শ্যামল কান্তিকে ঢাকা মেডিক্যালে ঢুকে হত্যার আহ্বান ফেসবুকে!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:৪৮, মে ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৫, মে ২১, ২০১৬

নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে লাঞ্ছিত শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তর বিরুদ্ধে ‘ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামকে গালিগালাজ' করার অভিযোগ এনে তাকে হত্যার টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে তার প্রাথমিক পরিকল্পনা করে ফেসবুকে একাধিক পেজ থেকে দেওয়া হয়েছে উস্কানিমূলক পোস্ট। এদিকে, এসব উস্কানির আঁচ পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শ্যামল কান্তি ভক্তের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে।

শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত

‘সালাহউদ্দিনের ঘোড়া’ ও ‘নবী-সা. এর কটূক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ নামের পেজ ইভেন্ট খুলে শ্যামল কান্তিকে হত্যার টার্গেট লক করে দেওয়া হয়েছে এবং ঘোষণা দিয়ে লেখা হয়েছে- ‘শ্যামল কান্তি ভক্ত এখন ঢাকা মেডিক্যালে আছে। কে আছো শ্যামলকে ঢাকা মেডিক্যালের ভেতরই বিজ্ঞানী বানাবে? ঢাকা মেডিক্যালের ভেতর বিজ্ঞানী বানালে লাশ পরিবহনের জন্য সরকার ও পুলিশের সময় ও খরচ অনেক কমে যাবে।’ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- এসব আহ্বান জানানো হয়েছে গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। পেজগুলো এখনও সচল আছে।

শ্যামলকান্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে উস্কানিমূলক পেইজ খোলা হয়েছে

‘সালাউদ্দিনের ঘোড়া' নামক একটি পেজ থেকে শুক্রবার দিবাগত রাতে পোস্ট করে এই শিক্ষককে হত্যা করার ১১টি পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়। ‘নবী-সা. এর কটূক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ থেকে শ্যামল কান্তির নাম পরিচয় দিয়ে অপরাধ হিসেবে ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামকে গালিগালাজকারী উল্লেখ করা হয় এবং তাকে বিজ্ঞানী বানানো হোক। তারা হত্যা করার সংকেত-শব্দ হিসেবে ‘বিজ্ঞানী বানানো’ ব্যবহার করে থাকেন।

এমনকি উস্কানি ছড়ানোর হোতা হিসেবে পরিচিত নয়ন চ্যাটার্জির অ্যাকাউন্ট থেকে অভিনেতা জয়ন্ত চ্যাটার্জির ছবিসহ তার শাস্তি দাবি করা হয়েছে। সেলিম ওসমানের ক্যারিকেচার আপলোড করায় একজন মুক্তিযোদ্ধার ছবি বিকৃত করার অভিযোগ এনে তার শাস্তির দাবি উঠেছে।

শ্যামলকান্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে উস্কানি-২

শ্যামল কান্তি নিজে তার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশের পর হেফাজতের জনসভায় তার ছাত্র রিফাতকে দিয়ে প্রধান শিক্ষকের শাস্তির দাবি তোলা হয়। যে ছাত্রের বরাত দিয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেই ছাত্র রিফাত তার লিখিত অভিযোগে কেবল মারধরের কথা উল্লেখ করেছে কিন্তু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা উল্লেখ করেনি। ঘটনার পর পরই বিভিন্ন টেলিভিশন ও মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে সে ও তার মা অকপটে জানিয়েছিল- শিক্ষক ধর্ম নিয়ে কোনও কটূক্তি করেননি। তবে একদিন পরই আবার কথা বদলে ধর্ম অবমাননার কথা জানায় সে। এ বিষয়ে আরেকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার  বক্তব্য সম্বলিত একটি ভিডিও প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে ফের তোলপাড় শুরু হয়।

এর আগে গত ১৩ মে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার পিয়ার সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর ও কান ধরে ওঠবোস করান জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত স্থানীয় শহর-বন্দর আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। এই প্রতিবাদের মধ্যেই বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি শ্যামল কান্তিকে বরখাস্ত করে কমিটির সভাপতির দূর সম্পর্কীয় বোনকে প্রধান শিক্ষক করে। তবে একদিন পর গত বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কমিটির তদন্তের পর শিক্ষামন্ত্রী ওই বিদ্যালয় কমিটিকেই বাতিল করে দিয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে স্বপদে বহাল রাখার ঘোষণা করেন। তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনেও ধর্ম নিয়ে শিক্ষকের কটূক্তির কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এ ধরনের উস্কানি ছড়ানোর বিষয়ে গণমাধ্যম এবং জঙ্গিবাদ বিষয়ক গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট নির্ঝর মজুমদার বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে টার্গেট করে হত্যার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে হত্যার আহ্বান জানিয়ে একটি পেইজ ইভেন্ট খোলা হয়েছিল। এর আগে শিক্ষকের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার কাজটি করেছিল ‘নয়ন চ্যাটার্জি’ নামের চরম সাম্প্রদায়িক পেজটি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, পেজটির নাম রাখা হয়েছে একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারীদের ব্যবহৃত নাম দিয়ে।এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতার ছলে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো। এই একটি মাত্র পেইজ বাংলাদেশের প্রশাসনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সব অফিসারের তালিকা প্রকাশ করেছিল। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই পেইজগুলো জঙ্গিবাদী কনটেন্ট সরাসরি শেয়ার করে না। তারা শুধু টার্গেট করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণা করছেন জার্মানির হাইলব্রন বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক হাসিব মাহমুদ। তিনি মনে করেন, কোনটা ভিন্নমত এবং কোনটা অপরাধ এ বিষয়ে একটা বোঝাপড়ায় আসা দরকার। তিনি বলেন, ফেসবুকে যেকোনও দেশের আইনে এরকম অপরাধ কার্যক্রম দেখা গেলে সেটা নিয়ে কী করণীয় তা আলাপ করতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের বসা উচিত। এক্ষেত্রে ফেসবুক দুইভাবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করতে পারে। অভিযোগ পাওয়া মাত্র এ ধরনের প্রচারণা হয় এরকম আইডি বা পেইজ বন্ধ করতে পারে বা কোনও অপরাধ সংগঠিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধী ধরতে সাহায্য করতে পারে।

শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে উস্কানি ৩

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) এ কে এম শহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিষয়টি এখনও নজরে আসেনি। পরবর্তীতে এ ধরনের কোনও হুমকির বিষয়ে অভিযোগ আসলে তদন্ত করবেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই পদক্ষেপ নেবেন, তবে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।

তবে শনিবার রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষক শ্যামল কান্তির নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন সূত্রে পুলিশের নজরে আসায় তার নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে বলে পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রাণনাশের আশঙ্কায় হাসপাতাল থেকে দেওয়া খাবার ছুঁয়েও দেখছেন না শ্যামল কান্তি। এ কারণে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবে বিষয়টি চিকিৎসকদের নজরে রয়েছে। 

/এএইচ/

আরও পড়তে পারেন:

বিএনপিশিক্ষক ইস্যুতে বিএনপি নীরব, চলছে ‘পর্যবেক্ষণ’

লাইভ

টপ