ ঘটিয়ে নতুন এক রিপাবলিক গড়ে তুলবেন?’

যতীন সরকারের ভাবনার একটা সমমনস্ক সমাজ যদি আসে, তবে বাংলা কবিতার জারুল বৃক্ষতে মৌলিক রঙ ধরবে। এখন কি তবে মৌলিক রঙ নেই। না নেই। অনেক রঙের ভেতরে স্বাতন্ত্রিক বাঙালি রঙ নেই। বুদ্ধদেব বসু তো কবি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও বলেছেন, `a European writing in bengali’ বহুপুরুষের লালিত পরিচর্যায় যে বাংলা কবিতা, সে বাংলা কবিতায় ঝকঝক করছে পাশ্চাত্যের ঋণ। যতীন সরকার তাই মূলধারার বাংলা কবিতার দিকে তাকাতে বলেন। লালন, হাসন, রাধারমণ, জালাল খাঁ, রশিদ উদ্দীন, কিংবা উকিল মুন্সির উত্তরাধিকারকে বহন করতে বলেন। কীভাবে করবেন? সময়ের কবি সময়ের ভাষাতেই করবেন। বাংলা কবিতার প্রজ্ঞাবান পাঠক হিসেবে তিনি চিহ্নিত রক্তের উত্তরাধিকারকে জেনে বুঝে কবিতা লিখতে বলেন।

পাঁচ

কবিকেও বদলাতে হয় ধ্যাণ ও দৃষ্টিভঙ্গি। ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমাদের কফির ক্রীম; জীবনানন্দ তা সযত্নে সরিয়ে দিয়েছেন।’ যতীন সরকারের কবিতা ভাবনা থেকে আগামিকালের আমি কিংবা আমরা কীভাবে কবিতা লিখবো, তাঁর একটা সূত্রপথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। অসুস্থ শরীর নিয়ে জীবনের শেষ বছরগুলোতে রবীন্দ্রনাথ কি ভাষা ও অনুভবের নতুন নতুন পরীক্ষায় নামেন নি? কল্পনা কি শিথিল এক চোখের আলস্য-জানালা! নাকি, মুহূর্তে মুহূর্তে বহু দৃষ্টির অনুভবে বদলে যেতে থাকে কবির জানালা। কবিকে তাকাতেই হয়। শেকড়েই দাঁড়াতে হয়। আপন চেহারা ভুলে, আপন ভাষা ও আবেগকে অস্বীকার করে কবিতার জিনিয়া ফোটানো অসম্ভব। আপন ভাষার লোকালয়ে দাঁড়িয়েই কবিতাকে সত্যে ও এবং ব্যাপ্তিতে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। জীবন কিংবা কল্পনার সাথে কবির সাদা পৃষ্টার দূরত্ব থাকবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ