যেমন হতে পারে জিয়া ও তামিমের এখনকার চেহারা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০৫:০৯, আগস্ট ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:২১, আগস্ট ০৫, ২০১৬

তামিম ও জিয়া

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার মাস্টার মাইন্ড হিসেবে পুলিশ সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ মো. জিয়াউল হক ও তামিম চৌধুরীকে শনাক্ত করেছে। তাদের ধরিয়ে দিতে বা তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিলে ২০ লাখ টাকা করে মোট ৪০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশের আশঙ্কা, গ্রেফতার এড়াতে জিয়া ও তামিম নিজেদের চেহারা পাল্টে ফেলতে পারে। ফলে পুরস্কার ঘোষণার পর তাদের সম্ভাব্য চেহারা কেমন হতে পারে সে বিষয়ে জনসাধারণকে ধারণা দিতে কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ।

সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর জিয়াউলের যে ছবিটি র‌্যাব ও পুলিশের ওয়ান্টেড তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাতে তার মুখে ঘন দাড়ি ও গোঁফ রয়েছে। এই দুর্ধর্ষ ব্যক্তি নাম পরিচয় পাল্টে ফেলার পাশাপাশি গ্রেফতার এড়াতে নিজের চেহারাতেও কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারে বলে পুলিশের ধারণা। তাই জিয়া যাতে সহজেই লুকিয়ে থাকতে না পারে সেজন্য তার সম্ভাব্য নতুন চেহারার ৫টি ছবি প্রকাশ করেছে। এগুলোর মধ্যে মূলত দেখানো হয়েছে মুখের দাড়ি-গোঁফ কেটে ফেললে বা পোশাক পাল্টে ফেললে তাকে কেমন দেখা যেতে পারে। জিয়ার চেহারার সম্ভাব্য পরিবর্তন আনা হয়েছে প্রথম ছবিতে পোশাকে। এখানে তাকে শার্ট পরলে কেমন দেখাবে তাই দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয় পরিবর্তিত চেহারায় দেখানো হয়েছে গোঁফ ছেটে ফেললে তাকে কেমন দেখাবে। তৃতীয় ছবিতে দেখানো হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মতো গোঁফ ছোট করে মাথায় টুপি পরলে তাকে কেমন দেখাবে। আর চতুর্থ পরিবর্তিত চেহারাটিতে দেখানো হয়েছে যদি জিয়া নিজের লুক একেবারে পাল্টে আধুনিক ফ্রেঞ্চকাটে দাড়িতে ছাট দেয় তাহলে তাকে কেমন দেখাবে। এ ছবিতে তার গোঁফ নেই এবং জ্যাকেট পরানো দেখানো হয়েছে। আর ৫ম পরিবর্তিত চেহারায় স্যুট-টাই পরা ক্লিন শেভড অবস্থায় জিয়ার চেহারা তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, তামিমের চেহারার যেসব সম্ভাব্য ছবি পুলিশ দিয়েছে তাতে প্রথম ছবিতে দেখা যায় চশমাপরা অবস্থায় ক্লিন শেভড মুখ। দ্বিতীয় ছবিতে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি থাকলেও চশমা নেই। তৃতীয় পরিবর্তিত চেহারায় তামিমের মুখ চশমা ছাড়া ও ক্লিন শেভড। চতুর্থ পরিবর্তিত চেহারায় মুখ ভর্তি ঘন দাড়ি, সঙ্গে আছে চোখে চশমা। ৫ম ছবিতে ঘন দাড়ি থাকলেও নেই চশমা।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২ আগস্ট) দুপুরে পুলিশ সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দুই ব্যক্তিকে নিউ জেএমবি নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তাদের ধরিয়ে দিতে প্রত্যেকের জন্য ২০ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। সেসময় তিনি জানান, মেজর জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষ নেতা। আর তামিম চৌধুরী নিউ জেএমবি’র নেতা।

তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক (মূল) জেএমবি গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় জড়িত ছিল না। মেজর জিয়া ও তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে জেএমবির একটি নতুন ভার্সন এই হামলা চালিয়েছে। তারাই এই হামলার মাস্টার মাইন্ড। এ হামলাগুলো ওই দুজনের নির্দেশনায় হয়েছে।’

পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জিয়া ও তামিমের বিস্তারিত পরিচয়ও তুলে ধরা হয়। পুলিশের তথ্য মতে, তামিমের পুরো নাম তামিম আহমেদ চৌধুরী। তার বাবা শফিক আহমেদ চৌধুরী, মা খালেদা শফি চৌধুরী। তাদের বাড়ি সিলেটের বিয়ানিবাজার থানার দোবাক (দুবাগ) ইউনিয়নের বড়গ্রাম সাদিমাপুরে। তামিমের বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর : এএফ-২৮৩৭০৭৬ ও পুরনো পাসপোর্ট নম্বর এল-০৬৩৩৪৭৮। তামিম চৌধুরীর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর : ১৯৮৬০০৯১২৪১০০১৩৪২। তার জন্ম ১৯৮৬ সালের ২৫ জুলাই। সর্বশেষ তিনি দুবাই থেকে ইত্তেহাত এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসেন ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর।

অন্যদিকে মেজর জিয়ার পুরো নাম সৈয়দ মো. জিয়াউল হক। তার বাবা সৈয়দ মো. জিল্লুল হক। তাদের বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুর গ্রামে। জিয়ার সর্বশেষ ব্যবহৃত ঠিকানা ছিল : পলাশ, ১২ তলা, মিরপুর, সেনানিবাস, ঢাকা। তার পাসপোর্ট নম্বর এক্স-০৬১৪৯২৩। জিয়ার বাবার বর্তমান ঠিকানা : বাড়ি নম্বর ৫১২ (৩য় তলা), রোড নম্বর-০৯, বারিধারা, ডিওএইচএস, ঢাকা।

এক সময় সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা ছিলেন তিনি জিয়া। তরতর করে ওপরে ওঠার সুযোগও ছিল তার। কিন্তু সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টায় পা বাড়ান তিনি। এরপর  ২০১১ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার খলনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান সবার কাছে। এ ঘটনায় তাকে বহিষ্কার করা হয় সেনাবাহিনী থেকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটনার পর থেকেই সৈয়দ জিয়াউল হক পলাতক রয়েছে। তাকে ধরার জন্য বিভিন্ন সময়ে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু আত্মগোপনে থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) আধ্যাত্মিক নেতা শাইখ জসিমউদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জিয়া। ধীরে ধীরে জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষপর্যায়ের একজন নেতা হয়ে ওঠে। সামরিক শাখার দায়িত্ব নেয় সে।এরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম কিলিং মিশন শুরু করে। গত বছর ঢাকার একাধিক ব্লগার ও লেখক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা জানতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরেই সবচেয়ে বেশি ব্লগার হত্যা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা এত বেশি নিখুঁতভাবে করা হয়েছে যে, ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতার কঠিন হয়ে পড়েছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটি)সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুন ব্লগার ও প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল হত্যা চেষ্টার মামলায় সুমন হোসেন পাটোয়ারী নামে এক আনসারুল্লাহ সদস্য আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ওই জবানবন্দিতে সুমন বলে, ‘উত্তরায় আমাদের আস্তানায় এক ‘বড়ভাই’ নিয়মিত আসতেন। ওই ‘বড়ভাই’ আমাদের সবার নেতা। ‘বড়ভাই’ আমাদের বলতেন, ‘আল্লাহর জন্য কাজ করতে হবে এবং নাস্তিকদের কতল করতে হবে’। তিনি আমাদের জানান, তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন এবং জিহাদের জন্য চাকরি ছেড়ে চলে এসেছেন। আমাদের নেতা বড়ভাইয়ের নাম ইশতিয়াক বলে শুনেছি।’

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, এই ইশতিয়াকই আসলে মেজর জিয়া। ইশতিয়াক তার সাংগঠনিক নাম। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকার সময় বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করে জিয়া।

অপরদিকে তামিম চৌধুরীকেই বাংলাদেশে সংগঠনের প্রধান বলে দাবি করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী তামিম চৌধুরীকেই বাংলাদেশের আইএস প্রধান আবু ইব্রাহিম আল-হানিফ বলে ধারণা করা হয়। ২০১৩ সালে তিনি কানাডা ছাড়েন। অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠী এবং আইএস-এর সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। চলতি বছরে আইএস-এর কথিত প্রপাগান্ডা ম্যাগাজিন দাবিক-এ তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, তামিম জেএমবি-র একাংশের প্রধান। অপর অংশের নেতৃত্বে আছে সাইদুর রহমান।

এর আগে সোমবার (১ আগস্ট) ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে  পুলিশের আইজিপি শহীদুল হক জানিয়েছিলেন, ‘‘গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোঁরায় হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তামিম চৌধুরী গ্রেফতার এড়াতে ভারতে আত্মগোপন করে থাকতে পারে, এ সম্পর্কে ইতিমধ্যে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আমরা সতর্ক করেছি।’’

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ আইজিপি শহীদুল হক ভারত সফর করেন। এ সময়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তামিম চৌধুরীর বিষয়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) এবং সিবিআই-কে সতর্ক করার পর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তামিমের অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলেও শহীদুল হক জানান।

তিনি আরও বলেছিলেন, তামিম চৌধুরী বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মূল ব্যক্তি হতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত জঙ্গি হামলাগুলোয় আইএস-এর কোনও সংযুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আইজিপি শহীদুল হকের সফরসঙ্গী এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর এই নতুন অংশ আইএস-এর সঙ্গে যুক্ত হয় বছর তিনেক আগে। একইভাবে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি জঙ্গি সংগঠন।

/জেইউ/এএ/টিএন/

আরও পড়ুন: নিউজ পোর্টালসহ ৩৫টি ওয়েবসাইট বন্ধ

লাইভ

টপ