লাখো আলেমের ফতোয়া জঙ্গিবাদ ও আত্মঘাতী হামলা হারাম

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ১৩:০০, জুন ১৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:৪৪, জুন ১৮, ২০১৬

লাখো আলেমের ফতোয়া ও ফতোয়ার ৩০ খণ্ডের সারিবাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার উদ্যোগে গৃহিত ‘একলক্ষ মুফতি, উলামা ও আইম্মার দস্তখতসম্বলিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী মানবকল্যাণে শান্তির ফতওয়া’ প্রকাশ হচ্ছে আজ (শনিবার)। প্রকাশিতব্য এই ফতোয়ায় সর্বসম্মতভাবে এক লাখ আলেম ও মুফতিরা ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ও আত্মঘাতী হামলাকে হারাম বলে আখ্যা দিয়েছেন। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এই ফতোয়া প্রকাশিত হলে সন্ত্রাস পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং সন্ত্রাসের মদদদাতারা হতোদ্যম হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর চৌধুরীপাড়ায় জামিয়া ইক্বরা বাংলাদেশ মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা গেছে, শনিবার সকালে ফতোয়া প্রকাশকে কেন্দ্র করে পুরোদমে চলছে প্রস্তুতি। পুরুষ ও নারী মিলিয়ে মোট ১ লাখ ১ হাজার ৮৫০ জন আলেম ও মুফতির স্বাক্ষর সম্বলিত ফতোয়ার ৩০ খণ্ড বাইন্ডিং এর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৯২ হাজার ৫৩০ পুরুষ আলেম-মুফতি এবং ৯ হাজার ৩২০ জন নারী আলেম-মুফতি। এছাড়া উল্লেখযোগ্য আলেমরা হচ্ছেন, হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, শায়খুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী, মুফতি আবদুল হালিম বোখারী, মুফতি মনসুরুল হক, আল্লামা সুলান জওক নদভী, আল্লামা আবদুর রহমান হাফেজ্জী অন্যতম।

শীর্ষ আলেমদের স্বাক্ষর

জানা যায়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর নামে ভাগ করে ২৬টি এবং শুধু নারী আলেমদের স্বাক্ষরে ৪টি খণ্ড তৈরি হয়েছে। সব খণ্ডেই জঙ্গিবাদ নিয়ে মূল ফতোয়ার সঙ্গে দারুল উলুম দেওবন্দ, মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, চরমোনাই জামিয়া রশিদিয়া ইসলামিয়া, শায়খ জাকারিয়া রিসার্চ সেন্টার ও জামিয়াতুল আসআদ মাদ্রাসার ফতোয়াও সংযুক্ত করা হয়েছে। সংযুক্ত প্রত্যেকটি ফতোয়াতেই সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে কোরআন ও হাদিসের আলোকে হারাম বলা হয়েছে।

শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের নেতৃত্বাধীন ‘একলক্ষ আলিম, মুফতি, ইমামগণের ফতওয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিট’র উদ্যোগে গত ৩ জানুয়ারি থেকে এই ফতোয়া স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু হয়। শেষ হয় ৩১ মে। ১১ সদস্যের কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন, আবদুর রহিম কাসেমী; সদস্য সচিব, সদরুদ্দীন মাকুনুন; যুগ্ম সদস্য সচিব, সদস্য; আল্লামা আলীম উদ্দীন দুর্লভপুরী, হোসাইন আহমদ, দেলোয়ার হোসাইন সাঈফী, ইমদাদুল্লাহ কাসেমী, আইয়ুব আনসারী, ইবরাহিম শিলাস্থানী, আবদুল কাইয়ুম খান, যাকারিয়া নোমান ফয়জী। ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ জানান, ৩০ খণ্ডে ফতোয়া ও স্বাক্ষর গ্রন্থবদ্ধ করা হয়েছে।

 চলছে বাইন্ডিং

কী আছে ফতোয়ায়?

লক্ষাধিক আলেম-আলেমার স্বাক্ষরিত ফতোয়াটি ৩২ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে সূচি, সহযোগী আলেমদের নামসহ ফতোয়া যুক্ত করা হয়েছে। ‘ইস্তিফতা ও এর উত্তর’ শীর্ষক অধ্যায় দিয়ে ফতোয়াটি দেওয়া হয়েছে। সুরা তওবার কয়েকটি আয়াত এবং বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত একটি হাদিসকে প্রেক্ষিত ধরে ফতোয়ায় ১০টি প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছে।

ফতোয়ায় যে ১০টি প্রশ্ন যুক্ত করা হয়

ওই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই ইসলামের ব্যাখ্যাসম্বলিত মূল ফতোয়াটি বর্ণিত হয়েছে। এরপর কোরআন শরিফ ও হাদিস শরিফের দলিলের ভিত্তিতে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, ‘জিহাদ ও সন্ত্রাস একই জিনিস নয়। জিহাদ হলো ইসলামের অন্যতম একটা নির্দেশ, পক্ষান্তরে সন্ত্রাস হলো হারাম ও অবৈধ।’ ৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, ‘আত্মহত্যা ও আত্মঘাত ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।’ ৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, ‘ইসলামে নিরাপরাধ মানুষদের গণহারে হত্যা বৈধ নয়। এমনকি সন্দেহের বশবর্তী হয়েও কাউকে হত্যা করা নিষেধ।’

৯ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে বলা আছে, ‘মুসলিম সমাজে বসবাসকারী অমুসলিমকে যদি কেউ হত্যা করে সে বেহেশতের গন্ধও পাবে না। অমুসলিমদের গির্জা, প্যাগোডা, মন্দির ইত্যাদি উপাসনালয়ে হামলা করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও অবৈধ। এটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ ধারাবাহিকভাবেই এভাবে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে কোরআন শরিফের আয়াত ও হাদিস দিয়ে।

 শেষ মহূর্তের প্রস্তুতি, ব্যস্ত জমিয়তুল উলামার কর্মীরা

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হ্রাসের আশা উদ্যোক্তাদের

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আসন্ন প্রকাশিতব্য ফতোয়া কতখানি ভূমিকা রাখতে সম্ভব হবে, এমন প্রশ্নে ‘একলক্ষ আলিম, মুফতি, ইমামগণের ফতওয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিটি’র আহ্বায়ক মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই লাখো অস্ত্রের চেয়েও ফতোয়া অনেক শক্তিশালী, অনেক ধারালো। সঠিক ফতোয়া মনোজাগতিক চেতনাকে শুদ্ধ করে, আলোড়িত করে এবং মানবতাবাদী বানায়।

৩২ পৃষ্ঠার ফতোয়াটির ‘প্রসঙ্গকথায়’ এর এক জায়গায় ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ লিখেছেন, ‘মানবকল্যাণ ও শান্তির ফতোয়ার এই বারতা সন্ত্রাস পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও এতে যে বহুলাংশে হ্রাস পাবে তাতে সন্দেহ নেই। সন্ত্রাসের মদদাতারা এতে হতোদ্যম হবে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়।’

 ‘একলক্ষ আলিম, মুফতি, ইমামগণের ফতওয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিটি’র আহ্বায়ক মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

ফতোয়ার উদ্যোগ যেভাবে

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের এক লাখ ওলামার স্বাক্ষরে একটি ‘ফতোয়া’ প্রচারের পরামর্শ দেন শোলাকিয়ার ইমাম ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ওই দিনই ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে ধর্মীয় নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক যৌথসভায় অংশ নিয়ে তিনি এ পরামর্শ দেন।

তার পরামর্শ শুনে ‘কিভাবে এক লাখ আলেমের সই নিয়ে ফতোয়া দেওয়া যায়’- সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে মাওলানা মাসঊদকে কমিটি করার অনুরোধ জানান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক।

শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম বলেছিলেন, ‘যারা ধর্মের নামে হত্যা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাস করছেন তারা সঠিক কাজ করছেন না। ইসলাম ধর্মে হত্যাকে কোনোভাবে সমর্থন করে না। তাই জনগণকে সচেতন করার জন্য সারাদেশের এক লাখ ওলামাকে নিয়ে তাদের স্বাক্ষরিত একটি ‘কমন ফতোয়া’ লিখে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর ২ জানুয়ারি মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের মাদ্রাসার উলামা সম্মেলন হয়। সম্মেলনের পর রামপুরা তাকওয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মুফতি আবদুর রহীম দেশের কয়েকটি বড় ফতোয়া প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ বিষয়ে শরিয়া মোতাবেক ব্যাখ্যা চান। এরপরই জঙ্গিবাদ নিয়ে ফতোয়া দেয় হেফাজতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে পরিচিত হাটহাজারী মাদ্রাসা, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, চরমোনাই জামিয়া রশিদিয়া ইসলামিয়া, শায়খ জাকারিয়া রিসার্চ সেন্টার ও জামিয়াতুল আসআদ  মাদ্রাসা।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র এ প্রতিবেদককে জানান, মূল পরিকল্পনা একটি সংস্থার। ওই সংস্থার ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করেই ফতোয়া ও প্রশ্ন তৈরি করেন মাওলানা মাসঊদ। যদিও তিনি বিষয়টিকে উড়িয়ে দেন। আর বলেন, এগুলো এই ফতোয়াটিকে দুষতেই এমন কথাবার্তা চালাচ্ছে। আর প্রশ্নপত্র তৈরি হয়েছে উলামা সম্মেলনে।

কর্মসূচি ব্যয়ের খাত

সারাদেশের আলেমদের স্বাক্ষরিত ফতোয়াটি আগামী শনিবার ৩০ খণ্ডে প্রকাশ করা হবে। এর কপি পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ওআইসি ও জাতিসংঘে পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে ইংরেজি ও আরবি ভার্সনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এ কাজ পুরোপুরি শেষ হতে আরও সময় লাগবে।

চলমান ৩০ খণ্ড তৈরির পেছনে প্রতিটি খণ্ডে ১৫শ টাকা করে খরচ হচ্ছে বলে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক আলেম জানিয়েছেন। তার দাবি, সর্বমোট ৬শ খণ্ড হবে। শুধু ৬শ খণ্ডের ছাপা খরচই প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি। এছাড়া স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে গিয়ে সারাদেশে সমন্বয় কমিটি কাজ করেছে। কেন্দ্র থেকে দেখভাল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরও ব্যয় হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।

এই কার্যক্রমের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মাওলানা আব্দুল্লাহ শাকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যয়ের অর্থ হুজুর দিয়েছেন এবং হুজুরের মুরিদরা কিছু দিয়েছেন।

জানতে চাইলে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন বলেন, আল্লাহর কাজ আল্লাহই আদায় করে নেন। আলেমরা সহযোগিতা করেছেন, শুভানুধ্যায়ীরা করেছেন। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী করেছি।

ছবি: প্রতিবেদক

/এসটিএস/এএইচ/

 

এ বিষয়ে আরও খবর

লাখো আলেমের জঙ্গিবাদবিরোধী ফতোয়া যাবে জাতিসংঘে







লাইভ

টপ