সেই চেনা অচেনা ‘বেগম’

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:১৩, মে ২৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, মে ২৩, ২০১৬






নূরজাহান বেগম

নারী স্বাধীনতা, নারীর এগিয়ে চলার যে পথ সেখানে একটা একটা করে মাইলফলক লাগিয়েছে যারা, তারমধ্যে অন্যতম ‘বেগম’ পত্রিকা। চেনা অচেনা সেই বেগম এখনও আছে, কিন্তু এর সম্পাদক ৯১ বছর বয়সী নূরজাহার বেগম একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে না ফেরার দেশে আজ ।

সাহিত্যক্ষেত্রে নারীদের জন্য জায়গা করে দেওয়া, রান্নাঘর থেকে আরেকটু বড় পরিসরে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে বেগম পত্রিকাটি প্রকাশিত হলে। পরের তিনবছরের মধ্যেই পত্রিকাটি ঢাকায় চলে আসে। বেগম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক ও নূরজাহান বেগমের বাবা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। আর বেগম–এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। তবে চার মাস পর থেকেই পত্রিকাটির সম্পাদনা শুরু করেন নূরজাহান বেগম। সেইসময়ে এই অসম্ভব কাজটি যারা করেছিলেন তারা বেগম ছাপিয়েছিলেন ৫০০ কপি। মূল্য ছিল চার আনা।
বেগম পত্রিকার প্রচ্ছদ

এর পাটাতন তৈরি হয় আরও আগে সেই ১৯১৮ সালেই। নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নূরজাহান বেগমের পিতা নাসির উদ্দিন প্রকাশ করেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম চিত্রবহুল মুসলিম পত্রিকা মাসিক ‘সওগাত’। এটি কলকাতা থেকে প্রকাশ হতো। তার হাত ধরে মেয়ের ভাবনার জগত তৈরি হতে হতে সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।উদ্যোগটা বাবার হলেও এর সঙ্গে নারীর ষোলআনা যুক্ততা পাওয়া যায়।আর বেগম-এর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এ বাংলায় নারীর জন্য লেখার পরিবেশ, নারীর লেখক আড্ডার পরিবেশ, নারীর কাজের পরিবেশ। সমাজের সীমাবদ্ধতা থেকে নারী সমাজকে টেনে তোলার জন্য নাসির উদ্দিন উদ্যোগ নেন। তাই তারই উদ্যোগ ও প্রেরণায় ১৯৪৭ সালে সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
বেগম

নারীর জায়গাগুলো কীভাবে করে দিচ্ছিলেন পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষেরা, তা দেখা যায় ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা পেলে। বেগম শামসুন নাহার মাহমুদকে প্রেসিডেন্ট, নূরজাহান বেগমকে সেক্রেটারি করে গঠিত হয় ক্লাবটি। বেগম ক্লাবের হাত ধরে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে ‘বেগম’। নূরজাহান বেগম নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলছিলেন, সে বছরেই বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক আইডা আলসেথ বেগম পত্রিকার কার্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখন বেগম প্রকাশ হতো ক্রাউন সাইজে। পত্রিকা দেখে মুগ্ধ আইডা নূরজাহান বেগমকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এত লেখা, তুমি ছবি ছাপছ না কেন?’ উত্তরে নূরজাহান বেগম বলেছিলেন, ‘এখানে নারীরা সামাজিকভাবে খুব এগিয়ে নেই। একটা লেখা লিখবে আবার তার সঙ্গে একটা ছবিও পাঠাবে এমন পরিবেশ তার নেই। আইডা তখন মেয়েদের নিয়ে একটি ক্লাব গঠনের পরামর্শ দেন।
বেগম পত্রিকার প্রচ্ছদ

এরপর আর ফিরে তাকানোর সুযোগ ছিল না। ক্লাবে সামাজিক বিধি নিষেধের বাধ ভেঙে আসতে শুরু করেন যারা লিখতে চান, লেখা নিয়ে ভাবতে চান। নূরজাহান বেগম পেয়ে যান হুসনা বানু খানম, লায়লা আরজুমান্দ বানুদের, যারা সাংস্কৃতিক আন্দোলন কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেন । বেরিয়ে এলেন দিল মনোয়ারা মনু, ফরিদা আখতার খান, শাহনাজ খান ও হোমায়রা খাতুনসহ আরও অনেকে।
আর এই কাজটার কাণ্ডারি ছিলেন যিনি সেই নূরজাহান বেগম তার জীবনের একটা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে হাজারো নারীর পথ নির্ধারণ করে দিতে পেরেছিলেন।নারী সাংবাদিক বললে এ বাংলায় নূরজাহান বেগম অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সওগাত প্রেস ও বেগম পত্রিকার অফিস

না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নূরজাহান বেগম জানিয়ে গেছেন, তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন, বাকিটা যাদের হাতে এখনকার পতাকা তাদের বহনের দায়িত্ব। নূরজাহান বেগম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে তিনি আইএ এবং ১৯৪৬ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা রোকনুজ্জামান খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পদক নিচ্ছেন নূরজাহান বেগম

নারীর অবস্থার উন্নয়ন ও সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য নূরজাহান বেগম বহু পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি রোকেয়া পদক পান।

আরও পড়ুন: বাবা ও নজরুলের সান্নিধ্যে নূরী’র বেগম সম্পাদক হয়ে ওঠা


/এপিএইচ/

লাইভ

টপ