ব্লগার ও জঙ্গিরা সমাজ ও মানবতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে: আইজিপি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৫:০৩, আগস্ট ০৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩০, আগস্ট ০৬, ২০১৬

প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে আইজিপি শহীদুল হক

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, ‘ব্লগার ও জঙ্গিরা সমাজ ও মানবতার ব্যতয় ঘটাচ্ছে। ব্লগাররা ইসলামকে তাদের মুক্তচিন্তার বিষয় বানিয়ে লেখনীর মাধ্যমে আর জঙ্গিরা মানুষ হত্যা করে এই কাজ করে যাচ্ছে।’ এ সময় কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের বিপথগামী করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন : কমিউনিটি পুলিশিং ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

আইজিপি বলেন, ‘তারুণ্যের বহুমুখী বিকাশ ঘটছে। তারুণ্যের বিকাশে কোনও বাধা নেই। আজকের তরুণরা আইটি সেক্টরসহ প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে তা সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু, এই তরুণদের কেউ কেউ আবার জঙ্গি সংগঠনে সম্পৃক্ত হচ্ছে, অন্য একটি অংশ মুক্তচিন্তার অনুশীলন করছে। মুক্ত চিন্তা ভালো। তবে অতিরিক্ত মুক্তচিন্তা করতে গিয়ে তারাও বিপদ ডেকে আনছে যা ব্লগাররা করে থাকে। ধর্মকে, ইসলামকে তারা তাদের মুক্তচিন্তার বিষয় হিসেবে নিয়ে তা বিকৃত করে ধর্মের বিরুদ্ধে এবং নবীজীর (সা.) বিরুদ্ধে যেভাবে কটূক্তি, কদাচার করছে যেগুলো ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তনশীল।এটা যুগে যুগে হয়ে থাকে, এটা রোধ করা যায় না। আপনার, আমার সকলের অবচেতন মনেই এই সামাজিক পরিবর্তন হয়ে থাকে। এই সামাজিক পরিবর্তনে যে ডাইভারসিটি (বৈচিত্র্য) আসে, এই ডাইভারসিটির পরম্পরায় বিভিন্ন চিন্তা-চেতনার লোক যুক্ত থাকায় সুস্থ স্বাভাবিকতার বিকাশে অনেক সময় ব্যতয় ঘটে। যেমন, আমাদের ব্লগাররা লেখনীর মাধ্যমে মুক্তচিন্তার নামে ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে অনেক কিছুর ব্যতয় ঘটাচ্ছে, আবার জঙ্গিরা মানুষ হত্যা করে সমাজের, রাষ্ট্রের ও মানবতার ব্যতয় ঘটাচ্ছে।এটাই হচ্ছে ডিফারেন্স।’ 

বয়োজ্যেষ্ঠরাই জঙ্গিবাদের দিকে তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে শহীদুল হক বলেন, ‘শায়খ আব্দুর রহমান কিন্তু তরুণ ছিলেন না, বাংলা ভাই ও মুফতি হান্নানও তরুণ নন। তারাই বিপথে টেনেছিলেন তরুণদের। কথা হচ্ছে, আমাদের তরুণরা কেন বিপথে যাচ্ছে? সরাসরি জান্নাতের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের জঙ্গিবাদে নেওয়া হচ্ছে।’

জঙ্গিরা কোনও তথ্য দিতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পেয়েছি। তারা খেলাফত কায়েম করতে চায়। তারা মানুষের সৃষ্টি সংবিধান মানে না। তাদের জিহাদ করতে হবে। তারা মুরতাদ, মুশরেক, মুনাফেক ও কাফেরের বিরুদ্ধে জেহাদ করবে। তারা সবাইকে এই কাতারে নিয়ে আসছে। যে ধর্ম পালন করে, পরকালে বিশ্বাস করে, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে তাদেরও তারা কাফের বানাচ্ছে। তারা তাবলিগকেও মুনাফেক বলছে। এখন এদেরকে বলা হচ্ছে এই চার শ্রেণির মানুষকে হত্যা কর তাহলে এটা হবে জিহাদ। আর জিহাদ করে যদি তোমার মৃত্যু হয় তুমি সরাসরি জান্নাত যাবে। তোমার কোনও বিচার নেই। এই জান্নাতের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের জিহাদি বানানো হচ্ছে।এভাবেই তারা মুসলমানদেরও হত্যা করছে।’

আইজিপি বলেন, ‘যারা তাদের বোঝাচ্ছে তারা এসব তরুণদের হিপনোটাইজ (মোহাবিষ্ট) করে ফেলেছে। যখন তারা গ্রেফতার হয় তখন তারা আর বাঁচতে চায় না। তারা বলে, আমাদের মেরে ফেলেন। তারা নিজেদের তাগদিক শক্তি বলে, আমাদের বলে মুরতাদ। তারা বলে আমরা বেহেস্তে যাবো, আপনারা জাহান্নামে যাবেন। আমরা দুই একজনকে বলেছি, তোমরা ভুলপথে আছো, তুমি মানুষের কাছে স্বীকার কর। কিন্তু তারা ভুল স্বীকার করে কোনও বক্তব্য দিতে চায় না। ওদের এই যে মোটিভেশন, এই মোটিভেশনের জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। একবার মোটিভেটেড হলে আর ফেরানো যায় না। তারা কোনও তথ্য দিতে চায় না। এজন্য আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের আবেগের সম্পর্ক চালিয়ে যেতে হবে। তীক্ষ্ম নজর রাখতে হবে। সন্তান সারাদিন কম্পিউটারে কী করে তাও খেয়াল রাখতে হবে।’

আইজিপি আরও বলেন, ‘যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তান লেখাপড়া করে সেখানেও কিছু সুযোগ সুবিধা রাখতে হবে, যাতে তরুণদের মেধা সুপথে বিকশিত হয়।’

আইজিপি বলেন, ‘গুলশান ঘটনার পর মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। যে মহল আমাদের তরুণদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

শহীদুল হক বলেন, ‘ইসলামের ব্যাখ্যা দিয়ে আজকে জঙ্গিরা অন্যধর্মের মানুষকে হত্যা করছে। কিন্তু তাদের এই ব্যাখা একদম ভুল। নিজেদের বানানো। এটা ইসলামের অপপ্রচার। মিথ্যা কথা।’

আইজিপি বলেন, মদিনা সনদের মাধ্যমে সব ধর্মের মানুষ সেখানে একসঙ্গে বসবাস করেছে। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) যখন মক্কা জয় করেন, তখন তিনি অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করেননি। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অন্য ধর্মের মানুষের দেওয়া সব শর্ত মেনে নেন মহানবী (সা.)। কিন্তু, ওরা (জঙ্গি) কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। একটা জঙ্গি অষ্টম শ্রেণি পাশ। সে কোরআন পড়তে পারে না, সুরার এক এক লাইন তারা পড়ে এসব শিখছে। কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।’

এই প্রবণতা বন্ধে শুদ্ধ ইসলামের প্রচারের জন্য আলেম সমাজকে এগিয়ে আসার তাগিদ দেন তিনি।

আইজিপি বলেন, জঙ্গিবাদ ইসলামের সমস্যা না, বৈশ্বিক সমস্যা। সমাজের সব ধর্মের সব মানুষকে এ সমস্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে । জঙ্গিরা মুসলমান হয়ে মুসলমানকে হত্যা করছে। এটি ইসলামের বিরুদ্ধেও একটা ষড়যন্ত্র। ইহুদি, নাসারা এই ষড়যন্ত্র করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা যদি মনে করি এখন যা ঘটে সব সরকারের বিপক্ষে যাবে, এটা ভেবেও আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। আপনি যদি দেশকে ভালোবাসেন, তাহলে আপনার নিজের জায়গা থেকে কাজ করুন। জাতীয় ঐক্য বলতে কি বোঝানো হচ্ছে? এক সঙ্গে বসে তারপর আলোচনা করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে এমন না। যে যেখানে আছেন, সেখানে থেকেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।’

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমাদের মনোবল দুর্বল হয়নি। আমরা মনোবল শক্ত রেখেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবো।

আলোচনায় আরও অংশগ্রহণ করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সফিকুর রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার ও প্রধান তথ্য কর্মকর্তা একেএম শামীম চৌধুরী প্রমুখ।

/এআরআর/টিএন/

লাইভ

টপ