Vision  ad on bangla Tribune

বলটাকে কোনও রকমে লাথি মারতে পারলে কেমনে যেন ঘুরতে থাকে.....

জাকিয়া আহমেদ০৮:৩২, জুন ২৭, ২০১৬

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরামিরপুর সাড়ে এগারোতে অবস্থিত বাড়িতে ঢুকেই দেখা গেল,দোতলার মাঝের একটি কক্ষের চারদিকে থরে থরে বই সাজানো, আর বাচ্চারা বসে আছে হাতে একটি করে টোকেন নিয়ে। টোকেনগুলোতে নম্বর লেখা। আর সামনে দাঁড়ানো বড় ভাইদের ভেতর থেকে একজন একটি করে পাশে রাখা উপহার সামগ্রী দেখে দেখে টোকেন নম্বর বলছেন। যার হাতে সেই টোকেন নম্বর মিলে যাচ্ছে সেই শিশুটি সামনে এগিয়ে এসে নিয়ে যাচ্ছে উপহার। এই উপহারগুলোই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে ফুটিয়েছে ঈদের হাসি। কারণ, সেখানে উপহার হিসেবে রয়েছে ঈদের পোশাক থেকে শুরু করে চকোলেট, ক্রিকেট ব্যাটসহ নানান কিছু। শুধু ঈদের আগে নয়,সারা বছর ধরেই এসব শিশুর পাশে থাকছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। যারা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের রামুতে বেশকিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়ার কাজ করে যাচ্ছে বেশ কয়েকবছর ধরে। তবে উদ্যোগটা ব্যক্তি পর্যায়ে শুরু হলেও এখন সেটা সামষ্টিকপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন একজন মানুষ। যিনি বয়সে তরুণ উদ্যমী একজন। কিশোর কুমার দাশ।
আরও পড়তে পারেন: সব ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে ‘ব্যর্থ’ ইসি
কিশোরের ভাষায়, আমি নিজে শৈশবে একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু ছিলাম, যার কারণে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কোনওদিন যদি টাকা উপার্জন করতে পারি তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমিও কিছু করবো। কিশোর তার সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছেন, কাজ করে চলেছেন অবিরত। তার সঙ্গে যোগ হয়েছেন আরও কিছু স্বপ্নবাজ মানুষ,যাদের অকৃত্রিম সাহায্য সহযোগিতায় কিশোর এখন তার স্বপ্নের পরিধি কেবল বাড়িয়েই চলেছেন।
শুরুটা আমি করেছিলাম, তবে এখন ‘আমরা’ করছি কাজটা। ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বরে শুরু করা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের শুরুটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হলেও এখন আর সেটি কারও ব্যক্তিগত নয়। এই আইডিয়া হয়তো আমার,টাকারও একটি বড় অংশ হয়তো আমার,কিন্তু এক্সিকিউশন (বাস্তবায়ন) করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের কিছু নির্দিষ্ট মানুষ। তারা এখানে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন,দিনের বেশিরভাগ সময় তারা ব্যয় করছেন এখানে। ফাউন্ডেশনের চারজন শাখা প্রধান অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাজগুলো করে যাচ্ছেন,আমি শুধু তাদের সমর্থন দেই। তাই তাদেরকেই আমি কৃতিত্বের অগ্রভাগে রাখতে চাই, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি, বলছিলেন কিশোর কুমার দাশ। একইসঙ্গে বলেন,এটা মোটেই আমার উদারতা নয়, এটাই বাস্তবতা।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কিশোর বলে চলেন তার স্বপ্নের জগতের কথা।

সুবিধাবঞ্চিত শৈশব: আমি কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্ম নিয়েছিলাম। আমি কিছু মনে রাখতে পারতাম না। আরও কিছু বিষয় ছিল যার কারণে আমার শৈশবটা আসলে আনন্দময় ছিল না। তখনই আমি জেনেছি, আমি একটা আনলাকি মানুষ এবং গুড ফর নাথিং। কিন্তু আমার অন্য ভাইবোনরা ছিল খুব মেধাবী, জীবনের ওই সময়টা ছিল খুব হতাশার, আর আমি তখন একা কাটিয়েছি ওই সময়টা। বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। উনি অবসরে যাওয়ার পরে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় টাকার অভাবে ১৬ বছর বয়সে এসএসসি পাস করার পরে। ভাইবোনদের লেখাপড়া চলছিল, তাদের প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প ছিল। কিন্তু আমার কোনও গল্প ছিল না। তখন চিন্তা করতাম,পৃথিবীতে এতো মানুষ,কেউ একজন কেনও আমাকে টাকা দিতে পারে না লেখাপড়া করার জন্য। কতোজনকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি, আমাকে একটু টাকা দেন যেন পড়তে পারি, কিন্তু হয়নি। শেষপর্যন্ত দুই বছর পর একজন শিক্ষকের সহযোগিতায় আমি লেখাপড়া করার সুযোগ পেলাম আবার। কিন্তু বুঝতে পারলাম,পড়াশোনাটা আমার জন্য নয়,কিন্তু কিভাবে জানি শেষ সময়ে কম্পিউটার সায়েন্স থেকে একটা ভালো ফল নিয়ে বের হলাম চুয়েট থেকে।

কিশোর কুমার দাসের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন জাকিয়া আহমেদজীবনের টার্নিং পয়েন্ট: ২০০৬ সালে বিডিকমে চাকরি পেলেন জানিয়ে কিশোর বলেন, চাকরি জীবনে সবাই বলতো আমি নাকি জিনিয়াস। হুটহাট করে প্রমোশন পেতে থাকলাম, এরপর মোবাইলফোন কোম্পানি এয়ারটেলে কাজ করি পাঁচ বছর। ওখানে আমি চারবার পদোন্নতি পেয়েছি। এরপর আরেকটি কোম্পানি। এরপর জয়েন করি বহুজাতিক কোম্পানি ওলোতে। ২০১১ সাল থেকে পেরুর একটি কোম্পানিতে হেড অব মার্কেটিং হিসেবে পেরুতে কর্মরত আছি, বলেন কিশোর। তার ভাষায়, একসময় বুঝতে পারি, জীবনে আমি একজন ইমব্যালেন্স মানুষ, ক্যারিয়ার এবং আর্থিকভাবে অনেক সফল হলেও আমি ব্যক্তিজীবনে একেবারেই ভঙ্গুর। সেসময় আমার সুইসাইডাল টেনডেনসি হয়, কিন্তু নিজেকে বলতাম, আমি মরতে চাই না, বাঁচতে চাই-আমার এমন কিছু একটা দরকার যেটা আমাকে বাঁচতে সাহায্য করবে।

বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠা: সেই বেঁচে থাকা শুরু করতেই আমি বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলাম আমার অবহেলিত শৈশবের কথা মনে করে। জীবনে অনেক টাকা উপার্জন করেছি, কিন্তু টাকা দিয়ে কিছু করার নেই আমার।এরপর ২০১৩ সালের আগস্টে বড় বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে কথা বলি বিদ্যানন্দ নিয়ে। ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের বন্দরথানার সাব্দি গ্রামে আমার বোন একটা কক্ষে পাঁচজন ছাত্র নিয়ে স্কুল শুরু করে। এরপরের বছরের মার্চে চট্টগ্রামে এবং জুলাইতে ঢাকার মিরপুরে বিদ্যানন্দের শাখা খোলা হয়। আর স্কুলের বিষয়ে শিক্ষা আর আনন্দ দু’টোকে এক  করতে গিয়ে এর নাম হয়েছে বিদ্যানন্দ। বিদ্যানন্দের প্রতিটি শাখায় রয়েছে হাজার হাজার বই,যেখানে শিশুরা এসে বই পড়তে পারে দিন থেকে রাত পর্যন্ত।

কিশোর বলেন,বিদ্যানন্দের খরচের জন্য আমরা কোনও ডোনেশন নেইনি অনেকদিন।কিন্তু আমার কয়েকজন কাছের মানুষ রয়েছেন যারা বিদ্যানন্দের সঙ্গে থাকতে চান। ফলে একসময় তারাও যুক্ত হন বিদ্যানন্দের সঙ্গে। এভাবেই ডোনেশনের বিষয়টি যুক্ত হয় বিদ্যানন্দে। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে একেকজন ডোনার দায়িত্ব নিচ্ছেন একেকজন শিক্ষার্থীর। এভাবেই এখন চলছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

এক টাকার আহার: গত ১৫ মে থেকে শুরু হয়েছে বিদ্যানন্দের নতুন কর্মযজ্ঞ এক টাকার আহার। কিশোর বলেন,খাবারের সঙ্গে ধর্মের সংশ্লিষ্টতা আমাকে কষ্ট দেয়, ইট শুড বি ফ্রি। আর আমি নিজেও একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবারের জন্য মন্দিরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি। তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল শিশুদের খাবার দেওয়ার। পেরুতে আমি দেখেছি,এক ডলার দিয়ে মানুষ খাবার কিনছে,বাকি টাকা সরকার সাবসিডি দেয়। সেখান থেকেই আমি এই উৎসাহ পাই, আর বিষয়টিকে যেন ভিক্ষা হিসেবে না দেখা হয় সেজন্য শিশুদেরকে এক টাকা দিয়ে খাবার কিনে নিতে হচ্ছে। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করেছে,কিন্তু এখন শিশুগুলোর মধ্যে অহংবোধ এসেছে। অনেকে আজ বাকিতে খাবার নিলেও কাল এসে টাকাটা দিয়ে যাচ্ছে-আমি এ জায়গাটাই বদলাতে চেয়েছিলাম,শিশুদের ভেতর ‘ভিক্ষা’ এবং দাতাদের মধ্যে ‘দান’ শব্দটি মোছার জন্য। আর প্রতিদিন এই এক টাকার আহার কর্মযজ্ঞ চলছে যেটাকে বড় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন কিশোর। প্রতিদিন বাজার করে নিজেদের রান্নাঘরে রান্না করে স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়ে যান চট্টগ্রামের ষোলশহর বস্তি, রেল স্টেশনের পাশে, ঢাকার গাবতলীতে। সেখানে শিশুরা কিনে নিচ্ছেন এই খাবার।

অারও পড়তে পারেন: আর্জেন্টিনার ২৩ বছরের খরা কাটাবেন মেসি?
দু
টি স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি: ১ টাকার আহার প্রজেক্টটিকে আরও বড় করতে চাই। বাংলাদেশ সরকার স্কুলগুলোতে খাবার দেবে এই স্বপ্ন দেখি। আর সরকার যদি না করে তাহলে আমি চেষ্টা করবো প্রতিদিন অন্তত ১ লাখ মানুষকে যেন খাবার খাওয়াতে পারি। তবে জানি না এই সংখ্যাটা আমি কবে পারবো, তবে আমি বিশ্বাস করি একসময়  না একসময় সংখ্যাটা ওখানে পৌঁছাবে, যদি আমি না পারি তাহলে অন্য কেউ হাল ধরবে। আরেকটি হচ্ছে, আমি সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাই। রামুতে একটি জায়গা পেয়েছি, ওখানে ইচ্ছা আছে প্রথমে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরে কলেজ, এরপর সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাই যদি সম্ভব হয়।খুব ছোট কিন্তু ব্যতিক্রমী কিছু হবে,যেখানে সুবিধাবঞ্চিতরা পড়বে। এটা হবে কী হবে না জানি না, তবে বলতে তো পারবো, চেষ্টা তো করলাম।

ফ্রেমে বাঁধা শৈশব: আমার নিজের শৈশবের কোনও ছবি নেই। আর তাই বিদ্যানন্দের উদ্যোগে একবার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ছবি সংরক্ষণের কাজ হাতে নিয়েছিলাম। ১০ হাজার শিশুর ছবি তুলে প্রিন্ট এবং লেমিনেটিং করে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল বিদ্যানন্দ।

চলছে এতিমখানার কাজ: এখন আমরা এতিমখানা তৈরির কাজে হাত দিয়েছি। কক্সবাজারের রামুতে ১৮ শতক জায়গা দিয়েছেন একজন আদিবাসী। পুরো জায়গাটিতে বাঁশঝাড় ছিল, এখন পরিষ্কার করার কাজ চলছে। থাকা খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে খরচ ধরেছি আমরা, কারণ ওখানে খাবার খরচ খুবই কম। শিশুরা ওখানে থাকবে আর বিদ্যানন্দে পড়বে।

তবে আমার জীবন থেকে একটি কথা আমি বুঝেছি, আমি কোনও রকমে যদি বলটাকে লাথি মারতে পারি, তাহলে কেমনে কেমনে যেন সেটা ঘুরতে থাকে-তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলেন তিনি। আর চাই, আমাকে দেখে যেন আরও কয়েকটি ’কিশোর’ এর সৃষ্টি হয়, তারা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অবহেলিত শিশুদের জন্য কাজ করবে এটাই স্বপ্ন-সব শেষে বলেন কিশোর।

/এমএসএম/

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ