Vision  ad on bangla Tribune

কেনো হলধর নাগ?

জাহিদ সোহাগ১৭:০২, এপ্রিল ০৭, ২০১৬

হলধর নাগপদ্মশ্রী পদক পাবার পর হলধর নাগ বাঙালি বিদ্বৎসমাজের সামনে আসেন, এবং বলা যায় সেটা নিতান্তই পদক পাবার কারণেই। অথচ এর আগেই তাঁর ২০টি মহাকাব্য রচনা-সহ প্রচুর কবিতা লেখা হয়ে গেছে, যা আবার তার মুখস্তও। তবে লক্ষ্য করি, তাঁর সাহিত্যকীর্তি নয়, বরং তাঁর দারিদ্র্য এবং প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে না-পারার অক্ষমতাই মিডিয়া বা আড্ডার টেবিলের বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ তাকে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তুলনাও করছেন, মানে কোনো চিহ্নায়ন ছাড়া তাকে আমরা বুঝতে পারছি না; বিদ্বৎসমাজের জন্য এই অসুবিধা সৃষ্টি করেছেন হলধর নাগ।
ভারতবর্ষের বহু ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃসম্পর্কহীনতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রে বিশেষ ভাষা-ধর্ম ও জাতির প্রতি পক্ষপাত নিজেদের মধ্যে অনতিক্রম্য এক দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে। যেন মানুষকে একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি ও একটি ধর্ম দিয়ে আত্রান্ত করে ফেলতে চাইছে জাতীয়তাবাদের প্ররোচনায়। আর ভারত তো তাঁর ঔপনিবেশিক ভাষার উপর দাঁড়িয়েই যেন বিকশিত হতে চাইছে– চমস্কি যেমন বলেন আগামী পৃথিবীর ভাষা হবে একটাই, সেটা কম্পিউটারের ভাষা(ইংরেজির দিকে ইঙ্গিত?)– ফলে ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের সাহিত্য সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় থাকছেই না। এমনকি এই অধুনা কালেও সেসব ভাষার লিপি সংরক্ষণ বা প্রবর্তনের কোনো উদ্যোগ থাকছে না।

মজার বিষয় হচ্ছে, আধুনিক সাহিত্য মৌখিক-সাহিত্যকে (ওরাল লিটারেচার) গ্রাম্যতা বলে বিদায় করেছে ভারতচন্দ্রের পর থেকেই, এবং যেটুকু বেঁচে আছে তা ফাইন এবং ফোক আর্টের পার্থক্য সৃষ্টির মাধ্যমে; ফলে তৈরি হয়েছে ‘অপর’ ভাষা; যা আমাদের নয়– তো এই বিদ্বৎসমাজের সামনে হলধর নাগ চারণ-কবি হিসেবেই গৃহীত হয়ে থাকবেন বলে আশা করা যায়, এবং তাঁর জীবদ্বশায় তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঁচজনের পিএইচ-ডি অভিসন্দর্ভ রচিত হওয়া এবং আরো হতে থাকার মধ্য দিয়ে আমরা যেন ভুলে না যাই, হলধর নাগ যে ভাষায় কবিতা লিখছেন, অর্থাৎ উড়িয়া রাজ্যের ‘কোশালি’ ভাষা, যে ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য চার দশক ধরে সংগ্রাম করছেন এই ভাষাই মানুষ– উনিশ শতকের আগে যার লিখিত রূপও ছিলো না, এখন একজন হলধর নাগ এই ভাষাকে মহাকাব্যিকতা দিয়েছেন, এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার আবেদনকে উচ্চকিত করে তুললেন।

 

হলধর নাগের কবিতা

 

কোকিল 
লুকিয়ে লুকিয়ে গান গাস রে কোকিল

আম বাগানের ঝোপে
(যেন) টুপটাপ পড়ে চাক ভেঙে রস
তাই শুনে পেট ভরে।।
পাখির ভেতর তুই রানি হোস
কন্ঠ বেড়ালের ঘণ্টা*
তোর বুলিটা নিখাদ মধুর
গলে মিশে যায় মনটায়।।
কাকের বাসাতে ডিম পেড়ে রেখে
নছড়ামি তোর ঘোর
ঝারা হাতপায়ে ট্যাংট্যাং ঘোরা
নেই সন্তান স্নেহ তোর।।
শুনেছি মালিকা যখন কৃষ্ণ
গেল কংসবধ দেখি
তার মা যশোদা শরণে কেশব
কেঁদেছিল তুই সাক্ষী।।
বছরে একবার আজ যে দশমী
পথে উল্টো রথের ঢল
শ্বশুর ভিটেতে খেটে মরা বধুর
সে খবরটাই সম্বল।।
গিরগিটি বয় কাপড়ের গাঁট
ফুল সাজি বয় ফিঙে
দুটো টুনটুনি যেন বউ দুটি
উলু দেয় তিতিরে।।
পাখির মিছিলে কাঠঠোকরা ঢাকী; মুহুরি অন্য পাখি
বিবাহের এই শোভাযাত্রায় ভাট পানকৌড়ি
ডালা সাজিয়ে বাজা বাজিয়ে গায়ে হলুদের তত্ত সাজিয়ে
ফলমূল আর খাজাগজা নিয়ে ময়না তাদের নেত্রী।।
দেখা দিস না রাগিণী শোনাস
লাজ করে গুণবতী
দেখা দেন না বিচক্ষণ সুজন
(দিলে) গুণ হয়ে যায় মাটি।।

 

* উল্টো রথের সময়ে শ্রাবণের শুরুতে কোকিলের ডাক ঘণ্টির  মতো শোনায়।

হয়তো তারা ছানা কোকিল, কিংবা বড় কোকিলের শেষ মেটিংকল।

 

পাঁচ অমৃত

যেখান থেকে অমৃত ঝরে
সাত সমুদ্র থেকে
স্বর্গ থেকে
মায়ের স্তন থেকে
মহৎ নীতির ধারা থেকে
কবির কলম চালাই।।

 

উজ্জ্বল সলিতা

প্রদীপ জ্বাললে জীবন উজ্জ্বল
ঘুপচি ছাদের ঘরে
চাঁদকে জীবন্ত উজ্জ্বল দেখে
আঁধার পালায় ডরে।।
অজ্ঞানতার আঁধার ভিতরে
পাঁড় ছ্যাঁচোর রত্নাকর
জ্ঞানের উজ্জ্বলতা দেখে হয়ে গেল
বাল্মীকি মুনিবর।।
আঁধারের ঝারে যোগ্য ছেলেটি
দিয়েছে প্রদীপ জ্বালি
জ্বলা সলিতার মতো উজ্জ্বল
পশ্চিম উড়িষ্যার বুলি।।

 

(কোশলি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন, কৌশিক ভাদুড়ি)

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ