দেশে নিরাপত্তাহীন- বিদেশই নিরাপদ! ভয়ে জিডিও করছেন না ভুক্তভোগীরা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০১:৪২, এপ্রিল ২৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৫৯, এপ্রিল ২৯, ২০১৬

একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকায় এবং দেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় জেনে বিদেশ যেতে বাধ্য হচ্ছেন ব্লগার,অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।সাধারণ চাকরিজীবীরাও সামান্য সুযোগ বের করতে পারলেই পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। আর এমন পরিস্থিতিতে যারা হুমকি-ধমকি নিয়ে দেশে আছেন, তারা সামান্য জিডি করতেও সাহস পাচ্ছেন না।কেননা জিডি আদৌ নিরাপত্তা দেবে, নাকি আরও বিপদ ডেকে আনবে তা নিয়েও শঙ্কিত।

গত দুইবছরে পরিচিতদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন ব্লগার নিরাপত্তা না পেয়ে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে গেছেন। দেশ ছাড়ার প্রক্রিয়ায় আরও ঠিক কতজন আছেন, তার কোনও হিসাব নিরাপত্তার কারণেই জানাতে চান না কেউ। এ ছাড়া নিয়মিত হুমকি মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন অনেকেই। তারা বলছেন,পরিস্থিতি যা এর বাইরে তাদের আর কিছু করণীয় নেই।

আরও পড়ুন:  প্রধানমন্ত্রীকে জন কেরির ফোন

সম্প্রতি মনে ভেতর দেশ ছাড়ার ক্ষত নিয়ে বিদেশ যেতে বাধ্য হওয়া ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী মাহমুদুল হক মুন্সী বলেন, আসলে শুধু মুক্তমনারা নয়, পুরো বাংলাদেশটাই হুমকির মুখে আছে। যেকোনও সময় চাপাতির কোপে খুন হয়ে যেতে পারেন যে কে।, আমরা কেউই বিপদের বাইরে নেই। বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ার কষ্ট থেকে তিনি বলেন, যে যুদ্ধটা আমরা করেছিলাম, সে যুদ্ধটা ছেড়ে চলে আসার অপরাধবোধ আমার মনে জীবন্ত আছে। কিন্তু এ কেমন যুদ্ধ? ছায়ার সঙ্গে মানুষ কিভাবে যুদ্ধ করে? যদি সরাসরি কোনও যুদ্ধ লাগে আমার বাংলাদেশে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষগুলোর সঙ্গে বিপক্ষের মানুষের, প্রগতিশীলতার সঙ্গে অন্ধত্ববাদের, আমাকে অস্ত্র হাতে সবার সামনে দেখবেন। কিন্তু অন্ধকারে পেছন থেকে ছুরি খাবার মধ্যে কোনও মহত্ত্ব নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণজাগরণ মঞ্চের এক সংগঠক বলেন, আমি নানা রকম হুমকি পাই। বাসা থেকে বের হওয়া ছেড়ে দিয়েছি। গেলেও একাধিক মানুষের সঙ্গে যাই। সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসি। কিন্তু এখনতো দেখছি বাসাও নিরাপদ না। জিডি করেছেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, জিডি করলে আমার ওপর হুমকি আরও বেশি ওপেন হয়ে যাবে। পুলিশের সহায়তা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন, জিডির ভিত্তিতে আমাকে এক্সপোজ করা হবে। বাইরে যাওয়ার কাগজপত্র রেডি না করে জিডি করাটা বর্তমান পরিস্থিতিতে বোকামি।

আরও পড়ুন:  এটা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈতনীতি!

সম্প্রতি একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং ব্লগারদের লেখালেখি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের পর দেশ ছাড়ার বিষয়ে ভাবছেন সামর্থবান সাধারণ মানুষও।বেসরকারি টেলিকম সেক্টরে কর্মরত এক ব্যক্তি বলেন, আমি দেশে থেকেই কিছু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার এক বন্ধু নিহতের ঘটনার পর আমি আর এই দেশে থাকতে চাই না। আমাদেরকে নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হয়। এরমধ্যে বাড়ি থেকে বের হলেই ছোট মেয়েটার চোখ ভেসে আসে মনে। বাসায় ফিরতে পারব কিনা সেই টেনশনে থাকি। সরকারইতো আমাদের দায়িত্ব নেবেন না বলে দিয়েছেন।

অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ সম্প্রতি ব্লগের লেখালেখিতে পর্ণ জাতীয় বিষয় থাকে এধরনের মন্তব্যের বিরোধীতা করে ফেসবুকে লিখেছেন, খুব জানতে ইচ্ছে করে অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর কোন লেখাটা পর্ণ ছিল। তার কোন কাজটায় বিকৃতি ছিল-সেতার বাজানো, পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাকি নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে লিটল ম্যাগাজিন বের করা?

আরও পড়ুন: বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর ১৬১টি মামলা ফের শুনানির সিদ্ধান্ত

তিনি আর লিখেছেন, খুব জানতে মন চায় আমাদের টক শো সেলিব্রিটিদের ‘কোপানো ঠিক হয়নি কিন্তু…’ টাইপের মূল্যবান বক্ত্যবের বাকিটা এখন তারা কী দিয়ে পূরণ করবেন। শুধু সরকারই ‘কোপানোর দায় নেব না’, ‘বরদাশত করবো না’, ‘আগে দেখে নেই সে কী লিখেছে' বা ‘পর্ণ লিখেছে, দোষ করেছে’ (যদিও অভি বা আমি কোথায় বিকৃত পর্ণ লিখেছিলাম তা এখনও খুঁজে পাইনি, তবে খুঁজছি, ওনারা যখন বলেছেন পেয়ে যাবো নিশ্চয়ই) বলে কোপানো হালাল করেনি, যারা কোপানো ঠিক হয়নি বলে আবার ‘কিন্তু'র ফলা যোগ দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন, তারাও কিন্তু আজকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করার পেছনে কম ভূমিকা রাখেননি।

ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর প্রথম খড়গ নেমে আসে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজীব হায়দার ওরফে ‘থাবা বাবা’ নামে একজন ব্লগারকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে। পরের বছর ২০১৪ সাল মোটামুটি শান্তভাবে চললেও গত বছর মার্কিন নাগরিক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যার মাধ্যমে আবারও ব্লগারদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু হয়। এরপর ব্লগার ওয়াসিকুর রহমান বাবু ও নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় খুন হন।

দেশে নিজেদের প্রচেষ্টায় নিরাপদে ও আত্মগোপনে থাকছেন এমন ব্লগাররা বলছেন, আমরা থ্রেটের কথা বললে থানা পুলিশে হাসাহাসিও হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ কে এম শহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেকোনও নাগরিক নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করলে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি তার বিষয়ে সে যেভাবে চায় সেভাবে ব্যবস্থা নিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদেরও সাবধানতা অবলম্বনের বিষয় আছে। তবে জিডি করা মানে এক্সপোজড হওয়া, বা এ ধরনের বিষয় ভেবে জিডি না করাটা কোনও কাজের কথা না।

এপিএইচ/

লাইভ

টপ