কুবিতে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কতখানি?

Send
কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:৫৮, জুলাই ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১১, জুলাই ১৯, ২০১৯

গত ৭ জুলাই, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির আয়োজনে শুরু হয় দ্বিতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু আয়োজনটির বিতর্ক বিভাগটির পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে শুরু হয় আরেক বিতর্ক। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের এক নেতাকে বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিচারক করা হলে বিতর্কের ফলাফলে অসামঞ্জস্যতা ও নিয়ম না মানার অভিযোগ ওঠে। এই কারণ দেখিয়ে প্রতিযোগিতা বর্জন করে বিতর্কে অংশ নেওয়া অনেকগুলো বিভাগ। পাশাপাশি পুরো আয়োজনটিও স্থগিত হয়ে যায়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
এ প্রসঙ্গে ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আদনান কবির সৈকত বলেন, ‘আমরা প্রথমবারের মতো এবারও বিতর্ক পরিচালনায় প্রস্তুত ছিলাম। শিক্ষক সমিতিও আমাদের বিতর্ক পরিচালনার জন্য আহ্বান করেছিলেন। তবে কোনও এক অদ্ভুত কারণে আমরা সংগঠন হিসেবে বিতর্ক পরিচালনার পুরো জায়গাটি স্বাধীনভাবে পাইনি।’
আগামী ২২ জুলাই থেকে আয়োজনটি আবার শুরু হচ্ছে। তবে বাদ দেওয়া হয়েছে বিতর্ক অংশটি। পাশাপাশি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে তারা এই আয়োজনের সাথে আর থাকতে পারছেন না।
তাই প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কতখানি সহজ?
বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগ ও বর্ষের প্রায় ৪১ জন শিক্ষার্থীর ৪০ জন শিক্ষার্থীই মনে করেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নেই সংস্কৃতিচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা এর পেছনে দায়ী করছেন অবকাঠামোগত সংকট, এই খাতে বিশ্ববিদ্যালয় কোনও অনুদান না দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়নের অভাবকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ উদীচি শিল্পীগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ থাকলেও আদতে তার কোনও কার্যক্রম নেই ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সংস্কৃতি চর্চা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মূলত, শিক্ষার্থীদের স্বপ্রণোদনায় তৈরি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গান, নাচ, অভিনয়, ছবি আঁকার সবচাইতে বড় সংগঠন প্রতিবর্তন এর সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ ইসলাম গল্প বলেন, ‘পূর্বের চাইতে এখন সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ আরও ভাল হয়েছে। মৌলবাদি বাধা এখানে নেই। তবে আমাদের এখানে সুযোগ-সুবিধার অনেক অভাব এবং প্রতিবন্ধকতা অনেক বেশি। আমরা কোনও অনুদান পাই না। নিজ খরচে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়। এখানে অডিটোরিয়াম নেই, নেই অনুশীলন করার জন্য কোন যন্ত্র কিংবা স্থানও।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি ও কণ্ঠচর্চার সংগঠন ‘অনুপ্রাস কন্ঠচর্চা কেন্দ্র।’ সংগঠনটির সভাপতি আলাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার যে পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। আবৃত্তি সংগঠন হিসেবে কর্মশালার প্রয়োজন, অনুশীলন কক্ষ প্রয়োজন। কিন্তু অনুদান না থাকায় এসব কিছুই হয় না। আবার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহলের চাপের মুখে পড়ে। যদি সংস্কৃতি চর্চা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল করতে হয় তবে প্রশাসনকেই এখানে অনুদান দিতে হবে ও মুক্তচর্চার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নাট্যসংগঠন থিয়েটারের সভাপতি নাজমুল ফাহাদ বলেন, ‘গত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নাট্যোৎসবের পুরো আয়োজনের আর্থিক জোগান আমাদের করতে হয়েছে। অডিটোরিয়াম না থাকায় শহীদ মিনারে আমাদের নাটকগুলো করতে হয়েছে। খোলা মাঠে হয়তো আমরা আয়োজন করতে পেরেছি কিন্তু অনুশীলন খোলা মাঠে করা যায় না, সেটের জিনিসপত্র রাখা যায় না। নষ্ট হয়। আর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন কারণে এখন আর তাদের অবস্থানে নেই।’
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ব্যান্ড প্লার্টফর্ম এর সভাপতি আহমেদ রাফি বলেন, ‘এখানকার শিক্ষার্থীরা এখনও একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করার মতো মানসিকতা ধারণ করে না। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতিচর্চার জন্য কোনো অনুদান দেয় না। ফলে আর্থিক কারণে অনেক জায়গাতেই আটকে যেতে হয়।’
ইমদাদুল হক রিফাত নামক এক শিক্ষার্থী চাইছেন একটি গানের দল গড়ে তুলতে। তবে তিনি মনে করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি না থাকার ফলে অনুশীলনে অনেক সমস্যা হয়। টিএসসি না থাকায় শিক্ষার্থীরাও এসবের দিকে খুব একটা আসছে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিষয়ক সংগঠন অনুস্বারের সভাপতি শতাব্দী জুবায়ের মনে করেন, ‘অবকাঠামোগত ও আর্থিক কারণে সংগঠনগুলো এগিয়ে যেতে পারছেনা। প্রশাসনের উচিৎ এই ক্ষেত্রটিতে সুনজর দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়কে বাইরে তুলে ধরার জন্য বড় মাধ্যম সাংস্কৃতিক চর্চা।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আদনান কবির সৈকত বলছেন, ‘ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ১৩ বছর পরও একই সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করছে। এখানকার ২০টিরও বেশি সক্রিয় কেন্দ্রীয় সংগঠনের গত ৬ মাসের সাংস্কৃতিক আয়োজন শূন্যের কোঠায়! সুতরাং এটি খুব স্পষ্ট লক্ষণ যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিকশিত হবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না। আমি উপযুক্ত পরিবেশ বলতে একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত ও অবকাঠামোগত পরিবেশের উন্নয়নকে বুঝাচ্ছি, পাশাপাশি স্বাধীনভাবে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচলনা করার পর্যাপ্ত সুযোগ প্রাপ্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছি।’
এদিকে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক উৎসবের সাথে আর না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নিয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামিমুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ আছে। তবে শিক্ষক সমিতি এখন অন্য অনেক কাজে ব্যস্ত। তাই আমাদের কার্যকরী পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আমরা এই উৎসবের সাথে আমরা আর থাকতে পারছি না।’
সাংস্কৃতিক খাতে অনুদান এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার প্রফেসর ড. আবু তাহের বলেন, ‘আগের থেকে পরিবেশ অনেক ভালো হয়েছে। সাংস্কৃতিক চর্চা বেড়েছে। আমরা সংগঠনগুলোকে তাদের অনুশীলনের জায়গা করে দেয়ার কথা ভাবছি। আপনারা জানেন মুক্তমঞ্চ হচ্ছে। আমি ইউজিসিতে যাচ্ছি। সেখানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অনুদান দেওয়া প্রসঙ্গে আমি কথা বলবো।’

/এনএ/

লাইভ

টপ