সেদিনের মঙ্গল শোভাযাত্রা চৈত্রে রচিত বৈশাখী গান

Send
নাজিব তারেক
প্রকাশিত : ০৭:০০, এপ্রিল ১৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, এপ্রিল ১৪, ২০১৬

আজকাল অনেকই বলছে এ শোভাযাত্রা যশোরে শুরু হয়েছিল। কথাটা ভুল নয়, কিন্তু কথাটা সঠিকও নয়। মনে রাখতে হবে এটি যশোর শোভাযাত্রার ঢাকাই রূপ নয়। যেমন এটি নয় রিও কার্নিভ্যাল কিংবা মহরমের তাজিয়া মিছিল কিংবা রথযাত্রা। যশোরের অভিজ্ঞতা ঢাকা চারুকলার শোভাযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এটা শতভাগ ঠিক, কিন্তু যশোরের শোভাযাত্রার প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন

সেই সময়ের পোস্টার১ লা বৈশাখ ১৩৯৬ (১৪ এপ্রিল, ১৯৮৯) সকাল, আনন্দ শোভাযাত্রার পর
মালি : কী করলেন ভাই, আমার সব ফুলগাছ তছনছ হয়ে গেল...
আমি : মেজাজ খারাপ হচ্ছে!
মালি : হচ্ছে...কিন্তু...না! অন্য রকম একটা কেমন যেন লাগছে...এতো মানুষ কোনোদিন চারুকলায় আসেনি...এমন পাগলের মতো হৈ হৈ করে ছুটাছুটিও করেনি, দেখছেন কেমন আনন্দ নিয়ে ঘুরছে...
ছোট সন্তানের হাতে ধরে আনন্দ উদ্বেল বাবা-মা কিংবা আমারই বয়সী কেউ বারবার জানতে চাইছে আর কী আছে? কিংবা এইসব পুতুল (হাতী ও অন্যান্য) একটু ছুঁয়ে দেখা যাবে কি? বিশিষ্ট ক’জন জানতে চাইলেন মুখোশ বা ঘোড়াগুলি কীভাবে পাওয়া যেতে পারে (কেনা যেতে পারে)?
১/২টি ঘোড়া ও ৫/৬টি মুখোশ ঘরে ফেরেনি! কী অদ্ভুত, একজন বাবা তার পাঁচ-ছ’বছরের বাচ্চাটিকে নিয়ে এসেছেন, বাচ্চাটি তার ও বাবা-মার মাথার মুকুটটি খুলে আমার হাতে ফেরত দিচ্ছে, বাবা বলছেন ‘আঙ্কেলকে ওগুলো দিয়ে দাও...এ মুকুটগুলি আমরা গত পাঁচ-ছ’দিনে এন্টিকাটারে কাগজ কেটে তুলিতে রঙ-নকশা ফুটিয়ে বানিয়েছি...‘না, আঙ্কেল ওগুলো তোমার ও আব্বু-আম্মুর...’ বিস্ময় ও আনন্দ হাসিতে বাবা-মা-ছেলের মুখ বলে দিচ্ছে– আজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য আনন্দের উৎস হয়ে গেল...

১ লা বৈশাখ ১৩৯৬ (১৪ এপ্রিল, ১৯৮৯) সকাল ৮-৮.৩০, আনন্দ শোভাযাত্রা

গেটটা খুলে দেয়া হলো, ঢাকের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ময়ূরবেশে মেয়েরা পা ফেললো শাহবাগ-টিএসসির রাস্তায়। শুরু হলো বৈশাখী আনন্দ শোভাযাত্রা। টিএসসি মোড়ে পৌঁছুতে পৌঁছুতে অসংখ্য মানুষ যুক্ত হলো এর সঙ্গে। যারা বছরের প্রথম দিনে এক জমকালো আনন্দ আয়োজনে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন...

দোয়েল চত্বর পেরিয়ে শোভাযাত্রা পৌঁছে গেল শিক্ষা ভবনের মোড়ে। পুলিশী বাধা। শঙ্কা ও উত্তেজনা। অনুমতি নেই বা নেয়া হয়নি! না, তা খুব সমস্যা তৈরি করেনি, কর্তব্যরত পুলিশই পথ দেখালো। আনন্দ শোভাযাত্রা হাইকোর্ট-মৎস্যভবন (তখনো নির্মাণ হয়নি) ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট, ঢাকা ক্লাব হয়ে শাহবাগ মোড়। পথে শোভাযাত্রা দীর্ঘই হয়েছে। আলোকচিত্রীরা ‘ছায়ানট’-এর ছবি তুলে ফিরে গেছেন অফিসে, গুটিকয় সৌখিন ক্যামেরায় তাই ইতিহাস রইলো তোলা।

১ লা বৈশাখে হবে শোভাযাত্রা এবং সেটা হবে আনন্দ শোভাযাত্রা। আনন্দই পারে স্বৈরাচারের জুজুর ভয় দূর করতে। স্বৈরাচার তো আনন্দকেই প্রথমে হত্যা করতে চায়, তো আনন্দই হোক স্বৈরাচার প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার

১ লা বৈশাখ ১৩৯৬ (১৪ এপ্রিল, ১৯৮৯), সকাল, আনন্দ শোভাযাত্রা শুরুর আগে
ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে হল থেকে পৌঁছালাম চারুকলায়। ৭ টা বেজে কিছু সময় গেছে। শোভাযাত্রা শুরু হয়ে যাওযার কথা, কিন্তু না, গত রাতেই আমাদের মনে পড়েছিল রমনা বটমূলের ‘ছায়ানট’-এর কথা, তো ৮ টায় হবে শুরু। সহপাঠী মেয়েরা সেজেছে ময়ূরের সাজে। ছেলেরা এবং যারা গত ২০-২২ দিন ধরে হাতি, ঘোড়া, পাখি, ময়ূর ও মুখোশ ও মুকুট বানিয়ে চলেছি তাদের থেকে ক’জন হয়ে গেছি ঘোড়সওয়ার। আরো সকলের হাতে হাতে ধরা মুখোশের দণ্ড। সকলেরই মাথায় কাগজের মুকুট, মুকুট আরো আছে সাধারণের জন্য...
নজরুলের কবরের দেয়াল ঘেষে যে গেট, সেটা দিয়ে বের হবে আমাদের শোভাযাত্রা, ঢাকিরা প্রস্তুত। ঢাকের বাড়ি পড়ছে মাঝে মাঝেই।
কাল সন্ধ্যায় যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিতে গিয়ে ঘণ্টা হিসেবের রিক্সাওয়ালা আমায় ঢাকা শহর চেনালো, সে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কি ছাপা হয়েছে? পোস্টার উল্টো করে লাগালাম বলে শামীমের সঙ্গে হাতা-হাতি হতে বাকি ছিল, সে পোস্টার কি মানুষের চোখে পড়েনি? মধ্যরাতের বৈশাখী স্বাগত সম্ভাষণ শেষে, আমাদের (চারুকলার ছাত্রদের) মানুষ মূর্খ ভাববে কিনা সে নিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতেই মুকুল বাড়ৈ নিউ মার্কেট ও ইডেনের দেয়ালে পোস্টার সেটে দিল উল্টো করেই, তা কি কারোই চেখে পড়েনি?
আটটা বাজে, আমরা অপেক্ষমান। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও মানুষের চোখে পড়েছে, চোখে পড়েছে উল্টো পোস্টারও...মানুষ আসছে...বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাই প্রধানত, তারা আসছে টিএসসির দিক থেকে। শাহবাগের দিক থেকে শুরু হলো মানুষের ঢল, সে ঢলে শিশুরাও আছে...

শোভাযাত্রার ব্যানারআনন্দ শোভাযাত্রা কেনো এ বৈশাখে?
আমরা খুঁজছিলাম এমন এক উপলক্ষ যা হাজার বছর ধরেই গ্রাম-বাংলার নাড়ির সঙ্গে প্রোথিত। যা কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত নয়। হ্যাঁ, সেটা পহেলা বৈশাখ, বছরের প্রথম দিন। এদেশে ইংরেজ শাসন আগমনের আগে কিংবা ৩০-৪০ বছর আগেও এটাই ছিল বছরের প্রথম দিন। সারাবিশ্বেই প্রত্যেক জনগোষ্ঠিরই তাদের নিজেদের নববর্ষ আছে, যা আসলে ভূগোল, প্রকৃতি, কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্য যাত্রার হিসেবের খাতা। আমাদের সেটা ১লা বৈশাখ, এ দিনটি পশ্চিমে সিন্ধু উপতক্যা থেকে পূর্বের ইন্দোনেশীয়া পর্যন্ত বছরের প্রথম দিন, ভিন্ন ভিন্ন নামে। এসব অঞ্চলে আরব, পারসী ও আফগানদের (মুসলমান) আগমনের আগে থেকেই এটি বছরের প্রথম দিন। মুঘলেরা রাজস্ব ও বাণিজ্য সুবিধার প্রয়োজনে এটাকেই পারসীক নওরোজের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়েছিল। একথা New Year's Day লিখে গুগল কিংবা উইকিপিডিয়ায় খোঁজ দিলে বিস্তারিত জানা যাবে।
কীভাবে শোভাযাত্রা
এটার একটু ইতিহাস আছে। আজকাল অনেকই বলছে এ শোভাযাত্রা যশোরে শুরু হয়েছিল। কথাটা ভুল নয়, কিন্তু কথাটা সঠিকও নয়। মনে রাখতে হবে এটি যশোর শোভাযাত্রার ঢাকাই রূপ নয়। যেমন এটি নয় রিও কার্নিভ্যাল কিংবা মহরমের তাজিয়া মিছিল কিংবা রথযাত্রা। যশোরের অভিজ্ঞতা ঢাকা চারুকলার শোভাযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এটা শতভাগ ঠিক, কিন্তু যশোরের শোভাযাত্রার প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ঢাকায় এর শুরুতে দুটো প্রধান বিষয় কাজ করেছিল, একটি চারুকলার তৎকালীন অচলাবস্থা অপরটি রাজনৈতিক। চারুকলায় তখন বার্ষিক প্রদর্শনীটিও ঠিকমত হতো না, বর্তমান জয়নুল গ্যালারী ছিল ভাঙা ডংকি (চারুকলার ছাত্রদের আসন বিশেষ), ইঁদুর, তেলাপোকা ও মাকড়শার নিরাপদ আশ্রয়। শিল্পকলা বা জাদুঘর গ্যালারীতে বছরে কী দু’বছরে দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া ছাত্রদের আর কোনো সুযোগ নেই। এর বাইরে এলিয়ন্স ও জার্মান কালচারাল সেন্টারের নিয়মনীতি ও সাজু আর্ট গ্যালারীর পছন্দ অপছন্দ। ঢাকা চারুকলার বহু বছরের পুরোনো প্রি-ডিগ্রী, বিএফএ ও এমএফএর সিলেবাস।
দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে এরশাদ শাসন, এরশাদ ভ্যাকেশন আর ছাত্রদল, ছাত্রলীগ (আওয়ামী), ছাত্রলীগ (জাসদ), শিবির ও ছাত্রসমাজ (এরশাদ) এর হল দখলের লড়াই যেন চর দখলের নাগরিক রূপ। আনন্দ বলতে শাহনেওয়াজ ভবনের প্রবেশ পথের পাশে রাখা পাইপের উপরে বসে ক’জন মিলে গলা ছেড়ে গান, ‘হরিণ একটা বান্ধা ছিল গাছেরও তলায়...’

শোভাযাত্রার প্রতীক বা মোটিভসমূহ বেছে নেয়া হলো গ্রাম্য শিশুর হাজার বছরের খেলনা থেকে, যা আমাদের লোক ঐতিহ্যের বাহক। হাতি, ঘোড়া, পাখি আর মুখোশ।

১৯৮৮-এর বন্যা আমাদের (ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, চারুকলা) এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল– আমাদের পরিচয় কী ও সামরিক স্বৈরাচারের বিপরীতে আমরা কীভাবে লড়তে পারি? হ্যাঁ, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী যে সামরিক শাসনের পুনরাগমন ঘটে, হ্যাঁ পুনরাগমনই বলছি, পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের কথা স্মরণে রেখেই, ব্রিটিশ শাসনের কথাও মনে রাখছি। এগুলো মনে না রাখলে বলতে হয় বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসন, আর সেটা হবে ইতিহাসের খণ্ডিত অধ্যায়ন। এরশাদ সে ধারাবাহিকতারই অংশমাত্র। জগতের সকল স্বৈরাচারের ন্যায় ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি স্বৈরাচার ধর্ম ও সাম্প্রদায়ীকতার ‘Divide & Rule’এর নীতি মেনেই ক্ষমতা সুসংহত করে ও করতে চায়। জিয়া-এরশাদ তার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। তাই এ শোভাযাত্রার আয়োজন কালটি ছিল গোপনীয় ও সতর্কতার। গোপনীয় রাখতে গিয়ে চৈত্র-সংক্রান্তীর বিকেলে আমরা আবিষ্কার করেছিলাম এ শোভাযাত্রার খবর পত্রিকাওয়ালারাও জানে না, এমন কী চারুকলার অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও জানে না কী হচ্ছে! কর্মী সংখ্যাও ছিল মাত্র ২০-২৫ জন এবং আমি হচ্ছি তাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ও হাতি বা মুখোশ বানাতে অযোগ্যতম।
১৯৮৮-এর বন্যার পর থেকেই আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। সেটা মোল্লা ভাইয়ের দোকানে, শাহনেওয়াজ ভবনের পাইপের উপর, সকাল-সন্ধ্যা-রাত...
হাতিসে আলোচনাতেই আমরা আবিষ্কার করি ছায়ানটের অনুষ্ঠানের শক্তি এখন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। নাগরিক বাংলার রবীন্দ্র-নজরুলকে রক্ষা বা হৃদয়ে মননে ধারণের চেয়েও বৃহত্তর এক প্রয়াস নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ছায়ানটের অভ্যূদয় ও ক্রমবিকাশ ঢাকা কেন্দ্রিক নাগরিক ইতিহাসের প্রথম পাঠ, যার ফলাফল মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে তৎকালীন নাগরিকবৃন্দের ভূমিকাতেই পাওয়া যায়। কিন্তু এখন সময় এসেছে যুক্ত করতে হবে ঢাকা নগরের সঙ্গে গ্রাম বাংলাকে, এমনভাবে যে, এ পথ ধরেই গ্রাম এগিয়ে আসবে নগরের পথে আর নগর ভুলবে না তার অতীত ও শেকড়, এটা হওয়া দরকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই, হয়নি (কলকাতার ঠাকুর পরিবারের বাংলা লোকায়তকে সাগ্রহে উৎসাহ প্রদান এবং ঠাকুর পরিবারের ভক্ত-অনুকারী বৃন্দের লোকায়তকে উপেক্ষার ইতিহাস কিংবা জয়নুলের লোকশিল্প যাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ও তা পূর্ণ হতে না পারা, এ ধারণারই প্রমাণ), না হোক এখন হতে তো ক্ষতি নেই।
সেটা ভাবতে গিয়েই আমরা অনুসন্ধানের বিশ্বভ্রমনও বাদ দেইনি। আমরা গিয়েছি রিও, থাইল্যান্ড, চীন, পারস্য, আরব, মিশর ও ইউরোপের আনাচে কানাচে। কিন্তু ‘ঘর হইতে দু-পা ফেলিয়া’ মহরম তাজীয়া মিছিল আর রথযাত্রা আমাদের চোখ খুলে দিল।
১ লা বৈশাখে হবে শোভাযাত্রা এবং সেটা হবে আনন্দ শোভাযাত্রা। আনন্দই পারে স্বৈরাচারের জুজুর ভয় দূর করতে। স্বৈরাচার তো আনন্দকেই প্রথমে হত্যা করতে চায়, তো আনন্দই হোক স্বৈরাচার প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার (প্রসঙ্গত, রমনার বটমূলে বোমা হামলার পর ও তার পরের বছর আনন্দ শক্তিকে অনুভব করেছিলাম নতুন অনন্যতায়)
শোভাযাত্রার প্রতীক বা মোটিভসমূহ বেছে নেয়া হলো গ্রাম্য শিশুর হাজার বছরের খেলনা থেকে, যা আমাদের লোক ঐতিহ্যের বাহক। হাতি, ঘোড়া, পাখি আর মুখোশ। চাইনিজ উন্নয়ন পণ্যের আগমনের আগে এগুলো সবই গ্রাম বাংলার বৈশাখী মেলাতে পাওয়া যেত। এখনো কিছু কিছু পাওয়া যায়। শোভাযাত্রার জন্য যখন এসব মোটিফ পুনঃনির্মাণ করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই নির্মাণ উপাদান, আকার, আয়তন ও ব্যবহার বিধির পরিবর্তন ঘটানো হয়। আর সেটা করা হয় গণরূপ বা বৈশ্বিকরূপ নির্মাণের লক্ষ্যেই। যা বিশ্বের সকলকেই জানান দেয় এটা আমাদের, আবহমান বাংলার; হিন্দুর কিংবা মুসলমানের, বুদ্ধের কিংবা খ্রিস্টানের, নগরবাসীর কিংবা গ্রাম-মফস্বল বাসীর। এটাই শিল্পের শক্তি। কুপমুণ্ডক স্বৈরাচার সাম্প্রদায়িক দানব এটাকেই ভয় পায়। কারণ সে আমিত্বের শক্তিকে সকলের সঙ্গে মিলতে দিতে চায় না। ‘আমি’ যখন সকলের সঙ্গে মেলে সে তখন গণতন্ত্র নির্মাণ করে, সে তখন মানুষ হয়ে ওঠে। সে বোঝে অপরের অস্তিত্বই তাকে মহান করে তোলে, অপরের বিনাশ তাকেও পরিচয়হীন করে তোলে। হারিয়ে যেতে থাকে সকল সুন্দর। ধর্ম পরিচয়, জাতি পরিচয়, ধনমাত্রার পরিচয় যার যার; সে পরিচয় বজায় রেখেই এ পৃথিবী এ রাজপথ সকলের। এটাই ‘আমি’র আমরা হয়ে ওঠা। আমারই দেশ সব মানুষের...
মানুষের উল্লাসদিনলিপিতে আমরা ক’জন
চারুকলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইচ্ছে নিয়ে বা চারুকলাকে সৃষ্টিশীলতার আনন্দযাত্রায় বেগবান করতে ২৯ মে ৮৮, প্রথম বর্ষ (পুরাতন)-ছাত্ররা জয়নুল স্মরণে প্রি-ডিগ্রীর দেয়ালে কাগজ সেটে একটা প্রদর্শনী করে ফেললো আর ২৮ ডিসেম্বর ৮৮-তে ২য় বর্ষ (নতুন)-আর ১ম বর্ষ (পুরাতন)-এর কিছু ছাত্রের উদ্যোগে জয়নুল জন্মোৎসবে একটা শোভাযাত্রা হলো, এ শোভাযাত্রায় ছিল কাগজে তৈরি বড় বড় পেন্সিল, তুলি আর রঙের টিউব। যা চারুকলা থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগার, মধুর কেন্টিন হয়ে কলাভবন প্রদক্ষিণ করে চারুকলায় ফিরে আসে।
তারপরের ঘটনা, সম্ভবত সেটা ছিল ১৯ মার্চ, ১৯৮৯, আমরা বসেছিলাম চারুকলার ছাপচিত্র বিভাগের পেছনে (এখন সেখানে কংক্রিটের বসবার ব্যবস্থা করা হয়েছে) উদ্দেশ্য এবারের পয়লা বৈশাখে একটা শোভাযাত্রা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করা। সেদিন উপস্থিত ছিলেন তরুণ ঘোষ, কামাল পাশা চৌধুরী, হিরন্ময় চন্দ, বিপুল শাহ, ২য় বর্ষ (নতুন)-এর শাখওয়াত হোসেন, ফরিদুল কাদের, শহীদ আহমেদ মিঠু, কামরুল, আহসান হাবীব লিপু ও সালেহ আহমেদ, ছিল ১ম বর্ষ (পুরাতন)-এর আমিনুল হাসান লিটু, শামীনুর রহমান ও নাদান আমি নাজিব তারেক।

২য় দিন আমরা বসলাম ২১-২২ মার্চ একই জায়গায়, সেদিন যুক্ত হলেন মুখোশের শিল্পী সাইদুল হক জুইস, তরুণতম শিক্ষক শিশির ভট্টাচার্য এবং মাহবুব জামাল শামীম (চারুপিঠ, যশোর শোভাযাত্রার প্রধান নাম), ফজলুল করিম কাঞ্চন, মনিরুজ্জামান শিপু, ফারুখ হেলাল, আদিব সাঈদ শিপু সহ আরো ক’জন। তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে নিসার হোসেনও ছিলেন, কিন্তু চারুকলার রাজনীতি তাঁর মতো আরো ক’জনকে আড়ালেই রাখলো (সংযুক্ত সকলকেই অনুরোধ করছি এ নিয়ে লিখবার জন্য)। প্রথমে নিজেদের পকেটের টাকা ও খেপের রঙ তুলি দিয়েই কাজ শুরু হলো। এখন যেখানে (মিজানের) ক্যান্টিন সেখানে। এখানে একটা বিশাল গুদাম ঘরের মত ছিল, তার ভেতরে। বলেছি গোপনীয়তার কথা। কাজ শুরুর পরে প্রথম ক’দিন যতটুকু কাজ হতো তা খড় ও চট দিয়ে ঠেকে রাখা হতো। খুব শিঘ্রই বোঝা গেল এভাবে হবে না। প্রকাশ্য হতে হবে। আর অর্থের যোগান দরকার। জানানো হলো ক’জন শিক্ষককে, পাওয়া গেল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই। সহযোগিতার হাত গুটি কয় মাত্র। সবচেয়ে আবাক করা সহযোগিতা দিলেন এক বিপরীত রাজনীতির শিক্ষক। তার সহযোগিতা না পেলে আমরা হতে পারতাম মৌলবাদের আক্রমনের শিকার। না, তার নাম এখানে অনুচ্চারিতই থাক। যারা সহযোগিতা করেছিলেন তাদের নাম উচ্চারণের ভার আমার বয়োজ্যেষ্ঠদের কাঁধেই রাখতে চাই। সেটা তারা আরো বিস্তারিত বলতে সক্ষম, সর্বকনিষ্ঠের অনেক কিছুই আড়াল থেকে দেখা। নিরব সহযোগিতা ছিল চারুকলার বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় সকল কর্মচারীর। আর আমাদের মোল্লা ভাইয়ের নাম বলতেই হয়, প্রতিদিন বিকেলের পর আমাদের জন্য ক’কাপ চা ছিল বিনামূল্যে।
হাতি, ঘোড়া, পাখি, ময়ূর ইত্যাদি নির্মাণের মূল কুশীলব ছিলেন তরুণ’দা, জুইস ভাই, শামীম ভাই, হিরণ’দা। প্রধান সমন্ময়ক ছিলেন কামাল ভাই। অশোক তরু ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগে এবং তাদের অহেতুক নাক গলানো থেকে আমাদের বাঁচাতে (অর্থ নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে)। পোস্টার ডিজাইন করেছিলেন তরুণ ঘোষ। বাকী যাদের নাম উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত তাহারা সকলেই মাথাদের মতোই নিজ নিজ ভূমিকায় অনন্য কর্মী। শেষ চৈত্র-সংক্রান্তির বিকেলে প্রচার প্রচারণার দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পণ করা হয়। আমাকে সহযোগিতা করেছিল লিটু, অঞ্জন, শামীম, মুকুল এবং তিনজন নাম না জানা রিক্সাওয়ালা ও ছোট বড় টোকাইরা। শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিল মূলত ছোটরা, প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রীরা। গুটিকয় সিনিয়র শোভাযাত্রায় গিয়েছিলেন।

এতোগুলো বছর পরে একথা বলতেই পারি– যা আজ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত, তা আসলে চৈত্রে রচিত বৈশাখী গান, প্রতি চৈত্রে কি যুক্ত হবে না নতুন সুর ও কলি?

হাতি নিয়ে শোভাযাত্রাপরিশিষ্ট

১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ বা বাংলা ১৩৯৭ থেকে এই ঢাকা চারুকলার ছাত্ররা নিজ নিজ শহরে এ শোভাযাত্রাকে নিয়ে যেতে থাকে, এর দ্বারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া এ শোভাযাত্রা ছিল ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশি স্বৈরাচারের সমাজকে ধর্মীওকরণের মাধ্যমে বিভক্ত করবার বিপরীতে এক প্রতিবাদ ও আত্ম-অনুসন্ধানের পথে যাত্রা। দ্বিতীয়বারের আয়োজন গণমাধ্যমের চোখের সামনেই হতে থাকে। ১৩৯৭-এর শোভাযাত্রার প্রস্তুতি থেকে শেষের অজস্র ছবি তাই পত্রিকার পাতায় পাতায়।
অবশ্যই এ রকম আয়োজনে যে সতর্কতা প্রয়োজন তা সর্বদা রক্ষিত হয়নি বা হয় না। বছর বছর কতৃত্ব ও কৃতিত্বের দ্বন্দ্বের ফাক গলে ঢুকে পড়ে বিবিধ পশ্চাৎপদতা ও অচলায়তন এবং পৌনঃপুনিকতা ও অনুসন্ধানহীনতা। কখনো রাজনীতি ছাপিয়ে ওঠে মৌলিক চেতনাকে আড়াল করে, এমন কী বিপরীত রাজনীতি বা অপ-সংস্কৃতিও দখল নেয় পরিচালনার আসন। গত ২৭ বছরে এ আনন্দ শোভাযাত্রাও পার হয়েছে এ রকমই কিছু অধ্যায়। এরপরও যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা, উৎপাদন ও পণ্য। যার কিছুটা শিল্প, বাকিটা নিছক অর্থ লেনদেন। হ্যাঁ, মনে করিয়ে দিতে চাই জগতের সকল নববর্ষ মানে ‘হালখাতা’, পহেলা বৈশাখও তাই, আর মুদি দোকানিরও থাকে নির্দিষ্ট পণ্য বা বিনিময় তালিকা। সেটা তাকে মেনে চলতে হয়। সেটাই ব্রান্ডিং। এতোগুলো বছর পরে একথা বলতেই পারি– যা আজ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত, তা আসলে চৈত্রে রচিত বৈশাখী গান, প্রতি চৈত্রে কি যুক্ত হবে না নতুন সুর ও কলি?
শুভেচ্ছা, অভিন্দন, কৃতজ্ঞতা তাদের যারা আমাকে ও পুরো বাংলাদেশকে আনন্দ শোভাযাত্রার বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো একটি অনন্য অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়েছেন তাদের।

১০ এপ্রিল ২০১৬



লেখক : চিত্রকর ও ব্রান্ড কনসালটেন্ট

লাইভ

টপ